page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

অল ঘোড়া কন্ট্রোল (৫)

শুরুর কিস্তি আগের কিস্তি

অধ্যায় ৫

১.

আমরা বসে আছি গণপ্রজাতন্ত্রী চট্টগ্রাম সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ভবনের ভিজিটরস রুমে। গেরিলারা স্যামুয়েলের দিকে ছুটে আসে। এমন সময় রুমে প্রবেশ করে বলরাম কর্মকার। বলরাম কর্মকার গণপ্রজাতন্ত্রী চট্টগ্রাম সরকারের গোপন আব্বু।

বলরাম কর্মকার বলে—কমরেড, কী হচ্ছে এইখানে? আপনারা কাকে মারছেন?

মঞ্জু বলরাম কর্মকারকে বলে—এই পোলাটা দেশদ্রোহী।

বলরাম কর্মকার—কীভাবে?

মঞ্জু বলরাম কর্মকারকে সব কথা গুঁড়া গুঁড়া করে বলে।

বলরাম কর্মকার বলে—কমরেড মঞ্জু! নিজেদের মধ্যে বিরোধ ভাল না। মাও সেতুং যেখানে বলেছেন শত্রুর শত্রু আমাদের বন্ধু সেখানে আপনি বন্ধুকেও শত্রুর কাতারে ফেলে দিচ্ছো! আর আপনার পোস্টিং ফেনি ক্যান্টনমেন্ট। আপনের ইউনিটের গেরিলারা সবাই ফেনির পথে রওনা হয়ে গেছে। আপনি এইখানে কী করছেন? ফেনির দিকে চলে যান।

মঞ্জু বলে—ঠিক আছে কমরেড। আমার সাথে স্যামুয়েলকেও নিয়ে যাই। আমারে অ্যাসিস্ট করবে!

বলরাম কর্মকার—মার্ক্সিজম কী বস্তু আপনি এখনো বুঝতে পারেন নাই, মঞ্জু। এইখানে কেউ কারো সহকারি না।

মঞ্জু বলে—আপনে ডাণ্ডি পটাশ! ডাণ্ডি পটাশ থেকে আমি কিছু শিখতে চাই না।

বলরাম কর্মকার গেরিলাদের নির্দেশ দেয়—কমরেড, অশোভন আচরণের জন্য মঞ্জুকে বন্দি করা হোক।

সাথে সাথে গেরিলারা টেনে নিয়ে যায় মঞ্জুকে।

বলরাম কর্মকার বাবলুকে বলে—একজন খাঁটি বিপ্লবী নির্মোহ…

বাবলু কান অফ করে ফেলে। এইসব কথা সে জীবনে অনেক শুনেছে।

বলরাম কর্মকারের কথা থামলে ফরিদ শাহকে দেখিয়ে বাবলু বলরাম কর্মকারকে বলে—কমরেড ব্রো, উনি ফরিদ শাহ।

বলরাম খুব তাজিমের সাথে ফরিদ শাহের সাথে মোলাকাত করে। বলরাম খুব মনোযোগ দিয়ে ফরিদ শাহের দিকে তাকিয়ে ফরিদ শাহের গতিবিধি ফলো করে। বলরাম কর্মকারের হাতের সেলফোন বেজে ওঠে একটু পর পর। বলরাম কর্মকার ফোন নিয়ে উঠে চলে যায়। একটু পর আবার ফিরে আসে। বলরাম কর্মকার রুমে ঢুকে ফরিদ শাহকে মনোযোগ দিয়ে দেখে।

বলরাম কর্মকার রুমে আসলে বাবলু তার হাতের ফোন দেখিয়ে বলরাম কর্মকারকে জিজ্ঞাসে—কমরেড ব্রো, এই ফোনের চার্জার হবে?

বলরাম খুব বিরক্ত হয়। একটা রাষ্ট্র গঠন করা কি যেই সেই ব্যাপার। কতটা আবাল হলে দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিকালীন সময়ে স্যামুয়েল অসামান্য বলরাম কর্মকারের কাছে সামান্য মোবাইল ফোনের চার্জার খোঁজে। কিন্তু বলরাম স্যামুয়েলকে ঠিক অপছন্দ করতে পারে না।

বলরাম স্যামুয়েলকে রুমের এক কোনায় দেখিয়ে দেয়। স্যামুয়েল ফোনের সাথে চার্জার কানেক্ট করে মারজিয়াকে কল করে। মারজিয়া ফোন বন্ধ।

স্যামুয়েল আমাকে বলে—মারজিয়া যদি বিয়া করে ফেলে তাইলে আমি মারজিয়ার জামাইকে শুট করে দিব।

আমি বলি—কইরো, খালাতো ভাই।

স্যামুয়েল বলে—কিন্তু মারজিয়ার জামাইরে শুট করব ক্যান? তার কী দোষ? সব দোষ মারজিয়ার বাপের। আমি মারজিয়ার বাপরে শুট করে দিব।

আমি বলি—কইরো, খালাতো ভাই।

স্যামুয়েল বলে—কিন্তু মারজিয়ার বাপের কী দোষ? আমিই তো তার কাছে বিয়ার প্রপোজালই নিয়া যাই নাই। সব দোষ মারজিয়ার। আমি মারজিয়াকে শুট করে দিবো।

আমি বলি—কইরো, খালাতো ভাই।

স্যামুয়েল বলে—কিন্তু মারজিয়ার তো কোনো দোষ নাই। সে তো আমাকে অনেক টাইম দিছে। আমাকে বার বার বলেছে একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলতে। মারজিয়ার কোনো দোষ নাই। সব দোষ আমার। আমি আমারেই শুট করে দিব। কিন্তু আমি আমারে শুট করব ক্যান? সুইসাইড করা হারাম। নো। আমি মারজিয়ার জামাইকেই শুট করে দিব।

 

২.

