আন্দ্রেস রুজো লোকমুখে শুনেছিলেন ফুটন্ত পানির নদীর ব্যাপারটি আসলে মিথ বা পুরাণের কাহিনী। কিন্তু তিনি আমাজনে একটি ‘ফুটন্ত নদী’র অবস্থান সনাক্ত করেছেন যেটাতে কিছু পড়লে সিদ্ধ হয়ে যায় বা পুড়ে যায় এমনকি জীবন্ত প্রাণীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘতে। আন্দ্রেস রুজো একজন ভূ-বিজ্ঞানী। তিনি প্রথম তার দাদার মুখে এ ধরনের একটি গল্প শুনেছিলেন যে – আমাজনে স্প্যানিশরা স্বর্ণের সন্ধানে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা ফিরে এসেছিল তারা আমাজনের বিষাক্ত পানি, মানুষখেকো সাপ এবং তলদেশ থেকে ফুটতে থাকে এমন একটি নদীর কথা বলেছিল। ভূপদার্থবিদ্যায় পিএইচডির ছাত্র রুজো সেই নদীটি খুজে দেখতে চেয়েছিলেন।

রুজো বলেছেন, আমি সবাইকে প্রশ্ন করছিলাম যে এরকম একটি নদী কি আসলেই থাকতে পারে। আমি আমার ইউনিভার্সিটিতে কলিগদেরকে, সরকারকে, তেল- গ্যাস খনন কোম্পানি গুলিকে জিজ্ঞেস করেছি এই ব্যাপারে, সবারই উত্তর ছিল- তারা জানে না।

তিনি বলেন, ফুটন্ত নদী পৃথিবীতে আছে, কিন্তু সেগুলি সাধারণভাবেই আগ্নেয়গিরির সাথে যুক্ত। এত বেশি ভূ-তাপ উৎপাদন করতে হলে একটি শক্তিশালী উৎসের দরকার।

একবার ফ্যামিলি ডিনারে এটা নিয়ে আলোচনা করার সময় রুজোর এক আন্টি তাকে বলেন যে, এরকম একটি নদী যে শুধু আছে তা না, তিনি সেই নদীতে সাতারও কেটেছেন।

সেই কথার সূত্র ধরে আমাজনের গভীরে একটি ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটন্ত নদী আবিষ্কার করেছেন রুজো। এটি প্রস্থে ২৫ মিটার বা সর্ব্বোচ্চ ৮০ ফুট এবং এর গভীরতা ছয় মিটার বা সর্ব্বোচ্চ ১৬ ফুট।

এই নদীর পানি চা বানানোর মত যথেষ্ট গরম, আর কোনো কোনো অংশে মাত্রাতিরিক্ত গরম।

রুজো বলেন, আমি নদীর পানিতে হাত ডুবিয়ে দেখেছি, এটা আধা সেকেন্ডেরও কম সময়ে চামড়া পুড়িয়ে ফেলে। পানিতে পড়ে গেলে আমি সহজেই মারা যাব। তিনি জানিয়েছেন ভূগর্ভস্থ ফাটলে সৃষ্ট ঝর্ণার কারণে এই নদীর পানি গরম।

এর কারণ সম্পর্কে রুজো বলেন, আমাদের শরীরের বিভিন্ন রক্তনালী ও আর্টারিতে যেমন গরম রক্ত প্রবাহিত হয়, ভূগর্ভের ফাটলগুলিতেও সেরকম গরম পানি প্রবাহিত হয়। এই ফাটলগুলি যদি বাইরে আসে বা ভূ-পৃষ্ঠের উপরে চলে আসে তাহলে ভূ-তাপ উৎপন্ন হয়। এর ফলে গরম পানির ঝর্ণা বা আমাদের আলোচ্য ফুটন্ত নদী তৈরি হতে পারে। এই নদীটি নন-ভলকানিক, অর্থাৎ আগ্নেয়গিরির সাথে যুক্ত নয়। এই নদীটির আশেপাশে কোনো আগ্নেয়গিরি নেই, সবচেয়ে কাছের আগ্নেয়গিরিটিও ৭০০ কিলোমিটার বা ৪৩০ মাইল দূরে।

