আমরা বেশির ভাগই কুয়ার ব্যাঙ। তার জন্য চিরকাল কুয়ার ব্যাঙ হয়ে থাকার দরকার নাই। সময়ের সাথে সাথে মানুষের অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। দেহ ও মন দুই-ই বদলায়।

বিবর্তিত হতে আরো বেশি সময় লাগে। তখন পরিবর্তনটাই ইমানের অঙ্গ হয়ে যায়, দেহের অংশে রূপান্তরিত হয়। মানুষের বাহ্যিক পরিবর্তন অর্থনীতির সাথে বেশি জড়িত আর ভেতরের পরির্তনের সাথে রাজনীতি সম্পর্কিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য যতটা বেগবান, রাজনৈতিক অর্জন ততটা না ’৭১ পরবর্তীতে। যেমন পাঁচ হাজার টাকার ছোট মানের বড় নোটটি ছাপার পর তা হয়তো মানিব্যাগে আটবে আমাদের, কিন্তু সেই অর্থের জীবন চেতনার মান গড়ে উঠবে না।


মৃদুল মাহবুব


আমি গত ২০ বছর আগে যে চিন্তার কথা শুনেছি, এখনো তাই তাই শুনি। চিন্তা একই, শুধু ভাষাই ভিন্ন। এই শহরের বইয়ের দোকানগুলি যা যা বিক্রি করেছে বিগত দিনে, এখনো তাই তাই বিক্রি করে। মানে ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতা ও সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু প্রোডাক্ট রেঞ্জ বাড়ে নি। আমাদের ভোগে আনন্দ বেড়েছে বৈ কি! ভোক্তা হিসাবে আমার তেমনই মনে হয়।

ত্যাগের নৈতিকতা অক্ষমের সেলফ-নারিশমেন্ট। ভোগেই সমাজের কনজ্যুমার মনোদেহের সুখ। ফেস্টিভ সোসাইটি গড়ে উঠেছে দিকে দিকে। মানুষের আগের চেয়ে বেশি উৎসব করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুনিয়া আনন্দের পক্ষে। গোড়াবাদিরা শুধু আনন্দ থেকে দূরে জীবনের অর্থ দাঁড় করাতে চায়। সেলিব্রেশনের মাধ্যমে আত্মতৃপ্তি অর্জন করি। সুখে থাকা এবং সেই সুখ উৎপাদনের সামাজিক মেশিন তৈরি ইকোনমিক্যাল ব্যাপার অনেক ক্ষেত্রে। আমাদের দৃশ্যমান অর্থের পরিমাণ যতই বাড়বে, উৎসবও ততই বাড়বে।

ধর্মীয় ও লোক সংস্কৃতির ছোট ছোট উৎসবের বাইরে সেলিব্রেশন কম ছিল। এখন অনেকগুলি উৎসবের দিন ধার্য হয়ে আছে। কয়েক বছরে আমাদের নাগরিক উৎসবে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। ঢাকায় নভেম্বর, ডিসেম্বরে কতগুলি বড় বড় উৎসব লেগে থাকে। শুনেছি ক্ল্যাসিক ফেস্টের মত এত বড় ধ্রুপদী সঙ্গীতের উৎসব এশিয়ায় বিরল। এত লোকের আনাগোনা, শুদ্ধ সঙ্গীত শোনার এই রূপ দেখা তো একটা ইতিহাসই বটে। বিশ ত্রিশ হাজার লোক একত্রে ধ্রুপদী বা লোক সঙ্গীত শোনার দৃশ্য এই শহরে ছিলই না।

লিট ফেস্ট
ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭

ফোক ফেস্ট, সুফি ফেস্ট এগুলি লেগেই আছে ইদানিং। প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসে। একই ভাবে অল্প কয়জন সাহিত্য করা লোকের দেশে লিট ফেস্টও হচ্ছে। ষোল কোটির দেশে দক্ষ পেশাজীবী শ্রেণি যেমন কম আমাদের কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, গদ্যকারও কম। কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা কম হলে সমাজকে ভেল্যুর ভাঙন কারা দেখাবে! নগরের ইন্টেলেকচ্যুয়াল কলুষ কারা পরিচ্ছন্ন করবে?

তারপরও লিটারেচার ফেস্ট হচ্ছে বছর বছর। প্রতি বছর এগুলি আরো আরো বড় হয়, ব্যয় বাড়ে। এই সমস্ত ঘটনা খুবই সিগনিফিকেন্ট। ভোক্তার ভোগের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তা ভেবে দেখার আছে। ক্ল্যাসিক ফেস্ট, ফোক ফেস্ট সারা রাত অব্ধি চলে। সবাই একসাথে খোলা মাঠের নিচে গান শোনে, গান গায়, নাচে। আমি নিজেও যতবার গিয়েছি, ততবারই ভাল লেগেছে। তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বল মুখ ভাল লেগেছে। এই সমস্ত ফেস্টের সংখ্যালঘু একমাত্র গরীব শ্রেণি মনে হয় আমার মত শিল্প, সাহিত্য করা লোকজন। কালচারের ছোট একটা ভোক্তা শ্রেণি হল শিল্প-সাহিত্য সম্পৃক্তরা। বাকি বড় একটা অংশ নানা শ্রেণির এলিট। সারারাত ধরে চলা এই সমস্ত অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক কোনো অপ্রীতিকর সংবাদ শুনি নি, আমার চোখেও পড়ে নি। ফলে, ধরে নেওয়া যায় এগুলি ভালোই চলে এবং আমরা সভ্য হয়ে উঠছি দিন দিন।

বাংলাদেশের এনজিওগুলি গ্রামীণ নারী-পুরুষের জীবনে যেমন একটা পরিবর্তন এনেছে, আমাদের এলিট তরুণ-তরুণীদের কালচারাল জীবনেও এই সমস্ত ফেস্টের ভূমিকা তার থেকে কোনো অংশে কম না। যিনি কোনোদিন ধ্রুপদী শোনেন নি তাকেও দেখেছি ধ্রুপদী উৎসবে। কার্ল মার্কসকে ওয়ার্ল্ড লিটারেচারের বড় লেখক ভাবে এমন ব্যক্তিও আপনি লিট ফেস্টে পেয়ে যাবেন কফি হাতে এক কোনায় দাঁড়িয়ে দেশি-বিদেশি বড় বড় কবি সাহিত্যিকের মাঝে।

লিট ফেস্ট
লিট ফেস্ট ভিজিটরদের জন্যে নির্দেশনা

এই শহরের এলিট নাগরিক সমাজ খুবই হিসাবদার। আপনি দরজা খুলে দিলেন আর তারা গিয়ে মাথা দুলিয়ে গান শুনবে, সাহিত্য আলোচনা শুনবে তা মনে হয় না। এলিটদের নানা রকম অপশনের সুযোগ থাকে আনন্দ লাভের জন্য। তবে, তারা কেন লিট ফেস্টে যায়? নাগরিকদের এই আচরণের আনুমানিক কারণ অনুসন্ধান করার দরকার আছে। শুধু এই নাগরিকরা না, যারা অতিথি হিসাবে আসেন তাদের বেশির ভাগের শিল্প-সাহিত্যের সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও সাহিত্য দর্শক উভয় দলের তেমন পরিচয় নাই। তাহলে এগুলির সাহিত্যগত গুরুত্ব কী? তাহলে আমরা কি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব করব না?

দুনিয়া আসলে পোস্ট-গুডস দশায় উপনীত। পণ্য আর পণ্যের মধ্যে নাই। পণ্য পণ্যের অধিক হয়ে উঠেছে এই কালে। এখন খাদ্য থেকে অর্গানিক ফুডের চাহিদা বেশি। খাবার থেকে ডায়েটিং আলোচ্য বিষয় খাবার টেবিলে। খাওয়া খাওয়া থেকে না খেয়ে থাকাটাই ব্যয়বহুল কখনো কখনো। টি শার্টের সুতোর তুলো ‘ফেয়ার কটন’-এ উৎপন্ন কিনা সেটাই অতীব বিবেচ্য। পণ্যের কোয়ালিটি থেকে সিএসআরের প্রচারণাই বেশি।

আপনি শুধু গুডস কেনেন না বাজার থেকে! পণ্যটির একটা ফলাফল আপনি ক্রয় করেন। ঠিক তেমনি, সাহিত্যও এই কালে পোস্ট-প্রোডাক্ট। লাইফ স্টাইল একটা বিষয় এখন। মানে, আপনি খাবার খান কিনা তা থেকে আপনার ভেগান পরিচয় মুখ্য। সাইকেলিস্টরাও নন-পলিটিক্যাল এক্টিভিস্ট পলিটিক্সের সাব্সটিটিউড হিসাবে, ব্লগাররা পলিটিক্যাল রিফর্মার রাজপথের। ফলে, আম বলতে আর আম না আর। আমের ফ্লেভারই বিষয়। ফলে, সাহিত্য বলতে আমরা যা যা জানি-বুঝি, তা তা সে আর নাই এই সময়ে এসে। সাহিত্য সাহিত্যের অধিক হয়ে উঠেছে। এর অর্থের পরিবর্তন হয়েছে। শিল্প-সাহিত্যে তো পণ্যই। তার উপযোগও ভিন্ন ছিল এক সময়। কিন্তু এই উপযোগের মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে। শিল্প, সাহিত্য একটা শ্রেণির লাইফস্টাইল হয়ে উঠতে পেরেছে। এই সমস্ত উৎসবে লিট-লাইফ যাপন করা মানুষের আনন্দ যদি হয় তবে এই ফেস্ট আরো বড় হওয়া দরকার তো বটেই। অর্থনৈতিকভাবে দেশে এলিট সমাজ বাড়ছে প্রতি বছর, ফলে একদিন বাংলা একাডেমিতে ফেস্টের লোক ধারণের তিল ঠাঁই থাকবে বলে মনে হয় না।

যে কোনো সাহিত্য সন্মেলনই আনন্দবাদী একটা ব্যাপার। এতে শিল্প-সাহিত্যের যা না হয় তার থেকে আনন্দ, ফূর্তি, লোক দেখাদেখি, দলাদলি ভাল হয়। সাহিত্যে এগুলির ব্যক্তিগত গুরুত্ব অপরিসীম।

দুনিয়াকে যতটা উদার করে দেখা যায় ততটাই ভাল। ফলে, লিট ফেস্টের বিরোধের কিছু নাই। এটা আসলে এলিটের উৎসব। এখানে গরীররাও আমন্ত্রিত, শুধু বাদাম না বেচলেই হল। দেশ যদি গরীব, বড়লোক সবার হয়, তবে এলিটের কড়ি ফেলে সাহিত্য শুনতে আমরা বারণ করতে পারি না।

আর সাহিত্যিকরা টাকা-পয়সায় কমজোরি হলেও তারা এলিটের, ক্ষমতার সেবকই। আমাদের সাহিত্যিকরা পোস্ট-কলোনির ভূত থেকে বেরই হতে পারল না। বাংলা সাহিত্য তো বিশ্বসাহিত্যের অনুকরণে তৈরি একটা বিষয়। ফলে, আপনি যতই বিদেশি সাহিত্যের বিরোধিতা করেন না কেন আপনার দেশি সাহিত্যের জিন কাঠামো ফরেন। হীনম্মন্যতা, ভাষা দুর্বলতা, অপর শ্রেণির প্রতি ঘৃণাবোধ উৎসারিত ফেস্ট বিরোধিতার কোনো মানে নেই। ইংরেজির পাশাপাশি, ফরাসি, জার্মন, আরবি, হিন্দি, উর্দূ শিখতে, লিখতে, পড়তে ও বলতে পারলে ভাল হতো। একটা সমাজে যত বেশি ভাষা তত বেশি চিন্তা, যেহেতু প্রতিটা ভাষারই চিন্তা কাঠামো আলাদা আলাদা। বহু ভাষার সাহিত্য চর্চা করার সুযোগ তৈরি করতে পারলে তা সমাজের জন্য, মানুষের জন্য ভাল। দুনিয়ার নানা প্রান্তের সাথে আমাদের সমকালীন ব্যবহারিক সাহিত্যিকদের কথা শোনা ও তাদের শোনানোর মিথষ্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আগানো ভাল।

সাহিত্যকে এতদিন আপনি যে পরিশীলিত, বিশুদ্ধ, জনকল্যাণমূলক, গরীবের বান্ধব মাধ্যম, সংস্কৃতি রক্ষার প্রতিজ্ঞা হিসাবে দেখেছেন সেভাবে দেখার সুযোগ আর নাই। সাহিত্য তার মিনিং থেকে অধিক কিছু হয়ে উঠেছে। সাহিত্যও অর্জন করেছে তার পোস্ট-লিট দশা। পোস্ট-গুডস দশা মানে যেমন পণ্যহীনতা না, তেমনি পোস্ট-লিটও সাহিত্যহীনতা না। ভিন্ন একটা মাত্র। ফলে, এই দশারই শিল্পগত সাহিত্য আচরণ হল নানা রকম ফেস্ট। মানুষ উৎযাপন চায়। হ্যাপি হতে চায় নানা ভাবেই। ফলে, কার্ল মার্কসকে সাহিত্যিক ভাবা কর্পোরেট ব্যক্তির দেখা মিলবে এখানে কফি হাতে সিরিয়াস সাহিত্যিকের সাথে সাথে। দুনিয়ায় এই বৈচিত্র্যকে মানতে শিখতে হবে।

আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল, সদজন এলিটরা এই সমস্ত ফেস্টের আয়োজক বলে ধরলাম। সেটাই হওয়ার কথা। অর্থের সাথে জাকজমকের সম্পর্ক রয়েছে। উৎকর্ষ অবশ্য অন্য বিষয়।

আমাদের এলিটরা সাহিত্যের রাজনৈতিক মুক্তি জানে না। টাকা তারা অর্জন করেছেন বহু কষ্টে, কৌশলে তবে তার ইফিসিয়েন্ট সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। গায়ক নির্বাচন পারফেক্ট, যন্ত্রীরা আনাড়ি হলে গানের যে দশা হয় আমাদের লিট ফেস্টের অবস্থা এর থেকে ভাল না। এগুলিকে আমাদের এলিটদের চিন্তার সীমাবদ্ধতাই বলব।

দেশে বিরাট এলিট শ্রেণি গড়ে ওঠলেও তাদের তেমন কোনো রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, অপরকে মূল্যায়নের বোধ, প্রান্তিক অনুসন্ধান, শিল্পের চাহিদা ও উদ্দেশ্য নানা বিষয়ে সীমিত জ্ঞানটুকুও নাই। ফলে, এই সমস্ত অনুষ্ঠানে বিরাট বিরাট ফিগার থাকে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা থাকে, আলোর অস্বল্পতা থাকে কিন্তু উৎকর্ষ থাকে না।

এমন একটা লিট ফেস্টের উদ্দেশ্য কী তা থেকে সেই উদ্দেশ্য তারা কীভাবে অর্জন করতে চায় সেটা মুখ্য। তার কোনো প্লান নাই। বিপুল অপচয় বলে মনে হয়। যেসব পৌউর আলোচ্য বিষয়ে আলোচনা হয় তাতে মনে হয় না তাদের কোনো ক্যালিবার আছে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে। অনুষ্ঠানগুলি সাজানো বিয়ের অনুষ্ঠানের মত করে। আক্দের অনুষ্ঠানে কাজী আসেন, গায়ে হলুদে ঘরের মেয়েরা শুধু, রঙ খেলায় বাড়ির বাচ্চারা, মেহেদীতে একটু নামকরা গজল গায়ক, বরযাত্রীতে নিকট আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব, বৌভাতে ঘুরে ফিরে বাংলা একাডেমি ও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাকুরিজীবী কোটায় চান্স পাওয়া শিল্পী-সাহিত্যিক। কলকাতার মাঝারি মানের শিল্পী-সাহিত্যিক আয়োজকদের বন্ধু। ফলে, তারা তিনদিন ফাইভ স্টার হোটেলে রাত কাটিয়ে ফিরে যান।

লিট ফেস্ট
লিট ফেস্ট আয়োজকত্রয়ী—কে আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ ও আহসান কবির

আমাদের গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও চিন্তকদের নানাভাবে নিরুৎসাহিত করার জন্য কিছু আয়োজক কমিটির লোক থাকে। মানে, আপনারা না আসলে অনুষ্ঠান থেমে থাকে না-র মত জবরদস্তিমূলক ব্যাপার থাকে তাদের আচরণে। তাহলে এই সমস্ত কাদের জন্য? ফলে, এখন অব্ধি ঢাকা লিট ফেস্ট বড়লোকের বাড়ির বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া কিছুই হয়ে ওঠে নি। এবছরও এর বাইরে কিছু হবে বলে মনে হয় না।

হয়ে উঠবে না, এমন চলতে থাকলে। কেন এমন হয় বছরের পর বছর? এই সমস্ত খুব নতুন কথা না। বাজারে প্রচলিত আছে। কিন্তু কোনো সংশোধন, নতুন ইচ্ছা আয়োজকদের থেকে দেখা যায় নি। প্রথমত তাদের বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান মানসিকতা থেকে রেব হতে হবে। ভাগিনার আব্দার বন্ধ করতে হবে আগে। আয়োজকদের যে অর্থ ও কানেকশনে কোনো সমস্যা নাই তা বিগত অনুষ্ঠানের অতিথিরাই উদাহরণ। কিন্তু তাদের অনুষ্ঠান পরিচালনার রুচি ও সক্ষমতা নিয়ে আমাদের সন্দেহ করার আছে বৈ কী!

কোনো একটা লিস্ট ফেস্ট যদি বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিগুলিতে প্রচলিত ‘বরিশাল সমিতি’ হয়ে যায় তাহলে তো মুশকিল। গত বছর যিনি ‘শিল্পে গাবগাছ’ নিয়ে কথা বলেছেন এবছর তিনি ‘সঙ্গীতে নৈঃশব্দ’ নিয়ে লেকচার দিবেন। কেমনে হয় এগুলি! ভাবা যায়! আয়োজকরা চক্ষুলজ্জাহীন ভাবে এগুলি কীভাবে সামাল দিচ্ছেন বছরের পর বছর, আমি বুঝি না। ঢাকা লিট ফেস্ট হয়ে উঠেছে সুযোগদান কর্মসূচি। প্রাতিষ্ঠানিক ও নিরপেক্ষভাবে আমরা কিছুই পারি না যেন এই দেশে। আমাদের যতটা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ততটা পলিটিক্যাল ও কালচারাল ওরিয়েন্টেশনের বিবর্তন হয় নাই। এই সমস্তের সমালোচনা জারি রাখা আমাদের কর্তব্য।

লিট ফেস্ট
লিট ফেস্ট অনুষ্ঠানে এদেশীয় কবিগণ

লিট ফেস্ট সাহিত্যের কী কী উপকার করে? কোনো উপকার নাই। যারা এই দেশে আসেন বরং তাদের লাভটাই একটু বেশি। তাদের নাম পরিচিতির সাথে সাথে বই বিক্রির বাজার তৈরি হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতির দুনিয়ায় এটাই স্বাভাবিক। নানা চিন্তক ও সাহিত্যিকদের বাজার বড় করা দরকার।

কিন্তু আমাদের কোনো বাজার কি তৈরি হচ্ছে এতে? সাহিত্যের মত মূল্যবান ক্রিয়েটিভ পণ্য বিক্রির সাপ্লাই চেইনকে আন্তর্জাতিক ফেস্ট কোনো সহযোগিতা বা প্রণোদনা দিতে পারছে কি? বা অন্যান্য দেশে আমাদের সাহিত্যিকদের নিজের অনুবাদ গ্রন্থ হাতে পাঠানোর জন্য কতটা সুযোগ তৈরি হয় এই সমস্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে? শিল্প-সাহিত্য বিক্রির জিনিস এইটা আমি তীব্র ভাবে বিশ্বাস করি। সাহিত্যে কোনো ভ্যালু তৈরি করতে না পারলে এই সমস্ত ফেস্ট দিয়ে আমরা কী করব।

সাহিত্য উন্নয়ন মানে আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য লেখার পাঠশালা খোলা না এখানে। হা করে আমরা বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক দেখে উৎসাহিত হয়ে সুসাহিত্যিক হয়ে যাব রাতারাতি! এভাবে হয় না সাহিত্য। সাহিত্য যতটা অনুপ্রেরণার ততটা সাধনার, ততটাই চর্চার বিষয়। সাহিত্যের আন্তর্জাতিকতা হল সাহিত্য-পণ্যটাকে বিশ্ববাজারে বিক্রি করতে পারা ভাল দামে। এই উন্নয়নের বিধিব্যবস্থা হোক এই সমস্ত ফেস্ট। কবি, সাহিত্যিকদের উৎপাদনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও দার্শনিক মূল্য তৈরি হোক।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে আনন্দ, উৎসব চাই অহরহ, যত্রতত্র। আমাদের জীবনে আনন্দ কমই। ঢাকা লিট ফেস্টের মাধ্যমে ঢাকার সাহিত্যিক ও আয়োজকদের জীবনে আনন্দ আসুক এই কামনা করি। ঢাকা লিট ফেস্টের মঙ্গল হোক।

Facebook Comments

কবি, গদ্যকার, চিন্তক, সমাজ দর্শক, ক্রিটিক জন্ম: ৯ অক্টোবর ১৯৮৪, বেড়ে ওঠা ঝিনাইদহ ও ঢাকা। প্রকাশিত কবিতার বই: ‘জলপ্রিজমের গান’ (২০১০), ‘কাছিমের গ্রাম’ (২০১৬) প্রকাশিতব্য কবিতার বই: ‘রক্তক্লেদ’।

1 COMMENT

  1. “আমাদের যতটা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ততটা পলিটিক্যাল ও কালচারাল ওরিয়েন্টেশনের বিবর্তন হয় নাই” এটাই আমাদের জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ভ্যালু বিনির্মাণের প্রধান অন্তরায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে কেন ওরিয়েন্টেশনের বিবর্তন হয় নাই! ব্যক্তিগত অভিমত হল এটার জন্য আমাদের মধ্যবিত্ত সাহিত্যকারী শিল্পকারী সিন্ডিকেটের অনমনীয় বিমাতাসুলভ অবস্থান। বিগত দুই যুগে বা তারও আগে থেকে সমসাময়িক সময় পর্যন্ত মানবিক জীবনধারায় যে পরিবর্তন (বলা ভাল বিবর্তন) এসেছে সাহিত্য/ শিল্পকারী মধ্যবিত্ত সিন্ডিকেট সে বিষয়ে সচেতনভাবে ভীষণ উদাসীন।

    আর উচ্চবিত্ত সাহিত্য/শিল্পকারীরা মধ্যবিত্ত সিন্ডিকেটের প্রতি হীনম্মন্যতায় ভোগে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় উচ্চবিত্ত সাহিত্যিক বা শিল্পকারীরা এখনও তাদের অবস্থানগত দিক থেকে দ্বিধাগ্রস্থ। সোস্যাল নর্মস ধরার বা অনুধাবন করার ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। যার কারণে এই মধ্যবিত্ত সিন্ডিকেট একদিকে আন্তর্জাতিক সাহিত্যরে উঁচু দরে কিনে আবার অন্যদিকে একে বালক মানসের খেলনাসুলভ আবেগী উপস্থাপন করে।

    অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সাহিত্য শিল্পকে “ইহা একপ্রকার মানসিক আনন্দদায়ক ক্রীড়া বই কিছু নহে” টাইপের ধারণাতে আজও অনড়। এই জিনিস যে হাইলি পেইড ইন্টেলেকচুয়াল প্রডাক্ট হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে অতি চাহিদাসম্পন্ন উঁচু শ্রেণির প্রডাক্ট তা অস্বীকার করা তো এক প্রকার বালকসুলভ সচেতন বোকামি। উচ্চবিত্ত কনোইজারদের এহেন অবস্থানগত অস্পষ্টতা এবং মধ্যবিত্ত সিন্ডিকেটের একগুঁয়েমি একপার্শ্বিক অনড় অবস্থানের ফল হিসেবে আমরা কেরানি সাহিত্যি, কেরানি শিল্প হয়ত তৈরি করছি (সৃষ্টি করছি না) যা আমাদের সোস্যাল ভ্যালু বিনির্মাণে বরং বিক্ষিপ্ত ও নেতিবাচক রোল প্লে করছে। এবং অবধারিত পরিণতি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে হাইলি পেইড ইন্টেলেকচুয়াল প্রডাক্ট হিসেবে মূল্যায়ন হওয়া তো দূরের কথা দেশি বাজারেও মুখ থুবড়ে পড়ছে। আর আমরা বিগত দুই যুগ পুরাতন ক্যাসেট ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিক্রি-বাজনা দুই ই করছি।

    আন্তর্জাতিক অবস্থান জানান দিতে বড় বড় ফেস্ট আয়োজন করছি বটে তাতে “আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার এর বদলে দর্জি” হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। কাজের কাজ যা হচ্ছে তা ওই ধনী লোকের শাদির মত “কোহি কমতি নেহি রাহেগা” টাইপের উৎসবের আয়োজন করে আমাদের উৎসবহীন নাগরিক জীবনে আনন্দের উপলক্ষ তৈরি এবং তা প্রতি বছর নিয়ম করে বৈচিত্রহীন ভাবে আয়োজন করে আত্মতুষ্টি উপভোগ করা।

    সর্বোপরি বলা যায় এই অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনে এই সিন্ডিকেট তেমন একটা আগ্রহী তো নয়ই বরং পরিবর্তনের বিপক্ষে। অন্তত আমাদের ভ্যালু বিনির্মাণের ইতিহাস তো তাই বলে। এই সব আন্তর্জাতিক আয়োজন থেকে আমাদের সাহিত্য-শিল্পকারীরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অবস্থান জানান দিতে চায় তবে উচ্চবিত্ত কনোইজারদের এখনই ভেবে দেখা দরকার যে, ঠিক কী কারণে এই মধ্যবিত্তের জমাট বাঁধা আবেগী মধ্যযুগীয় অবস্থানকে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সময়োপযোগী সংযোগ ঘটানো যাচ্ছে না! আর এ ক্ষমতা উচ্চবিত্তরাই ধারণ করে, তাদেরই পারতে হবে এবং অর্থবহ আয়োজনে যে কোনো সিদ্ধান্ত দ্বিধাহীন ভাবে গ্রহণ করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here