এ বাড়িতে অনেক তরুণ কবি-সাহিত্যিক যেমন যেত, অনেক ধান্ধাবাজও যেত। বেশিরভাগই যেত আলমগীরের আকর্ষণে, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতে।

আমি যখন তাকে চিনি তখন তিনি খোশনূর আলমগীর, চিত্রনায়ক আলমগীরের স্ত্রী। যখন তার সঙ্গে আমার শেষবার দেখা হয়, তখনো তিনি খোশনূর আলমগীর। পরবর্তীতে আলমগীর কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লাকে বিয়ে করলে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তিনি তার নাম থেকে আলমগীর মুছে দিয়ে হয়ে যান খোশনূর। কিন্তু আমি যেহেতু তাকে খোশনূর হিসেবে চিনি নি তাই আমার চেনা নামটিই ব্যবহার করলাম। খোশনূর আলমগীরের ডাক নাম অনু, তাকে আমরা অনু আপা বলেই ডাকতাম।

১৯৮৪ সালের শেষের দিকে, বা ‘৮৫ সালের প্রথম দিকে, এক বিকেলে কবি আমিনুল হক আনওয়ার আমাকে খোশনূর আলমগীরের বনানীর বাড়িতে নিয়ে যান। ছিমছাম একটি বাড়ি, গাড়ি বারান্দায় দুটো গাড়ি, বিশাল লিভিং রুম নিচতলায়,বেডরুমগুলো সব দোতলায়। বিদেশের সিনামায় যেমন বাড়ি দেখি ঠিক সেইরকম একটি বাড়ি।

প্রথম পরিচয়েই খোশনূর আপাকে ভীষণ ভালো লাগে, তার মায়াভরা দুটি ডাগর আঁখির দিকে তাকাতেই তিনি তার বড় মেয়ে আঁখির কথা বলেন,ছোটো মেয়ে তুলতুলের কথা বলেন, শিশুপুত্র তাসবীরের নানান দুষ্টুমির কথা বলেন। এরই মধ্যে কাজের মেয়ে নানান রকম খাবার সাজিয়ে টেবিল ভরে ফেলে। আমরা দীর্ঘ সময় আড্ডা দিই। তিনি তার সদ্য লেখা কবিতা পড়ে শোনান। আমি এবং আমিনুল হক আনওয়ারও আমাদের লেখা কবিতা পড়ি। আমাদের তিনজনের কবিতা সন্ধ্যাটি ছিল সৌহার্দ্য আর আন্তরিকতায় পূর্ণ।

এ বাড়িতে অনেক তরুণ কবি-সাহিত্যিক যেমন যেত, অনেক ধান্ধাবাজও যেত। বেশিরভাগই যেত আলমগীরের আকর্ষণে, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতে। আলমগীরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। তার গ্রাম গোপালপুর আর আমার গ্রাম রতনপুর। পাশাপাশি গ্রামের মানুষ হওয়া সত্বেও আলমগীরের প্রতি আমি কোনো আকর্ষণ অনুভব করতাম না। আমি যেতাম অনু আপার টানেই। আমার কাছে অনু আপাকে একজন খাঁটি মানুষ মনে হত। জানি না কী কারণে, আলমগীরকে আমার ভালো মানুষ মনে হত না। মনে হত অহঙ্কারী এবং বদরাগী। অথচ অনু আপা ছিলেন এমন একজন মানুষ যাকে দেখলেই ভালো লাগে, তার সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগে। আমার সব সময় মনে হত, আমার মত এক দরিদ্র কিশোর কবিকে তিনি সম্মান করেন, ভালোবাসেন, গুরুত্ব দেন, এটা আমার কাছে এক বিশাল পাওয়া। কবি হিসেবে তিনি যে আমাকে গুরুত্ব দিতেন, এটা আমার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। তিনি আমাকে ফোন নাম্বার দিয়ে বলেন, ফোন দিও, আর সময় পেলে চলে এসো। আমি বনানীর এই বাড়িটিতে প্রায় রোজই যেতে শুরু করি।

খোশনূর

আমার খালাত ভাই কনককে একদিন এই দম্পতির কথা বলি। তাদের বাড়িতে আমি যাই, এটা বলি। কনক রীতিমত পাগল হয়ে যায় আলমগীরকে দেখার জন্য। একদিন ওকে নিয়ে যাই। এরপর আমার চেয়ে কনকই এই পরিবারের বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

অনু আপা খুব অতিথিপরায়ণ মানুষ। দিন-রাত মানুষ আসছে, দলে দলে মানুষ আসছে। সবাইকে খাওয়ান, সকলের সঙ্গে কথা বলেন। তার মধ্যে একটা নেত্রী নেত্রী ভাব। সুযোগটা নেয় দুজন, একজন কাজী সালাহউদ্দীন, অন্যজন শেখ সামসুল হক। দুজনই কবি। এবং দুজনই অনু আপার সাথে লেগে আছেন আঠার মত। একদিন ঠিক হয় আমরা সবাই মিলে একটি কবিতার সংগঠন করব। নাম কী হবে সংগঠনের? কাজী সালাহউদ্দিন বলেন, অনুপ্রাস। অনু আপার অনু দিয়েই অনুপ্রাস। অনু আপা দারুণ খুশি। অনুপ্রাস এর যাত্রা শুরু হয়। খোশনূর আলমগীরকে সভাপতি আর কাজী সালাহউদ্দিনকে মহাসচিব করে অনুপ্রাস এর একটি কমিটি গঠন করা হয় ১৯৮৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। প্রথম কমিটিতে সম্ভবত আমি নির্বাহী সদস্য ছিলাম, কিছুদিন পরেই আমাকে সাংগঠনিক সচিব করা হয়। এবং অল্প দিনের মধ্যেই সারা বাংলাদেশে অনুপ্রাস ছড়িয়ে পড়ে। জেলায় জেলায় অনুপ্রাস এর শাখা গঠিত হয়। অনুপ্রাস হয়ে যায় জাতীয় কবি সংগঠন। কয়েক বছর পরে এর একটি স্লোগানও তৈরি করি আমরা, ‘সত্য, সুন্দর ও শান্তির জন্য কবিতা’। তখন মনে হত, অনুপ্রাস মানেই কবিতা, কবিতা মানেই অনুপ্রাস।

অনু আপা তখন খুব মেধাবী একজন মানুষ ছিলেন, হয়তো এখনো তার সেই মেধার ধার আছে। মুখে মুখে মিল-টিল দিয়ে কবিতা বানিয়ে ফেলতেন। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো মঞ্চে তাকে তুলে দিলেই তিনি বেশ গুছিয়ে কয়েক মিনিট বক্তৃতা দিতে পারতেন। শেখ সামসুল হক ছিলেন দৈনিক নব অভিযান পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। নব অভিযান পত্রিকার অফিস ছিল শান্তিবাগে। তিনি তার সাহিত্যের দুটি পাতা থেকে একটি পাতা অনুপ্রাসকে ছেড়ে দেন। সেই পাতায় শুধু অনুপ্রাসের কবিদের কবিতা ছাপা হত। সেই পাতাটির সম্পাদনার দায়িত্ব পান আমিনুল হক আনওয়ার। আমরা প্রতি শনিবারে দল বেঁধে শান্তিবাগের নব অভিযান অফিসে যেতাম। আড্ডা দিতাম, চা খেতাম। কবিতা বাছাইয়ে আমি হক সাহেবকে সহযোগিতা করতাম। তখন প্রায় প্রতি মাসেই নব অভিযান-এ দুটো আর দৈনিক আজাদ-এ দুটো কবিতা ছাপা হতো আমার। কয়েক বছর পরে নব অভিযানের অফিস লাল কুঠিতে চলে গেলে আমরা ওখানেও প্রতি শনিবারে যেতাম। অনুপ্রাস নিয়ে এতটাই মশগুল হয়ে পড়ি, বাংলাদেশের অন্য কোনো পত্র-পত্রিকায় কবিতা ছাপানোর কথা তখন আমার মাথায়ও আসত না।

অনুপ্রাস এর সদস্য সংখ্যা বাড়তে বাড়তে শত শত, হাজার হাজার হয়ে গেল। কবিতার পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া ও জাতীয় দিবসগুলোতে রাজনৈতিক সংগঠনের মতো প্রটোকল মেনে স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে ফুল দেওয়াও শুরু করি। বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, শীতার্তদের গরম কাপড় দেওয়া, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, বুদ্ধিজীবী দিবসে ফুল দেওয়া, হেন কোনো জাতীয় ও সামাজিক ইভেন্ট নেই যা আমরা পালন করছি না। অনু আপা খরচের সিংহভাগ দিতেন। আমাদের অবশ্য কিছু শিল্পপতি ডোনারও জুটে গেল, যেমন রায়হানুল ইসলাম, শেখ ওয়াহিদুর রহমান প্রমুখ। ডোনার জোগাড় করা, সামাজিক ইভেন্ট সংগঠিত করা, এসব কাজ করতেন শেখ সামসুল হক। কাজী সালাহউদ্দীন মহাসচিব হলেও তিনি ছিলেন ফাঁকিবাজ, শুধু ফুল দেবার সময় আর ছবি তোলার সময় থাকতেন সকলের আগে।

