page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

আদর্শ লিপি’র শুটিং থেকে – ৩

তারেক মাহমুদ। আদর্শ লিপির আনফিট সমান্তরাল অপ্রয়োজনীয় একটা চরিত্র। প্রতিদিন ভোরে উনার কল থাকে, উনি কাক ডাকা ভোরে এসে হাজির হন। শুট তো দূরে থাক, সবাই ঘুম থেকেও ওঠে নাই।

তারেক ভাই বিরক্ত হতে থাকেন। সবাই চোখ মেলে প্রথমে দেখে তারেকের ভোমা খোমাটা। তাদেরও মেজাজ খারাপ হয়। দেখেই বোঝা যায়।

প্রতিদিন এই কাম হয় তাহলে তুই প্রতিদিন ভোরে আইয়স ক্যা! শুধু প্রতিদিন না তো—এত সিনিয়র—অভিজ্ঞতা বলেও একটা কথা আছে।

এরপর শুরু হবে উনার নাস্তা ক্যাচাল।

প্রতিদিন “একটা পরোটা কম, আরেকটা দাও!”

প্রোডাকশান দিবে না। এই। প্রতিদিন।

জিনিসটা শুনতেও খারাপ লাগে। দেখতেও। খানার বিষয় বলে আমি বিপক্ষ নেই না। তার পক্ষও নিতে পারি না।

তা বাবা খেয়ে আয়, নাইলে বাইরে থেকে মেরে আয়। এদের আশায় কেন বসে থাকিস, ডেলি ডেলি একি হিন্দি সিরিয়াল।

ডিরেক্টর প্রতিদিন সকালে ডিজাইন করা বড় কাচের গ্লাসে দুধ খায়। সেটা দেখে তারেক ভাই শফিরে কয়, আরে গ্লাসটা তো সুন্দর?

শফি: হুম।

তারেক: আর আছে?

শফি: আছে।

তারেক: দাও আমাকে এক গ্লাস দুধ।

শফি: গ্লাস আছে দুধ নাই।

শফি তার ধার ধারে না।

তারেক: তাইলে আরেকটা ডিম দাও, পোচ।

শফি সংক্ষেপে ‘কাইলকা’ বলে গুম গুম হেঁটে চলে যায়।

উনি শফিকে ‘বিশ্ব বেদ্দপ’ ডিক্লেয়ার করে দিছেন। মোটা-তাজা হাফিজকে তার সহজ-সরল মনে হয়। তাকেই ধরছেন,”বাবা, তুই ভাল, তুই আমার দেখভাল করিস। যা বাবা, এক কাপ চা নিয়ে আয়।”

আমি দুইজনের সামনে বলি, “ঠিক তো? যাবার সময় তারেক ভাই হাফিজকে একশো টাকা বখশিশ দেবে। যাও দফারফা।”

এই ডিক্লারেশানে তারেক ভাই কিঞ্চিৎ ভড়কাইল কি ভড়কাইল না আমি ধার ধারলাম না। ডিল।

শফিকে ধরলাম, “কী মিয়া তোমার তো ডিউটি কইমে গেল। এখন আমার পিছে ডিউটি বাড়ায়া দেও।”

শফি: কী কন বস। আপ্নের লাইগা তো সবসময় জানপ্রাণ।

আমি: তাই নাকি? আচ্ছা আমার পারফর্মেন্স হচ্ছে?

শফি: কী কন বস, শাকিব খানের পর আপ্নে সেরা। আপ্নেরে আমি রাইতে স্বপ্নেও দেখি।

আমি চোখ মেলে তাকাই, “শুধু স্বপ্ন তো… স্বপ্নে কোনো দোষ নাই তো?”

“বস যে কী কয়” বলে শফি মুচকি হাসি দিয়ে চলে যায়। আমার আশঙ্কা যায় না।

শফি সবার কাছ থেকে সমানে বখশিস পেয়ে যাচ্ছে। হাফিজের ভরসা তারেক ভাই।

রাতে তারেক ভাইয়ের চলে যাবার সময় হাফিজ খাড়ায়া আছে। হাফিজকে দেখে তারেক ভাই বলল, তিরিশটা টাকা আছে। রিক্সাভাড়া ভাঙতি নাই।

হাফিজ কইল, কেম্নে কী? আমার দিকে তাকাইল।

তারেক ভাই বলল, আমার কার্ডে আছে, মোবাইলেও আছে। আমি বাসায় গিয়েই বিকাশ করে দিব। সাধু তোমার কাছে আছে?

আমি দিলাম।

পরদিন আমি হাত পাতলাম, তারেক ভাই আপ্নের কাছে খুচরা একশ আছে। আমার কার্ডে আছে। তারেক ভাই হেসে টাকা দিলেন।

২.
আমাদের এখানে সবচেয়ে বুজুর্গ ক্যারেক্টার হায়দার ভাই। তার সাথে আমার তেমন খায়-খাতির ছিল না। উনি প্রতিবার একটা না একটা প্রবলেম নিয়া হাজির হন। সমস্যাগুলা সমাধানযোগ্য না, একমাত্র না যদি মাননীয় তথ্যমন্ত্রী ইনু বা সংস্কৃতিমন্ত্রী নূর ভাই কিছু করেন।

উনি কোত্থেকে শুনছেন আমি একটা হেডম, আমারে পাইয়া বসছেন। উনার এবারের প্রবলেম উনার ছেলে। আমি উনার কাছ থেকে পলায়া পলায়া থাকি। দেখলেই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা বাথরুমে ঢুকে পড়ি।

উনার ছেলে মিডিয়ায় আসতে চায়। কিন্তু মিডিয়ায় উনার ছেলেকে দেবার ভরসা পান না, রিস্ক মনে করেন। তাই দেন না। এখন আমাকে ধরছেন যদি কিছু করা যায়। আমি বললাম, কীসের রিস্ক?

হায়দার ভাই বলল, “আমার পোলাটা সুন্দর লাল টক্টকা, নাদুস নুদুস। যদি কোনো মেয়ে কিছু করে দেয়।”

আমি শিউর হবার জন্য তার দিকে তাকাইলাম।

হায়দার ভাই: কী বিশ্বাস হয় না। কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।

ফেসবুক থেকে উনার নাদুস-নুদুস লাল টক্টকা পোলার ছবি বের করে দেখাইলেন।

আমি: আসলেই… রিস্ক আছে।

হায়দার: আছে না?

আমি: ১০০%। তো এখন কেন দিচ্ছেন?

হায়দার ভাই: এখন পোলা বিয়ে হরছে। এখন রিস্ক কম। তারপরেও (গলা নামিয়ে) যার তার দারে তো দেওন যায় না, বোজো না। কোন কোনদিক দিয়া কী সিস্টেম হইরে দেয়, নাদান পোলা।

আমি সায় দিলাম। ‘ঠিক বলছেন,’ কিন্তু আমিও নাদান। খাড়ান আপ্নেরে একটা সিস্টেম করে দিচ্ছি। তারপর আমি লাইটের হেড গাবুর রতনকে ডেকে আনলাম। কিছু করতে পারলে এই রতন পারবে। হায়দার ভাই চিৎকার দিয়া উঠলেন, আস্তাগফিরুল্লাহ্‌! তুমি আর লোক পাইলা না।

এই রতনকে হায়দার ভাই ঘুমের মধ্যে আরেক ছেলের গায়ের উপর দেখছেন। রতন ভাই কিছু না বুঝে আমারে জিগায়, কী হইছে?

কইলাম, কিছু না।

৩.
আমাদের ধারাবাহিকে যে অপর্ণা আছে কইছিলাম? অপর্ণা ঘোষ, মেধাবী অভিনেতা। আমাদের চট্টগ্রামের গর্বিত আর্টিস্ট। খুব জিদ উঠলে আঞ্চলিক ভাষায় চিল্লাচিল্লি করে। এরমধ্যে জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার পায়া বইসা আছে। অথচ তার কোনো চিহ্ন, গরিমা তার চরিত্রে নাই।

তার কোনো অহং-ঢং নাই, ভোলাভালা। তাকে প্রায় সিল দিয়ে সবাই এটা ওটা খায় খাচ্ছে। এই সুযোগে আমাদের ডিরেক্টর তার কাছ থেকে জোরপূর্বক গিফট একটা স্মার্ট মোবাইল আদায় করে ফেলছে।

অপর্ণা দুষ্টামি করে জানাইল, তার মা বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগছে। সে তো আর কইলেই বিয়া করতে পারতেছে না। সিডিউল বেচা, ডেট নাই। তারপরেও কাউকে দেখলেই দুষ্টামি করতেছে—”এই তুই তো স্মার্ট, সৎ। তোর ভাই আছে?”

ডিরেক্টরের চিফ এসিস্ট সুজনরে শুধু একবার বলছে, “ঐ তুই তো সে রকম আবার মেধাবী। তোর ভাই নাই?” এরপর থেকে সুজন দুইন্যায় নাই। সেদিন সারাদিন ছবি তুলছে বিভিন্ন পোজ দিয়া আর ফেসবুকে আপ করছে।

এক পর্যায়ে আমি হাত তুললাম, আমার ভাই আছে। কিন্তু আমারে দিয়া আমার ভাইরে বিচার করা যাইব না। আমি মূর্খ, আনকালচার্ড, আনস্মার্ট আর আমার ভাই নরওয়েতে সেট্‌ল্ড, সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার, ফর্সা, ৫’৮”।

ছবি দেখাইলাম। ছবি দেখে অপর্ণা প্রেমে পড়ে যাবার একটা ভান করলেন। কিন্তু প্রব আছে।

অপর্ণা থাকলে ডিরেক্টর খুব চার্মে থাকে। অপর্ণা না থাকলে অফ। এটা ডিরেক্টর নিজেও বলে। ডিরেক্টরের কী জানি হইছে…।

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু