জীবনে সবচেয়ে ডাকসাইটে যে মানুষটাকে কাছ থেকে দেখা, সে আমার নানু। এক হাতে রান্নাঘর, বৈঠকঘর, প্রতিবেশীর উঠান আর বাইরের দুনিয়া সব সামলাতেন তিনি।

ছোটবেলায় আর দশটা বাচ্চার মত আমাদেরও স্কুল ছুটির মানে নানুবাড়ি ছিল। তখন দুপুরের শেষে নানুকে দেখতাম, গল্পের বই অথবা কবিতার খাতা নিয়ে উঠানে বসেছে৷ আমার নানু আবার নতুন করে গল্প-কবিতা লেখা শুরু করেছিল নব্বইর মাঝামাঝি থেকে। তখন তার বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। ছোটবেলাতেও কি নানু গল্প কবিতা লিখতেন?

জানিনা আসলে! কখনো জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

শুধু জানি ক্লাস থ্রি অব্দি স্কুলে পড়াশুনা ছিল তার। ষোলো বছর বয়সে যখন তার স্কুল মাস্টারের সঙ্গে বিয়ে হয়, তখন নাকি সে ভীষণ খুশি হয়েছিল, আবার পড়তে পারবে সেই সম্ভাবনায়৷ সেই সম্ভাবনা আলোর মুখ দেখতে দেখতে সে ষাট বছরের হয়ে গেল।

প্রচুণ্ড হাত কাঁপত তার৷ আমি উঠানে মোড়াতে বসা নানুর পিছনে থাকতাম। প্রথম দিকে বাম হাত দিয়ে ডান হাত চেপে ধরে লিখত সে। এতখানিই হাত কাঁপত তার। ছোটরা মনে হয় দুঃখের জিনিস কম দেখে, অথবা কম বোঝে কিনা! আমি নানুর হাত কাঁপাকাঁপি দেখতাম না৷ আমি মুগ্ধ হয়ে আমার নানুকে দেখতাম। ষাট বছর বয়সেও নানুর একমাথা কালো লম্বা চুল ছিল। দুপুরের সমস্ত কাজ শেষ হলে, গোসল খাওয়া শেষ হলে সে যখন মোড়ার ওপর তার ভেজা চুল পিঠে এলিয়ে দিয়ে হাতে বই বা লেখার খাতাটা নিয়ে বসত, তখন তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগত।

গল্পের বই বা লেখার খাতায় হারিয়ে যাওয়া এই নানুরই আবার অন্য রূপ থাকত বিকেল বা সন্ধ্যায়। তখন দেখতাম, এক হাতে সামাল দিচ্ছে পুবপাড়ার বাগানে লাগানো মেহগানি কার ছাগলে খেল, বা জমির আগের মালিকের সাথে দ্বন্দ্ব মেটাচ্ছে শান্ত অথবা চড়া গলায়। আমার মামারা বা নানা এসব বৈষয়িক বিষয়ে ছিল না কোনো কালেই। নানুই সামলাতো এক হাতে৷ এমনই শক্ত হাত ছিল তার।

ভরা সংসারে আমার নানু। জামাই, ছেলে মেয়ে, নাতি, নাতনি সবসহ

এই নানুরই একটা কঠিন পরিবর্তন দেখি দশ-পনের বছর পর। তখন সে সত্তর-আশির মাঝামাঝি। ততদিনে নানা নেই। নানা মারা যাওয়ার এক বছরের মধ্যেই নানুর একমাথা ভর্তি কালো চুল হু হু করে পড়ে গেল আর ধুসর হয়ে গেল। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় যেটা তা হল নানু কবিতা লেখা বন্ধ করে দিল।

নানার নাম ছিল ‘মনি’৷ খুব সম্ভবত নানুর শেষ কবিতা ছিল ‘হারানো মনি’। অথচ নানার মৃত্যু নিয়ে আমি কখনো নানুকে খুব বেশি শোক করতে দেখিনি৷ নানা বেঁচে থাকতে নানু একটা কথা প্রায়ই বলত, “আল্লাহ যেন তোমার নানাকে আমার আগে নিয়ে যায়। আমি মরে গেলে তাকে কে দেখবে? এই লোক তো একটা কাজও নিজে নিজে করতে পারে না।”

যেদিন নানা মারা যায় সেদিনও উনি আম্মু, মামা, খালাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন৷ সান্ত্বনা দিতে দিতেই আমার শক্ত নানু একবার অজ্ঞান হয়ে গেলেন। অবশ্য পরের দিনই আবার শক্ত তিনি তার ছেলেমেয়েদের ডেকে বললেন, “আমি তোমাদের কারো বাসায় থাকব না। মাঝে মাঝে হয়ত বেড়াতে যাব। কিন্তু আমি আমার মুক্তাগাছার বাসাতেই থাকব।”

আমি আমার অতটুকু বয়সেই মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম সেই ব্যক্তিত্ববান মানুষটাকে। যিনি কিনা হাজবেন্ড মারা যাওয়ার পরের দিনই এমন বলিষ্ঠভাবে তার সিদ্ধান্ত জানাতে পারে৷

শারীরিক কোনো অসুখ তাকে কখনোই কাবু করতে পারেনি। যতখানি করেছিল সত্তরের শেষে হওয়া মনভোলা রোগ৷ মনে হয় ডিমেনশিয়া। সময় খুব উল্টাপাল্টা করে ফেলত। সংসারের শুরুর দিকে যখন মুক্তিযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আবার অভাব ছিল, সেই স্মৃতি আর বর্তমান গুলিয়ে ফেলত সে। একটা ডিম সেদ্ধ দিলে অর্ধেকটা খেত, আর বাকি অর্ধেকটা রেখে দিত। বলত, অপচয় করা ঠিক না। ৩০-৩২ বছরের আমাকে বলত, সন্ধ্যার সময় যেন বাইরে না থাকি। নানুর এসব অদ্ভুত আচরণে এত বিরক্ত লাগত!

আমার শ্বাশুড়িকে নিয়ে একবার মেঝমামা-রাঙ্গামামার বাসায় গেছি, সবার সামনে আমাকে বলল, মাথায় কাপড় দেয়া হচ্ছে বাঙালি মেয়ের সৌন্দর্য। আমি মহাবিরক্ত হয়ে বললাম, খুব বাজে সময়ে আছি নানু। কত যে বাজে বাজে সমস্যা আছে। আর আপনি আছেন মাথায় ঘোমটা দেয়া নিয়া। নানুও ক্ষেপে গেল। বলল, “লাইল্লা পাইল্লা করলাম বড় এখন ফড়িঙ ধইরা খাও?”

আমি ভয়াবহ বিরক্ত হতাম। আরে! একটা সময় এই মানুষটাকে যুক্তি দিলে সে পালটা যুক্তি দিত, এখন এত অল্পতেই ক্ষেপে যায়!

তার উপরে আবার যন্ত্রণা তার ডিমেনশিয়া। অভাব না থাকলেও সে বাস করে তার অভাবের দিনগুলিতে। এক গ্লাস দুধ খেলে হায় হায় করতে থাকে। বাড়ির বাকি লোকে কী খাবে!

যদি বলি, দুধ কিনে নিয়ে আসব, তখন শুরু হয় অপচয়কারীকে আল্লাহ কত অপছন্দ করে তার বয়ান। সংসার করতে গেলে কত হিসাব করে চলতে হয় তার বয়ান৷

আমারে বলে, “যে ভাঙা নৌকা বাইতে পারে, সে-ই প্রকৃত মাঝি৷ তোমরা তো বোঝো না।”

আমারও মুখে মুখে জবাব রেডি, “নানু শোনেন, ভাঙা নৌকা বাওয়া কোনো কাজের কথা না। বরং নৌকাটারে আগে পাড়ে ভিড়ান। নৌকা ঠিক করেন৷ তারপর যত ইচ্ছা নৌকা বান!”

আপানারা নিশ্চয়ই আমাকে বেয়াদব ভাবছেন। কিন্তু আমার নানুর বিষয়টাই এমন, যার সাথে মন খুলে তর্ক করা যেত। অবশ্য তিন চার বছর ধরেই ভীষণ চুপ হয়ে গেছে নানু। কোনো কথাই বলে না। খালি বিছানায় শুয়ে থাকে। গতবারের ঈদটা সবাই মিলে নানুর বাসায় করলাম। সারাটা দিন বিছানায় শুয়ে ছিলেন। আমরা খালাত-মামাত ভাইবোন মিলে নাচগানের আয়োজন করলাম। তাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে সোফায় নিয়ে আসা হল। চুপ করে বসে লক্ষীর মত নানু প্রোগ্রাম দেখল। একটা গানও গাইল আমাদের সাথে। কেমন অদ্ভুত শান্ত-শান্ত ভাবে বসে রইল সারাটা ক্ষণ।

যে কয়টা দিন আমরা নানুবাসায় ছিলাম, নানুর চোখে-মুখে ভীষণ তৃপ্তি ছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে নানু দশটা বাক্যও বলেনি।

আমার এত তৃপ্তি ভাল লাগে না।

সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে তিনি আরাম করেন, আমার ভাল লাগে না।

মনে হয় জোর করে বসাই তারে।

চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে, নানু ম্যালা হইছে! এইবার আসেন। কথা বলেন। চলেন, তর্ক করি।

আপনি এত শান্তিতে কেন আছেন নানু?

আপনার এত শান্তি আমার সহ্য হয় না। একদমই সহ্য হয় না আমার।

কভার ফটো: আমরা চার জেনারেশন। নানু, আম্মু, আমি আর আমার মেয়ে।

Recommended Posts

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *