page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

আপনার ফুড যেভাবে আপনার মুড বদলে দেয়

আপনার চিন্তা, মুড এবং আচরণ সবই আপনার ব্রেইনের তৈরি করা একরকম প্রডাক্ট। ডাইনি বুড়ির বিশাল হাড়িতে সিদ্ধ হওয়া নিওরোকেমিক্যালস এবং সূক্ষ্ম নকশার মাকড়শার জালের মত নিওরোনাল কানেকশানে তৈরি হয় আপনার সেই মহার্ঘ্য ব্রেইন।

হাড়ির নিওরোকেমিক্যালের ঝোল একটু পর পর পালটায়, তার সাথে নাটকীয়ভাবে পালটায় আপনার আচরণ। আপনি যা খাচ্ছেন, অর্থাৎ খাবারদাবার—এই নাটকে আপনার ভাবনার পরিধির চাইতেও একটু বেশিই ভূমিকা পালন করে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

মুড কীভাবে তৈরি হয়

ব্রেইনে যেসব কেমিক্যাল দিয়ে ‘মুড’ তৈরি হয়, তাদের বলা হয় নিওরোকেমিক্যালস। এদের মধ্যে আছে নিওরোট্রান্সমিটারস। এরা আসলে একরকম ছোট ছোট মলেকিউলাস নার্ভ সেল (নিওরন), যারা একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করে তথ্য আদান-প্রদান করে। মুড পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ নিওরোট্রান্সমিটারটির নাম সেরেটোনিন।

food-mood-5

ব্রেইনের সিস্টেমকে টার্গেট করে যেসব ঔষধ বানানো হয়, তাদের বেশিরভাগেরই কাজ নিওরোট্রান্সমিটারের লেভেল ওঠানো বা নামানো। অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ঔষধ, যেমন ফ্লুক্সেটিন বা এসিটালোপ্রামকে এমন ভাবে বানানো হয়েছে যাতে তারা সেরেটোনিনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে ব্রেইনে তার লেভেল বাড়িয়ে ফেলতে পারে।

সেরেটোনিন কী

সেরেটোনিনকে বলা হয় সুখী হরমোন। ব্রেইনস্টেমের ভেতরের নিওরন মারফৎ এর উৎপত্তি।

নিওরনগণ ভারচুয়ালি ব্রেইনের প্রধান প্রধান এলাকায় সংযোগ ঘটাতে সক্ষম, সুতরাং সেরেটোনিনের প্রভাব অনেকখানি জায়গা জুড়ে হয়। সেরেটোনিন আচরণ সহ বিভিন্ন রকম মুড পরিবর্তনে ইনফ্লুয়েন্স ফেলে, এইসব আচরণ এবং মুডের মধ্যে আছে আনন্দের অনুভূতি এবং বিষণ্নতার অনুভূতি, সামাজিক আচরণ, ক্ষুধা, ঘুম, স্মৃতিশক্তি, যৌন ইচ্ছা ইত্যাদি।

ট্রিপটোফ্যান নামক একধরনের অ্যামিনো এসিড থেকে সেরেটোনিন তৈরি হয়। এর অর্থ, আপনার শরীর ট্রিপটোফ্যান তৈরি করতে অক্ষম এবং আপনাকে সেরেটোনিন পেতে হলে অ্যামিনো এসিড বানাতে পারে এমন খাবার খেতে হবে। তবে আমাদের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা সাধারণ খাবার, যেমন মাংস, দুধ বা দুধ জাতীয় খাবার, ফল এবং বিভিন্ন রকম বীজেই ট্রিপটোফ্যান পাওয়া যায়।

তবে এখান থেকেই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপনার খাবারের ট্রিপটোফ্যান কোনো কারণে পালটে যায়, সাথে সাথে কি আপনার ব্রেইনের সেরেটোনিনের পরিমাণও পালটে যাবে?

আপনি যা খান, আপনি তাই

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, আপনার ব্রেইন পারে না এমন কাজ নাই! আপনি হয়তো ভাবেন, ব্রেইন তার নিজের কাঁচামাল নিজেই জোগাড় করতে খুব পারদর্শী। হয়তো ভাবছেন, সাধারণ খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে নিওরোট্রান্সমিটারের মেইক-আপ পালটে যাবে এমন অকেজো সিস্টেম ব্রেইনের। না কিন্তু। আশ্চর্য হলেও সত্যি, ট্রিপটোফ্যান সম্বলিত খাবারের ক্ষেত্রে ব্রেইন আসলেই একেবারে অক্ষম। খাবার ছাড়া ব্রেইনের আসলেই স্পেশাল বা সেকেন্ডারি কোনো রাস্তা নাই যাতে শরীরে সেরেটোনিনের পরিমাণ বাড়তে পারে। সাধারণ পরিস্থিতিতে অন্যান্য অ্যামিনো এসিডদের সাথে যুদ্ধ করে অতিরিক্ত ট্রিপটোফ্যানকে ব্রেইনে ঢুকতে হয়। এবং খুব সামান্য পরিমাণেই ট্রিপটোফ্যান ব্রেইনে ঢুকতে পারে।

