page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

অন্ধবিশ্বাসী, মৌলবাদী ও প্রতারক মাদার তেরেসাকে মহিমান্বিত করেছেন পোপ

ক্রিস্টোফার হিচেন্সের লেখায় মাদার তেরেসার ‘মহিমান্বিত’ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বিপরীত ধারণা পাওয়া যায়।  বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে মাদার তেরেসার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠতা, অনৈতিক অর্থ গ্রহণ, অতি রক্ষণশীল বক্তব্য, দারিদ্র টিকিয়ে রাখার প্র্যাকটিস সহ বিভিন্ন বিষয় এনেছেন লেখক।

ক্রিস্টোফার হিচেন্স

অনুবাদ: আশরাফুল আলম শাওন

আমার ধারণা ম্যাকাউলেই বলেছিলেন, নিজেদের অন্ধবিশ্বাস এবং সেই অন্ধবিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতার কারণে রোমান ক্যাথলিক চার্চ কৃতিত্বের দাবিদার এবং তাদের এই ব্যাপারটি অনেক দিন টিকে থাকবে। এটা আসলে অনেক সিরিয়াস সময়ে করা এক ধরনের টিটকারিমূলক প্রশংসা। নিজেকে ‘মাদার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এক নারীকে ভ্যাটিকানের ‘বীটিফিকেশন’ করার ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। বিষয়গুলি হলো সেই নারীর আংশিকভাবে চার্চের কাছে, শোবিজের শক্তির কাছে, কুসংস্কারের কাছে ও জনপ্রিয়তার কাছে শোচনীয়ভাবে আত্মসমর্পণ।

ভ্যাটিকান এই ব্যাপারে আসলে একটি আলোড়ন তৈরি করেছিল এবং এই আলোড়নটিই সবার আগে চোখে পড়ে। ভ্যাটিকানের প্রচলিত নিয়মে কারো মৃত্যুর পর পাঁচ বছরের আগে সেই ব্যক্তিকে ‘সেইন্টহুড’ প্রাপ্তির প্রথম ধাপ ‘বীটিফিকেশন’ এর জন্য মনোনীত করা যাবে না। এর কারণ হল কোনো ব্যক্তির সেইন্টহুড প্রাপ্তি যাতে কোনো ক্ষমতা অথবা সেই ব্যক্তির জনপ্রিয়তা দ্বারা প্রভাবিত না হয়। ১৯৯৭ সালে মাদার তেরেসার মৃত্যুর এক বছর পরেই তাকে ‘বীটিফিকেশনের’ জন্য মনোনীত করেন পোপ। এই ব্যাপারে ভ্যাটিকানের আরেকটি প্রচলিত নিয়ম হলো কারো সেইন্টহুড প্রাপ্তিকে পরীক্ষা করতে ‘ডেভিল’স অ্যাডভোকেট’ বা ‘শয়তানের উকিল’ নামের পদ্ধতি। এর অর্থ হলো সেই ব্যক্তি সম্পর্কে সতর্কভাবে ও বিশদভাবে আরো তদন্ত করা। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় পোপ এই নিয়মগুলি বাতিল করে দিয়ে তাড়াতাড়ি কিছু ‘সেইন্ট’ তৈরি করেন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ষোড়শ শতাব্দীতে বর্তমান পোপের পুর্বসূরীরা নিয়ম ভেঙে তাড়াতাড়ি যত বেশি ‘সেইন্ট’ বানিয়েছিলেন এই পোপ তার চেয়ে বেশি সংখ্যক সেইন্ট দ্রুত বানিয়েছেন।

যে ‘অলৌকিক’ ব্যাপারটি প্রমাণিত হওয়ার কথা ছিল সে সম্পর্কে আপনাদের কোনো ধারণা আছে? এই নিশ্চিত প্রতারণার ঘটনাটিতে কোনো সম্মানীয় ক্যাথলিক অবশ্যই লজ্জা পাবেন। মনিকা বেসরা নামের একজন বাঙালি নারী দাবি করেন মাদার তেরেসার ছবি থেকে আলো বের হচ্ছিল। তিনি বলেছেন তার বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে এবং এর ফলে তার একটি ক্যান্সারাস টিউমার ভালো হয়ে যায়। অথচ মনিকার চিকিৎসক ড. রঞ্জন মুস্তাফি বলেছেন, প্রথমত তার কোনো ক্যান্সারাস টিউমার ছিল না এবং যক্ষার কারণে তার শরীরে যে একটি বড় গুটি ছিল সেটা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদী ওষুধের কারণে ভালো হয়। ভ্যাটিকানের তদন্তকারীরা কি সেই চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন? না (এই ঘটনার ফলে তারা আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল কিন্তু খুবই তাচ্ছিল্যের সাথে। সাধারণত সন্দেহকারীদের সাথে আলোচনা হওয়ার কথা, এবং এই ক্ষেত্রে নামে মাত্র একটি আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছিল)।

প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সঙ্গে, হোয়াইট হাউজে, ১৯৮৫ সালে।

ইতালিয়ান সংবাদপত্র এল’ইকো ডি বার্গামোতে প্রকাশিত একটি স্বচ্ছ রিপোর্ট বলা হয়েছে, জুনে পোপের হয়ে ভ্যাটিকান স্টেটের সেক্রেটারি সিনিয়র কার্ডিনালদের একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জানতে চেয়েছিলেন এখনই তারা মাদার তেরেসাকে সেইন্ট বানাতে রাজি আছেন কিনা। পোপের পরিষ্কার উদ্দেশ্য ছিল মাদার তেরেসাকে তাড়াতাড়ি সেইন্ট বানানো যাতে পোপের জীবদ্দশায়ই এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায়। ক্যানোনাইজেশনের সময় অ্যাডভোকেটের দায়িত্ব পালন করা কানাডিয়ান প্রিস্ট ফাদার ব্রায়ান কোলোডিয়েজচাকের মতে, তাদের সবার প্রতিক্রিয়া ছিল নেতিবাচক। কিন্তু প্রক্রিয়াটির মধ্যে এ রকম অসততা থাকার কারণে ক্ষতি যা হওয়ার তা ততক্ষণে হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিল এর উপর আলোচনার সময়ে পোপ জন ত্রয়োবিংশের অধীনে পুনর্গঠনের সব প্রস্তাবের বিরোধীতা করার একটি বিষয় ছিল মাদার তেরেসা। তাদের প্রয়োজন ছিল মতবাদ বা নিয়মগুলি বারবার সামনে না এনে বেশি বেশি কাজ এবং বেশি বেশি বিশ্বাস দেখানো, এবং মাদার তেরেসা সেটা করতে পেরেছিলেন। এমনকি অর্থডক্স ক্যাথলিক ব্যাপারেও মাদার তেরেসার অবস্থান ছিল খুব বেশি প্রতিক্রিয়াশীল এবং মৌলবাদী ধরনের। খাঁটি ক্যাথলিকেরা আসলে অ্যাবরশনকে ঘৃণা করত এবং এটা বাদ দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদেরকে এত জোরালোভাবে বলার দরকার ছিল না যে অ্যাবরশন একটি বড় শান্তি নষ্টকারী ব্যাপার। মাদার তেরেসা নোবেল শান্তি পুরষ্কার গ্রহণ করার সময়

প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে মাদার তেরেসা, নিউ ইয়র্ক ১৯৯৭

বুদ্ধি বিবেচনা হারিয়ে ফেলা উপস্থিত দর্শকদের কাছে এই ব্যাপারটি দারুণভাবে জাহির করেছিলেন। ক্যাথলিকেরা একইরকমভাবে ডিভোর্সকেও ঘৃণা করতে ও তা বাদ দিতে চেয়েছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে তাদের জোর করার প্রয়োজন হয় নি যে রাষ্ট্রের সংবিধান ডিভোর্স এবং আবার বিয়ে করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আয়ারল্যান্ডে একটি ইশতেহারে মাদার তেরেসা এমন দাবি করেছিলেন (যেখানে তার দল খুবই শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছিল)। অথচ ওই বছরই পরে এক সময় লেডিস হোম জার্নালকে তিনি বলেছিলেন, তার বন্ধু প্রিন্সেস ডায়ানার ডিভোর্সে তিনি খুশি হয়েছেন কারণ এটা সুখী সম্পর্ক ছিল না…।

এটা আমাদের মধ্যযুগে চার্চের দুর্নীতিগুলির কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন চার্চ ধনীদের কাছে সুবিধা বিক্রি করত আর গরীবদের কাছে নরকের আগুন ও সংযম বিক্রি করত। মাদার তেরেসা দরিদ্রের বন্ধু ছিলেন না। তবে তিনি ছিলেন দারিদ্র্যের বন্ধু। তিনি বলতেন জীবনে কষ্ট ভোগ করা হলো ঈশ্বরের দেওয়া উপহার। তিনি সারাজীবন পার করেছেন দারিদ্র্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়টির বিরোধিতা করে। সেই কার্যকর উপায়টি হলো নারীর ক্ষমতায়ন এবং শুধু সন্তান জন্মদানের জন্য ব্যবহৃত হওয়া থেকে নারীকে বের করে আনা। মাদার তেরেসা খারাপ ধনীদের বন্ধু ছিলেন। হাইতির নিষ্ঠুর ডুভালিয়ার পরিবারের কাছে থেকে অনৈতিক টাকা নিয়েছিলেন (বিনিময়ে তাদের শাসনের প্রশংসা করেছিলেন তিনি) এবং লিংকন সেভিংস অ্যান্ড লোন কেলেঙ্কারীর চার্লস কীটিং-এর কাছ থেকেও টাকা নিয়েছিলেন। সেইসব টাকা এবং অন্যান্য ডোনেশনগুলি কোথায় গেল? কলকাতায় পুরোনো আশ্রমটি তিনি মারা যাওয়ার পরও আগের মতই ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। তিনি যখন অসুস্থ হন তখন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্লিনিকে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার আশ্রম সবসময়ই আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কিন্তু আমরা জানি তিনি দাবি করেছিলেন তিনি একশটিরও বেশি দেশে পাঁচশরও বেশি আশ্রম খুলেছেন, এবং সবগুলিই তার নিজের সংঘের নামে খুলেছিলেন। আমাকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু এটা কি ভদ্রতা এবং বিনয়?

ধনী বিশ্বের একটি নিম্নমানের বিবেক আছে। খুবই অসহায় ও গরীব মানুষের জন্য কাজ করছে এমন একজন মহিলার কাছে টাকা পাঠানোর মাধ্যমে অনেক ধনীই নিজেদের অস্বস্তি দূর করতে চেয়েছে। মানুষ স্বীকার করতে পছন্দ করে না যে তাদেরকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে। ফলে এই সুযোগে মাদার তেরেসার মিথকে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ একটি অলস গণমাধ্যম কখনোই আসল ঘটনা তলিয়ে দেখার মত প্রশ্ন করে নি। কলকাতায় যাওয়ার পরেও অনেক স্বেচ্ছাসেবীই মিশনারিজ অব চ্যারিটির দারিদ্র্যের প্রতি ভালোবাসার আসল বাস্তবতা ও কঠোর আদর্শবাদ দেখে আশাহত হয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু তাদের গল্প শোনানোর জন্য কোনো শ্রোতা তারা পায় নি। জর্জ অরওয়েলের লেখায় গান্ধীর প্রতি তার তিরষ্কার ছিল এরকম—সেই সাধু লোকটি নিষ্পাপ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে দোষী মনে করতেন—ফলে তিনি তদন্তের ঊর্ধ্বে, নরম হৃদয়ের, স্থির বুদ্ধির এইসব প্রোপাগান্ডার নায়াগ্রা জলপ্রপাতে ডুবে গিয়েছিলেন।

