page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

অল ঘোড়া কন্ট্রোল (৪)

শুরুর কিস্তি  আগের কিস্তি

অধ্যায় ৪

১.

স্যামুয়েল পুরা রকেটের মতো ড্রাইভ করছে।

আমি স্যামুয়েলকে বলি, ডিস্কো শফির সাথে খারাপ ব্যাবহার করা উচিত হয় নাই। ডিস্কো শফি প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছে।

স্যামুয়েল বলে, ডিস্কো শফি না। বেঈমানি করছে মঞ্জু।

আমি জিজ্ঞাসি, শিউর?

স্যামুয়েল একটু ভেবে বলে, অবশ্য ডিস্কো শফিও খবর দিতে পারে। শিউর না।

আমি বলি, খালাতো ভাই, ঘোড়া ডিঙায়া খাস খাওয়া ঠিক না।

স্যামুয়েল বলে, কী ঘাস-টাস ব্রো! আমি তো ঘোড়াই জবাই কইরা খায়া ফেলি।

আমি জিজ্ঞাসি, এখন কী করবা? টাকা কেমনে ম্যানেজ করবা? চাকরি কেমনে ম্যানেজ করবা? মারজিয়ারে কেমনে বিয়া করবা?

স্যামুয়েল বলে, সব অটো হয়ে যাবে। অল ঘোড়া কন্ট্রোল।

স্যামুয়েল হুদাই ফাঁকাফাঁকি করে। জীবনে বড় হবার এত বড় সুযোগ সে দুই দিন না যেতেই হারিয়ে ফেলেছে ছয় সাত মিনিট আগে। আমি এই নভেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব হতাশ।

নভেল চালিয়ে নিতে আমি স্যামুয়েলকে জিজ্ঞাসি—অল ঘোড়া কন্ট্রোল এই কথাটা তুমি কার কাছ থেকে শুনছ?

পাঁচ ছয় বছর আগে স্যামুয়েল ঘুরতে গিয়েছিল ঢাকায়। পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ধানমণ্ডি সাতাশে অবস্থানরত এক চিটাগোনিয়ান বন্ধুর বাসায় ছিল দুই দিন। এক সকালে স্যামুয়েল একা একা হাঁটতে গিয়েছিল ধানমণ্ডি লেকে।

কোত্থেকে ছবি আঁকার তুলি ও ছবি হাতে এক মোবাইল চিত্রকলা এসে স্যামুয়েলকে জিজ্ঞাসে, ছবি কিনবেন?

স্যামুয়েল এমনিতেই চিত্রকলাদের দুই চক্ষে দেখতে পারি না। স্যামুয়েল ছবিগুলা উল্টায় পাল্টায়। সব দিক দিয়ে খুব বাজে ছবি। স্যামুয়েল জিজ্ঞাসে, কত দাম?

চিত্রকলা—তিন হাজার টাকা।

স্যামুয়েল—এত কম দাম?

চিত্রকলা বলে, তিন হাজার টাকা দিয়ে নেন, পাঁচ বছর পরেই এই ছবির দাম হবে পাঁচ কোটি টাকা।

স্যামুয়েল পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ বের করছে। আর্টিস্ট চকচকে চোখে স্যামুয়েলের দিকে। মানিব্যাগ আবার পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে স্যামুয়েল। চিত্রকলার কপালে ভাঁজ পড়ে।

স্যামুয়েল—তিন হাজার টাকা দিব। আপনি ঠিকঠাকভাবে কালার করে নিয়া আসেন, দ্যান টাকা।

চিত্রকলা বসে বসে ছবির কালার ঠিক করে। এই ফাঁকে স্যামুয়েল আস্তে আস্তে পার্ক থেকে বের হয়ে যায়। একটা রিকশা নিয়ে চলে যায় সোজা বাসার নিচে। স্যামুয়েল রিকশা থেকে নেমে দেখে তার বাসার গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রকলা। স্যামুয়েল চিত্রকলাকে দেখেও না দেখার ভান করে গেইটে ঢুকে পড়ে। চিত্রকলা আটকায়, হাতের ছবিটা দেয়। বলে, টাকা দেন।

স্যামুয়েল হালকা গিলটি ফিল করে। এই অভাবী চিত্রকলারে র‍্যাগ দেয়া ঠিক হয় নাই। স্যামুয়েল বলে, স্যরি, ভাই। আসলে আমার কাছে এত টাকা নাই।

চিত্রকলা জিজ্ঞাসে, কত টাকা আছে?

স্যামুয়েল মিথ্যা বলে, পঞ্চাশ টাকা।

চিত্রকলা বলে, ওইটাই দেন।

একশ টাকা নিয়ে আর্টিস্ট ছবিটা স্যামুয়েলের হাতে দিয়ে বলে, আমার নাম স্মরণে রাখবেন। আমি সোহেল। অল ঘোড়া কন্ট্রোল।

স্যামুয়েল জিজ্ঞাসে, মানে?

চিত্রকলা উত্তর না দিয়ে হাঁটা দেয়। সুযোগ পাওয়া মাত্র আঁতলামি করে ফেলল চিত্রকলা। চিত্রকলা না খালি সব মিডিয়ামের শিল্পীদের ফাতরামির কোন সীমা পরিসীমা নাই। স্যামুয়েল আর্টিস্টদের মনে প্রাণে হেইট করে। কিন্তু এই শ্লোগান তার মাথার ভিতর থেকে আর বের হয় নাই।

স্যামুয়েলের কথা থামে। আমরা অক্সিজেনে জ্যামে। দশ মিনিট চলে যায়। জ্যাম ছাড়ে না। আমি ও স্যামুয়েল গাড়ি থেকে নামি। গাড়ি থেকে সামনে গিয়ে দেখি পুলিশ রাস্তা ব্লকড করে দিয়েছে। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে পুলিশের গাড়ি। লোকজন বলাবলি করে, চিটাগং ক্যান্টনমেন্টে হামলা হয়েছে।

স্যামুয়েল এক লোককে জিজ্ঞাসা করে, কারা হামলা করেছে?

লোকটা বলে, জাইনা কী করবেন?

স্যামুয়েল বিরক্ত হয়। একটু পর একদল আর্মিকে প্রাণপণে দৌড়ে আসতে দেখা যায় অক্সিজেনের দিকে।

আর্মি এসে পুলিশকে বলে, আপনারাও পালান।

সাথে সাথে গাড়ি থেকে নেমে পুলিশ পালাতে শুরু করে। পুলিশের দেখাদেখি মানুষও দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। আমি ও স্যামুয়েল একটু পিছিয়ে আমাদের গাড়িটার কাছে যাই। একটু পর কয়েকটা আর্মি ট্যাংক এসে পড়ে। ট্যাংক থেকে নেমে আসে এক খাটো টাক মাথার লোক। তার পিছে পিছে নেমে আসে কয়েকটা নওজোয়ান। আমি ভাল করে তাকিয়ে নওজোয়ানদের চিনতে পারি। এরা মঞ্জুর পেন্টিয়াভ ফাইভের পোলাপান।

স্যামুয়েল বলে, ব্রো, চলো পালাই।

আমরা গাড়িতে উঠে পড়ি। খাটো টাকমাথা দিগবিদিক ছুটতে থাকা জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়া শুরু করে হ্যান্ডমাইক দিয়ে। “প্রিয় দেশবাসী। আপনাদের বিপ্লবী অভিনন্দন। নাফ নদী থেকে ফেনি নদী পর্যন্ত এলাকায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি… ।”

স্যামুয়েলকে বলি, নিউ বিপ্লবী সার্কাস পার্টি।

স্যামুয়েল আমাকে বলে, আস্তে, ব্রো। শুনলে গুলি কইরা দিবে।

বক্তৃতা চলে, এই বিপ্লবে শামিল হতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমরেড ফজলে রাব্বি।

স্যামুয়েল আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ব্রো, ফজলে রাব্বি সেই ঘোড়াটা না?

হ্যাঁ। এই সেই ঘোড়া। পাঁচ নম্বর ট্রাক ব্রেক ফেইল করে বহদ্দারহাট বাজারে ঢুকে পড়ার পর ওইখানে যে পাগল জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিল সেই ঘোড়াটাই কমরেড ফজলে রাব্বি।

আমি বলি, খালাতো ভাই, শহরে ঢুকা সেইফ হবে না। চলো হাটহাজারির দিকে চলে যাই।

স্যামুয়েল বলে, হাটহাজারিও সেইফ না। আরো ডিপে চলে যেতে হবে। চলো ফটিকছড়ি চলো।

 

২.

রাতে ফটিকছড়ির কাঞ্চনপুরের এক গভীর গ্রামে এসেছি একটু আগে। এই বাড়ির নাম মিঞা সওদাগরের বাড়ি। স্যামুয়েলের দাদা মিঞা সওদাগর। এইখানে স্যামুয়েলের নিঃসন্তান চাচা-চাচি থাকে।

ভাত খেয়ে আমরা টিভি দেখি। টিভি খবরে দেখায় নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলারা চিটাগং ডিভিশনের সব জেলার সব শহরের ক্যান্টনমেন্ট ও থানা দখল করে ফেলেছে। কমরেড ফজলে রাব্বির চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল, চূড়ান্ত বিকেন্দ্রিক, চূড়ান্ত বেপরোয়া সেনাবাহিনীর ভয়ে আর্মি, পুলিশ সব ব্যারাক ছেড়ে পালিয়ে গেছে। হালকা একটু রক্ত অবশ্য ঝরেছে। এক গেরিলা বন্দুক ঘাড় থেকে নামাতে গিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে নিজের মাথা। শহীদ সেই গেরিলার স্মৃতিতে শোকবার্তা পড়ে কমরেড ফজলে রাব্বি।

স্যামুয়েল বলে, দশ ট্রাক অস্ত্র এই পাগলটার কন্ট্রোলে কীভাবে গেল? বুঝলাম না আমি।

আমি বলি, খালাতো ভাই। কেমনে কী বুঝতে যায়ো না। বাদ দাও। চলো ঘুমাই পড়ি।

সূর্যের আলো ফোটে। ঘুম থেকে উঠে দেখি স্যামুয়েলের চাচি আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে পাঁচ-ছয় পদের পিঠা, দুধ, চা।

চাচা স্যামুয়েলকে জিজ্ঞাসা করে, ভাইপো, চিটাগং নাকি আর বাংলাদেশ নাই? চিটাগং নাকি আলাদা রাষ্ট্র!

স্যামুয়েল বলে, এগুলা যে কী হইতেছে আমি বুঝতেছি না চাচা।

সিটিভি মানে চিটাগং টেলিভিশন থেকে লাইভ দেখানো হয় জনগণতান্ত্রিক চট্টগ্রাম সরকারের রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রেস কনফারেন্স। জনগণতান্ত্রিক চট্টগ্রাম সরকারের এক প্রতিনিধি ঘোষণা করে—আগামি সাত ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি, সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল, রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীসভা শপথগ্রহণ করবে। সন্ধ্যা সাতটায় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে সিটিভি।

না। আর টিভি দেখা যাবে না। স্যামুয়েলের বাড়ি থেকে বের হয়ে নদীর ধারে যাই। নদীর উপরে ঝুলন্ত সেতু পার হয়ে চলে যাই আরো পশ্চিমে। যত পশ্চিমে যাই, মানুষের চিহ্ন দেখা যায় না।

গভীর বন। পাশ দিয়ে দুই একজন কাঠুরে চলে যায় বাঁশ নিয়ে। একটা ছোট টিলার উপরে উঠে বসি আমি ও স্যামুয়েল। টিলার ঢালুতে একটা ঝিল, তাতে ওযু করছে চেক লুঙ্গি, ফুলহাতা চেকশার্ট পরা চুলে দাড়িতে জট ধরে যাওয়া একজন। পাশেই দুই তিনটা তাঁবু টাঙ্গানো। পড়ে আছে দুই তিনটা পেপসির প্লাস্টিক বোতল। দুইজন রান্না করে, একজন চেক লুঙ্গির মাথায় ছাতা ধরে আছে, একজন চেক লুঙ্গি থেকে মুখ লুকিয়ে সিগারেট খায়। যে সিগারেট খাচ্ছিল সে আমাদের কাছে এসে সালাম দিয়ে পরিচয় ও উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করে।

স্যামুয়েল তাদের পরিচয়, উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসে। লোকটা দূরে অযুরত চেক লুঙ্গিকে দেখিয়ে বলে, ওই যে দেখছেন উনি সাধারণ লোক না…। কথা থামে না।

স্যামুয়েল কথাগুলা শোনার জরুরত ফিল করে না বলে কান অফ করে দিয়ে পাহাড়ের গায়ে পড়া রৌদ্রের চলাচল দেখে।

লোকটার কথা শেষ হলে স্যামুয়েল জিজ্ঞাসা করে, ঘোড়াটার নাম কী?

লোকটা বিরক্ত হয়ে বলে, ঘোড়া মানে?

স্যামুয়েল বলে, আমি খারাপ অর্থে ঘোড়া বলি নাই।

লোকটা কনভিন্সড হয়ে বলে হুজুরের নাম বলে, উনি হলেন মজজুবে ছালেক ফানা ফিল্লা বর্তমান জমানার জিন্দা ওলি ফরিদ শাহ বি এ অনার্স এম এ…। কথা থামে না।

স্যামুয়েল আবার কান অফ করে দেয়।

কথা থামলে আমি লোকটাকে বলি—এই জীবন নিয়ে বড় মুসিবতে আছি। তিন বছর ধরে আমার কোনো চাকরি নাই, একটা ব্যবসা হবে হবে করছিল, হয় নাই। ক্রিয়েটিভ কাজ যেমন ধরেন নভেল, লেখা শুরু করসিলাম, তাও শেষ হয় নাই। আমি ভাই নাই হয়া আছি। একটু ফরিদ শাহের কাছে আমার নামে আর্জি পেশ করেন।

লোকটা টিলা থেকে ঢালুতে নামে। ফরিদ শাহের কাছে যায়। একটু পর লোকটা আবার আমাদের কাছে এসে জানায়—বাবা, এখন দুনিয়াবি হালতে নাই।

আমরাও ঢালুতে নামি। ফরিদ শাহ একটু দূরে অযু শেষ করে দুনিয়া থেকে আলগা হয়ে বসে আছেন। ফরিদ শাহ আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আকাশে শরতের নীল সাদা সাদা করে দেয় মেঘ ও বক। আমিও আকাশের দিকে তাকাই। আকাশ থেকে দৃষ্টি নামালে দেখি ফকির এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

চোখে চোখ পড়লে জিজ্ঞাসি—দুনিয়ার কী হাল?

ইষৎ বিলা খেয়ে ফকির মুখ ফিরিয়ে আবার আকাশ দেখে। আমি ও আকাশের দিকে তাকাই। আকাশে শরতের নীলকে আরেকটু সাদা করে ও নির্জনতা চোচির করে ছোটে হেলিকপ্টার।

মুখ নামিয়ে দেখি ফরিদ শাহ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

ফরিদ শাহ বলে, আমি রেডিও না যে তোর কাছে দুনিয়ার খবর দিব?

আমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি—ও আপনি রেডিও না, তাইলে আপনি কি টিভি?

ফরিদ শাহ খুব বিরক্ত হয়ে আবার আকাশের দিকে মুখ ফেরায়। আকাশের হেলিকপ্টারের শব্দ আর একটু তীব্র হয়। আমি ফরিদ শাহ’র আশেকানদের একজনকে খোঁজি—সিগারেট দরকার। স্যামুয়েল ফরিদ শাহের দিকে তাকিয়ে আছে। প্লেইনের শব্দ একটু তীব্র হয়।

ফরিদ শাহ আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে বলে—আমি রেডিও না, আমি টিভি না, আমি ইন্টারনেট না, আমি জাস্ট একটা অ্যান্টেনা। সো কোনো কথা হবে না।

ফরিদ শাহকে আরেকটু চেতিয়ে দিলে আনন্দ হয়, তাই আবার জিজ্ঞাসা করি—চাইনিজ অ্যান্টেনা না জাপানিজ অ্যান্টেনা নাকি হোমমেইড অ্যান্টেনা?

