রোজী আপার সাথে আমার বয়সের পার্থক্যটা আমি কোনোদিন বুঝতেই পারি নি। আমি যখন ত্রিশ বছরের যুবক, নব্বুইয়ের দশকে, তখন যে গতিতে ছুটতাম, রোজী আপার গতি এর চেয়ে একটুও কম ছিল না। আজ এই সভায়, কাল ওই সভায়, অথবা ফোন করে বললাম, রোজী আপা চলেন, গাজীপুর থেকে ঘুরে আসি, কবিতার আড্ডা হবে, তিনি সাথেই সাথেই রাজী।

এই তো সেদিন, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে, ফোন করে বলি, রোজী আপা দীপনপুর-এ আসুন, আড্ডা দেব। তিনি শুধু জিজ্ঞেস করলেন, কয়টায়? আমি বলি, পাঁচটায়। গিয়ে দেখি রোজী আপা আমার আগেই পৌঁছে গেছেন, সাড়ে চারটায়।

এই হলো কাজী রোজী। খুব বিপদে না পড়ে গেলে কখনো কোথাও বিলম্বে পৌঁছান না, আর কোনো কিছুতেই তার না নেই। অসম্ভব ইতিবাচক এবং প্রাণশক্তিতে ভরা এক মানুষ।

‘ভাত দিবার পারস না ভাতার হবার চাস’ লিখে তিনি চপেটাঘাত করেন মরদগিরির শেকড়ে। তখন, সেই নব্বুইয়ের দশকেই, সাংবাদিক দুলাল খান কানের কাছে সব সময় কাজী রোজী, কাজী রোজী করতেন। তার অফুরন্ত প্রাণশক্তিই দুলালকে আপ্লুত করেছিল। আরো একটি কারণ ছিল, রোজী আপা ক্যান্সার সারভাইবার।

১৯৯৪ সালে ধরা পড়ে তার দেহে বাসা বেঁধেছে কর্কট রোগ, স্তনকর্কট। চিকিৎসা শুরু হয়, কেমো চলে, মাথার চুল চলে যায়, কিন্তু তার মনোবল যায় না। অটুট মনোবল তাকে উজ্জীবিত রাখে সারাক্ষণ। তিনি বলেন, এই ক্যান্সার, ওই ঘরের মধ্যেই থাকো, আমি দরোজা বন্ধ করে দিলাম। আমার এখনো অনেক কাজ বাকি। কাজ শেষ হোক তখন দরোজা খুলে দেব, তখন তুমি আমাকে যেখানে নিয়ে যেতে চাও, নিয়ে যেও। এই হলো রোজী আপা।

কাজী রোজী
নিউ ইয়র্কে লেখকের স্ত্রী মুক্তি জহিরের সাথে কাজী রোজী

ক্যান্সারকে এক ধমক দিয়ে বসিয়ে রেখেছেন আর তিনি ছুটছেন, কাজে, জাতীয় কবিতা উৎসবে, সেন্সর বোর্ডে, সর্বত্র। কবি কাজী রোজী হাজারো কর্কট রোগীর কাছে হয়ে ওঠেন দৃঢ় মনোবলের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রোগযন্ত্রণাকে উড়িয়ে দিয়ে, ভয়কে জয় করে তিনি এগিয়ে চলেছেন, ছুটে চলেছেন, নির্মাণ করে চলেছেন নির্ভয়-সড়ক সতীর্থদের জন্য, উত্তর প্রজন্মের জন্য। বাড়ির সবাই, বন্ধুরা, অবাক, বলে কী এই মেয়ে!

তার সাথে আমার পরিচয় ঘটে পাবলিক লাইব্রেরিতে। কী অনুষ্ঠান ছিল সেটা মনে নেই, তবে সম্ভবত সুকান্ত পরিষদের কোনো অনুষ্ঠান হবে। তিনি আলোচক ছিলেন, আমিও বক্তৃতা করি। অনুষ্ঠান শেষে, আমি না, রোজী আপাই এগিয়ে আসেন এবং আমার সাথে আলাপ জমিয়ে তোলেন।

অনুজপ্রতিম কোনো কবির সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে চাওয়ার মত উদার মানসিকতাসম্পন্ন লেখক/কবি আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই। রোজী আপা খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারা, নারী লেখক শুধু নয়, লেখকের সংখ্যাই বাংলা সাহিত্যে বিরল। আমি তার কথার জাদুতে মুগ্ধ হই। তিনি ফোন নাম্বার দেন, আমিও নাম্বার দেই। ব্যাস, সেই থেকেই রোজী আপার সাথে আমার এবং আমার পরিবারের একটি নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে।

তখন তিনি চাকরিতে, ডিএফপি’র মাসিক প্রকাশনা সচিত্র বাংলাদেশ-এর সম্পাদক। আমাকে বলেন, লেখা দাও। একদিন লেখা নিয়ে যাই, কবিতা। তিনি ছাপেন। এরপর বলেন, বিল নিয়ে যাও, আবার একদিন যাই, বিল নিয়ে আসি। এভাবে আমাদের বন্ধুত্ব ক্রমশ নিবিড় হতে থাকে। রোজী আপাকে আমার স্ত্রী মুক্তিও ভীষণ পছন্দ করেন। খুব ঘরোয়া, পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান, আর কাউকে না বললেও, আমরা রোজী আপাকে বলি। রোজী আপা সানন্দে তাতে যোগ দেন। কখনো তার মধ্যে এই অনীহা দেখি নি, ওটা তো শিল্প-সাহিত্যের কিছু না, আমি কেন যাব?

আমার কোনো বই বেরুলে আমি যেমন রোজী আপাকে দেই, রোজী আপাও তার বই বেরুলে আমাকে দেন। এখন যতটা মন দিয়ে কবিতা পড়ি, ঢাকায় থাকতে ততটা মন দিয়ে পড়তাম না, পড়ার চেয়ে লিখতেই বেশি ব্যস্ত থাকতাম। যেন সব শিখে ফেলেছি, আর পড়তে হবে না। আমার সেই মূর্খতার কথা মনে করে এখন খুব লজ্জা পাই। তাই সেই সময়ে রোজী আপা আমাকে যে বইগুলো দিয়েছেন তা শুধু শেলফেই শোভা পেয়েছে, হয়তো খুলে, বইটি যখন পেয়েছি তখনই, একটি দুটি কবিতা পড়েছি। ব্যাস ওইটুকুই। তাই তার কাব্যপ্রতিভা নিয়ে তেমন কিছুই আমার লেখা হয়ে ওঠে নি।

গত গ্রীস্মে তিনি কাজী রোজীর কবিতা আমাকে দ্বিতীয়বারের মত দেন। আমি বইটি পড়ি। বেশ মনযোগ দিয়েই পড়ি। কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি ছন্দের শৃঙ্খলে খুব বেশি বন্দি থাকেন নি। তবে যে কয়টা স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের কবিতা লিখেছেন তা লিখেছেন নিখুঁত ছন্দেই। বাংলা কবিতার প্রচলিত ছন্দগুলো যে তিনি ভালো করেই জানেন, তা আমাদের দ্বিপাক্ষিক অনেক আড্ডাতেই নিশ্চিত হয়েছি, যখন আমরা অন্য অনেকের কবিতার ব্যবচ্ছেদ করেছি একসঙ্গে বসে।

তিনি খুব সহজ কথায় সমাজের অসঙ্গতিগুলো তার কবিতায় তুলে এনেছেন। সব সময় অবস্থান নিয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র মানুষের পাশে। কাজী রোজীর অনেক কবিতায় আমি দেখেছি তিনি একটি বিষয়কে কবিতার কেন্দ্রে রাখেন, সেই বিষয়কে কেন্দ্র করে কবিতাটি আবর্তিত হয়। তাই পুরো কবিতাটির মধ্যে একটি সুগভীর পারম্পর্য তৈরি হয়।

আধুনিক কবিরা এই পারম্পর্যটিকেই ভাঙতে চেয়েছেন। কবিতায় তিনি যে জীবনের জয়গান করেছেন, তার একটি মূল্য অবশ্যই আছে। তিনি যখন ঝড় নিয়ে কবিতা লেখেন, ঝড়ের নেতিবাচক প্রভাবে গৃহ ভাঙে, পশুপাখি মারা যায়, মানুষের জীবনে-সংসারে রূপকল্পেও ঝড়কে উপস্থাপন করেন, তবে তিনি ঝড়কে দূরে রেখে পঙ্ক্তি‌ নির্মাণ করেন না। এটি তার কবিতার অনেক বৈশিষ্ট্যের একটি মাত্র।

তিনি প্রেমের, বিরহের, আধ্যাত্মিকতার কবিতা লিখেছেন যদিও, কিন্তু তার কবিতার প্রধান সুর হচ্ছে বিপ্লব। তার কবিতায় নারীর অধিকার, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার তীব্র ও জোরালোভাবে এসেছে। এই যে যুদ্ধ, এই যে সংগ্রাম তার কবিতার কেন্দ্রে, এটি কোনো ধার করা বিষয় নয়, বিষয়টি তিনি তুলে এনেছেন তার জীবন থেকে।

ঊনিশ বছরের তরুণী নিজের চেয়ে ত্রিশ বছরের বড় ফুপাত ভাই কবি সিকান্দার আবু জাফরকে বিয়ে করে ফেলেন। মাত্র ৪/৫ বছরের সংসার। ১৯৭৫ সালে যখন সিকান্দার আবু জাফর মারা যান তখন রোজী আপার কোলে সুমী, তিন বছরের শিশু। এই শিশুটিকে কোলে নিয়ে তিনি নেমে পড়েন জীবন যুদ্ধে। রোজী এবং সুমীর জন্য কিছুই রেখে যান নি সিকান্দার আবু জাফর, তাই সর্বাগ্রে জীবিকার জন্যেই তাকে পথে নামতে হয়।

কাজ পান রেডিওতে, ক্যাজুয়াল আর্টিস্ট। চেকটা পেয়েই ছোটেন দুধ কিনতে, তার শিশু কন্যার জন্য। এরপর চাকরি পান তথ্য মন্ত্রণালয়ে, পরে পিআইডিতে, এরপর ডিএফপি, এরপর ন্যাম, এরপর অবসর। আসলেই কি অবসর আছে তার? না নেই, কত কত সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত, কবিতা যুদ্ধে, রাজপথের যুদ্ধে, নারীর অধিকার আদায়ের যুদ্ধে কাজী রোজী এক বীর যোদ্ধা।

এবার একটি মজার ঘটনা বলি। কবি আল মাহমুদ চাকরি করতেন দৈনিক ইত্তেফাকে। রোজী আপার আব্বা কাজী শহিদুল ইসলাম ছিলেন মাহমুদ ভাইয়ের বস। রোজী আপার প্রতি মাহমুদ ভাইয়ের দুর্বলতা ছিল, হয়ত দুজনের প্রতিই দুজনের দুর্বলতা ছিল। কিন্তু একদিন রোজী আপার আব্বা বিষয়টি টের পেয়ে মাহমুদ ভাইকে আচ্ছা করে শাসান, “বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে চাও” বলে তাকে ভর্ৎসনা করেন। এই দুঃখ মাহমুদ ভাইয়ের বুকের ভেতর সারা জীবন ছিল। প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার দুঃখ না, অপমানিত হওয়ার দুঃখ। গল্পটি আমি মাহমুদ ভাই এবং রোজী আপা দুজনের মুখে দুই রকমভাবে শুনেছি। তবে ঘটনা যে কিছু একটা ছিল তা আমি টের পেয়েছি।

২০০৩ সালে আমার বাসায়, এক আড্ডায়, দুজনই আসেন। তারা দুজন ঘরের আড্ডা ফেলে বারান্দায় গিয়ে নিভৃতে দীর্ঘ সময় কাটান। তাদের দুজনের মুখেই সেই সময়ে খানিকটা রোমান্টিকতার আভাস ছিল বৈকি। এ নিয়ে আমি মাহমুদ ভাইকে পরে অনেক খেপিয়েছিও। তিনি শুধু হো হো করে হেসেছেন।

কাজী রোজী
লেখকের নিকেতনের ফ্ল্যাটে বাঁ থেকে জাহিদ হায়দার, কাজী জহিরুল ইসলাম, কাজী রোজী ও আল মাহমুদ। ছবি. কাজী বিটন, ডিসেম্বর ২০০৩

২০১৮-র মার্চ মাসে রোজী আপা নিউ ইয়র্কে এলে কথাটি আবার তুলি। তিনি বলেন, মাহমুদ ভাই আমাদের বাড়িতে আসতেন আমাকে কবিতা লেখা শেখাতে। তিনি আমাকে ছন্দ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, পয়ার, অমিত্রাক্ষর, বাংলা কবিতার ইতিহাস এসব শেখাতেন। আমি বাজে কবিতা লিখলেও মাহমুদ ভাই বলতেন, ভালো হয়েছে, খুব এনকারেজ করতেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমরা এক সাথে কাজ করেছি। খুব বড় মনের একজন মানুষ কবি আল মাহমুদ। তবে একটা কথা তোমাকে বলি, তিনি যে আমাকে কবিতা শেখাতেন, এই শেখানোটাই সব নয়, এর ভেতরে আরো কিছু ছিল যা কেউ জানে না, আমি জানাতেও চাই না। থাক না কিছু কথা গোপন।

আমি বলি, আপনার আম্মা নাকি মাহমুদ ভাইকে খুব পছন্দ করতেন, জামাই-আদরে যত্ন করে খাওয়াতেন? আমার একথা শুনে রোজী আপা হাসেন। সেই হাসিতে আমি দেখি অনেক দূরে ফেলে আসা এক নদীর ঢেউ। নিউ ইয়র্কে একটি রাত তিনি আমাদের বাসায় কাটান। সেই সন্ধ্যায় মুক্তি এবং আমি রোজী আপার জন্যে একটি আড্ডার আয়োজন করি। নিউ ইয়র্কের শিল্প-সাহিত্যের কিছু প্রিয় মুখ যোগ দেন, তাদের মধ্যে তাজুল ইমাম, নজরুল কবীর, স্বপ্না ইমাম, নার্গিস আহমেদ, উইলি মুক্তি, মোস্তাক আহমেদ, নুসরাত এলিন, ওবায়েদুল্লাহ মামুন প্রমুখ ছিলেন।

কাজী রোজী
নিউ ইয়র্কে পাঠকের পাতার অনুষ্ঠানে সাবিনা নীরু, কাজী জহিরুল ইসলাম ও ওবায়েদুল্লাহ মামুনের সঙ্গে কাজী রোজী। ছবি. মুক্তি জহির, মার্চ ২০১৮

পরদিন কুইন্স লাইব্রেরিতে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। এতেও তিনি যোগ দেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তার জন্ম না হলে বাংলাদেশ হত না।

২০০৭-এ প্রেসক্লাবে আমার তিনটি বইয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। ‘কাকাওয়ের দেশে’ বইটির ওপর আলোচনা করেন নাসির আহমেদ, ‘আকাশের স্ট্রিটে হাঁটে ডিজিটাল নারদ’ গ্রন্থের ওপর আলোচনা করেন জাহিদ হায়দার এবং ‘কসোভোর পথে প্রান্তরে’ বইটির ওপর আলোচনা করেন কাজী রোজী। রোজী আপা লিখিত বক্তব্য দেন, তিনি বলেন, “কবি কাজী জহিরুল ইসলামের কসোভোর পথে-প্রান্তরে পড়তে পড়তে আমার মনন-ভ্রমণ হয়ে গেল। স্থলপথে জলপথে কিংবা আকাশপথে নয় — মনের দৃষ্টি মেলে কসোভোতে হারিয়ে গেলাম আমি। নীরবে নিভৃতে মুহূর্তে ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে আমার মন আশ্রয় নিল কসোভোর মানুষ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ঘটনাবহুল নান্দনিকতার অবস্থানে। সাথে ছিলেন ঘুরে ফিরে সেই অদৃশ্য মানুষ যার নাম কাজী জহিরুল ইসলাম।

কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা পড়েছি, আলোচনাও করেছি, সেখানে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি। কিন্তু গদ্য — এ যে ভীষণ অন্য জগত! তার ওপর এখানে-সেখানে নিকট ও দূরের খবরাখবর মিশ্রিত গদ্য।”

দীর্ঘ রচনাটি থেকে এইটুকু এখানে তুলে দিলাম।

কাজী রোজী একজন স্বতঃস্ফূর্ত কবি, সাবলীল কবি, প্রাকৃতিক কবি। কবিতা লেখার জন্যে তার কোনো প্রস্তুতি দরকার হয় না। অথবা বলা যায় তিনি সব সময় প্রস্তুত হয়েই আছেন। একবার আমরা গাজীপুরের কাজীর গাঁ থেকে ফিরছি। সাথে রোজী আপা। তিনি ফিরে এসে কাজীর গাঁয়ের ওপর একটি কলাম লিখেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায়। গাড়িতে বসে রোজী আপাকে বলি, আপা আজ অগ্নির জন্মদিন, গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে বসে আমরা একসাথে খাওয়া-দাওয়া করব। রেস্টুরেন্টে পৌঁছাতেই রোজী আপা বলেন, অগ্নির জন্য আমি একটি কবিতা লিখেছি, তিনি কবিতাটি পড়ে শোনান। সেটিই, সন্দেহ নেই, অগ্নির জন্মদিনের সবচেয়ে দামি উপহার হয়ে উঠেছিল।

কাজী রোজী
কাজীর গাঁয়ে কাজী রোজী ও লেখক-পুত্র কাজী আবরার জহির। ছবি. কাজী জহিরুল ইসলাম, ২০০৭

রোজী আপা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নানান ভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যে সাক্ষী দিয়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত একজন সাংসদ। গত আগস্টে যখন দেখা হয়, তিনি আমাকে বলেন, জহির, আমার আত্মতৃপ্তিটা কী জানো, আমি যখন মরে যাবো, জাতীয় পতাকা দিয়ে আমার মৃতদেহটাকে মুড়িয়ে দেয়া হবে। দেশপ্রেম রোজী আপার ধমণীর প্রতি শিরায় শিরায় বহমান। তার সঙ্গে কথা বললে আমার শুধু এই কথাই মনে হয়, “সবার ওপর বাংলাদেশ সত্য তাহার ওপরে নাই।”

কবি কাজী রোজীর সেই বিখ্যাত কবিতাটি দিয়েই তাকে নিয়ে লেখা আড্ডার গল্প শেষ করছি।

ভাত দিবার পারস না ভাতার হবার চাস
কেমন মরদ তুই হারামজাদা
নিত্যি রাইতে ক্যান গতরে গতর চাস
পরাণ না রয় যদি পরাণে বাঁধা।
যে জন বাঁচতে চায় তারেই লড়তে হয়
তামাম দুইন্যা জুড়ে বুঝছে এখন
নিঠুর জঠর জ্বালা সইতে পারে না বলে
সবাই সহ্য করে সব জ্বালাতন।
কৃষক লড়াই করে জমিনে ফসল ভরে
সাত পুরুষের ভিটে আগলে রাখে
কানাকড়ি মূল্যের সে ভিটের দাম দিতে
কোটি টাকার মহাজন আড়ালে ডাকে।
ছাওয়াল কানলি পরে পোড়া এ গতরডারে
মাঝির বৈঠ্যা ভেবে দাঁড়ে দেই টান
হায়রে সোয়ামী তোরে ছুঁইয়া কইতে পারি
খরায় জমিন পোড়ে পোড়ে না পরাণ
এটটু ভাতের লাগি এটটু ত্যানার লাগি
গল্পের মতো এই গতর দিলাম
ভাত দিতি পারলিনে তবুও ভাতার হলি
হায়রে সোয়ামী তুই-ই ডাকলি নিলাম।

হলিসউড, নিউ ইয়র্ক, ৭ মার্চ ২০১৮

আড্ডার সব গল্প >>

Facebook Comments

জন্ম. খাগাতুয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ১৯৬৮। প্রধান আয়কর কর্মকর্তা, জাতিসংঘ সদর দফতর।

১৯৯৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বের হয়েছে ৪২টি বই।
কবিতার  বই ১৬ টি, উল্লেখযোগ্য  কয়েকটি:

  • পুরুষ পৃথিবী, ১৯৯৪, কবি জসীম উদদীন পরিষদ;
  • আকাশের স্ট্রিটে হাঁটে ডিজিটাল নারদ, আগামী, ২০০৫;
  • দ্বিতীয়বার অন্ধ হওয়ার আগে, একুশে প্রকাশন, ২০০৬;
  • ক্রিয়াপদহীন ক্রিয়াকলাপ, সৃষ্টিসুখ প্রকাশন (কোলকাতা), ২০১৬;
  • না জর্জেট না জামদানি, দেশ প্রকাশন, ২০১৬;
  • রাস্তাটি ক্রমশ সরু হয়ে যাচ্ছে, সময় প্রকাশন, ২০১৭;
  • সূর্যাস্তের পরের ফিরিস্তি, অনন্যা, ২০১৭;
  • উটপাখিদের গ্রামে উড়ালসভা, তিউড়ি প্রকাশন, ২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here