এই নদীটি যে এলাকায় অবস্থিত সেখানে আরো দুটি ফুটন্ত নদী আছে। তাদের একটির পানি লবণাক্ত, ফলে এটি থেকে লবণাক্ত বাষ্প উঠে, আরেকটি নদীর পানি স্বাভাবিক মিঠা পানি। তবে সেই দুইটি নদী রুজো আবিষ্কৃত এই নদীটির চেয়ে আকারে অনেক ছোট, এই কারণে এই ফুটন্ত নদীটিকে তিনটির মধ্যে ক্রাউন জুয়েল বলা হয়।

রুজো বলেছেন তিনি এই নদীতে পড়ে প্রাণীদেরকে জীবন্ত রান্না হতে দেখেছেন। তিনি বলেন, আমি অনেক প্রাণীকে এই নদীতে পড়তে দেখেছি, আমার কাছে সবচেয়ে শকিং লেগেছে যে প্রক্রিয়াটি একইরকম, পড়ার প্রথমে সবচেয়ে প্রথমে যায় তাদের চোখ, চোখ খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধ হয়ে যায়। সিদ্ধ হওয়ার পরে তাদের রঙ অনেকটা দুধের মত সাদা হয়ে যায়, আর তারা স্রোতে ভাসতে থাকে। তারা সাঁতরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পানি এত গরম যে তাদের মাংস সিদ্ধ হয়ে তাপ হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে তাদের শক্তি কমতে থাকে, কমতে থাকে এবং একসময় পানি তাদের মুখের ভিতর চলে যায় এবং তাদের ভিতরেও সিদ্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে এই নদীটি আধ্যাত্মিক ও পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।

এই নদীটির কাছাকাছি আমাজনের সানতুয়ারিও হুইসতিন ও মায়ানতুয়াচু দুইটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের বসবাস। তারা মনে করে এই স্থানের প্রচন্ড আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে। এই দুটি সম্প্রদায়ের শুধুমাত্র হীলার বা আরোগ্যকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিই এই জায়গায় গিয়ে থাকেন। তাদের উদ্দেশ্য আত্মাদের কাছে থেকে গোপন আরোগ্য শক্তি ও পূর্বপুরুষদের প্রথা-অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানা।

তবে বাইরের মানুষের জন্য এই স্থানে পৌঁছানো বেশ কঠিন। রুজো বলেছেন, খুব গরম এবং আর্দ্র পরিবেশের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, অনেক খাড়া পথ বেয়ে উঠতে হবে, পোকা-মাকড়ের কামড় খেতে হবে। এখানে কোনো মোবাইল বা ইন্টারনেটের নেটওয়ার্ক নেই। এই জায়গা থেকে সবচেয়ে কাছের ক্লিনিকটির দূরত্ব এক ঘণ্টার পথ এবং কাছের হাসপাতালটি তিন ঘণ্টার পথ।

রুজো এই নদী নিয়ে একটি বই লিখেছেন। নাম-‘দ্য বয়লিং রিভারঃ অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড ডিসকভারি ইন দ্য আমাজন’। এই বইতেই প্রথম এই নদীর কথা বলা হয়েছে।

রুজো জানিয়েছেন তিনি এই নদী সংরক্ষণ করার চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, পিএইচডির সময়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে এই নদীটি আসলে একটি প্রাকৃতিক আশ্চর্য। আমরা যদি কিছু না করি তাহলে এটি টিকে থাকবে না।

ক্যাপশন ১- আবিষ্কার…ভূবিজ্ঞানী আন্দ্রেস রুজো পেরুতে মায়ানতুয়াচু ফুটন্ত নদীর সন্ধান পেয়েছেন
ক্যাপ ২- জীবন্ত সিদ্ধ… আন্দ্রেস রুজো বর্ণনা করেছেন কিভাবে জীবন্ত প্রানীরা নদীতে পড়ে মারা যায়
ক্যাপ ৩- পাওয়া গেছে… আন্দ্রেস রুজোর আন্টি নদীটি খুজে পেতে তাকে সাহায্য করেছেন
ক্যাপ ৪- লেখক… নদীটি সংরক্ষণ করার উদ্যোগের জন্য রুজো একটি বই লিখেছেন
ক্যাপ ৫- উত্তপ্ত… নদীর পানি তলদেশ থেকে ফুটতে থাকে