ফকির উত্তর না দিয়ে আবার আকাশের দিকে মুখ ফেরায়। আর মুখ নামায় না। বিমানের শব্দ তীব্রতর হয়। সবাই আকাশের দিকে তাকায়। সাথে সাথে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়ে যায়, আতঙ্ক টুকরা টুকরা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।

ghora-42

“বিমানের শব্দ তীব্রতর হয়। সবাই আকাশের দিকে তাকায়। সাথে সাথে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়ে যায়, আতঙ্ক টুকরা টুকরা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।” অলঙ্করণ. তানভীর আহম্মদ চৌধুরী

সবাই দৌড়াতে শুরু করে। দিকবিদিক। আমিও। শুধু ফরিদ শাহ তার জায়গায় স্থির। আল্লার ইশকে ফানা হওয়া ফরিদ শাহ হেলিকপ্টারটা দেখে। হেলিকপ্টার কন্ট্রোল হারিয়ে ধেয়ে আসছে এই দিকে। সাত সাত আট সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটা ক্র্যাশড হয় সামনের টিলায়। ফরিদ শাহ ছাড়া আমরা সামনের টিলার দিকে যাই।

আমরা দৌড়ে হেলিকপ্টারের কাছে যাই। হেলিকপ্টারের দরজা খুলে হেলিকপ্টারের ভিতরে থাকা দুই জনকে বের করা হয়। একজন অলরেডি মরে গেছে। আরেকজন অজ্ঞান। ফরিদ শাহের আশেকানরা লোকটার সেবা-শুশ্রুষা করে। হেলিকপ্টার থেকে ছিটকে বের হয়ে পড়া একটা ভারি বাক্স পড়ে আছে। আশেকানরা বাক্সটা ফরিদ শাহের জিম্মায় রেখে আসে।

একটু পর বেঁচে থাকা কপ্টার আরোহীর জ্ঞান ফিরে আসে।

কপ্টার আরোহি বলে, আমি কমরেড জুবায়ের জুয়েল। আমি গণপ্রজাতন্ত্রী চট্টগ্রাম সরকারের একজন এজেন্ট। কয়টা বাজে?

এখন বারোটা।

জুবায়ের বলে, প্রিয় জনগণ, আপনারা আমাকে সাহায্য করুন। এই প্লেইনে আপানারা কি বড় কোনো বাক্স পেয়েছেন?

এক আশেকান জবাব দেয়, বাক্সটা বাবার হেফাজতে।

জুবায়ের বলে, এই বাক্সে একটা মেশিন আছে। মেশিনটা খুব জরুরি।

স্যামুয়েল জিজ্ঞাসে, জরুরি কেন?

জুবায়ের বলে, গণপ্রজাতন্ত্রী চট্টগ্রাম সরকারের প্রেসিডেন্টের মাথা ক্র্যাশ করেছে!

স্যামুয়েল, ক্র্যাশ মানে কী? ওই কমরেড ফজলে রাব্বি আগাগোড়াই একটা পাগল।

জুবায়ের বলে, প্রেসিডেন্টের নামে কোনো অশোভন কথা বলা হলে পার্টি ব্যবস্থা নিবে।

স্যামুয়েল একটা ঘুষি মারে জুবায়েরের মুখে। জুবায়ের আবার অজ্ঞান হয়ে যায়।

ফরিদ শাহ তার আশেককে বলে, কেরোসিন নিয়া আসো।

সাথে সাথে কেরোসিন নিয়ে আসা হয়।

ফরিদ শাহ বলে, গাছ নিয়ে আসো। আর এইখানে একটা বড় সাইজের আগুনের গোল্লার জন্ম দাও।

তার আশেকানরা গাছ কেটে নিয়ে এসে এক জায়গায় জড়ো করে। গাছে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়।