আমি কিছু বলি না। বলরাম কর্মকার রুমে আসে। তার পিছন পিছন গেরিলারা এসে একটা মনিটর সেট করে। ইন্টারনেট কানেক্ট করে। মনিটরে ভেসে ওঠে চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্র। কমরেড ফজলে রাব্বি শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। আমাদের উদ্ধার করা মেশিন থেকে বের হওয়া একটা কয়েকটা চিপ সেট করা হয় ফজলে রাব্বির মাথায়। ফজলে রাব্বি মাথা তোলে। তার চোখে হাল্কা চাঞ্চল্য দেখা যায়। বলরাম কর্মকার ও তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বীর গেরিলাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে ওঠে।

ফজলে রাব্বি বলে—মেইক আপ। আই উইল গিভ অ্যা স্পিচ।

সাথে সাথে মেকাপম্যান হাজির। মেকাপ শেষ হবার আগেই ফজলে রাব্বির চোখ স্থির হয়ে যায়, মাথা গড়িয়ে পড়ে নিচে। আবার মেশিন। আবার চেষ্টা। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ফজলে রাব্বি অফ।   

বলরাম কর্মকার গেরিলাদের বলে—মনিটর সরাও।

মনিটর নিয়ে চলে যায় গেরিলা। বলরাম কর্মকার পায়চারি করে ভিজিটরস রুমে। তার মোবাইল বাজে। রাত নয়টা। রাষ্ট্রপতি কোমায় চলে গেছে। প্রেসিডেন্টকে নিয়ে কী করবে বলরাম কর্মকার ভাবে। নিজেই কি নিজেরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন? বলরাম কর্মকার রুমে আসে।

সে ফরিদ শাহ কে জিজ্ঞাসে—আপনি কি প্রেসিডেন্ট হবেন?

ফরিদ শাহের ভক্তদের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তারা ফরিদ শাহের কেরামতি দেখে। ফরিদ শাহ নিজে থেকে একবারও বলে নাই সে আসলে এইখানে এসেছে প্রেসিডেন্ট হতে। অথচ অটোমেটিক তাকে প্রেসিডেন্ট হতে বলা হচ্ছে।

ghora-5-a

বলরাম কর্মকার ফরিদ শাহকে জিজ্ঞেস করে, “প্রেসিডেন্ট হবেন।”

ফরিদ শাহ আকাশের দিকে তাকিয়ে গলায় বলে—আল্লাহ! আমি তো সিংহাসন চাই নাই, আমি চেয়েছি তোমার দিদার।

বলরাম কর্মকার বলে—কমরেড, আপনাকে রেডি হতে হবে।

ফরিদ শাহ বলে—আমি তো জন্ম থেকে রেডি হয়ে আছিরে, পাগলা।

বলরাম বলে—কমরেড, উইথ ডিউ রেসপেক্ট বলতে চাই—পাগলা বলা যাবে না।

ফরিদ শাহ বলে—এক নম্বর কথা হল তুমি আমারে কমরেড বলবা না। বাবা বলবা বাবা, বাবা ডাকতে যদি লজ্জা লাগে স্যার বলবা। দুই নম্বর কথা হল—তুমি ইহুদি মার্ক্সের পথে দেশকে নিয়া যেতে চাও। আমার রাষ্ট্রে কোনো মার্ক্স টার্ক্স কারো রুল চলবে না।

ফরিদ শাহ গেরিলাদের নির্দেশ দেয়—এই ইহুদির এজেন্টটাকে জেলে ভইরা দাও।

গেরিলারা বলরামের দিকে তাকায়।

বলরাম কোমর থেকে রিভলবার বের করে ফরিদ শাহকে বলে—প্রেসিডেন্ট হবেন শুনে বিচি কান্ধে উইঠা গেছে? এইসব ভুংভাং আমারে দেখায়া লাভ নাই। যদি প্রেসিডেন্ট হতে চান আমার কথামত চলবেন। আমরা মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদ ও চারু মজুমদারের শিক্ষার ভিত্তিতে আমাদের দেশ চট্টগ্রামকে গড়ে তুলব। আপনি প্রেসিডেন্ট হবেন নাকি হবেন না বলেন।

ফরিদ শাহ বলে—তোর প্রেসিডেন্টের কেথা ফুড়ি।

বলরাম কর্মকার—কোনো সমস্যা নাই। আপনার জন্য জেলখানার দরজা খোলা আছে।

ফরিদ শাহ বলরামকে বলে—ঠিক আছে। সব তোমার কথামত হবে। খালি আমার একটা দাবি।

বলরাম জিজ্ঞাসে—কী দাবি?

ফরিদ শাহ বলে—আমার রাষ্ট্রে যেন দুনিয়ার সব পীর-মজ্জুবদের যেন ওপেন করে দেয়া হয়।

বলরাম কর্মকার ভেবে বলে—ওকে, প্রেসিডেন্ট।

বলে বলরাম কর্মকার আর্মি কায়দায় স্যালুট দেয় ফরিদ শাহকে। সাথে সাথে বলরাম কর্মকারের গেরিলারা আর্মি কায়দায় ফ্লোর কাঁপিয়ে স্যালুট ঠুকে ফরিদ শাহকে। ফরিদ শাহও সোফা থেকে উঠে আর্মি কায়দায় স্যালুট গ্রহণ করে।  

বলরাম স্যামুয়েলকে বলে—কমরেড, আপনি প্রেসিডেন্টরে স্যালুট দেন নাই কেন? আমি তো আরো ভাবছিলাম আপনাকে আমাদের পার্টির যুব ব্রিগেডের চিফ বানাবো।

স্যামুয়েল বলে—কমরেড ব্রো, আমি তো স্যালুট দিছি।

বলরাম—কই? আমি তো দেখলাম না।

স্যামুয়েল বলে—দেখবেন কেমনে? মনে মনে দিছি আর কি।

প্রেসিডেন্ট ফরিদ শাহ বলে—আমি তোর স্যালুট পেয়েছিরে, পাগলা।

বলরাম ফরিদ শাহকে বলে—ডিয়ার প্রেসিডেন্ট, আপনাকে এক্ষুনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে হবে। টেলিভিশন সেন্টারে যেতে হবে।

বলরাম স্যামুয়েলকে বলে—আর কমরেড আপনার নাম যেন কী?

স্যামুয়েল বলে—আমি আর্তুর র‍্যাঁবো।

বলরাম বলে—আপনে খৃস্টান নাকি?

স্যামুয়েল বলে—না। না। মুসলমান।

বলরাম বলে—র‍্যাঁবো আবার কী ধরনের নাম?

স্যামুয়েল বলে—র‍্যাঁবো নকশাল মুভমেন্টের এক শহীদ নেতার নাম!

বলরাম বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসে—ও হ্যাঁ হ্যাঁ আমি কই যেন পড়েছিলাম। এই নাম কে রেখেছে?

স্যামুয়েল বলে—আমার আব্বু।

বলরাম বিস্ময় নিয়ে বলে—কী বলেন?   

স্যামুয়েল বলে—আমার বাপের হোক্সাপন্থি কোনো পার্টির সাথে কানেকশন ছিল।

স্যামুয়েলের এই স্পনটেনিয়াস চাপাবাজি তারে কই নিয়ে যাবে কে জানে?

বলরাম বলে—বাহ! হোয়াট অ্যা কো-ইনসিডেন্স। মঞ্জুর পরিবর্তে আমরা আমাদের যুব ব্রিগেডের জন্য আরো বেটার সম্ভবত সবচেয়ে বেস্ট সভাপতি পেয়ে গেছি। কমরেড আতুড় খেম্বো…।

স্যামুয়েল বলে—উইথ ডিউ রেসপেক্ট কমরেড, আতুড় মানে লুলা… আতুড় না… বলেন আর্তুর… আর খেম্বো না। র‍্যাঁ..বো…।

বলরাম বলে—কমরেড আর্তুর র‍্যাঁবো,  আপনাকে যুব ব্রিগেডের চিফ হিসাবে মনোনিত করা হল। আপনারে রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়া হালকা ব্রিফ করছি। আপনার কাজ করতে সুবিধা হবে। বর্ডারে বর্ডারে আমাদের গেরিলারা আছে। গেরিলাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমাদের জাতীয় বীর ফিল্ড মার্শাল কমরেড খোকা। আমাকে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যেতে হবে টিভি সেন্টারে। আরো দেশী বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সাথে মিটিং করতে হবে। আজ রাতে আমি আর ফিরব না। আপনি ফিল্ড মার্শাল খোকার সাথে আমার হয়ে যোগাযোগ করে আমার হয়ে নির্দেশ দিবেন। নির্দেশ একটাই—ফায়ার। ক্রিটিক্যাল কোনো ডিসিশান নিতে হলে আমাকে কল করবেন। রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর যে কোনো মানুষকে মেরে ফেলতে হবে। বুঝাইতে পেরেছি, কমরেড?

র‍্যাঁবো বলে—কমরেড ব্রো, ইয়েস। ইয়েস। আপনি কোনো টেনশানই করবেন না। প্রতিবিপ্লবীদের রক্ত দিয়ে সি-বিচ বানিয়ে চট্টগ্রামকে ট্যুরিস্ট স্পট বানাবো।

বলরাম বলে—বিপ্লব কোনো সূচিকর্ম নয়, বিপ্লব কোনো ভোজসভা নয়…।

কান অফ করে রাখে স্যামুয়েল।

বলরাম কর্মকার গেরিলাদের বলে—কমরেড। উনি আর্তুর র‍্যাঁবোআমাদের যুব ইউনিটের চিফ। আমি না আসা পর্যন্ত আপনারা ওনার অর্ডার মেনে চলবেন।

 

৩.

সকাল নয়টা। ব্রেকফাস্ট করেছি একটু আগে। র‍্যাঁবো বলে—ব্রো, ঘুমাইতেই পারি নাই। খালি স্বপ্ন দেখছি।

আমি জিজ্ঞাসি—কী স্বপ্ন দেখছো, খালাতো ভাই?

র‍্যাঁবো  বলে—দেখছি মারজিয়ার বিয়া হচ্ছে। কার সাথে বিয়ে হচ্ছে দেখি নাই।

রুমে আসে এক গেরিলা।

গেরিলা র‍্যাঁবোকে বলে—কমরেড, হলরুম রেডি।

র‍্যাঁবো বলে—হলরুমে কী?

গেরিলা বলে—কমরেড লিডার, আপনি হলরুমে চলুন। হলরুম হচ্ছে কন্ট্রোলরুম।

 

৪.

বিশাল অন্ধকার হলরুমে প্রবেশ করি। হলরুমে ষাটটা মনিটর। র‍্যাঁবোকে পথ দেখিয়ে একটা চেয়ারের কাছে নিয়ে যায় গেরিলা। র‍্যাঁবো চেয়ারে বসে। আমি তার পাশের একটা চেয়ারে বসি। গেরিলা তাকে একটা সেলফোন দেয়।

গেরিলা বলে—এইটা হচ্ছে কন্ট্রোল সেলফোন।

র‍্যাঁবো ফোনটা হাতে নেয়। সেলফোনে কিছুক্ষণ পর পর কল আসে। ফিল্ড মার্শাল খোকা।

গেরিলা আমাদের ছেড়ে দূরে চলে গেলে আমি র‍্যাঁবো কে জিজ্ঞাসি—নিউ বিপ্লবী সার্কাস পার্টির যুব ব্রিগেডের মাহামান্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে কেমন লাগতেছে, আর্তুর র‍্যাঁবো?

র‍্যাঁবো বলে—মাও সেতুং বলেছেন—কথা হবে কম। সো। চুপ।

আমি বলি—ওকে। তবে এখন না একটু পর। আমিও মনিটরে চোখ রাখি। ষাটটা মনিটরে ষাটটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের ছবি ফুটে ‌ওঠে। ফেনি নদীর পাড়ের বর্ডার এলাকার সেট করা ক্যামেরার সাতটা মনিটরে দেখা যায় পীর মজ্জুব টাইপের লেবাস ও কাদেরিয়া, চিশতিয়া, মুজাদ্দেদিয়ার ফ্ল্যাগ হাতে নিয়ে লংমার্চ করে আসছে অনেকগুলা দল। পীরের কাফেলাগুলা সুশৃঙ্খল, মজ্জুবের কাফেলাগুলা বিশৃঙ্খল। পীরের কাফেলায় আছে পীরের ডিরেক্ট  মুরিদান আর মজ্জুবের কাফেলায় আছে তার ফ্যানরা।

র‍্যাঁবো গেরিলাকে ডাকে। গেরিলা কাছে আসলে র‍্যাঁবো বলে—কন্ট্রোল ফোনটা নিয়ে মার্শাল খোকাকে ডায়াল করে আমার হয়ে অর্ডার দেন—শুট।

গেরিলা র‍্যাঁবোকে বলে—কমরেড লিডার, এই যে পীর মজ্জুব এরা তো ক্ষতিকর না। তাদের তো ঢুকতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট চলবে পার্টির নির্দেশে। আর পার্টির প্রেসিডেন্ট হচ্ছে কমরেড বলরাম। কমরেড বলরাম বলে দিয়েছেন এদেরকে যেন ঢুকতে দেয়া হয়।

র‍্যাঁবো বলে—টুএলএস কী জানেন?

গেরিলা বলে—এইটা আবার কী?

র‍্যাঁবো বলে—আপনে মাও সেতুং পইড়া আসেন ভাল করে, দ্যান আসেন কথা বলি। আমি জানি কমরেড বলরাম কর্মকার আমার লিডার। আমারে আমার মত কাজ করতে দেন।

র‍্যাঁবো মনোযোগ দিয়ে মনিটর দেখে।

একটা মনিটরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেন—চট্টগ্রাম যে স্বাধীন হয়েছে এইটা একটা ভার্চুয়াল রিউমার।

র‍্যাঁবোর ফোন বাজে। ফিল্ড মার্শাল খোকার কল।

খোকা বলে—কী করবো? প্রেসিডেন্টের কথা শুনে বাংলাদেশ না খালি ইন্ডিয়া থেকেও পীর ফকিররা এই রাষ্ট্রে চলে আসতে চায়।

র‍্যাঁবো বলে—আমি দশ মিনিটের মধ্যে কল দিয়ে জানাচ্ছি কী করতে হবে।

র‍্যাঁবো বলরাম কর্মকারকে কল করে।

বলরাম কর্মকার বলে—এইসব ঢুকতে দেয়া হোক।

মনিটরে দেখা যায় পীর মজ্জুবেরা বর্ডারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তাদের বর্ডারে ঢুকতে দিতে। বর্ডারের এই পাশে বিপ্লবী সরকারের সশস্ত্র গেরিলারা তাদের অস্ত্র তাক করে রাখে পীর মজ্জুবদের দিকে। বর্ডার গরম হয়ে ওঠে।

র‍্যাঁবো ফিল্ড মার্শালকে কল করতে ফোন হাতে নেয়। কিন্তু তার ভয় লাগে অর্ডার দিতে। র‍্যাঁবোর হাত কাঁপে।

র‍্যাঁবো আমাকে বলে—ব্রো, অবস্থা তো খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে। মঞ্জুরে যেখানে বন্দি রাখা হয়েছে ওইখানে যাও। দশ ট্রাক অস্ত্রের খবর নাও।

আমি বলি—ট্রু। অস্ত্রগুলা সিস্টেম করে ফেলে সিন থেইকা সরে পড়তে হবে ।

র‍্যাঁবো বলে—অবশ্য সিন থেকে সরারও কিছু নাই। দশ ট্রাক অস্ত্র দিয়া কী হবে? মারজিয়ার তো এনগেইজমেন্ট হয়ে গেছে। স্বপ্নে দেখলাম বিয়েও হয়ে গেছে।

আমি বলি—সেটাও ঠিক।

র‍্যাঁবো বলে—না। ব্রো। আমার মনে হয় আমারে চেতাইতে মারজিয়া আমারে হুদাই এনগেইজমেন্টের গল্প দিছে। তুমি খবর নাও।

আমি বলি—এটাও ঠিক। একটু ব্ল্যাক কফি খাই। দ্যান যাই।

র‍্যাঁবো এক গেরিলাকে বলে—কমরেড ব্রো, আমাদের দুইটা ব্ল্যাক কফি দিয়া যান।

গেরিলারা যুব ব্রিগেডের প্রেসিডেন্টের চা বানানোর মহান দায়িত্ব নিয়ে চলে যায় প্রেসিডেন্ট ভবনের কিচেনের দিকে।

র‍্যাঁবোর ফোন বাজে। ফিল্ড মার্শাল খোকা।

র‍্যাঁবো আমাকে জিজ্ঞাসে—আচ্ছা, ব্রো, এই খোকারে কী বলব বলো।

আমি বলি—একদম গুলি করে দিতে বলো।  

র‍্যাঁবো ফিল্ড মার্শাল খোকাকে ফোনে বলে—ফায়ার… অল ঘোড়া কন্ট্রোল।

খোকা জিজ্ঞাসে—অল ঘোড়া আবার কী?

র‍্যাঁবো উত্তরে বলে—চারু মজুমদার বলেছেন—কথা হবে কম। আপনি আধা ঘণ্টার মধ্যে বর্ডারে সাউন্ড সিস্টেম বসান। আমি ডিরেক্ট ওই মজ্জুবগুলারে নির্দেশ দিতে চাই।

খোকা বলে—ওকে, কমরেড।

র‍্যাঁবো ফোন রেখে আমাকে বলে—ব্রো, চলো মঞ্জুকে ধরি।

 

৫.

প্রেসিডেন্ট ভবনের একটা বদ্ধ রুম। রুমের বাইরে চারজন সশস্ত্র গেরিলা। মঞ্জু এক রুমে বন্দি। আমরা সেই রুমে প্রবেশ করি। মঞ্জু বিষণ্ন মুখে বসে আছে একা।

র‍্যাঁবো মঞ্জুকে জিজ্ঞাসে—আচ্ছা আমাদের চার ট্রাক অস্ত্রগুলা কই?

মঞ্জু বলে—আমি জানি না।

র‍্যাঁবো বলে—র‍্যাবকে কল করছিলাম আমি। তারপরের ঘটনা বলেন। র‍্যাবের হাত থেকে এইটা নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির হাতে গেল?

মঞ্জু বলে—আমি জানি না।

র‍্যাঁবো—মঞ্জু ব্রো, আমি এই মূহুর্তে চট্টগ্রাম সরকারের যুব ব্রিগেডের ম্যাট্রিক্স। আমি চাইলেই আপনারে তূরীয় লেভেলের মাইর দিয়ে রিভেন্জ নিতে পারি। কিন্তু রিভেন্জ আমি নিবো না।

মঞ্জু বলে—আমি জানি না।

র‍্যাঁবো বলে—আমি আপনারে মুক্ত করে দিবো।

মঞ্জু বলে—দশ ট্রাক অস্ত্র ছিন্নভিন্ন হয়ে সারা চিটাগং টাউনে ছড়িয়ে গেছে।

র‍্যাঁবো বলে—ব্রো, আমি রিভেন্জ নিবার মত পোলা না। কিন্তু ঘটনা কীভাবে বাইর করতে হয় সেইটা না জানার পোলাও আমি না। বলেন ব্রো, বলেন। আমি আপনারে মারলে ব্যাপারটা কি কিউট হবে?

মঞ্জু বলে—বাবলু…।

র‍্যাঁবো বলে—বাবলু না, আমি র‍্যাঁবো।

মঞ্জু আমাকে বলে—ভায়া, সিগারেট আছে?

আমি সিগারেট ও লাইটার এগিয়ে দিই। সিগারেট ধরিয়ে লাইটার আবার পকেটে ঢুকিয়ে মঞ্জু র‍্যাঁবোকে বলে—অস্ত্র চিটাগং ক্যান্টনমেন্টে।

র‍্যাঁবো আমাকে বলে—ব্রো, চলো, চিটাগং ক্যান্টনমেন্ট।

আমি মঞ্জুকে বলি—আমার লাইটার দাও।

মঞ্জু বলে—লাইটার আপনাকে দিয়ে দিছি।

র‍্যাঁবো বলে—ব্রো, আপনি ভুলে পকেটে নিয়ে নিছেন।

মঞ্জু পকেট থেকে লাইটার বের করে দিয়ে র‍্যাঁবোকে জিজ্ঞাসে—আমি কি ফ্রি?

র‍্যাঁবো বলে—না। এখন না। এখন ফ্রি করে দিছি এই কথা বলরামের কানে গেলে বলরাম যা বুঝার বুঝে ফেলবে। অস্ত্র বেহাত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।

দরজা বন্ধ হয় মঞ্জুর মুখের উপর।

 

৬.

আমরা আবার হলরুমে ফিরে আসি। মনিটরে দেখা যায় পীর মজ্জুবের ঢল দুপুরের রোদে। তারা বর্ডারের বাইরে তাঁবু গেঁড়ে লান্চ করে। দুপুর। র‍্যাঁবো তার সেলফোন আমার হাতে দিয়ে বলে এইখানে ডিস্কো শফির নম্বর আছে। নম্বরটা বের করো তো।

আমি র‍্যাঁবোকে তার ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলি—ডিস্কো শফি।

র‍্যাঁবো ফোন হাতে নিয়ে ডিস্কো শফিকে ডায়াল করতে যাবে এমন সময় র‍্যাঁবোকে দেয়া কন্ট্রোল ফোনটা বেজে ওঠে। র‍্যাঁবো কল রিসিভ করে।

র‍্যাঁবো বলে—হ্যালো।

ওই প্রান্ত বলে—আই অ্যাম ফ্রম আসাম।

র‍্যাঁবো আমার দিকে তাকায়। সাথে সাথে বুঝে ফেলি দশ ট্রাক অস্ত্র আসামের যে পার্টির জন্য যাচ্ছিল সেই পার্টি অস্ত্রগুলা ফিরে চায়।

র‍্যাঁবো ফোনে বলে—কোনো অস্ত্র ফেরত দেয়া যাবে না।

ওই প্রান্ত বলে—আপনারা বিপ্লবী সরকার গঠন করেছেন। আপনারা তো বুঝবেন…।

র‍্যাঁবো বলে—ব্রো, কমরেড অ্যান্ডি ওয়ার্হোল বলেছেন বিপ্লব একটা ব্যবসা। অন্য সব ব্যবসার মতো বিপ্লবেও খালি নিজের কৌমের ভাগ বুঝে নিতে হবে।

ঐ প্রান্ত বলে—তাইলে আপনারা কি অস্ত্র ফেরত দিবেন না? আমরা কি হার্ড লাইনে যাবো?

র‍্যাঁবো বলে—তোর আসাম লিবারেশন আর্মিরে আমি তিন তিরিক্কে নব্বই বার চুদি। কোনো অস্ত্র ফেরত দেয়া যাবে না।

র‍্যাঁবো ফোন কেটে দেয়। র‍্যাঁবো তার ফোন থেকে ডিস্কো শফিকে কল করে।

র‍্যাঁবো—ব্রো, আমি নোমান বদ্দার ছোট ভাইটা। চিনছেন?

ডিস্কো শফি বলে—হ। চিনছি।

র‍্যাঁবো বলে—আমি আপনাকে একটা ইনফর্মেশন দিবো। ইনফর্মেশন দিবার আগে আমারে এক কোটি টাকা দিয়ে দিতে হবে।

ডিস্কো শফি—ইনফর্মেশনটা কী?

র‍্যাঁবো বলে—অস্ত্র কই আছে ঐ ইনফো।

ডিস্কো শফি হাসে।

ডিস্কো শফি বলে—অস্ত্র যে চিটাগং ক্যান্টনমেন্টে পইড়া আছে এই ইনফরমেশন আমার কাছেও আছে।

র‍্যাঁবো বোকা হয়ে ফোন কেটে আমার দিকে তাকায়।

র‍্যাঁবো কন্ট্রোল ফোন হাতে নিয়ে ফিল্ড মার্শাল খোকার ফোন নম্বর বের করে কল করে খোকাকে জিজ্ঞাসে—সাউন্ড সিস্টেম রেডি?

খোকা বলে—রেডি।

র‍্যাঁবো বলে—আমার কল লাউডস্পিকারে দিয়ে মাইক্রোফোনে দেন।

খোকা বলে—জাস্ট ওয়ান সেকেন্ড। ওকে কমরেড লিডার। অর্ডার প্লিজ।

র‍্যাঁবো বলে—হেই ম্যান, লিসেন টু মি। এখন থেকে আগামি পাঁচ মিনিট পরে কোনো পীর মজ্জুব যদি দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে ননস্টপ পনেরো মিনিট গুলি চলবে পাঁচশো রাইফেল থেকে। হ্যাভ ইউ গট মাই পয়েন্ট, ডার্লিং?

সাথে সাথে র‍্যাঁবোর হাতে থাকা কন্ট্রোল ফোন বেজে ওঠে। বলরামের ফোন।

বলরাম জিজ্ঞাসে—আমাদের কি হার্ড লাইনে যাওয়া ঠিক হচ্ছে। আপনি নাকি ফায়ার করে দিতে নির্দেশ দিচ্ছেন!

র‍্যাঁবো বলে—কমরেড চারু মজুমদার তার তিন নম্বর দলিলের চার নম্বর পয়েন্টে বলছেন—দেরি করা যাবে না। দেরি করলেই খেলা শেষ। আর পীর মজ্জুবরা সব আনপ্রোডাক্টিভ মাল। এদের একদম টলারেট করা যাবে না। এরাও শ্রেণিশত্রু।

বলরাম বলে—না না কমরেড। গুলি করা যাবে না।

র‍্যাঁবো বলে—ওকে।

র‍্যাঁবো ফোন রাখে। র‍্যাঁবো আবার কল করে ফিল্ড মার্শাল খোকার ফোনে। খোকা ফোন কানেক্ট দেয় বর্ডার এরিয়ার স্পিকারে।

র‍্যাঁবো বলে—জিরো বলার সাথে সাথে গুলি চলবে। ফাইভ, ফোর, থ্রি, টু…।

ওয়ান  বলার সাথে মজ্জুবরা সব ছুটাছুটি করে মূহুর্তেই পালিয়ে যায়। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে একজন। লোকটাকে দেখে র‍্যাঁবো টাসকি খায়।

লোকটার হাতে হ্যান্ডমাইক, মাইকের স্পিকারে থুতু ছিটিয়ে আজিজ বলে—আমি যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। আমি সোহেল। অল ঘোড়া কন্ট্রোল।

র‍্যাঁবো ফিল্ড মার্শালকে কল করে বলে—এই মালটাকে আমি চিনি। শুধু এই মালটারে ঢুকতে দেন, কমরেড ব্রো। 

 

৭.

মনিটরে দেখা যায় চিত্রকলা সোহেলের পিছে পিছে বর্ডার দিয়ে ঢুকে পড়ে পালিয়ে যাওয়া পীর মজ্জুবরাও। মজ্জুবরা নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে ভাসতে ভাসতে আবার কেউ কেউ একদম সাইলেন্ট চোখ মাটির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ে চট্টগ্রাম শহরে। তাদের আশেকান ও মুরিদেরা জিইসি মোড় পাস করার সময় জিইসি মোড়ের মেয়েদের দিকে তাকায় এবং তাদের ধারণা আজ তারা এই শহরের যে কোনো মেয়েকে বললেই প্রেম হয়ে যাবে। এক মুরিদ এই আত্মবিশ্বাস কলিজায় নিয়ে এক মেয়েকে বলে—চলেন প্রেম করি।

মেয়েটাকে দেখে স্যামুয়েল গেরিলাকে ডাক দেয়—একটু জুম ইন করেন তো।

গেরিলা জুম ইন করে।

র‍্যাঁবো বলে—ব্রো, ব্রো, দেখো, ঐটা মারজিয়া।

র‍্যাঁবো মারজিয়ার ফোনে কল দিবে এমন সময় র‍্যাঁবোর ফোন বেজে উঠে। মারজিয়ার কল।

মারজিয়া বলে—বাবলু, কুত্তার বাচ্চা তুই কই? তোর চাকরি কই?  

র‍্যাঁবো কিছু বলতে পারে না। মারজিয়া বলে—কুত্তার বাচ্চা কথা বল। তুই বাটপার, তুই খানকি, তুই শুয়ার কথা বল। দুই দিন ধরে আমি তোর গলা শুনি না, খানকি, আই মিস ইউ, টক টু মি।

র‍্যাঁবো জিজ্ঞাসা করে—ঠিক আছো তুমি?

মারজিয়া বলে—চিটাগঙের পলিটিক্যাল সিচুয়েশন ভাল না। কোথাকার কোন পাগল ছাগল ভইঙ্গা এসে চিটাগং দখল করে ফেলেছে। তুই আমার জানের দুশমন, তুই বিশ্ববেকুব আমার সাথে যোগাযোগ করস নাই কেন?

র‍্যাঁবো বলে—তুমি তো ফোওন অফ করে রাখছো। কীভাবে জানাবো?

মারজিয়া বলে—আমার বাসায় চলে আসতে পারতি না?

র‍্যাঁবো বলে—এখন আসি?

মারজিয়া বলে—কুত্তার বাচ্চা, চাকরি জোগাড় করার আগে আমার সাথে দেখা করতে চাইলে আমি তোর কলিজা খায়া ফেলবো।

র‍্যাঁবো কিছু বলার আগেই মারজিয়া ফোন রাখে। এবার র‍্যাঁবো কল করে।

র‍্যাঁবো মারজিয়াকে বলে—তুমি না কইলা তোমার এনগেইজমেন্ট হয়ে গেছে?

মারজিয়া বলে—এনগেইজমেন্ট মানে তো বিয়া না। আর এনগেইজমেন্ট হয় নাই।

বলে ফোন কেটে দেয় মারজিয়া।

র‍্যাঁবো আমাকে বলে—বলরামের এই সেটাপ থেকে দূরে চইলা যাইতে হবে। বিপ্লব টিপ্লব এগুলা আমার জীবন না। আমার জীবনের নাম—মারজিয়া।

আমি বলি—ট্রু।

এমন সময় বাইরে গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যায়। একটু পর বলরাম কর্মকার ও প্রেসিডেন্ট ফরিদ শাহ এসে হলরুমে ঢোকে।

বলরাম র‍্যাঁবোকে বলে—তোমার অনেক সম্ভাবনা আছে। যাও এখন। আজিজকে বরণ করে নিয়ে আসো।

রাত দশটা বাজে।

র‍্যাঁবো বলে—ডিস্কো শফি আসবে ওয়ার সিমেট্রিতে। চলো…।

আমি বলি—চলো।

র‍্যাঁবো বলে—না, আগে লান্চ করে নিই।

 

৮.

প্যাকেট বিরিয়ানি খেতে খেতে ওয়ার সিমেট্রিতে মিটিং। আমি, র‍্যাঁবো ও ডিস্কো শফি। ডিস্কো শফি বিকাল পাঁচটার মধ্যে ক্যাশ এক কোটি টাকা দিয়ে যাবে আমাদের হাতে। আমরা তারপর চিটাগং ক্যান্টনমেন্টে ঢুকতে সাহায্য করবো ডিস্কো শফির লোকজনকে।

 

৯.

ওয়ার সিমেট্রি থেকে বের হয়ে সার্সন রোডে ঢোকার মুখে চিত্রকলার সাথে দেখা হয় আমাদের।  

র‍্যাঁবো হ্যান্ডশেক করে চিত্রকলাকে জিজ্ঞাসে—আমাকে চিনছেন?

চিত্রকলা বলে—চিনা বা না চিনার মধ্যে কোনো ভেদ নাই।

র‍্যাঁবো পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে। মানিব্যাগের চিপা থেকে একটা ছবি বের করে চিত্রকলাকে দেখায়।

চিত্রকলা জিজ্ঞাসে—প্রেসিডেন্ট ভবন কোনোদিকে।

চিত্রকলার পিছনে হাজার হাজার আশেকান ও মুরিদান। প্রেসিডেন্ট ভবনের সিঁড়িতে নেমে এসে প্রেসিডেন্ট ফরিদ শাহ খুব তাজিমের সাথে চিত্রকলার সাথে মোলাকাত করে।  

চিত্রকলা বলে—অ্যাই! অল ঘোড়া কন্ট্রোল মানে কী বল।

সোহেলের এমন রুঢ় ব্যবহার প্রেসিডেন্ট ফরিদ শাহের ইগোতে লাগে, প্রেসিডেন্ট বলে—”এক নম্বর কথা হলো, অ্যাই অ্যাই করবা না, বাবা ডাকবা বাবা, যদি বাবা ডাকতে লজ্জা লাগে তাইলে স্যার ডাকবা, দুই নম্বর কথা হলো…।”

বলার আগে আগে ফরিদ শাহকে ঘুষি মেরে ফ্লোরে শুইয়ে দেয় সোহেল।

বলরাম কর্মকার তার গেরিলাদের কয়েকজনসহ র‍্যাঁবোকে ডেকে একটা ছোট মিটিং করে।

বলরাম বলে—কমরেডরা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী সবাই চট্টগ্রাম দখল করতে আসছে। আমাদের হাতে তাদের সাথে ফাইট করার মত ইনাফ অস্ত্র থাকলেও, এই অস্ত্র চালানোর মানুষ নাই। পার্টি এগিয়ে গেছে কিন্তু জনগণ অনেক পিছনে। আমাদের ডিসাইড করতে হবে এই মুহূর্তে কী করা যাচ্ছে, আর কী করা যাচ্ছে না। কোনটা মৌলিক দ্বন্দ্ব…।

র‍্যাঁবো কান অফ করে ফেলে।

বলরাম বলে—আমাদের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে পালিয়ে যাওয়া। পালিয়ে জনগণের সাথে মিশে যাওয়া।

এক গেরিলা বলে—কমরেড, আপনি এই বিপ্লবের সাথে বিট্রে করছেন। বলরাম কর্মকারকে এই মুহূর্তে পার্টি থেকে বহিস্কার করা হলো। এখন থেকে পার্টির প্রেসিডেন্ট আর্তুর র‍্যাঁবো।

র‍্যাঁবো বলে—আমি না।

গেরিলাটি বলে—এখন থেকে পার্টির প্রেসিডেন্ট আমি বদি আলম। আর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কমরেড সোহেল।

সোহেল বলে—আমার নামের আগে কমরেড, টমরেড বসানো যাবে না।

কমরেড বদি আলম নির্দেশ দেয়—আর্তুর র‍্যাঁবো, বলরাম কর্মকার ও এই প্রতিবিপ্লবী চক্রের সাথে জড়িত সবাইকে অ্যারেস্ট করা হোক।

কিছুক্ষণ নীরবতা। হঠাৎ কয়েকটা গেরিলারা রাইফেল ঘুরিয়ে দেয় গণপ্রজাতন্ত্রী চট্টগ্রাম সরকার এই প্রোডাক্টের ইন্জিনিয়ার বলরাম কর্মকারের দিকে। আমাদের ঘিরে ফেলে সশস্ত্র গেরিলারা।

 

১০.

রাত। একটা গরম বদ্ধরুমে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে আমাদের। মঞ্জু ও বলরাম কর্মকার এক দিকে কানে কানে কথা বলে।

আমি র‍্যাঁবোকে বলি—ব্রো, প্রেসিডেন্ট সোহেল তোমার পরিচিত বললা না। একটা গেরিলা ডাইকা প্রেসিডেন্টের কাছে বলো, প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাও। আমরা আজিজ প্রেসিডেন্টের লোক হয়ে জেলে আটকে আছি?

র‍্যাঁবো এক গেরিলাকে ডেকে বলে—প্রেসিডেন্টকে বলেন, আমি তার একজন ক্লায়েন্ট।

সৈন্য চলে যায়। একটু পর সৈন্য ফিরে আসে। তারা গারদের লক খুলে ভিতরে আসে। আহ! মুক্তি। সৈন্যটা এসে র‍্যাঁবোকে পিটায় ও দূরে দাঁড়িয়ে মঞ্জু হাসে।  

মঞ্জু বলে—ব্যাঙ মরে গালের দোষে।

র‍্যাঁবো আবার সৈন্যটাকে ডাকে—খোদার কছম ভাই, আমার কাছে প্রেসিডেন্টের আঁকা একটা ছবি আছে।

গেরিলা বলে—তুই চুদানির ফোয়ারে হন চুদানির ফুয়াই চুদানির বুদ্ধি দিয়িদে মাইর হাইবাল্লাই?

বলে সৈন্য ঢুকে আবার র‍্যাঁবোকে পিটায়। হঠাৎ র‍্যাঁবো চেপে ধরে গেরিলার বিপ্লবী বিচি। মঞ্জু ও বলরাম কর্মকার এসে সৈন্যকে ফ্লোরে ফেলে পিটায় ও তার রাইফেল কেড়ে নেয়। এক গেরিলার চিৎকার শুনে অন্য গেরিলারা আসে। র‍্যাঁবো আমাকে ডাক দেয়। পালাতে হবে, দৌড় দেয়। পিছন থেকে এক গেরিলা গুলি করে। বদ্ধ রুম থেকে বের হয়ে আমরা বের হয়ে করিডোর বেয়ে চলে যাই প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে।

জেলখানার এই সেল থেকে আমরা সবাই হঠাৎ দৌড় দিই। আমার পাশ থেকে হঠাৎ ঝরে যায় একজন। পিছনে তাকিয়ে দেখি মাথায় গুলি লেগেছে বলরামের। বলরাম মুখ থুবড়ে পড়ে। 

 

১১.

দৌড়াতে দৌড়াতে ডিসি হিল চলে আসি। রাত দশটা এগারোটা বাজে। ডিসি হিলে একটু জিরাই। দূরে পাথঘাটার দিক থেকে দৌড়ে আসছে নোমান বদ্দা। নোমান বদ্দাও আমাদের দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। নোমান বদ্দা প্রেসিডেন্ট ভবনের আরেকটা রুমে আটকে ছিল। পালাতে গিয়ে মারা গেছে নিগারের বাকি দুই আশেক—বক্কর ও টুটুল।

র‍্যাঁবো নোমান বদ্দাকে জড়িয়ে ধরে বলে—দুনিয়াতে সবাই আমার ব্রো, আপনিই খালি ভাই, নোমান বদ্দা।

কর্ণফুলি ব্রিজ পার হবার সময় আমাদের ধরে ফেলে বাংলাদেশ পুলিশ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন শাখা।

 

১২.

কত রাত। দুইটা তিনটা। কোতোয়ালি থানাতে ভিড়। হাজতে ঢুকে র‍্যাঁবো ভেঙে পড়ে।

নোমান র‍্যাঁবোকে জড়িয়ে ধরে বলে—বদ্দা, সোয়াবিরিন, সোয়াবিরিন আমি আছি, নো টেনশান। সব ঠিক হয়ে যাবে। মার্লে বদ্দার গান শুনো নাই? এভরিথিংস গনা বি অলরাইইট।

র‍্যাঁবো বলে—কিচ্ছু ঠিক হবে না ব্রো। আমাদের ফাঁসি হয়ে যাবে।

ফাঁসি শুনে ভয় হয়। থানা হাজতে প্রেস আসছে, র‍্যাঁবোকে ফোকাস করে ফ্ল্যাশ জ্বলে ওঠে, নিভে যায়। আমি ও মঞ্জু মাথা নিচু করে বসে আছি, নোমান বদ্দা দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত নয়নে সব দেখে।

এক মেয়ে জার্নালিস্টকে দেখিয়ে র‍্যাঁবো নোমানকে বলে—মালটা জাস্তি না বদ্দা?

নোমান বদ্দা র‍্যাঁবোর এই কথা পছন্দ করে না—বদ্দা, আমি কিন্তু মাইন্ড করলাম।

বাবলু আবার বলে—কেন?

নোমান বদ্দা বলে—মিয়া তোমার মারজিয়ারে ফাইতে দেশে কত বড়ো ঘটনা ঘটে গেল। কতো জন শহীদ হয়ে গেল, আর তুমি লুচ্চাদের মতো অন্য মেয়েরে জাস্তি বল! জাস্তি খুব বাজে একটা শব্দ। আঁর নিগারর মিক্কে চাই হনো হানকির ফোয়া জাস্তি হইলে আঁইতো ইতের মুখ সেলাই গরি দিতাম।

নোমান বদ্দা চাঁটগাইয়া বলছে। এখন কোনো কথা হবে না। এই মুহূর্তের নোমানকে চিটাগঙের টপ রকস্টার থেকে শুরু করে টপ টেরর সবাই ভয় পায়।

নোমান বদ্দা এক পুলিশকে ডাক দেয়। পুলিশ আসে।

নোমান পুলিশকে বলে—একটা নম্বর লিখেন।

পুলিশ তার সেলফোন বের করে বলে—বলেন।

নোমান একটা নম্বর বলে। পুলিশ ফোনে নম্বরটা সেইভ করে।

নোমান বলে—বদ্দা, আমার চাচার নাম্বার এইটা। আমার চাচারে কল দিয়ে বলেন আমি কই আটকে আছি। পুলিশ নোমানের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে চলে যায়। থানা হাজতের টিভি থেকে খবর ভেসে আসে—গণপ্রজাতন্ত্রী চট্টগ্রাম সরকারের গেরিলারা ট্যাংক রাইফেল ছেড়ে পালাচ্ছে।

থানা হাজতের পুলিশ আরেক পুলিশকে বলে—র‍্যাব এই সর্বহারা সাইজ করে দিছিল। এখনো দুই একটা আছে। শেষ মাইর চলতেছে।

টিভিতে দেখা যায় প্রথম প্রেসিডেন্ট কমরেড ফজলে রাব্বি, দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট ফরিদ শাহ ও তৃতীয় প্রেসিডেন্ট সোহেল চিত্রকলাকে অ্যারেস্ট করার খবর নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

একটু পর থানা হাজত ভরে তোলে নোমানের খুলশি এলাকার মানুষজন। নোমান বদ্দাকে হাজত থেকে বের করে পুলিশ। নোমান র‍্যাঁবোকে বলে—বদ্দা, আমি তোমাদের না নিয়ে বের হবো না।

নোমান বদ্দা হাজত থেকে বের হবার একটু পর আবার পুলিশটা আসে। আমাদের ওসির সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। দেখি ওসির সামনে চেয়ারে বসে আছে নোমান বদ্দা। থানার টিভিতে দেখা যায় দশ ট্রাক অস্ত্র কুমিল্লায় আটক করেছে র‍্যাব।

 

১৩.

ভোর হয়ে আসছে। আলো ফুটছে। আমরা কোতোয়ালি থানা থেকে বের হই। কোতোয়ালি থানা থেকে গেট থেকে বের হবার পথ ব্লকড করে দাঁড়িয়ে থাকে একটা মেয়ে।

বাবলু কাছে আসলে মেয়েটা বাবলুর গায়ের উপর হামলে পড়ে—কুত্তার বাচ্চা, সিনিয়র অফিসারের চাকরি জোগাড় করছস?

মেয়েটা মারজিয়া।

 

এপিলোগ

আরো অনেক অনেক অনেক দিন পর রিকশা নিয়ে আমি এসেছি দেবপাহাড়ে। বাস থেকে নেমে দেবপাহাড়ের রাস্তা ধরে উপরে উঠি, বৌদ্ধ মন্দিরে পৌঁছে যাই, বৌদ্ধ মন্দিরের দরজা দিয়ে দেখা যায় ধ্যানরত অলিফলিরা। আমি ঢুকে যাই মন্দিরের বিপরীতে লিলি খালার বাসায়। লিলি খালা জেল থেকে বের হয়েছে এক মাস হয়ে গেছে। জেল থেকে বের হয়েই লিলি খালা সোজা চলে গেছে দুবাই। দুবাই বসে আবার তার নেটওয়ার্ক চালু করে দিয়েছেন। আমি আবার ফিরে গেছি চাকরিতে। লিলি খালার অর্ডারে রেয়াজউদ্দিন বাজারের নূর আলমের দোকান থেকে পনেরো লাখ টাকা তুলে আমি দেবপাহাড়ে এসেছি বাবলুকে টাকা দিতে।

বাবলুকে কি বাবলু ডাকা যাবে?

বাবলু দরজা খোলে। আমি টাকা দিই। বাবলু পনেরো লাখ টাকা গোনে।

বাবলু চাকরিদাতা দৌলতকে কল করে। দৌলত কল রিসিভ করে না।

বাবলু আমাকে বলে—যে পাঁচ লাখ দিছিলাম দৌলত কি ঐটাও মেরে দিয়েছে নাকি, ব্রো?

কয়েকবার কল করার পর কল রিসিভ করে দৌলত।

আমি বলি—হইতে পারে, খালাতো ভাই।

বাবলু বলে—না না, মারবে না। চলো টাকা দিয়ে আসি।

আমি বলি—চলো।

বাবলু টাকা ব্যাগে ভরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। আমি বাবলুকে ফলো করি। ও এপিলোগ লেখি। কিন্তু বাবলু এতো জোরে হাঁটে যে ইন্সটিংকট ও ইন্টেলেক্টের সীমা থেকে তাকে আমি হারিয়ে ফেলি। ইন্সটিংক্টের কাছে অস্ত্র বেচে ইন্টেলেক্ট থেকে যারা আফিম কিনে খায় তারা আমারে অর্ডার দেয়—ইন্সটিংক্ট ও ইন্টেলেক্টের কন্ট্রোল থেকে বের হও। আমি থেমে যাই। বাবলুকে আর দেখা যায় না।

(সমাপ্ত)

About Author

তানভীর আহম্মদ চৌধুরী
তানভীর আহম্মদ চৌধুরী

জন্ম. চট্টগ্রামে। কবি, গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও শর্টফিল্ম নির্মাতা। 'ডিয়ার ট্রটস্কি (২০১৬)' ও 'লাইফ ফ্রম অ্যাকুরিয়াম (২০১১)' দুটি শর্টফিল্ম বানিয়েছেন।