খাবার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন গল্প থাকলেও খাবারের প্রশ্নে সবার আগে খেয়াল রাখা দরকার শরীরের জন্যে তা কতটুকু উপকারি। নতুন যোকোনো খাবার এমনকি পুরনো খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও মান আর উপাদান নিয়ে সবসময় সতর্ক থাকা দরকার। নিচের আলোচনায় কমন ১২টি খাবার কীভাবে বিষাক্ত হয় এবং এর তৈরি প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকলে কীভাবে তা খাওয়ার উপযোগিতা হারায় তার উল্লেখ থাকছে।

১২. জায়ফল
এক চা চামচ কাঁচা জায়ফলই আপনার হার্টবিট বাড়িয়ে দিতে পারে।

বহুল প্রচলিত এই মসলাটি ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ আর ইন্দোনেশিয়ায় প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। বীজের শ্বাসটুকুই মূলত জায়ফল হিসেবে পরিচিত। রান্নায় হালকা ঝাল মিষ্টি ধরনের স্বাদ আনে এটি।

কিন্তু এই মসলাটাই আবার দেহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এক চা চামচ কাঁচা জায়ফলই আপনার হার্টবিট বাড়িয়ে দিতে পারে। মুখ শুকিয়ে যাওয়া কিংবা বমি বমি ভাবও তৈরি করতে পারে অল্প পরিমাণ অপরিপক্ক জায়ফল।

বড় কোনো অসুখ না হলেও এই ধরনের উপসর্গ কয়েক দিন পর্যন্ত ভোগাতে পারে আপনাকে। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আপনার মসলার কৌটায় থাকা জায়ফলগুলোর কোনোটাই আর কাঁচা নেই।

১১. মাশরুম
বিষাক্ত মাশরুম খাওয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণাম হতে পারে মৃত্যু।

জংলি মাশরুম খাওয়ার বিপদ সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। এমনকি বিশেষজ্ঞরাও মাঝে মধ্যে খাওয়ার উপযোগী মাশরুম চিনতে ভুল করেন। বিষাক্ত মাশরুম খাওয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণাম হতে পারে মৃত্যু।

রোম সম্রাট ক্লডিয়াস, রাশিয়ার শাসক কিংবা পোপও বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেকেই বলেন, উজ্জ্বল রঙের মাশরুমই শুধু ক্ষতিকর। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

মৃত্যু ছাড়াও বিষাক্ত মাশরুম খাওয়ার ফলে খিঁচুনি, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত বমি হওয়া ছাড়াও কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

১০. কিডনি বিন (রাজমা)
শিমের বিচির প্রোটিন পাকস্থলির কোষ ধ্বংস করে।

কিডনি বিনের মতো খাদ্যবস্তুও যে বিষাক্ত হতে পারে তা ভাবা যায় না। তবে গবেষণায় উঠে এসেছে, এতে লেকটিন নামের একধরনের গ্লাইকোপ্রোটিন থাকে। এই প্রোটিন পাকস্থলির কোষ ধ্বংস করে।

এতে করে বমিভাব থেকে শুরু করে ডায়রিয়া পর্যন্ত হতে পারে। তবে এর বিষাক্ততা পরিহার করাও অনেক সোজা। কিডনি বিন রান্নার আগে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে তা খাওয়ার জন্য নিরাপদ হয়। বিশেষ করে অল্প আঁচে রান্না করার আগে এই কাজটা করা উচিৎ।

৯. আপেল
বীজসহ আপেলের শ্বাস কিংবা মাঝের অংশ না খাওয়াই ভালো।

প্রবাদ আছে, দৈনিক একটা আপেল আপনাকে ডাক্তারের কাছ থেকে দূরে রাখবে। তবে এটা সবসময় সত্য না। প্রকৃতিগতভাবেই আপেলের বীজে অল্প পরিমাণে সায়ানাইড থাকে। সায়ানাইড বিষাক্ত পদার্থ হিসেবে পরিচিত। তাই বীজসহ আপেলের শ্বাস কিংবা মাঝের অংশ না খাওয়াই ভালো।

আবার চাষের সময় ব্যবহৃত কীটনাশক অনেক সময় আপেলের ত্বকে লেগে থাকে। খাওয়ার আগে তাই ফলটা ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিৎ।

৮. পটকা মাছ
পটকা মাছের লিভার সহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অত্যন্ত বিষাক্ত।

যদি কখনও জাপান ভ্রমণে যান, তাহলে সেখানে প্রচলিত পটকা মাছ দিয়ে রান্না করা একধরনের রেসিপির দেখা পাবেন। উপযুক্ত উপায়ে রান্না করা না হলে ‘ফুগু’ নামে পরিচিত এই জাতের পটকা মাছ প্যারালাইসিস কিংবা মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে।

এই মাছের লিভার সহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অত্যন্ত বিষাক্ত। অনেক শেফ রান্নার সময় অল্প পরিমাণে মাছের লিভার সহই রান্না করেন। এতে করে তাদের রেসিপিতে অন্যরকম স্বাদ আসে। তবে পরিমাণে তা একটু বেশি হলেই মৃত্যু নিশ্চিত।

৭. মধু
অপরিশোধিত মধুতে পাইরোলিজিডিন এলকালয়েড থাকতে পারে।

মধু সংগ্রহকারী মৌমাছিরা অনেক সময় পরাগ কিংবা রেণু বহন করার সময় বিষাক্ত উদ্ভিদের সংস্পর্শে আসে। ফলে অপরিশোধিত মধুতে পাইরোলিজিডিন এলকালয়েড থাকতে পারে। এই পদার্থ মানবদেহে লিভার সিরোসিস কিংবা ক্যান্সারের মতো রোগ সৃষ্টি করে। মধু পাস্তরিত করার মাধ্যমে বিষাক্ত এই পদার্থকে দূর করা হয়।

মধু সেবনের আরেক ঝুঁকি হলো বটুলিজম। প্রাপ্তবয়ষ্কদের ক্ষেত্রে যদিও এই প্রাণঘাতী রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তা খুব বেশি। তাই ১২ মাসের কম বয়সী বাচ্চাদের মধু খাওয়ানো অনুচিৎ। মধু গরম করে খাওয়ালেও এই ঝুঁকি থেকে যায়।

৬. সেলেরি
গবেষণায় সেলেরিতে প্রায় ৬৪ প্রকারের কেমিক্যাল পাওয়া গেছে।

সেলেরির মতো প্রাচীন আর রসালো উদ্ভিদে বিষাক্ত কিছু থাকতে পারে এই কথা সচরাচর কারো মাথায় আসবে না। কিন্তু গবেষণায় এতে প্রায় ৬৪ প্রকারের কেমিক্যাল পাওয়া গেছে।

বড় হওয়ার সময় সেলেরি গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি টেনে নেয়। যেই পানিতে নানা প্রকারের কীটনাশক মিশে থাকে। সেটাই ওই শাকে থাকা কেমিক্যালের উৎস।

৫. ব্লুবেরি
ব্লুবেরিতে ৫২ ধরনের কীটনাশকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

কীটনাশক আর সারের বিষক্রিয়ার আছে এমন আরেকটা খাবার হলো ব্লুবেরি। এর গাছে পোকার আক্রমণ বেশি হওয়ায় চাষীরা প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করেন। আর ফলন বৃদ্ধির জন্যে অন্যান্য ফলের তুলনায় সারের প্রয়োগও হয় প্রচুর।

উত্তর আমেরিকার স্থানীয় ফল ব্লুবেরিতে ৫২ ধরনের কীটনাশকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। যা একইসাথে মানবদেহ আর পরিবেশের জন্যে ক্ষতিকর।

৪. অ্যাকি ফল
কাঁচা কিংবা অতিরিক্ত পাকা অবস্থায় খেলেই শরীরে বিষক্রিয়া দেখা দেয়।

পশ্চিম আফ্রিকার স্থানীয় এই ফলটা কাঁচা কিংবা অতিরিক্ত পাকা অবস্থায় খেলেই শরীরে বিষক্রিয়া দেখা দেয়। ‘জ্যামাইকান ভমিটিং সিনড্রোম’ নামে একটা আলাদা রোগই আছে, যা শুধুমাত্র এই ফল খাওয়ার কারণেই হয়। এই রোগে এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয় অনেক সময়।

লিচু জাতীয় এই ফল জ্যামাইকার জাতীয় ফল। ফ্যাটি এসিড আর ভিটামিন সমৃদ্ধ অ্যাকি এমনিতে খেতে অনেক সুস্বাদু। এর স্বাদ অনেকটা তালের শ্বাসের মতো। ক্যালরির পরিমাণ কম থাকায় একই সাথে স্বাস্থ্যকরও।

৩. ব্রাজিল নাট
অতিরিক্ত ব্রাজিল নাট খেলে হার্ট ফেইলের সম্ভাবনা থাকে।

এই জাতের বাদামে প্রচুর পরিমাণে সেলেনিয়াম থাকে। সেলেনিয়াম দেহের জন্যে অনেক উপকারী। কয়েক ধরনের ক্যান্সার আর হৃদরোগ মোকাবেলায় সেলেনিয়ামের অবদান অনেক। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্ষমতা বাড়াতেও সেলেনিয়াম কাজে দেয়।

তবে অতিরিক্ত সেলেনিয়াম মানবদেহে নানা জটিলতা সৃষ্টির জন্যে দায়ী। মুখের দুর্গন্ধ থেকে শুরু করে হার্ট ফেইলেরও সম্ভাবনা তৈরি হয় অতিরিক্ত সেলেনিয়াম গ্রহণে। তাই ব্রাজিল নাট দিনে দুইটার বেশি খাওয়া উচিৎ না।

২. কাসু মারজু
অল্প সময়েই এই পনির খাওয়ার একদম অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

এটা একধরনের ইতালিয়ান পনির। খাদ্য হিসেবে ইতালিতে অবৈধ। ভেড়ার দুধ থেকে তৈরি এই পনিরকে বিভিন্ন শূককীটের সংস্পর্শে রেখে গাঁজানো হয়। শূককীটদের দেহ নিঃসৃত পদার্থের প্রলেপ পড়ায় পনিরে চমৎকার একধরনের ফ্লেভার আসে।

তবে শূককীটেরা মারা গেলেই এই পনির খাওয়ার একদম অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অর্থাৎ কাসু মারজু আপনাকে জীবন্ত শূককীট সহই খেতে হবে।

১. ফাস্ট ফুড
কয়েক ধরনের ক্যান্সার ফাস্টফুড খাওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

আমেরিকানদের আবিষ্কার করা এই ধরনের খাদ্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রতিবছর অসংখ্য আমেরিকান নাগরিক মারা যান শুধুমাত্র ফাস্টফুড খেয়ে।

ফাস্টফুড জাতীয় খাবারগুলো ডিজাইন আর মার্কেটিং’ই করা হয় এমনভাবে যাতে ভোক্তারা আকৃষ্ট হন। ফ্যাট আর ক্যালোরিতে ভরা এই খাবার যেকোনো মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলতে পারে। রক্তে বেশি পরিমাণে কোলেস্টরল, ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা স্থূলতার সমস্যাও তৈরি হয় ফাস্টফুড থেকে। আর এই রোগগুলোই একটা সময় হৃদরোগ হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে। কয়েক ধরনের ক্যান্সারও ফাস্টফুড জাতীয় খাবার খাওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বেঁচে থাকার জন্য আমরা খাদ্য গ্রহণ করলেও এই খাদ্যই আমাদের ক্ষতি করতে পারে। তাই খাওয়ার আগে যা খাচ্ছি তা নিয়ে আমাদের একটু ভাবা উচিৎ।

সূত্র: হেলথ অ্যান্ড হিউমেন রিসার্চ