অন্যান্য গরীব দেশের মতই ভারতের জন্য অনেক অভিশাপের একটি হলো হাতুড়ে ডাক্তার। সে রোগীকে অলৌকিকভাবে রোগ ভালো হওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঠকায়। রবিবার এইসব হাতুড়ে ডাক্তারদের জন্য খুব ভালো একটি দিন। তারা দেখেছে তাদের এই অকার্যকর পদ্ধতি হিজ হোলিনেস (পোপ) গ্রহণ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেগুলি কম বেশি প্রচারণা পেয়েছে। বিশেষ কোনো দাবি করতে হলে তা প্রমাণ করার দরকার হয় এবং যা প্রমাণ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত করা যায় তা আবার প্রমাণ ছাড়া বাতিলও করে দেওয়া যায়—তারা যুক্তির এই প্রাথমিক ব্যাপারটিই ভুলে গিয়েছিল। তাছাড়া আমরা চরম মতাদর্শিক, অন্ধবিশ্বাসী এবং একজন মাঝারি মানের মানবিক ব্যক্তিত্বের পূজা করে তাকে অনেক উঁচুতে স্থান দেওয়া ও প্রতিষ্ঠিত করা ও তার ফলে কি হয় সেটা এখানে দেখতে পাই। মাদার তেরেসার কারণে অনেক বেশি মানুষ গরীব এবং অসুস্থ। এমনকি তার মতাদর্শ অনুসরণ করা হলে আরো অনেক মানুষ গরীব এবং অসুস্থ হবে। তিনি একজন অন্ধবিশ্বাসী, একজন মৌলবাদী, একজন প্রতারক। এবং যারা নিষ্পাপদের সাথে প্রতারণা করে একটি চার্চ সাংগঠনিকভাবে তাদের রক্ষা করে। এটি আমাদের স্পষ্টভাবে দেখায় নৈতিক এবং এথিক্যাল প্রশ্নে এই ভ্যাটিকান আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।

সংশোধন, অক্টোবর ২১, ২০০৩: এই লেখায় দাবি করা হয়েছে মাদার তেরেসা তার নোবেল শান্তি পুরষ্কারের বক্তৃতায় বলেছেন বিশ্বের শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি গর্ভপাত ও গর্ভনিরোধ। কিন্তু সেই বক্তৃতায় মাদার তেরেসা আসলে গর্ভপাতকে ‘শান্তির জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক’ বলেছেন। এবং প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পরিবার পরিকল্পনার প্রশংসা করা ছাড়া গর্ভনিরোধ নিয়ে বেশি আলোচনা করেন নি।

ক্রিস্টোফার হিচেন্স
ক্রিস্টোফার হিচেন্স ব্রিটিশ-আমেরিকান লেখক, দার্শনিক ও সাংবাদিক। তিনি অনেক বিতর্কিত আলোচনা সামনে এনেছেন। ব্রিটেনের হ্যাম্পশায়ারে ১৯৪৯ সালের ১৩ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পুরো নাম ক্রিস্টোফার এরিক হিচেনস। যুক্তির মাধ্যমে বিতর্ক তৈরি করার জন্য হিচেনস বেশ বিখ্যাত। দি টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট, দি ভ্যানিটি ফেয়ার, দি ন্যাশন, নিউ স্টেটসম্যান সহ বিভিন্ন বিখ্যাত পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন হিচেনস। হিচেনস-এর বিখ্যাত কয়েকটি বই এর নাম হলো হোয়াই অরওয়েল ম্যাটারস, থমাস জেফারসন : দি অথর অব আমেরিকা, গড ইজ নট গ্রেট, দি মিশনারী পজিশন : মাদার তেরেসা ইন থিওরী অ্যান্ড প্র্যাকটিস

২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর হিচেনস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।