page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল

অ্যাট দ্য রেট (@) এর বৃত্তান্ত

কিবোর্ডের বিভিন্ন সাইনের মধ্যে “@” সাইনের সাথে আমরা ভাল ভাবেই পরিচিত।

@ সাইনের প্রয়োজন তখনই হয় যখন আমরা কোনো মেইল সার্ভার, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কিছু করতে যাই। প্রশ্ন হল এই সাইনের ব্যবহার কি শুধু ইন্টারনেটেই সীমাবদ্ধ?

মাত্র দুই শতক ধরে “@” সাইন “স্থান”, “কাল” বা “দিক” নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভাষাভিত্তিক অবস্থানের দিকে থেকে “@” সাইনের উদ্ভব নিয়ে তর্কের শেষ নাই। বিভিন্ন সময়ে সাইনটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কারো কারো মতে ৬ষ্ঠ বা ৭ম শতাব্দীতে ল্যাটিন লিপিকাররা ল্যাটিন “অ্যাড” শব্দ থেকে “@”-কে ধারণ করেছে যা “টু” অর্থাৎ “দিকে” অথবা “টুয়ার্ড” অর্থাৎ “অভিমুখে” অর্থে ব্যবহৃত হত। ল্যাটিন লিপিকাররা লেখার সুবিধার্থে দোয়াতের আঁচরের পরিমাণ কমানোর জন্য “অ্যাড” শব্দের “d” অক্ষর এর উপরকার টানা দাগ ও “a” অক্ষর-এর উপরকার বাঁকানো দাগকে মিলিয়ে “@” সাইনের এই গঠন তৈরি করেন।

কোথাও বলা আছে, “@” সাইনটি মূলত গ্রীক ভাষার “ανά” অব্যয় শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ যা “রেইট অফ” অথবা “per” অর্থাৎ “মাথাপিছু” অর্থে ব্যবহৃত হত।

আবার কোথাও কোথাও বলা আছে, “@” সাইনটি নর্মান ফ্রেঞ্চদের “à” থেকে এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে “প্রত্যেক”।

সবশেষে ১৯৯০-এর দিকে “@” ইমেইলে ব্যবহারের কারণে হিসাবরক্ষণের কাজে এর ব্যবহার বাতিল হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত ফ্রেঞ্চ, সুইডেন ও চেক প্রজাতন্ত্রে “à” লেখার সুবিধার জন্য “অ্যাট সিম্বল” ব্যবহৃত হয় যাতে লেখার সময় কাগজ থেকে হাত ওঠানোর ঝামেলায় না পড়তে হয়। আর এই ধরনের নমুনা এখন পর্যন্ত ফ্রেঞ্চ হস্তলিপিতে বিভিন্ন স্ট্রিট মার্কেটে পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক ব্যবহার এর বিভিন্ন নমুনা
“@” সাইন ঐতিহাসিক ভাবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

আফ্রিকায়
দক্ষিণ আফ্রিকায় “এপ্সটার্ট”—যার অর্থ “বানরের লেজ”।

আরবে
দিক বোঝাতে আরবের কিবোর্ডে “@” সাইনের পরিবর্তে “fi” রয়েছে।

বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়া
এই সব দেশে “Crazy I” অর্থে ব্যবহৃত হয়।

ক্যান্টস
হংকং এ “@” সাইনের ব্যবহার আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতই।

কাটালান
কাটালনিয়াতে “@” সাইন “arrova” অর্থাৎ ভরের একক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

চেক প্রজতন্ত্র
এখানে “@” সাইনকে “zavinac (যাভিনেক)” বলা হয় যার অর্থ “rollomop (রল্লমপ)” অথবা “pickeled herring”। এটি জারিত মৎস্যবিশেষ, যা অত্যন্ত রুচিকর খাবার।

ড্যানিশ
এখানে এটিকে “alpha tegn” বা “আলফা সাইন” অথবা “snable–a” যার অর্থ হাতির শুঁড় অথবা “grisehale” অর্থাৎ শুকরের ল্যাজ ইত্যাদি বলা হয়।

ডাচ
যেহেতু নেদারল্যান্ডসে ইংরেজি ভাষা জনপ্রিয় তাই এখানে ইংরেজদের “অ্যাট” বোঝাতেই “@” ব্যবহৃত হয়। আবার কখনও কখনও “অ্যাপ্সটার্ট” বা “বানরের লেজ” অর্থেও ব্যবহৃত হয়।

ফ্রেঞ্চ
ফ্রান্সে এটি “রঅ্যাবেস” সিম্বলের নামে পরিচিত। এছাড়া ব্যবসার কাজেও ব্যবহৃত হয়। আবার “enroule a” অর্থাৎ জড়ানো হয়েছে অথবা “escargot” বা শামুক অর্থেও ব্যবহৃত হয়।

গ্রীক
“παπακι (পাপাকি)” বা হাঁস অর্থে।

হিব্রু
শ্যাবলুল অর্থাৎ শামুক অথবা “shtrudl” অর্থাৎ “strudel” যা কিনা এক ধরনের পিঠা (ফল ইত্যাদি ময়দার হাল্কা লেইয়ের মধ্যে মুড়ে আগুনে সেঁকে তৈরি করা)।

হাঙ্গেরিয়ান
হাঙ্গেরিতে “কুকাক” বা কৃমি অর্থে।

জাপানিজ
“মাকু” যার অর্থ লক্ষ্যের দিকে।

ইতালিয়ান
“চকলিয়া” যার অর্থ শামুক।

পোলিশ
পোল্যান্ডে একে “মাল্পা” অর্থাৎ বানর অথবা কটেক নামে ডাকা হয় যার অর্থ বিড়ালছানা কিংবা “উকো সয়াইনি” অর্থাৎ শূকরের কান।

তুর্কি
তুরস্কের বহু মেইল ইউজার একে “কুলেক” বলে, যার অর্থ কান।

ভাষাবিদ ও প্রফেসরদের মত
বহু ভাষাবিদ “@” সাইনের উদ্ভব সম্পর্কে ভিন্নমত রাখেন। তাদের ধারণা “@” সাইনের উদ্ভব কিছুদিন আগেই ঘটেছে। তারা মনে করেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে কমার্শিয়াল ক্ষেত্রে প্রতি একক দামের সিম্বল হিসেবে “@” সাইন ব্যবহৃত হতো। যেমন ২টি মুরগী @ ১০ পেন্স।

তবে কল্পনাভিত্তিক মতামতের বাইরে, কিছু প্রফেসরদের রিসার্চে “@” সাইনের উদ্ভব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ২০০০ সালে ইতালির “লা সাপিনেজা” বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের জর্জীয় স্টেবাইল নামে এক অধ্যাপক চতুর্দশ শতাব্দীর এমন সব নথিপত্র আবিষ্কার করেন যেখানে স্পষ্টতই ধারণা করা যায় যে “@” সাইনের যাত্রা পরিমাপ করার অর্থেই শুরু হয়েছিল। তাঁর মতে, “@” সাইনের বাণিজ্যিক ব্যবহার ছিল যা “দাম নির্ধারণে, দিক নির্দেশনায়” ব্যবহৃত হত।

প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে “@” সাইনের ব্যবহার

বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে “@” সাইনের ব্যবহার রয়েছে যদিও বিভিন্ন ল্যাঙ্গুয়েজে একে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়।

মেইলিং পারপাজে “@” এর উদ্ভব কীভাবে হলো
১৯৭২ সালে রে টমিলসন সর্বপ্রথম “@” সাইনকে লোকেশন অর্থাৎ অবস্থান/ঠিকানা অথবা মেইল প্রাপকের প্রতিষ্ঠান বোঝাতে ইলেক্ট্রনিক মেইলে ব্যবহার করেন। যা বর্তমানে ই-মেইল নামে পরিচিত। তিনি মডেল-৩৩ নামে একটি টেলিটাইপ ডিভাইস থেকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি বন্ধ করার জন্য “@” সাইন ব্যবহার করে মেইল পাঠান যাতে করে একটি ইউনিক নাম ব্যবহার করা যায়। যা কিনা অন্য ইউজারদের নাম থেকে আলাদা। তার “@” ব্যবহারের পিছনে যুক্তি পাওয়া যায় দুটি:

ক) “@” সাইন অন্য কোনো ইউজারের নামে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ প্রত্যেক ই মেইল ব্যবহারকারীর জন্য একটি ইউনিক নামের ব্যবহার প্রতিষ্ঠা করা যাতে করে বিভ্রান্তি এড়ানো যায়।
খ) এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারকারী ও ঐ নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর নির্দিষ্ট ডিভাইস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

টাইপিং ডিভাইসে “@” সাইনের অনুপ্রবেশ
অষ্টাদশ শতাব্দীতে “@” সাইনকে টাইপিং ডিভাইসে আর ১৯৪০ সালে QWERTY কিবোর্ডে স্থান দেওয়া হয়।

ইমেইলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও ওয়েবসাইটে “@” সাইনের ব্যবহার

ইমেইল অ্যাকাউন্ট খুলতে আমাদের “@” সাইন ছাড়া চলে না, যেহেতু মেইল অ্যাকাউন্ট মেইল সার্ভার প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বহন করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন টুইটার, ফেসবুক ইত্যাদিতে “@” সাইনের ব্যবহার হয়ে থাকে যাতে করে প্রত্যেকটা মেইল একাউন্ট আলাদা ভাবে চেনা যায় এবং সব ইউজারের মেইলে তারা নানা ধরনের আপডেট পেতে পারে।

ফেসবুকে “@” সাইনের নানা ব্যবহার
কোনো ধরনের আপডেট দিতে বন্ধুবান্ধবকে ট্যাগ করতে “@” লিখে ফ্রেন্ডের নাম লেখা শুরু করলে ফেসবুক আপনাকে ঐ নামে আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে যত ফ্রেন্ড রয়েছে তার একটা সাজেশন আপনার স্ক্রিনের সামনে তুলে ধরবে। তারপর নির্দিষ্ট ফ্রেন্ডকে মাউসের মাধ্যমে নির্বাচন করতে পারবেন আপনি।

লোকেশন শেয়ার
ফ্রেন্ড ট্যাগিং-এর মত একইভাবে আপনি আপনার বর্তমান ঠিকানা/স্থান শেয়ার করতে পারেন “@” সাইনের মাধ্যমে। এভাবে “@” সাইন আমাদের বিভিন্ন কাজকে সুবিধাজনক ও গতিশীল করেছে।

সূত্র
১. The History of the @ Sign (http://www.webopedia.com/DidYouKnow/Internet/2002/HistoryofAtSign.asp)
২. উইকিপিডিয়া

About Author

রাইয়্যান আহমেদ অর্ক
রাইয়্যান আহমেদ অর্ক

একাডেমিক নাম জাওয়াদ আহমেদ। ঢাকায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে নৃবিজ্ঞান পড়ছেন।