যেহেতু সংগঠন বড় হচ্ছে, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মতো এখানেও শুরু হয়ে গেল কনুইয়ের গুঁতোগুঁতি। কে কাকে ঠেলে নেত্রীর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবেন। এই গুঁতোগুঁতিতে কনক বেশ এগিয়ে আছে। আমি, আমিনুল হক আনওয়ার আর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ আমরা অনুপ্রাসে এবং অনু আপার বাসায়, দু’জায়গাতেই যাওয়া বন্ধ করে দিলাম।

একদিন অনু আপা আমাদের ডেকে পাঠালেন। আমরা তার বাসায় গেলাম। হক সাহেব এইসব ভিড়-ভাট্টা ভালো লাগে না জানালেন। অনু আপা বলেন, আপনাদের সাথে কি আমার অনুপ্রাস দিয়ে পরিচয়? আপনারাই অনুপ্রাস বানিয়েছেন। আপনাদের যখন ইচ্ছে তখন আসবেন। আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, এই ছেলে, তোমার কী সমস্যা? ইয়াং ছেলে, যখন খুশি চলে আসবে। তিনি আঙুল তুলে মাঝে মাঝে এমন নির্দেশ দিতেন যা অমান্য করার সাধ্য আমাদের অনেকেরই ছিল না। এই নির্দেশের শক্তি হচ্ছে ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা, আর কিছু নয়। আর সেই ভালোবাসার ভিত্তি হচ্ছে কবিতা। এরপর অনুপ্রাস এর নামেই,আমরা এক্সক্লুসিভ কয়েকজন, মাঝে মাঝে অনু আপার বাসায় সাহিত্য সভা করতাম, সেখানে অনুপ্রাস এর সবাই দাওয়াত পেত না। আমরা এই ক’জন ছাড়া অন্য আর যে দু’চারজন সেইসব সাহিত্যসভায় যেতেন তাদের মধ্যে অনিমেষ বড়াল, হেলাল মাহমুদ, সাঈদ আখন্দ, শহীদুল্লাহ সবুজ, জাহাঙ্গীর হাবীব উল্লাহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

ধীরে ধীরে অনু আপার পুরো পরিবারের কাছের মানুষ হয়ে উঠি আমি। মহাখালিতে অনু আপার মায়ের বাড়ি, খালাম্মার নাম জোবেদা খানম, তিনিও কবিতা লিখতেন। খালাম্মা বলে ডাকলে তিনি অভিমান করতেন, বলতেন আমাকে আম্মা ডাকবি। আমি লজ্জা পেলেও কনক অবলীলায় আম্মা ডাকত। অনু আপার ছোট বোন বিনু আপার সাথেও আমাদের সখ্য গড়ে ওঠে। তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী। তার দুই মেয়ে স্বর্ণা, তমা বলতে গেলে আমাদের চোখের সামনেই জন্ম নেয়। ওদের দুই বোনকে আমি এবং কনক অনেকবার কোলে নিয়েছি।

অনু আপাদের বনানীর বাসাটা ছিল ভাড়া বাড়ি। আলমগীরের সমসাময়িক অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীর গুলশান বনানীতে নিজের বাড়ি আছে, আলমগীরেরত তখনো হয় নি এই দুঃখ অনু আপার ছিল। তারা উত্তরায় নিজেদের বাড়ি বানিয়ে চলে যান। প্রথম প্রথম অনু আপা বলতেন আমরা গ্রামে থাকি। একদিন মহাখালি থেকে বাসে চড়ে সেই গ্রামে গিয়ে আমি হাজির হই। খোলা এক বিরাণ প্রান্তরে একটি বাড়ি। এই বাড়িটিও বনানীর বাড়িটির মতোই, গাড়ি বারান্দায় দুটো গাড়ি, সামনে এক চিলতে বাগান, ডুপ্লেক্স বাড়ির নিচতলায় লিভিং রুম, কিচেন, ওপরতলায় বেডরুম। বাড়িভর্তি কাজের মেয়ে, ড্রাইভার, আরো কত রকমের লোক। উত্তরায় যাওয়ার পরে ওই অঞ্চলের কিছু টাউট-বাটপার ভিড় করে, যা আমার তেমন ভালো লাগে নি।

কিন্তু অনু আপার সাথে আমার এবং কনকের একটি নিবিড় সম্পর্ক দীর্ঘদিন ছিল। প্রথম দেখার দিন থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সময়কালে আমি আমার মায়ের পরে যে নারীকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করতাম তিনি অনু আপা। এই শ্রদ্ধা তিনি অর্জন করেছেন। তিনি সব সময় আব্বা-আম্মার খোঁজ নিতেন, ভাই-বোনের খোঁজ নিতেন, পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। আর এমনভাবে এই খোঁজগুলো নিতেন, মনেই হত না তিনি আমার পরিবারের কেউ নন। অনু আপা অনেক শিক্ষামূলক উপদেশ দিতেন। তার কাছেই আমি প্রথম শুনি, “তোমরা যত খুশি প্রতিযোগিতা করো কিন্তু লক্ষ্য রাখবে প্রতিহিংসায় যেন জড়িয়ে পড়ো না।” প্রতিযোগিতা থেকে যে প্রতিহিংসার জন্ম হতে পারে বিষয়টা আমি তখনই খেয়াল করি এবং সারা জীবন এই উপদেশ মনে রাখি, যাতে কোনো রকম প্রতিহিংসায় কখনোই জড়িয়ে না পড়ি। তখন অনুপ্রাস এর ভেতরে প্রচুর প্রতিহিংসামূলক কাজ হচ্ছিল।

আগেও বলেছি, আবারও বলছি, অনু আপা খুব মেধাবী, হাস্যোজ্জ্বল, ইতিবাচক প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এক মানুষ। তার কবিতায় মেধার স্ফুরণ ছিল কিন্তু তিনি কবিতা লিখে বাংলা কবিতার অঙ্গনে দাঁড়াতে পারেন নি। এর মূল কারণ তিনি একটি ধারাবাহিক চর্চা বা অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে যান নি। যতটা চর্চা করা দরকার ছিল, তা না করে তিনি নেতৃত্বের দিকে ধাবিত হয়েছেন। কাব্যসাহিত্য নিরবচ্ছিন্ন এবং নিবিড় চর্চা দাবি করে, নিমগ্নতা দাবি করে। তবে তিনি ভালো কিছু গান লিখেছেন। আমার জানা মতে তার রচিত গানের সংখ্যা হাজার তিনেক হবে। তার লেখা গান বাংলাদেশের অনেক বড় শিল্পীই গেয়েছেন। তার লেখা একটি গান ‘তুমি ছিলে মেঘে ঢাকা চাঁদ/ এই মনে ছিল বড় সাধ/ একবার তোমাকে দেখার’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

১৯৯০ সালের জুন মাসে আমি ব্র্যাকের চাকরি নিয়ে ঢাকা ছাড়ি। যাবার আগের দিন বিকেলে অনু আপার সাথে দেখা করতে যাই। ছাদের ওপর বসে অনেকক্ষণ গল্প করি। তাকে আমার কর্মস্থল হবিগঞ্জের ঠিকানা দিয়ে যাই। আমি এক বছর ৩ মাস হবিগঞ্জে ছিলাম। এই সময়ে তিনি আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। আমিও সেইসব চিঠির উত্তর দিতাম। তারই একটি চিঠির কিছু অংশ উদ্ধৃত করে আমার প্রথম বই, গল্পগ্রন্থ ‘যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে’ তাকে উৎসর্গ করি। সেই অংশটি এখানে তুলে দিচ্ছি:

‘তুমি বিপুল সম্ভাবনার স্বপ্নীল সিঁড়ি ভেঙে

আনন্দের স্বর্ণদ্বারে পৌঁছে যাও

ক্লান্ত হলে আঁচলে মুখ মুছে দেবো

বিশ্বাস করো, এ আশ্বাস মিথ্যে নয়।’

হলিসউড নিউইয়র্ক, ৫ মার্চ ২০১৮ 

আড্ডার সব গল্প >>