page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

অতি-রাবীন্দ্রিক বাঙালী

একটু ইতিহাসের কথা বলি। কথ্যভাষায় আমাদের “সাম্প্রতিকতম উপন্যাস।”

বাঙালিদের সব চেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে অতিরিক্ত রাবীন্দ্রিকীকরণ করে। অনেকে ভুরু কুঁচকোবেন। অনেকে বাক্রুদ্ধ হবেন। অনেকে ভাববেন আঁতলামো। তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। আমি অনেক ভেবেছি। এই যে প্রতিটি টিভি শোতে রবীন্দ্রনাথ, এবং রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর সব কিছু গৌণ, এতে আমাদের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে।

যে কোনো প্রোগ্রাম দেখুন, যে কোনো চ্যানেল দেখুন, যে কোনো রেডিও স্টেশন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কিছু প্রায় নেই। যেন রবীন্দ্রনাথের আগে বাঙালির যে হাজার বছরের ইতিহাস, সেই ধর্মপাল, চৈতন্যদেব, বারো ভূঁইয়া, মনসামঙ্গল, লালন, সিরাজ, গ্রাম বাংলা, বৈষ্ণব পদাবলী, কীর্তন বাউল—সব মিথ্যে। একমাত্র সত্য রবীন্দ্রনাথ। স্বয়ং বিশ্বকবি এমতবস্থায় তিনবার ভিরমি খেয়ে সাতবার মূর্ছা যেতেন। নয়তো এই সমাজের মাথায় চড়ে বসা সাংস্কৃতিক গুরু আর গুরুমাদের চাবকাতেন।

parthabondo-logo

আমার ধারণা এই ব্যাপারটা মিডিয়া টেকওভার করেছে ১৯৬১তে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী থেকে। এর আগেও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাড়াবাড়ি হত। বোধহয় ১৯১৩তে নোবেল পুরস্কার পাবার পর থেকে রবীন্দ্রনাথকে এই সর্বশ্রেষ্ঠ কালচারাল আইকন হিসেবে শিক্ষিত বাঙালি ভেবে নিয়েছে। একটা ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে যে নোবেল প্রাইজই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। বাঙালি বোধ হয় নোবেল প্রাইজের নাম তার আগে শোনেই নি, ফলে পশ্চাদদেশ উল্টে পড়েছে।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ – ১৯৪১), শান্তিনিকেতনে।

এর আগেই ব্রিটিশ শাসক একশো বছরেরও বেশি সময়ে পেয়েছে বাঙালিকে বোঝাতে যে তোমাদের আসলে কিছুই নেই। না আছে ইতিহাস, না আছে ধর্ম, না আছে অর্থ, না আছে সংস্কৃতি। ম্যাকলে, চার্চিল এরা সব অনেক দিন ধরেই মগজধোলাই করেছে। আগে সুবিধে করতে পারে নি, কারণ হঠাৎ বিবেকানন্দ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর এরা সব বিশাল বিশাল স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন সেই ব্রিটিশ রাজশক্তির কাছ থেকেই। বিবেকানন্দ আবার আমেরিকা। ইংরেজ মুশকিলে পড়েছিল। জগদীশ বোসের নোবেল প্রাইজ আটকে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজটা একদিক থেকে ব্রিটিশদের একটা শাপে বর হয়ে গেল। মধ্যবিত্ত, শহুরে বাঙালি বিশেষ কিছু না করেই কংগ্রেস ও গান্ধীর দাক্ষিণ্যে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতের নেতা হয়ে বসেছিল। যারা জীবন দিয়েছিল, তারা ততদিনে ইতিহাসের পাতায়। সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা—তখনই বাঙালি ভাবতে শুরু করেছে মহাত্মা, দেশপ্রাণ এরাই সব আমাদের আসল স্বাধীন ভারতের নেতা। নেহেরু। গান্ধী আগেই সুভাষ বোসকে দেশছাড়া করেছে। বাঙালি ততদিনে একটা মেরুদণ্ডন্যুব্জ জাতি।

(ইতিহাসের ক্রনোলজি একটু এদিক ওদিক হয়ে গেল? তাহলে আপনি ঠিক করে নিন। আমার ব্যাপারটা ঠিকই আছে। শুধু কি তাই? দু চারটে ভুলভ্রান্তিও থাকতে পারে। ঠিক করে নিন। কৃতার্থ হব।)

১৯১১। বাংলা একবার ভাগ হয়ে গেছে, এবং রাজধানী চলে গেছে কলকাতা থেকে দিল্লি। ১৯১৩। এই সময়ে এলো নোবেল প্রাইজ। বাঙালি নিজে থেকেই যত না ভেবেছে, ব্রিটিশ ও ইউরোপিয়ান শক্তি, এবং তারাই তখন পরাশক্তি, তারা বাঙালির মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মিয়ে দিল এই গীতাঞ্জলিই এখন তোমাদের গীতা বাইবেল কোরান। অবশ্য হার্ডকোর কোরান অনুসারীরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কখনই তেমন করে মাতামাতি করে নি। করেছে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত হিন্দু বাঙালি। এবং তাদের হাতেই তখন বাংলার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক চাবিকাঠি। তারা নেহরুর কোটটেল ধরে, বা বলা যেতে পারে গান্ধীর দুর্বল লাঠি ধরে, বাংলাকে ভাগ করে দিল, এবং সেই থেকে আমাদের সংস্কৃতির আকাশে শুধুই একটি ‘জীবনের ধ্রুবতারা’।

পূর্ব বাংলা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সঙ্গে নজরুল, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে লোক ও গ্রামীণ শিল্প সংস্কৃতি অনেক বেশি ধরে রেখেছে, এবং তার প্রধান কারণ বোধহয় গরিব মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য। ওরা বেঁচে গেছে। রবীন্দ্রনাথকে ওরা আমাদের পশ্চিম বাংলা থেকে অনেক বেশি করে চিনেছে, কিন্তু তাঁকে শুধু গীতাঞ্জলি গীতবিতানের সোনার খাঁচার মধ্যে ধরে রাখে নি। আর রবীন্দ্রনাথই একমাত্র সত্য পথের দিশারী—এই ভাবনা ভেবে সুখনিদ্রা দেয় নি।

tagore-monomohan

নয়া দিল্লীর পার্লামেন্ট লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি উন্মোচন উপলক্ষে মূর্তির পায়ে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করছেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। সাল ২০০৫, ৭ ডিসেম্বর, বুধবার।

একটা অরা সৃষ্টি করা হয়েছে সমস্ত মিডিয়া জুড়ে। একটা পরিবেশ। একটা আবহ। এমন ভাবে সেটা করে চলেছে মিডিয়া—বিশেষ করে টিভি ও রেডিও—যাতে অন্য সমস্ত প্রোগ্রাম, অন্য সমস্ত আলোচনা সেই আবহ, বাতাবরণ মেনে হয়ে চলেছে। যেন একটা অনুচ্চারিত সতর্কবাণী—রবীন্দ্রনাথ এবং শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, এক বিশেষ ধরনের রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্য কিছু করা চলবে না, তাহলেই তা শালীনতাবিরোধী হবে। মাঝে মাঝে মিষ্টি মিষ্টি নজরুল, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল হবে, দু চারটে গ্রামের ‘লোকগীতি’ হবে, আর ভক্তিমূলক গান হবে প্রচুর। কিন্তু গানে, কবিতায়, নাচে, কোনকিছুতেই ‘অ-রাবীন্দ্রিক’ কিছু করা চলবে না। কবীর সুমন জাতীয় কেউ তারা, আকাশ বা ওই সব চ্যানেলে এলেও তাঁরা শুধু ‘মাথা নত করে চরণধূলার তলে’ মনোভাব এবং মুখভঙ্গী নিয়ে তাঁদের কর্তব্য করে যাবেন।

রবীন্দ্রনাথকে অতি আংশিক ব্যবহার করে, কুক্ষিগত করে সাংস্কৃতিক এক মানদণ্ড তৈরি করা হয়েছে বাঙালিদের জন্যে। বাঙালির মেরুদণ্ড আগেই গেছিল, বা জোর করে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল গান্ধী, নেহেরু, প্রফুল্ল সেন, জ্যোতি বসু, সিদ্ধার্থ রায়ের কল্যাণে। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপারে মেরে কেটে শেষ করেছে। এপারে নকশাল বা ওই জাতীয় ‘হিংস্র’দের খতম, তাদের থেকে হাজারগুণ বেশি হিংসা দিয়ে।

রাষ্ট্রযন্ত্র শান্তি কায়েম করেছেন। দুর্মুখেরা বলে, শ্মশানের শান্তি।

এখন বাঙালিদের শেষ সম্বল, বাঙালির শেষ লেংটি, অর্থাৎ মগজ ও চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণ, নতুন পথের সন্ধানের রাস্তাটাও বন্ধ। শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবী নিজের গড়া ধূসর রঙের কুয়োতে অন্ধকার রঙের ব্যাঙের মত বসে আছেন, এবং নিজের নিজের পেট ফুলিয়ে কে কত বড়, তার প্রতিযোগিতায় আত্মহারা হয়ে আছেন। নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন।

সে নেশার মাদক যোগাচ্ছেন সমাজ ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহকেরা। তাঁরা বলেছেন, কেবল রবীন্দ্রনাথ। এবং, কেবল এক ধরনের মিষ্টি, মধুর রবীন্দ্রনাথ।

সেখানে ‘ভালো মানুষ নই রে মোরা’ গাওয়া চলবে না। সেখানে মৃণাল পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতি চরম ঘৃণায় ঘর ছেড়ে চলে যাবে না কখনই। সেখানে দেশে দেশে নিন্দে যেন না রটে। আর বিপদ যেন একেবারেই না ঘটে।

সেখানে অযাত্রাতে নৌকো ভাসানোর সাহস যেন কোনো বাঙালির আর না হয়।

ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক, ২রা জুন, ২০১৬

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে আত্মজীবনী 'ঘটিকাহিনি'র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee