আশির দশকের মাঝামাঝি, এক পড়ন্ত বিকেলে, ব্রাত্য রাইসু আর আমি আবদুল মান্নান সৈয়দকে খুঁজতে বের হই। রাইসু তার সাথে দেখা করার জন্য ব্যাকুল।

আশির দশকের মাঝামাঝি, এক পড়ন্ত বিকেলে, ব্রাত্য রাইসু আর আমি আবদুল মান্নান সৈয়দকে খুঁজতে বের হই। রাইসু তার সাথে দেখা করার জন্য ব্যাকুল। পরাবস্তব কবিতা লিখেছেন মান্নান সৈয়দ, তার সাথে দেখা করতেই হবে। ১৯৮৪ সালে তার পরাবাস্তব কবিতা গ্রন্থটি বের হয়। আমি পড়ি নি, সম্ভবত রাইসু পড়েছে, এবং পড়ে প্রায় পাগল হয়ে গেছে। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড তখন আমাদের আড্ডালোচনার একটি বিষয়।

কবি জসীম উদদীন পরিষদের সভায় উল্টা-পাল্টা কবিতা কেউ নিয়ে এলেই আমিনুল হক আনওয়ার মান্নান সৈয়দের কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড থেকে দু/চার লাইন আওড়াতেন।—এখানে কবিতা বানানো হয়।/ সব ধরনের কবিতা।/ রাজনীতিক কবিতা,  সামাজিক কবিতা।/ নাগরিক কবিতা,  গ্রামীণ কবিতা।/ প্রেমের কবিতা,  শরীরের কবিতা।/ স্বপ্নের কবিতা,  বাস্তবের কবিতা।/ চল্লিশের কবিতা,  পঞ্চাশের কবিতা।/ ষাটের কবিতা,  সত্তরের কবিতা।/ আশির কবিতাও আমরা বাজারে ছাড়ছি শিগগিরই।/ কবিতার হাত,  পা,  মাথা,  ধড়,/ শিশ্ন,  যোনি, চুল,  নখ,/ চোখ,  মুখ,  নাক,  কান,/ হাতের আঙুল,  পায়ের আঙুল/ সবকিছু মওজুদ আছে আমাদের এখানে।/ স্বদেশি ও বিদেশি উপমা ও চিত্রকল্প,/ শব্দ ও ছন্দ,/ অন্ত্যমিল ও মধ্যমিল/ লক্ষ লক্ষ জমা আছে আমাদের স্টকে।”

রাইসুকে নিয়ে লেখা অন্য এক রচনায় (রাইসুর লগে যা যা হৈছে) আমি সেই সন্ধ্যার গল্প করেছি, এখানে শুধু এইটুকু বলি, বেশ কবার গ্রিন রোডে অবস্থিত মান্নান সৈয়দের বাসা এবং বাসার কাজের লোকের নির্দেশনা মতো শিল্পতরুর অফিসে ছোটাছুটি করেও তার দেখা পাই নি। আমার মনে হয়েছিল তিনি বাসার ভেতরেই ছিলেন, অচেনা বালকদের সাথে দেখা করবেন না বলেই বলে দিয়েছেন, “বাড়ি নেই।” পরাবাস্তব নেশা ছুটে যায় আমার, আমি কড়া বাস্তবে ফিরে আসি।

১৯৯০ সালের জুন মাসে আনসার ভিডিপির মুখপত্র প্রতিরোধ পত্রিকার চাকরি ছেড়ে আমি যোগ দেই ব্র্যাক-এ, চলে যাই খরস্রোতা খোয়াই নদীর পাড়ে, হবিগঞ্জে। এরপর একদিন কাউকে কিছু না বলে ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে ব্র্যাকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসি ঢাকায়, আমার প্রিয় শহরে। এসেই যুক্ত হই সাপ্তাহিক পূর্ণিমা পত্রিকার সাথে। এই সময়েই, ১৯৯১ সালের শেষের দিকে, প্রথম দেখা হয় মান্নান ভাইয়ের সাথে। তবে তার সাথে আমার তেমন নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে না। যদিও এর কয়েকদিন আগে তিনি আমার গদ্যের হাত খুব ভালো বলে পূর্ণিমার নির্বাহী সম্পাদক আতাহার খানের কাছে প্রশংসা করেছেন, কিন্তু আমার মাথায় ‘৮৪/’৮৫ সালের সেই সন্ধ্যা একটি নেতিবাচক পেরেক ঠুঁকে রেখেছে। আমার কেবলই মনে হয় তিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ঈদসংখ্যার জন্য উপন্যাস লিখছেন মান্নান ভাই। তখন তিনি জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেন। কলেজ ছুটির পরে চলে আসতেন পূর্ণিমা, রাত নয়টা পর্যন্ত এখানে বসে উপন্যাস লিখতেন, পাণ্ডুলিপি রেখেই চলে যেতেন, পরদিন এসে আবার লিখতে বসতেন, এভাবে প্রায় এক/দেড় মাস লিখে উপন্যাস শেষ করতেন।

আবদুল মান্নান সৈয়দ
আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩ – ২০১০)

এই দৃশ্য প্রতি বছরের। শুধু মান্নান ভাই না, আল মাহমুদ, শহীদ আখন্দ, সৈয়দ হায়দার, শিহাব সরকার, মঞ্জু সরকার — লাইন ধরে লেখকেরা বসে গল্প, উপন্যাস লিখতেন পূর্ণিমার ঈদ সংখ্যার জন্য। মান্নান ভাইকে আতাহার ভাই বিশেষ খাতির করতেন, স্টার কাবাব থেকে নান, শিক কাবাব আনাতেন। খেতে খেতে টুকটাক গল্প হত, হতে হতে মান্নান ভাইয়ের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে আমার। আতাহার ভাই আমাকে দায়িত্ব দেন, যেসব লেখকে এখানে আসেন তাদের ছোটো ছোটো ইন্টারভিউ করে রাখেন।

আমি ইন্টারভিউ করতে শুরু করি। মান্নান ভাই যে ঘটি এই বিষয়টি লুকোতে চাইছিলেন। উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে আমি প্রশ্ন করি, ওপার থেকে কি আপনার আব্বা এসেছেন, নাকি আপনি এসেছেন? তিনি তখন হেসে ফেলেন, আপনি তো দেখি সবই জানেন। না, আব্বার সাথেই আসি, আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের জালালপুরেই। ১৯৫০ সালে সাত বছর বয়সে পরিবারের সাথে চলে আসি। ঢাকার গোপীবাগে আমার বেড়ে ওঠা।

ইন্টারভিউ ছাপা হয়, তিনি খুব খুশি হন। এত নির্ভুল গদ্য আর শুদ্ধ ইন্টারভিউ আমার আর কোথাও বের হয় নি। এই কথা শুনে আতাহার ভাই আরো খুশি হন। তিনি আমাকে আরো দায়িত্ব দেন, আমি দ্বিগুণ উৎসাহে অন্যান্য লেখকদের ইন্টারভিউ করতে শুরু করি।

এরপর মান্নান ভাই এলেই আমাকে ডাকতেন আতাহার ভাই, তিনজন বসে আড্ডা দিতাম। অনেক পরে একদিন মধ্য আশি থেকে সেই সন্ধ্যাটিকে তুলে এনে টেবিলে বিছিয়ে দিই। তিনি মুগ্ধ হয়ে সেই সন্ধ্যার সৌন্দর্য দেখেন। দুই কিশোরের কবিতাপ্রেম দেখেন, নেড়ে-চেড়ে, উল্টে-পাল্টে দেখেন কৈশোরক পরাবাস্তব-উড়াল। এরপর তিনি হাসেন, রাইসু কিন্তু এই কথাটা আমাকে বলে নি কখনো। আমি বলি, হয়তো ভুলে গেছে। আমি অবশ্য কোনো কিছুই ভুলি না। তিনি বলেন, তাই তো দেখছি।

এরপর মান্নান ভাই আমার আপনজন হয়ে ওঠেন, অভিভাবক হয়ে ওঠেন। আমার প্রথম কবিতার বই পুরুষ পৃথিবী বের হবার আগে পাণ্ডুলিপি পড়তে দেই তাকে, তিনি পড়েন। বই বের হয়। এর প্রকাশনা উৎসব হয় মতিঝিলের এক রেস্টুরেন্টে। মান্নান ভাই সেই অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। উৎসবের স্যুভেনিরের জন্য একটি ছোট্ট লেখা দেন। তিনি লেখেন, “জিজীবিষা আর ইতিবাচকতা, কাজী জহিরুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত সপ্রেম দৃষ্টিতেই তাকিয়েছেন জীবন ও পৃথিবীর দিকে।” প্রকাশনা উৎসবে তিনি আমার কবিতার চেয়ে গদ্যের বেশি প্রশংসা করেন এবং বলেন, আমার হাত থেকে নাকি বড় কোনো গদ্যের কাজ বেরিয়ে আসবে।

মান্নান ভাই অতি মাত্রায় সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন। সহজেই রেগে যেতেন। তার ইন্টারভিউ নিয়ে ভুল ছাপার কারণে অনেকের সাথেই তার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। আমার সাথেও একটি বেশ তিক্ত ঘটনা ঘটে। একবার কবি জসীম উদদীন পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সংকলন সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর।

জসীম উদদীন পরিষদ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতেই পুরস্কার প্রদান করত। সেই বছর এমএস হুদা নামের এক ভদ্রলোক শিক্ষানুরাগী হিসেবে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। সংকলনে পুরস্কারপ্রাপ্ত সকলের জীবনী যাবে। অন্য অনেকেরটা আমি নিজেই লিখে দিয়েছি কিন্তু এই ভদ্রলোকের কোনো তথ্য পাচ্ছিলাম না। কেউ একজন আমাকে একটি লেখা এনে দিল, যেখানে এসএম (বা এম এস) হুদার ওপর মান্নান ভাইয়ের একটি লেখা আছে। আমি সংকলনের জন্য সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে দিই। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবনী কে লিখেছেন তা কোনো লেখার সঙ্গেই ছাপা হয় নি, কাজেই এটা যে মান্নান ভাইয়ের লেখা তা আমি উল্লেখ করি নি। সত্যি কথা বলতে কী, এই লেখার নিচে মান্নান ভাইয়ের নাম থাকলে তার অসম্মান হবে ভেবেই আমি তার নাম দিই নি।

কিন্তু সংকলন বের হবার পরে তিনি এটা পড়েন এবং বুঝতে পারেন যে এটি তার লেখা থেকে আমি নিয়েছি। এতে তিনি এতটাই রেগে যান যে পরবর্তী বেশ অনেক বছর আমার সাথে আর কথাই বলেন নি। আমি তাকে বোঝাবার অনেক চেষ্টা করেছি যে তার সম্মানহানি হবে ভেবেই আমি নাম দিই নি। তা ছাড়া এই লেখার সাথে তো অন্য কারোরই নাম যায় নি। তিনি কিছুতেই কিছু বুঝতে চাইলেন না।

এক পর্যায়ে তার রাগ থিতু হয়ে এলে আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন, ততদিনে আমারও জেদ চেপে যায়, আমিও তার সাথে কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। ২০০০ সালের পর থেকে তো বাইরে বাইরেই। ছুটিতে দেশে গিয়ে এক দুইবার দেখা হয়েছে, কিছু কথাও হয়েছে কিন্তু আগের মতো অন্তরঙ্গতা আর হয় নি।

আবদুল মান্নান সৈয়দ সন্দেহ নেই একজন প্রকৃত সব্যসাচী লেখক। কবিতা, কথাসাহিত্য, মননশীল সাহিত্য, গবেষণা, সম্পাদনা, নাটক, কাব্যনাট্য সাহিত্যের অনেক শাখায়ই তার ছিল সাবলীল বিচরণ। তিনি ধার্মিক ছিলেন না কিন্তু আস্তিক ছিলেন। আস্তিক যে ছিলেন এটি তার লেখা পাঠ করলেই বোঝা যায়। তার ছিল হাইটফোবিয়া, তিনি প্লেনে চড়লে জানালার পাশে বসতেন না। ফজল শাহাবুদ্দীন এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলেন তার সম্পর্কে, মান্নান এমনিতে খুব সাহসী কিন্তু ওপরে উঠে আর নিচের দিকে তাকাতে পারে না। একবার কলকাতা থেকে ঢাকার প্লেনে উঠলাম। আমি বলি মান্নান নিচে দেখো, সোনার বাংলাদেশ দেখা যাচ্ছে। মান্নান চোখ বন্ধ করে বলে, ফজল ভাই, প্লিজ প্লিজ…

খুব গোছানো মানুষ ছিলেন মান্নান ভাই। দু লাইন ড্রাফট কিছু লিখলেও খুব গুছিয়ে তা রেখে দিতেন। আমার ওপর যে দুই স্লিপ লিখেছিলেন তা আমাকে দিয়ে বলেন, কপি করে এটা আবার আমাকে ফেরত দেবেন কিন্তু। আমি অবশ্য তাকে আর মূল লেখাটা ফেরত দিতে পারি নি। অবশ্য প্রকাশনা উৎসবে তিনি ছিলেন এবং ছাপানো স্যুভেনির পেয়েছিলেন। জানি না সেটা তিনি তার কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন কিনা।

আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখা আমার প্রিয় একটি কবিতা দিয়ে লেখাটি শেষ করছি।

“আমার বন্ধু শাহজাহান হাফিজ ছিল জীবনানন্দের চেয়ে বেশি নির্জন।

চাঁদ দেখলে সে থরথর করে কাঁপত,

নদী দেখলে থরথর করে কাঁপত,

নতুন কবিতাবই দেখলে তার হাত কাঁপত 

            থরথর করে হাতের আঙুলগুলি কাঁপত,

তার গ্রামের বর্ণনা দিতে-দিতে উত্তেজনায় তার চোখে পানি এসে যেত,

কোনো মেয়ের মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারত না 

হাফিজ সামান্যে ছিল অসামান্য খুশি।

একবার মাধবকুন্ডের জলপ্রপাতের উৎসে যেতে গিয়ে

পা হড়কে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল কয়েকশো ফুট নিচের গহ্বরে।

আমি তাকে কোনো বই উৎসর্গ করলে

হয়তো সে আত্মহত্যা করে বসবে আনন্দের চোটে 

এই ভয়ে এখনো তাকে বই উৎসর্গ করি নি কোনো।

আমাদের শাহজাহান দেখেছিল জীবনের প্রতিটি জিনিশে

তাজমহল প্রতিষ্ঠিত।

 

অধুনা সে বিবাহিত, কিন্তু এখনো তার বিস্ময় কাটে নি,

নারীতে বিস্ময় আজো তার,  নিসর্গে বিস্ময়,  অক্ষরে বিস্ময়।

 

সে নিজে বিস্ময়,  সে কি তা জানে?

আত্মমগ্ন, কবির অধিক কবি,  শাহজাহান হাফিজ জানে না।

জানে না,  সে নিজে বিস্ময়ের অধিক বিস্ময়।

চাঁদ কি জেনেছে কোনোদিন তার নিজের শরাব?

ঘোড়া কি জেনেছে তার নিজের গরিমা?

 

আমি চিন্তাই করতে পারি না, শাহজাহান হাফিজ কী করে

রতিক্রিয়া সম্পাদন করে।  

(কবিতা: আমার বন্ধু)

 হলিসউড নিউইয়র্ক, ২ মার্চ ২০১৮

আড্ডার সব গল্প >>