আবার জুবায়েরের জ্ঞান ফিরে আসে। ফরিদ শাহ আগুনের গোল্লার মধ্যে দেয়ার জন্য মেশিনটাকে হাতে নেয়। জুবায়ের এই সিন দেখে টাসকি খায়।

জুবায়ের পিস্তল বের করে ফরিদ শাহের দিকে ধরে, ঘোড়া টাইনা দিব কিন্তু।

ফরিদ শাহ ভয় পায় না।

ফরিদ শাহ জুবায়েরের দিকে তাকিয়ে বলে, টান দাও মিয়া। এইটা পুড়বে। কোনো ফজলে রাব্বি বা চারু মজুমদার বা কমিউনিস্ট কোনো বাতিল ফেরকার ঠাঁই চট্টগ্রামের জমিনে হবে না।

জুবায়ের পিস্তল হাতে টক টক করে কাঁপে। কাঁপতে কাঁপতে আবার জ্ঞান হারায় জুবায়ের।

স্যামুয়েল ফরিদ শাহকে বলে, এই মেশিনটা নষ্ট করে লাভ কী? বরং জুবায়েরকে এইখানে বাইন্ধা আমরা মেশিনটা নিয়ে শহরে চলে যাই। এই মেশিনটার উসিলায় আমরা রাষ্ট্রপতি ভবনে ঢুকে যেতে পারব! কী বলেন ব্রো?

ফরিদ শাহ বলে, ব্রো আবার কী? বাবা বল।

স্যামুয়েল বলে—বাবা।

ফরিদ শাহ স্যামুয়েলকে বলে, তোর মাথায় আল্লা যে বুদ্ধি দিছেন শুকরিয়া। তোর নাম আমি আমার আশেকানের লিস্টে তুইলা নিলাম।

স্যামুয়েল বলে, বাবা, আমি আশেকান না। আমি আপনের এজেন্ট হতে চাই।

ফরিদ শাহ বলে, আগে ছোট থেকে শুরু কর। এই যে দেখছস এরা আমার ওল্ড, ভেরি ওল্ড ফ্যান। এইখানেই এজেন্ট হতে চায় তিনজন। তাদের বাদ দিয়ে তোরে কেমনে বানাই? আশেকান দিয়া শুরু কর প্রেসিডেন্ট হয়া বের হবি।

স্যামুয়েল আমারে কানে কানে বলে—আমিও আজ থেকে মারফতিদের বিরুদ্ধে। মারফতিরা সব মুশরিকের বংশধর।

টিলার বৃক্ষরাজির দিকে তাকিয়ে স্যামুয়েল আমার কানে কানে বলে—ব্রো, ত্বরিকত, বেলায়েত, মারফত  সব পথে হায়ারার্কি আছে। শুধু শরিয়তে কোনো হায়ারার্কি নাই।

আমি বলি, এতদিনে বুঝলা, খালাতো ভাই?

স্যামুয়েল বলে, আমি ফরিদ শাহরে একদম চুদে দিবো। ওয়েইট।”

 

৩.

বিকাল। শহরে ঢোকার মুখে আমাদের গাড়ি আটকায় একটা চেকপোস্ট।

স্যামুয়েল চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকা গেরিলাদের জিজ্ঞাসা করে—প্রেসিডেন্ট ভবন কই?

আরো অনেক চেকপোস্ট পার হয়ে সার্সন রোডে ঢুকে পড়েছে আমাদের নীল গাড়ি।

সার্সন রোডে ট্যাংকের চলাচল। সামনে নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি’র আরেকটা চেকপোস্ট। চেকপোস্টে গাড়ি থামায়। স্যামুয়েল কথা বলে। গাড়ি ছেড়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট ভবনের গেইটেও চেকপোস্ট। স্যামুয়েল চেকপোস্টে গাড়ি থামায়। একজন গেরিলা গাড়ির কাচে এসে গাড়ির ভিতরে আমাদের দেখে।

গেরিলা স্যামুয়েলকে বলে—ঐপ! স্টার্ট বন্ধ! গাড়ি থেকে নামেন।

আমরা গাড়ি থেকে নামছি।

গেরিলা বলে—হাত উপরে তুলে নামেন।

আমি ও স্যামুয়েল দুই হাত উপরে তুলে গাড়ি থেকে বের হই। ফরিদ শাহ হাত উপরে না তুলে বের হয়। ফরিদ শাহের দেখাদেখি তার আশেকানও হাত উপরে না তুলেই বের হয়।

গাড়ি থেকে বের হয়ে ফরিদ শাহ পুরা পাটে চলে যায়। গেরিলারা তাকিয়ে আছে ফরিদ শাহের দিকে। ফরিদ শাহ তাকিয়ে আছে আসমানের দিকে। ফরিদ শাহ আসমান থেকে চোখ নামিয়ে সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে তর্জনি আকাশের দিকে তুলে আবার আসমানে তাকায় ফরিদ শাহ। এক গেরিলা ফরিদ শাহের পেটে রাইফেল দিয়ে খোঁচা দেয়। রাইফেলের খোঁচা ফরিদ শাহের উপর কোনো প্রভাব ফেলে না। তবে তার আশেকানের উপর প্রভাব ফেলে। আশেকান সাথে সাথে হাত উপরে তোলে। আর ফরিদ শাহ আকাশের দিকে তাকিয়েই থাকে।

স্যামুয়েল গেরিলাকে বলে—ব্রো…।

গেরিলা বলে, ‘ব্রো’ আবার কী। ‘কমরেড’ বলুন…।

স্যামুয়েল বলে—স্যরি ব্রো… কমরেড, প্রেসিডেন্টের মাথা ঠিক করতে একটা মেশিন কপ্টারে কইরা বাংলাদেশ থেকে আনার কথা ছিলো না?”

গেরিলা বলে—হ্যাঁ! হ্যাঁ! অনেকক্ষণ ধরে আমরা ওই কপ্টারের কোন সিগন্যাল পাচ্ছি না।

স্যামুয়েল বলে—সিগন্যাল কেমনে পাবেন? ওই কপ্টারটা কাঞ্চনপুরে ক্র্যাশ করেছে। আমরা মেশিনটা উদ্ধার করেছি।

গেরিলা স্যামুয়েলকে জিজ্ঞাসে—এরা ফরিদ শাহ ও তার আশেকান। আপনি কে?

স্যামুয়েল বলে—যে টিলায় বিমান বিধ্বস্ত হয় ওইখানে আমার দাদুবাড়ি। আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম।

গভীর সন্দেহ নিয়ে গেরিলাটি স্যামুয়েলের দিকে তাকায়। নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির গেরিলারা মেশিনটা একটা জিপে তুলে সাইরেন বাজাতে বাজাতে টিভি স্টেশনের দিকে চলে যায় মেশিনটা নিয়ে।

প্রেসিডেন্ট এখন টিভি স্টেশনে। গেইট খুলে দেয়া হয়। একদল গেরিলা আমাদের নিয়ে যায় প্রেসিডেন্ট ভবনের ভিতরে। একটু পরে রাষ্ট্রের একজন হাই অফিশিয়াল আমাদের সাথে দেখা করতে আসবে।

 

৪.

আমরা একটা রুমে বসে আছি। আমাদের চা ও বেলা বিস্কুট দেয়া হয়। হাই অফিশিয়াল রূপে আমাদের সামনে হাজির হয় মঞ্জু।

মঞ্জু স্যামুয়েলকে দেখামাত্র গেরিলাদের নির্দেশ দেয়—এই চুদানির পোয়া রাষ্ট্রদ্রোহি। ইতেরে বান দে…।

(কিস্তি ৫)

About Author

তানভীর আহম্মদ চৌধুরী
তানভীর আহম্মদ চৌধুরী

জন্ম. চট্টগ্রামে। কবি, গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও শর্টফিল্ম নির্মাতা। 'ডিয়ার ট্রটস্কি (২০১৬)' ও 'লাইফ ফ্রম অ্যাকুরিয়াম (২০১১)' দুটি শর্টফিল্ম বানিয়েছেন।