page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

আমার তুচ্ছ মায়ারা

সবাই যখন পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হল বলে, চাকরি হচ্ছে না বলে, প্রেম হচ্ছে না বলে, প্রেম ভাঙছে বলে কষ্ট পেতে থাকে আমার তখন কষ্ট হতে থাকে অন্য অনেক কারণে।

পুরনো জামা, যেটা পরা হয় না বলে ফেলে দিই সেটার জন্য কষ্ট হতে থাকে। কোনো রাস্তায়, যেখানে আমার আর হাঁটা হবে না সে রাস্তায় আমার জুতোর ছাপটা দেখে কষ্ট হয়। কোথাও বেড়াতে গিয়ে দেয়াল ছুঁলে কষ্ট হয়, ওখানে আমার হাতের ছোঁয়া ফেলে আসতে হচ্ছে বলে। আমার জানালার সামনে আমার হাতে লাগানো চন্দ্রমল্লিকার গাছ মরে গেল, আমার কিচ্ছু মনে হলো না। কিন্তু বনে ঘুরতে গিয়ে মরা বুনো ফুলের গাছ দেখে কেমন টন টন করে উঠল বুকের ভেতরটা।

bithi-haque-logo

ছোটবেলায় বাড়িতে একটা মাধবী লতার গাছ ছিল। গোলাপি রঙা ফুলে পুরো গাছ ছেয়ে থাকত, তাতে কতটা মায়া ছিল জানি না। কিন্তু বাড়ির বাইরে বাবার বড় চাচার কবরের উপর কাঠগোলাপের গাছ ছিল। সেটার উপর আমার অদ্ভুত একটা আকর্ষণ ছিল। স্কুলে পড়ার সময় আমার খুব মন খারাপ করলে ভরদুপুরে গাছটার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম।

bithy-2-b

নষ্ট ঘড়ি সম্ভার—লেখক

জন্মের পর থেকে দেখে এসেছি, আমার বাড়ির পাশ দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা গেছে। সেখানে বর্ষায় জল জমে, গ্রীষ্মকাল জুড়ে রাস্তায় ধূলো উড়তে থাকে, শীতের কুয়াশায় টপা টপ ফোঁটা পড়ে স্যাঁতসেতে হয়ে থাকে। আমি যে বার মাধ্যমিক স্কুলে গেলাম সেবার নির্বাচনে জিতে মন্ত্রী সাহেব পাকা রাস্তা বানাবেন বলে যাবার পর থেকে আমার খারাপ লাগা শুরু হয়। আগে যে রাস্তাটা শুধু হেঁটে যাবার জন্যই ছিল, সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার পাশাপাশি সেটার দিকে তাকিয়ে থাকাও শুরু করলাম। হঠাৎ যেন তার চেহারা বদলে যেতে শুরু করল।  ভাঙা রাস্তাটার সঙ্গে দেখা হবে না চিন্তা করে দু’রাত ঘুমানোর আগে শুধু চোখে জল জমে যেত, সে কথা এখনো মনে আছে।

আমার বাড়ির পাশে দিঘীর মত একটা বড় জলাশয় আছে, সবাই সেটাকে কোপরা বলে। বর্ষার জলে প্রতি বছর নদী উপচে কোপরার সঙ্গে মিশে যেত, বন্যার জলে ফুলে ফেঁপে উঠত কোপরা। সেই বন্যা কমতে শুরু করলে আমার বুক খালি খালি লাগত।

অনেক আগে একবার বাবা আমাকে নীল রঙের পাথর বসানো একটা নেকলেস সেট কিনে দিয়েছিলেন। মাস খানেকের মধ্যে সেই সেট থেকে একটা দুল হারিয়ে গেলে আমি ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেছিলাম। বাবা দেখে বললেন নতুন আরেকটা কিনে দেবেন।

আমার আর নতুন দরকার নেই বলে হারানো দুলের সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে পুরো দুপুরবেলা কাঠগোলাপের গাছের সামনে বসে কাটিয়ে দিলাম। দুলটার দিকে তাকিয়ে মনে হল কেউ যেন আকাশ থেকে ড্রপারে করে এক ফোঁটা নীল রঙ তুলে এনে কাচ দিয়ে ঢেকে রেখেছে। হারানো নীলের কষ্টটা আমাকে পুরোপুরি এখনো ছেড়ে যায় নি। গতকাল গোসলের সময় হঠাৎ দুলটার কথা মনে করে খারাপ লাগা শুরু হল।

পড়ুন, বিথী হকের আরো লেখা » রুম্পা আর আমি আর একটা দিন!

আমার নখ বড় রাখার অভ্যেস। কিন্তু নখ বড় রাখলেই ভেঙে যায়, সেই ভাঙা নখ ফেলতে আমার মন টানে না। মনে হয় সেটা কোথাও তুলে রাখি। কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিসের ঠাসাঠাসিতে আমার ছোট ছোট মায়াগুলোর ঠাঁই হয় না কোথাও।

bithy-2-a

সঙ্গী হারানো কানের দুল—লেখক

ফুলদানি থেকে পুরনো বাসি ফুলটা ফেলে দেয়ার সময় নিজেকে কেমন অসহায় লাগতে থাকে। আমার বাসায় পুরনো ছেঁড়া জামা, জুতো, বই, প্লাস্টিকের বোতল, অকেজো ইলেক্ট্রনিকস, জিনিসপত্রের প্যাকেট জমতে থাকে। একসময় স্তুপ হয়ে গেলে সেটা ফেলে দিতে হবে চিন্তা করে আমি বিষণ্নতায় ডুবে যেতে থাকি।

পরিত্যক্ত বলে সব ফেলে দেয়ার কষ্টটা না রাখতে পারি, না  ফেলতে পারি। ওসব মা’র চোখে পড়লে সব ফেলে দেয়, সেগুলোর প্রয়োজন কখনো অনুভব করি না সেটা সত্যি কিন্তু সেগুলো না থাকার অনুভূতিটাও তো কম তীব্র নয়।

যে সময়ে মানুষই বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে পিঁপড়ের মত পিষে তার অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয় সেখানে আমার মায়াকান্না অনর্থক বটে।

হাতের মুঠোয় থাকা হাতটাকেই ক’দিন পর মানুষ ধরে রাখার প্রয়োজন মনে করে না আর আমি পড়ে থাকি কোথাকার কোন হারিয়ে যাওয়া সময়ে, পথের ধূলোর কষ্ট নিয়ে, মরা বানের জল নিয়ে, ছিঁড়ে যাওয়া বইয়ের পাতা নিয়ে।

সবাই তো সঙ্গে কিচ্ছু না রেখে দিব্যি ১০টা ৫টা অফিস করে সুখেই বাঁচছে, আমার তবে কীসের এত মায়া? কীসের টানে এত সব জমিয়ে রাখি আমি তবে!

About Author

বিথী হক
বিথী হক

ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার এবং স্ক্রিপ্ট রাইটার । আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) এর প্রিন্ট এন্ড ইলেক্ট্রনিক জার্নালিজম বিভাগ থেকে অনার্স শেষ করে এখনো কোথাও থিতু হইনি । অনলাইন পোর্টাল এটিএন টাইমস এবং ইনডিপেনডেন্ট টিভিতে কাজ করেছি । বেড়ে ওঠা রাজশাহী শহর এবং মফস্বল এলাকা মিলিয়ে ।