এর বিপরীত চিত্রটা অবশ্য সত্যি না। আমাদের ব্রেইনের পক্ষে ট্রিপটোফ্যান-ফ্রি খাদ্য গ্রহণ করা সম্ভব না, খাবারের অভাবে খুব দ্রুতই ব্রেইন সেরেটোনিন শূন্য হয়ে যায়।

food-mood2

তো ব্রেইনে সেরেটোনিন কমে গেলে কী এমন হতে পারে? বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, যেসব মানুষের খাবারে ট্রিপটোফ্যানের পরিমাণ কম বা শূন্য, তাদের মধ্যে বিরক্তি ভাব এবং রাগ বা এ্যাগ্রেশানের পরিমাণ অন্যান্যদের তুলনায় বেশি। তাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল এবং মুড বেশিরভাগ সময় চড়া থাকে।

ধরা যাক একসময় বিষণ্নতায় আক্রান্ত একজন মানুষ এখন আপাততঃ সুস্থ। তার খাবারে যদি আবার ট্রিপটোফ্যানের পরিমাণ কিছু সময়ের জন্য কমে যায়, তাহলে তার মধ্যে আবার ডিপ্রেসিভ রিল্যাপস ফেরত আসবে। যাদের জেনেটিক্যালি ডিপ্রেসড হবার বা যারা ডিপ্রেশান প্রবণতার ঝুঁকির ভেতর থাকেন, তাদের মধ্যে এর প্রভাব সবচাইতে বেশি। এধরণের মানুষ হয়তো এখন বিষণ্নতায় আক্রান্ত না, কিন্তু ট্রিপটোফ্যান কমার সাথে সাথে তারা তাদের প্রথম ‘ডিপ্রেসিভ এপিসোড’-এর মুখোমুখি হবেন।

একইভাবে, একমাস ধরে ট্রিপটোফ্যানের ঘাটতিতে পশুপাখিদের হতাশ হয়ে যেতে দেখা যায়, তাদের আচরণের ভেতর রাগ-উদ্বেগ-ভয়ের প্রকাশ শুরু হয়। আমেরিকান ওপেন ইউনিভার্সিটির একটা মডিউল আছে, ‘ট্রিপটোফ্যান ডিপ্লেশান এক্সপেরিমেন্টস’, চাইলে আপনি সেখানে গিয়ে মুড এবং মুড পরিবর্তন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।

ভালো মুডের জন্য ভালো খাবার?

সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায়, যেসব খাবারে ফাইবার কম, রিফাইন্ড চিনি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি, সেসব খাবার আপনার মনঃস্তত্ত্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ঠিক কীভাবে তা হয় তা এখনো বিজ্ঞানীরা জানেন না, তবে এটুকু জানা গেছে, এধরনের ‘ওয়েস্টার্ন-স্টাইল-ডায়েট’ আপনার পেটের ভেতরে আরামসে বসবাস করা উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের ধরন পালটে ফেলে, যার প্রভাবে আপনার মুড পালটে যায়।

উদাহরণ হিসাবে, যেসব হরমোন নির্ধারণ করে—আপনার কী খেতে মন চাইছে বা আপনি কী পরিমাণ দুঃশ্চিন্তা করবেন, এই ব্যাকটেরিয়াগণ সেইসব হরমোনের প্রবাহতে হস্তক্ষেপ করবে।

এইসব ব্যাকটেরিয়া এমনকি আপনার খাবারের ট্রিপটোফ্যান খেয়ে ফেলতেও ছাড়বে না। যদি আপনার পেটে এমন ট্রিপটোফ্যান-প্রেমী ব্যাকটেরিয়া থাকে, তারা আপনার শরীরে জমিয়ে রাখা দরকারি অ্যামিনো এ্সিডের ভাণ্ডারেও হাত দিবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব ইঁদুরের পেটে ‘গাট ব্যাকটেরিয়া’ নাই, তাদের শরীরে ট্রিপটোফ্যানের এবং ব্রেইনে সেরেটোনিনের পরিমাণ বেশি। তাদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানোর পর পরই অবশ্য এর পরিমাণ কমতে শুরু করে। সুতরাং, বোঝা গেলো—ব্যাকটেরিয়া আপনার ব্রেইনের সেরেটোনিনের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারে। এখন বুঝতে হবে, এরা কী ধরনের ব্যাকটেরিয়া।

তিন বছর বয়সের পর থেকে আপনার পেটের ব্যাকটেরিয়া মেইক-আপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এক জায়গায় আটকে থাকে। আপনি খাদ্যাভাস পাল্টালেন, আপনিই নিয়ন্ত্রণ করলেন—কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে আপনি বেশি খাইয়ে অন্যদের তুলনায় বেশি হৃষ্টপুষ্ট, এবং সেই বাবদ বেশি প্রভাবশালী করবেন। একই ভাবে, আপনি কিছু ব্যাকটেরিয়াকে না খাইয়ে মেরেও ফেলতে পারেন। তবে, আপনি আবার আপনার পুরানো খাদ্যাভ্যাসে ফেরত গেলে স্বাভাবিকভাবেই তারা আবার আগের জায়গায় ফেরত আসবে।

ভালো খাবার ভালো স্বাস্থ্য জন্ম দেয়—এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ নাই। কিন্তু ভালো খাবার কী এবং ভালো খাবার কি সকলের জন্যই সমান সেটা এখনো একটা অনুত্তরিত প্রশ্ন। এই পাজলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টুকরা হচ্ছে, কীভাবে খাদ্যাভ্যাস এবং সেই খাদ্যাভ্যাসের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা ব্যাকটেরিয়া আপনার মুড ও আচরণ পালটায়, সেই প্রশ্ন।

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক