page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

“আমি যখন আবর্জনার স্তবগান গাই তার মানে এই নয় যে আবর্জনা আমি চাই।” — হুমায়ুন আজাদ

১৯৯৭ সালে হুমায়ুন আজাদের পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ভোরের কাগজ পত্রিকার তরফে এই ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছিল। হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আমাদের প্রায়ই দেখা হতো নানা জায়গায়। উনি শাহবাগ আজিজ মার্কেটে প্রায় নিয়মিতই কেডস পরে আসতেন। অধ্যাপক-অসুলভ পোশাক আশাক পরতে ভালোবাসতেন আজাদ। একটু টেনে জোর দিয়ে কথা বলতেন তিনি। অন্যের মুখের উপর কথা বলতে পছন্দ করতেন। অন্যে বললে তা গ্রহণও করতেন। এই সাক্ষাৎকারে সিরিয়াস ভাব যাতে আমরা রক্ষা করি তা তিনি চাইছিলেন। দেখা যাইতেছে সাক্ষাৎকারের কিছু অংশে তা রক্ষা করা গেছে! — ব্রাত্য রাইসু

হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসু


 

হুমায়ুন আজাদ

ঘড়ি আছে?

ব্রাত্য রাইসু

আছে, একটা স্যার। সিনেমা দেখতে গেছিলাম স্যার। সিনেমা শেষ হইতে চায় না।

হুমায়ুন

সিনেমা… কী সিনেমা? ফরাসি, অ্যাঁ?

রাইসু

না স্যার, জপানি। স্যার, আপনার তো বয়স পঞ্চাশ হইল, না স্যার?

সাজ্জাদ শরিফ

না একান্ন হলো বোধহয়, না?

হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭ – ২০০৪)

হুমায়ুন

পঞ্চাশ শুরু হলো। এখন একান্নর পথে।

রাইসু

আপনাকে তো স্যার কেউ বুড়ো বলে না নিশ্চয়ই?

সাজ্জাদ

বুড়ো কত বছর বয়সে হয়, এটা কিন্তু বুঝতেই পারি না স্যার।

হুমায়ুন

বুড়ো কেউ বিশ বছর বয়সে হতে পারে, কেউ আশি বছর বয়সে হয় না।

রাইসু

শামসুর রাহমান তো তাহলে সেই অর্থে বুড়ো হন নি।

হুমায়ুন

শামসুর রাহমান এক অর্থে কিন্তু ভালই আছেন আমি মনে করি। তার চুল পেকে গেলেও তার বয়স এখন বোধহয় আটষট্টি। বুদ্ধদেব বসু এ বয়সে মারা গেছেন, জীবনানন্দ অনেক আগেই আত্মহত্যা করেছেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ঊনষাট বা ষাট বছরে মারা গেছেন। সে অর্থে শামসুর রাহমান একটু বেশি… একটু জড়তাগ্রস্ত বলে মনে হয়, কিন্তু ভালই আছেন কিন্তু।

রাইসু

এটা কি অভিনয় করেন শামসুর রাহমান, জড়তার?

হুমায়ুন

না, অভিনয় নয়, তবে… না অভিনয় নয়। তুমি লক্ষ্য করো, শামসুর রাহমান না, আমাদের আহমদ শরীফ স্যারের সঙ্গে পোপের তুলনা করো। তারা একই বয়সের। পোপকে দেখলে মনে হয় দু’হাজার দশ বছর বয়স। কিন্তু শরীফ সাহেব, তিনি এখনও বোধহয় তিন চার মাইল হাঁটেন বিকেল বেলা। আর পোপ, ‌ওই যে চিরকাল ধরে জরাগ্রস্ত।

সাজ্জাদ

মনে হয় যেন যিশুর সঙ্গে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এখনও বেঁচে আছেন।

হুমায়ুন

যিশুরও পূর্বপুরুষ। কী একটা… মানে বোঝা যায় যে ধর্ম মানুষকে কতটা জরাগ্রস্ত করে।

রাইসু

খ্রিস্টান ধর্ম বেশি করে মনে হয়?

হুমায়ুন

হ্যাঁ, তার তো যৌন ব্যাপারগুলো অপরিতৃপ্ত রয়ে গেছে। যদিও বিচিত্র উপায়েই… কিন্তু…।

সাজ্জাদ

আমি স্যার ভগবান রজনীশের একটা বইয়ে পড়লাম, সে বলছে যে ক্রিশ্চিয়ানিটি—এটাকে আমি ক্রিশ্চিয়ানিটি বলি না, আমি বলি ক্রুসিয়ানিটি। কারণ তার কাছে জীবন্ত যিশুর চেয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশু বেশি মূল্যবান।

হুমায়ুন

সমস্ত গোত্রের কাছেই কিন্তু তার জীবিত মানুষের চেয়ে ক্রুশবিদ্ধ শরীরটি বেশি মূল্যবান। এটা কিন্তু শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে নয়। প্রতিটি সংঘ, প্রতিটি রাজনৈতিক দল একটা করে শহীদ চায়।

সাজ্জাদ

শহীদ কাদরী সেক্ষেত্রে আমাদের বিশিষ্ট কবি হলেন না কেন?

ষাটের দশকের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদ।

হুমায়ুন

আমরা এই জাতীয় প্রসঙ্গে পরে আসব।

রাইসু

শহীদ কাদরীকে ভয় পান আপনি?

হুমায়ুন

না, ঠিক ভয় পাই না। এই জাতীয় প্রসঙ্গে পরে আসা যাক। আমি চাইব যে যেহেতু আমার পঞ্চাশ পূর্তি উপলক্ষে—ইন্টারভিউ শ্যুড বি সিরিয়াস। তারপরে আমরা মজার বিভিন্ন প্রসঙ্গে যাব। (এ সময়ে স্যারের পুত্র চা নিয়ে আসে।) আমাদের বাসায় তো কয়েক বছর থেকে কাজের লোক নেই। ফলে কেউ এলে চা খাওয়াতে পারি না।

সাজ্জাদ

টেলিভিশন নেই আপনার বাসায়?

হুমায়ুন

টেলিভিশন আছে, কাজের লোক নেই। চাইলে তো আমি ওর ঘরেই টেলিভিশন দিয়ে দিতাম।

রাইসু

কাজের লোক থাকে না কেন স্যার?

হুমায়ুন

মানে কাজের মেয়ে তো এখন দুষ্প্রাপ্য। আগের মেয়েগুলো আসতো আমার স্ত্রীর বাড়ি থেকে—ভোলা থেকে। আর আমার এলাকা এত ধনী হয়েছে, তুমি জানো, কাজের মেয়ে মানে কী, আমার চাষী বলে, “আমার প্রথম ছেলেটি ভালই আছে কোরিয়ায়। জামাইটি বরং কষ্টে আছে, ভাল নাই। ফ্রান্সে।” অবস্থা বুঝছো! ফ্রান্স ভালো নাই, কারণ বেতন কম। কোরিয়া অনেক বেতন। নব্বই হাজার পায়। আর ফ্রান্স পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ পায়। মহা ধনী।

রাইসু

আপনাকে যে দেখতে পারে না লোকজন, আপনি কি জানেন?

হুমায়ুন

না, এইভাবে শুরু কোরো না। এটা বাদ দাও। এটা ইরেজ করতে হবে। ইরেজ করো একদম।

সাজ্জাদ

পঞ্চাশ বছর যে পার হয়ে এলেন, এখন তো স্যার আপনার জীবনের দ্বিতীয় পর্যায়?

হুমায়ুন

এটা ইরেজ করো।

সাজ্জাদ

আপনার পিছুটান লাগছে না? এখন স্যার মৃত্যুর দিকে ধাবিত হবেন ক্রমাগত।

হুমায়ুন

না, মৃত্যুর দিকে তো আমি অনেক বছর থেকেই ধাবিত হয়ে আছি। পঞ্চাশ বছর হওয়ার পর আমার একটি অনুভূতি হয়েছে, সেটি হচ্ছে যে আমার আর কোনো তথাকথিত বাস্তব ভবিষ্যৎ নাই। অর্থাৎ আমার যা কিছু অর্জন করার, বাস্তব মানুষ যা কিছু অর্জন করে এগুলো আমার সবই অর্জিত হয়ে গেছে। এখন আমার আর কোনো সাফল্য, প্রতিযোগিতা, প্রাপ্তি এ সমস্ত ভাবনা-চিন্তা কিছুই নেই। ফলে আমার কিন্তু একদিকে খুব ভাল লাগছে যে আমার আর প্রতিযোগিতার কাল নাই। ফলে আমি একদিকে খুব শান্ত, খুব স্নিগ্ধ জীবনযাপন করছি। মনে হয় আমি যখন ভোরবেলায় চা খাই এবং জানালার ফাঁক দিয়ে সবুজ নারকেল গাছের পাতা দেখি তখন আমার কাছে অনেক বেশি সুন্দর বলে মনে হয়।

সাজ্জাদ

ওখানে কি মৃত্যুর ছায়া পড়ে, না?

হুমায়ুন

মৃত্যু তো বাল্যকাল থেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আমার চারপাশে এত বুড়োরা বেঁচে আছে যাদের বেঁচে থাকার কথা নয়। বেঁচে আছে। বুড়ো, অসুন্দর, ক্লান্ত এবং বলা যায়—বন্ধ্যা। কিন্তু আমি তাদের কথা ভাবি না। মৃত্যুর কথা কিন্তু আমি বাল্যকাল থেকেই ভাবি যে আমাকে মরে যেতে হবে। এখন পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে বলেই মৃত্যুর কথা ভাবছি এমন নয়। পঞ্চাশ হওয়ার পর আমার অনুভূতি হচ্ছে আমি খুব সুখে এবং শান্তিতে আছি। খুব স্নিগ্ধতার মধ্যে আছি।

 

সাজ্জাদ

আচ্ছা পাঠক হিসেবে নিজের লেখা নিয়ে হতাশ বোধ করেন না কখনো?

হুমায়ুন

না, হতাশ বোধ করা যেতে পারে যে আমি শেকসপিয়রের মানের কিছু লিখি নি। বা টলস্টয়ের মানের কিছু লিখি নি।

রাইসু

এগুলি স্যার আপনার বিনয়।

হুমায়ুন

কিন্তু সালমান রুশদী পড়ে আমি হতাশ হই না যে সালমান রুশদী খুব অসাধারণ কিছু লিখেছে। এমন কি রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়েও আমি হতাশ বোধ করি না।

সাজ্জাদ

আমাদের আধুনিক কবিতা সম্পর্কে আপনার কখনো সংশয় জাগে নি?

হুমায়ুন

আমি তো মনে করি আমাদের আধুনিক কবিতাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ কবিতা।

সাজ্জাদ

মনে হয় না যে একই প্রবণতা প্রায় সমস্ত কবির মধ্যে কাজ করেছে! সেই ঘুরে ফিরে অমঙ্গল বোধ, সেই ঘুরে ফিরে কুৎসিতের প্রতি ভালবাসা। যদি বলি যে এটা একটা নতুন দৃষ্টিকোণ এনেছে, কিন্তু সব কবির মধ্যে একই ভাবে এসেছে—এ রকম মনে হয় না?

হুমায়ুন

না, যেমন ধরো ঊনিশ শতকে মধুসূদন বাংলা কবিতাকে একটা ভিন্ন স্তরে উঠিয়ে দিয়েছেন। আঠারো এবং ঊনিশ শতকের মধ্যে শুধু এক শতাব্দীর ব্যবধান নয়, কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান। তারপর কবিতায় প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এবং আমরা এখনো বুঝি যে তিনি কত বিশাল ছিলেন। যদিও তার শেষ দিকের কবিতা আমার কাছে তেমন মূল্যবান নয়। তার যে কবিতাগুলো রোমান্টিক সেগুলো আমার কাছে মূল্যবান। শেষ জীবনে তিনি অনেক গদ্য কবিতা লিখেছেন, রোমান্টিসিজম তার মতোই আছে, কিন্তু যেগুলোর অনেক কবিতাই কবিতা হয়ে ওঠে নি। কিন্তু আধুনিকরা যে কাজটি করেছেন সেটা আমি বুঝি যে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে যে গৌণ কবিরা এসেছেন—তাদের পর্যন্ত চলছিল—তরুণ পাঠকেরা কবিতা পড়বে, কবিতা হবে প্রধানত আবেগের কবিতা, প্রেমের কবিতা—এর মধ্যে কোনো মননশীলতা থাকবে না, এর মধ্যে কোনো নতুন বোধ থাকবে না—এ রকম একটি ধারণা ছিল। কিন্তু আধুনিকরা এসে এটা বদলে দিয়েছে। এবং আধুনিকরাই প্রথম কবিতাকে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের উপযুক্ত করে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ার জন্য আঠারো বছরের যুবক হওয়াই যথেষ্ট, নজরুলের কবিতা পড়ার জন্য ষোলো বছরই যথেষ্ট—কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বা বিষ্ণু দে বা জীবনানন্দ দাশ, শেষ বয়সে বুদ্ধদেব বসু—এদের পড়ার জন্য পঞ্চাশ ষাট বছর বয়স হলে ভাল হয়। কারণ ইতোমধ্যে অভিজ্ঞতা অনেক বাড়ে। আর ওই যে অমঙ্গলের কথা বলা হয়, এটা বুঝতে হবে কবিরা যখন অমঙ্গলের কথা বলে তখন তারা অমঙ্গলকে ভালবাসেন জন্য নয়, বোদলেয়ারও অমঙ্গলকে ভালবাসতেন এমন নয়। অমঙ্গল এত প্রবল যে অমঙ্গলকে তারা উপস্থাপিত করেছেন ভালবেসে নয়। তার রূপটি দেখিয়েছেন—কিন্তু পেছনে হচ্ছে মঙ্গলের জন্য ভালবাসা । আমি যখন আবর্জনার স্তবগান গাই তার মানে এই নয় যে আবর্জনা আমি চাই। এর মানে বুঝতে হবে যে আমি আবর্জনা দ্বারা প্লাবিত হয়ে গেছি, কিন্তু আমি এর বিপরীতটি চাই।

রাইসু

বিপরীতভাবে যারা কিনা শুভটাই চায় তাদের ক্ষেত্রে আমরা উল্টাটা ভাবি না কেন?

হুমায়ুন

না ভাবার কারণ হচ্ছে শুভ চাওয়াটা বহু বছর ধরে চলে এসেছে।

রাইসু

তার মানে শুভ যারা চাইছে তারা আসলে অমঙ্গল চাইছে?

হুমায়ুন

না, শুভটা এত বেশি চাওয়া হয়েছে… আমরা হাজার বছর ধরে শুভ কামনায়… যে শুভ নেই সেই শুভর স্তবগান আমি লিখে যাব কেন?

রাইসু

এটা খুব বালখিল্য ব্যাপার না যে অশুভ দিয়ে আমি শুভকে বোঝাই?

হুমায়ুন

না, এটা এত গভীর ব্যাপার যে তুমি বুঝতে পারছো না।

সাজ্জাদ

আমার অন্য একটা কোয়েস্ট আছে, সেটা হচ্ছে যে আপনি বলছেন যে মঙ্গলকাব্যের সময়ে শেকসপিয়র আসছে ওদের কবিতায়। মানে আমরা সাংস্কৃতিক ভাবে অধমর্ণ হয়ে আছি। আমাদের আধুনিক কবিতাও কি সাংস্কৃতিকভাবে ইউরোপের অধমর্ণ না?

হুমায়ুন

না, অধমর্ণ শব্দের অর্থ হচ্ছে, যে অন্যের কাছ থেকে ঋণ করে চলেছে। যদি বলো যে আমরা নিম্ন পর্যায়ে আছি সেটা তো সমগ্র আধুনিক বাংলা সাহিত্যই তাই। মধুসূদন দত্ত ওই মহাকাব্য লিখতে পারতেন না যদি না তিনি হোমার বা দান্তে বা মিলটনের কাব্যের সঙ্গে পরিচিত হতেন। তিনি ঐ চতুর্দশপদীগুলি লিখতেন না যদি তিনি ইতালিয়ান সেই পেত্রার্কের সঙ্গে পরিচিত হতেন। ফলে শুধু আমাদের আধুনিক সাহিত্য কেন, এটাকে খারাপ অর্থে ধরার কোনো মানে হয় না, আমাদের আধুনিক জীবনপদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে বলা যাক আন্তর্জাতিক এবং যেহেতু পশ্চিমের মানুষেরা এগুলো সৃষ্টি করেছে সেগুলো গ্রহণ করার মধ্যে কোনো রকম হীনতা নেই। তুমি এখন গ্রামে গেলে দেখবে যে, গ্রামের চাষীও দিনরাত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সঙ্গে আছে। সে বিদ্যুৎ অত্যন্ত পছন্দ করে, টেলিভিশন পছন্দ করে, পানি তোলার জন্য সে মেশিন ব্যবহার করে। এমনকি সে এখন আর নৌকা বাইতে পছন্দ করে না, যন্ত্র চালাতে পছন্দ করে। গ্রাম ভরে গেছে ওই যে… ‘শ্যালো’কে ওরা ‘সাইলো’ বলছে—সাইলো নৌকায় গ্রাম ভরে গেছে। আমি আগের নৌকা খুঁজি গিয়ে, আগের নৌকা নাই।

সাজ্জাদ

আপনি স্যার কম্পিউটারে কবিতা লেখেন?

হুমায়ুন

হ্যাঁ, ফলে… পশ্চিম এককালে বলা যাক, আধিপত্য করেছে আমাদের উপর। একেবারে সরাসরি। এটাকে গ্লানিকর মনে করি, কিন্তু পৃথিবীর যা ইতিহাস এটা কিন্তু আধিপত্য এবং অধীনতার ইতিহাস। আমি এখন আর পশ্চিমের সঙ্গে ওই রকম… “তুমি আমাকে অধীন করে রেখেছিলে, আমি” ইত্যাদি এই জাতীয় ‘কারার ঐ লৌহকপাটে’র মারামারির মধ্যে নেই। আমি চাই…

সাজ্জাদ

লৌহকপাটের ওপার থেকে হ্যান্ডশেক করতে?

হুমায়ুন

না। কপাটের ব্যাপারটাই আমার কাছ থেকে এখন চলে গেছে। আমি চাই যে সারা পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু সৃষ্টি করতে পারে, বিচিত্র প্রান্তে তা সৃষ্টি হয়, মানুষের আবিষ্কারপ্রবণতা, তার সৃষ্টিশীলতা বিকশিত হবে। আমরা সেই সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে যুক্ত থাকব। আমরা উপজাতিতে পরিণত হয়ে যাব না।

রাইসু

তাহলে স্যার, আমরা ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করি না কেন?

হুমায়ুন

ইংরেজি ভাষার চর্চা করার দরকার নেই। ভাষা হচ্ছে ভিন্ন ব্যাপার। ভাষা হচ্ছে মাধ্যম। এটি আমার নিজের ভাষা, আমি এই মাধ্যমে প্রকাশ করি। তুমি কি এখন বলবে আমি আইনস্টাইনের তত্ত্ব মানবো না তার কারণ তিনি জর্মন, আমার কিন্তু বাঙালির তত্ত্ব তৈরি করতে হবে। এটা তো হবে না। রোমান্টিসিজম একটি বিশাল ঘটনা। যে, না, আমি রোমান্টিসিজম মানি না, মঙ্গলকাব্য নিয়েই আমি থাকব—এটা তো হবে না। আমরা চাইব এখন যে আমরাও সৃষ্টিশীল হব। কেন শুধু ইউরোপ বা আমেরিকা বা জাপানই শুধু উদ্ভাবন করে চলবে; আমরা কেন উদ্ভাবন করি না। এটা আমাদের অসামর্থ্য। এটা আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা। আমাদের সমাজ চায় না যে আমরা কিছু সৃষ্টি করি।

সাজ্জাদ

আমাদের আধুনিক সাহিত্যে তাহলে আপনার সৃষ্টিশীল অবদানটা কী?

হুমায়ুন

আমাদের আধুনিক সাহিত্যে আমার অবদান?

সাজ্জাদ

হ্যাঁ।

হুমায়ুন

যদি ধরো, রবীন্দ্রনাথকেই টেনে আনা ভাল, যদি চেতনার কথা বলো—রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন ইউরোপীয় রোমান্টিসিজম, ভিক্টোরিয়ান বিভিন্ন ভাবনা এবং বিশ্বাস ও প্রাচীন ভারতীয় বিশ্বাসের একটি মিশ্রণ। আমাদের যে আধুনিক কবিতা, তার যে পাঁচজন প্রধান তারা তাদের সমকালীন যে ইউরোপীয় চেতনাগুলো এগুলো প্রকাশ করেছেন। তুমি যদি বলো ক্লান্তি, হতাশা, নৈরাশ্য, নিঃসঙ্গতা, অন্ধকার—আর যা যা তুমি ধরতে চাও—কিন্তু তাদের কবিতা অতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়। জীবনানন্দের কবিতা প্রেমে, প্রীতিতে, নিসর্গে, আলোকে পরিপূর্ণ। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতাও কিন্তু তাই। তিনি যে “বিশ্বাস করি না”, “বিশ্বাস করি না”—এটা খুব ভাল। বিশ্বাসের মধ্যে এত শতাব্দী কেটেছে। আমাদের নতুন বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে, পুরনো বিশ্বাসগুলোকে যাচাই করে। যেটা আমি অনেকটা ‘আমার অবিশ্বাস’-এর মধ্যে করার চেষ্টা করেছি। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার কবিতার মধ্যে করেছেন।

সাজ্জাদ

তাহলে আপনার নতুন অবদানটা কোথায়?

হুমায়ুন

আমার অবদানের কথা যদি বলি আমার থেকে বেশি লিখেছে এমন বাঙালি মুসলমান পাবে না। আমি মুসলমানিত্বকে পাত্তা দেই না, এটা সামাজিক স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করার জন্য বললাম। আমি পরিমাণে অনেক বেশি লিখেছি। তারপর বৈচিত্র্যে আর—যে, আমি শুধু গান আর নাটক লিখি নি। এই সমাজে ঠিক এমন বৈচিত্র্য পাওয়া যাবে না। তুমি বৈচিত্র্য খুঁজতে গেলে পাবে, ধরো সৈয়দ শামসুল হক। তিনিও গান লিখেছেন, কিন্তু ভাষাবিজ্ঞান লেখেন নি, বা সমালোচনা লেখেন নি, বা শিশুসাহিত্য লেখেন নি।

রাইসু

প্রবচনও লেখেন নি।

সাজ্জাদ

এটা আপনার মৌলিক কনট্রিবিউশন। আর কোনো বাঙালি লেখে নি।

হুমায়ুন

হাঃ হাঃ… যদি মননশীলতার কথা ধরো, বাঙালি সেই ঊনিশ থেকে বিশ শতকব্যাপী তাদের লেখা মননশীলতার প্রকাশ নয়। সেই মি. মশাররফ হোসেন, বা কায়কোবাদ, নজরুল—অমননশীল লেখক। তুমি আমার লেখায় অন্তত এই মননশীলতাটা পাবে। তারপর ভাষাবিজ্ঞানে অনেক পাণ্ডিত্যের ব্যাপার আছে—আমরা পুরোনোদের অনেক পণ্ডিত মনে করি—কিন্তু আমার বই এবং শহীদুল্লাহ্’র বই তুমি মিলিয়ে দেখতে পারো, পাণ্ডিত্যের পার্থক্যটা কোথায়? তারপরে এর যে সৌন্দর্যবোধ, এর যে শিল্পকুশলতা, এর যে ভাষা ব্যবহার—তুমি বিচার করে দেখতে পারো। আজ তো হবে না, বাঙালি মুসলমান সব সময় কবরের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, যে কবে কবর দেওয়া যাবে, তারপরে আমরা এটাকে ভাল করে…।

রাইসু

ধোলাই করবো…?

হুমায়ুন

ধোলাই না। এখানে অনেকগুলো মাজার তৈরি হয়েছে। তাই না? বাঙালি মুসলমানের কাজ হচ্ছে মাজার তৈরি করা। আমার মাজারে অ-নে-ক মোমবাতি জ্বলবে।

রাইসু

কিন্তু আপনার বিরুদ্ধেই তো সবচে বেশি পরিমাণ লোক।

হুমায়ুন

এর অর্থ হচ্ছে আমিই একমাত্র সৎলোক। একটা সমাজে সব লোক ভাল আর আমি একা খারাপ এটা হতে পারে না। এটা হতে পারে যে আমি একা ভাল আর অধিকাংশ লোক খারাপ। আমি দেখেছি কারা আমার বিপক্ষে…।

রাইসু

সবাই, আমি তো দেখি সবাই।

সাজ্জাদ

অনেকে বলে আপনি আত্মগর্বী।

হুমায়ুন

কে আত্মগর্বী নয়! কেউ গোপনে গোপনে তোষামোদ করে তার সাফল্য অর্জন করে নেয়। আমি যেটা করি না। কেউ বিনয়ে গিয়ে বসে। আমি সেটি করি না। আমি গ্যালিলিওর অহমিকা চাই। আমি বোধহয় বাংলাদেশে একমাত্র লেখক যে কোনো শক্তিশালীকে পাত্তা দেয় না। অন্য সবাই এই শক্তিশালীদের পথে। এমনকী তোমাকেও তো একজন রাষ্ট্রপতি “শ্রদ্ধেয় সাজ্জাদ শরিফ” বলে। আমি তোমাকে তা বলি না। সবসময় বিনীত থাকা ভাল না। বিনীত, স্বার্থবাদী, আত্মস্বার্থপরায়ণ আমি পছন্দ করি না। আমি গ্যালিলিওর ঔদ্ধত্য পছন্দ করি।

সাজ্জাদ

গ্যালিলিও ও তো পরে আবার চার্চের কাছে মাথা নত করেছেন।

হুমায়ুন

হ্যাঁ, কিন্তু নিতান্ত প্রাণরক্ষার জন্য। নইলে তাকে অগ্নিকুণ্ডে প্রাণ দিতে হতো। আমি দেখেছি সমস্ত সময়েই সমকাল বা সমবয়স্করা কাউকে মেনে নেয় না। আমার সমবয়স্ক যারা তারা ঈর্ষাকাতর। কাউকে মানতে চান না। কিন্তু তরুণ যারা, আমি খুব সামাজিক লোক নই, আমি কাউকে ডেকে এনে আমার পাশে বসিয়ে কথা বলি না, বা বহুবার টেলিফোন করে সম্পর্ক রক্ষা করি না, কিন্তু তরুণরা কী পরিমাণ যে আমার কাছে আসে! এবং অনেকগুলো বই নিয়ে আসে। আমার সমবয়স্ক লোকেরা তো আমার বিরুদ্ধে হবেই, যেহেতু আমি তাদের বহু কিছুকে বাতিল করেছি। আমার সমস্ত সাহিত্য হচ্ছে এক ধরনের প্রচণ্ড আক্রমণ। আমি যাদের আক্রমণ করছি—’আমার অবিশ্বাস’ ভরাই আক্রমণ—তো, মহাজগৎ আমার বিরুদ্ধে কাজ করে। এই যে ধরো, পৃথিবীর যত রকম ঈশ্বর এবং বিধাতা আছে তারা আমার বিরুদ্ধে কাজ করবে। আমি’ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’-এ যেভাবে আক্রমণ করেছি এটা বাংলাদেশের কোনো লেখক, এক পাতা লেখা কেন, ভাবতে ভয় পাবে।

রাইসু

সবাই আপনার বিরুদ্ধে, কিন্তু কেউ কিছু করে না কেন?

হুমায়ুন

আমার বই নিষিদ্ধ করেছে। আমি অবশ্য বলি, আমার সব বই নিষিদ্ধ হতে পারে।

সাজ্জাদ

কিন্তু এই বইটা আপনি স্যার লিখতে গিয়েছিলেন কেন, ‘নারী’ বইটা? তসলিমার সঙ্গে কোনো ব্যাপার ছিল কিনা?

হুমায়ুন

তসলিমাই আমার প্রভাবে নারীবাদ শুরু করে। বাংলাদেশে প্রথম নারীবাদী প্রবন্ধ কিন্তু আমিই লিখেছি।

সাজ্জাদ

আমাদের এখানে অবশ্য বলে, নারীবাদী দুইজন—তসলিমা নাসরিন আর হুমায়ুন আজাদ।

 

হুমায়ুন

মজা হয়েছে কী, আমি একটি নারীবাদী প্রবন্ধ লিখি, ‘দেশবন্ধু’তে। ‘মার্কসবাদী, মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা’ বলে আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। যার মূল বক্তব্য ছিল নারীকে এখন সমাজ আক্রমণ করতে হবে দেহ দিয়ে বা শরীর দিয়ে। তসলিমা ওই জিনিসটাকেই বিস্তৃত করে। হাঃ হাঃ আমি ওই প্রবন্ধের পর আর বেশি কিছু লিখি নি।

সাজ্জাদ

আপনি স্যার বাংলা ব্যাকরণে কয়েকটি বড় কাজ করেছেন, একটা তো বাংলা ব্যাকরণ সংকলন আপনি করেছেন—দু’খণ্ডে বেরিয়েছিল—’বাংলা ভাষা’; খুবই একটা অসামান্য সংকলন। বাংলা ব্যাকরণের স্বভাব সম্পর্কে আপনার নিজস্ব কিছু মৌলিক ধারণা আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা করেছিলাম পূর্ণাঙ্গ না হোক প্রাথমিকভাবে আপনি একটা কিছু করে যাবেন।

হুমায়ুন

আমার বাংলা ভাষায় একটি বিস্তৃত ব্যাকরণ লেখার ইচ্ছে ছিল। কারণ আমি যে ভাষার তত্ত্ব নিয়ে কাজ করি তার মূল কথাই হচ্ছে সম্পূর্ণ, এবং সম্পূর্ণ বাক্য সৃষ্টি করা—হচ্ছে ভাষাতত্ত্বের লক্ষ্য। এবং আমি যখন বিদেশ থেকে ফিরি, আমার পরিকল্পনাই ছিল যে প্রথম আমি তত্ত্বটি বাংলা ভাষায় ব্যাখ্যা করব। নইলে পাঠক বুঝবে না। এখন আমি তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু তারপর যখন আমি ব্যাকরণ লিখার কথা ভাবলাম, বাংলা একাডেমি বোধহয় আজ থেকে বিশ বছর আগে আমার কাছে চাইল যে আমাদের একটি বাংলা ব্যাকরণ লিখে দেন। তো আমি বললাম ঠিক আছে আমি একটা প্রস্তাব করছি, তাতে সম্ভবত দশ খণ্ডের একটি বাংলা ব্যাকরণের প্রস্তাব হয়েছিল। তারা এটি পেয়ে, বলা যাক, বিমর্ষ, বিহ্বল এবং হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে থাকেন যে বাংলা ভাষা নিয়ে দশ খণ্ড লেখার কী আছে! এমনকী বাংলা ভাষার পাণ্ডুলিপি যখন আমি উপস্থিত করেছিলাম তারা “আপনি এটি কী করেছেন! আমরা ভেবেছি দু’শ পাতার!”… আমি বললাম, আপনার ভাবার মতো তো হবে না। আমার ভাবনা ভিন্ন । তারপরে বাংলা একাডেমি সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে নি। যদি গ্রহণ করতো এর মধ্যে দশ খণ্ডের অন্তত আট খণ্ড লেখা হতো। কারণ আমার সে সময় যে উৎসাহ ছিল, আমার তখন বয়স বত্রিশ বৎসর। আঠারো বছর পেরিয়ে গেছে। আমার মনে হয় দশ খণ্ডই আমি লিখে ফেলতাম। কিন্তু এই জাতীয় বিশাল কাজ ইউরোপ আমেরিকায় এখন কেউ ব্যক্তিগতভাবে করে না। একজন প্রধান গবেষক থাকেন। তাকে সাহায্য করার জন্য খুবই মেধাবী একদল গবেষক থাকেন। বেশি ছিল না, আমি বোধহয় দু’কোটি টাকার একটি প্রকল্প দিয়েছিলাম, দশ বছর ধরে কাজ হবে। দশ বছরে দু’কোটি কিছুই না। আমাদের এখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে, অসৎ ধনীরা কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট করছে। কিন্তু যখন কোনো একটি কাজের জন্য টাকা চাওয়া হয়, তখন দেয়া হয় না। এবং বাংলা একাডেমির, আমার মনে হয়, এই কর্মকর্তারা ভাবে যে বই লেখা হলে তো এর নাম হবে, আমাদের কী? আর বাংলাদেশ সরকারের মতো নির্বোধ সরকার বলে এরাও বুঝতে পারে না যে কী…; এখন আমার যে বয়স, কাজ করলে আরো বিশ বৎসর লাগবে। অন্তত দশজন গবেষণা সহকারী লাগবে—এবং মোটামুটি ধরো পাঁচ কোটি টাকা দশ বছরের জন্যে—বেশি না, দশ বছর পাঁচ কোটি টাকা কী! তাতে একটি প্রকল্প হয়। অন্তত আমি শুরু করে দিলে, পথ দেখিয়ে দেয়া, যে, এ পথে কাজ হবে।

তবে আমি বোধহয় জুলাই বা আগস্ট মাস থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বৎসরের ছুটি নিচ্ছি। তখন আমার পরিকল্পনা আছে, যেহেতু সম্পূর্ণ ব্যাকরণ আমার পক্ষে লেখা সম্ভবই নয়—আমি একটি খসড়া ব্যাকরণ অন্তত লিখব। যার নাম ‘বাংলা বাক্যের ব্যাকরণ’; চারশ পাতার মধ্যে আমি এটি লেখার কথা ভাবছি। যে, দশ খণ্ড যখন হলোই না, অন্তত এ খসড়াটি করে যাওয়া, যাতে পরে এগুতে পারে। আমাদের এই একাডেমিগুলো, এগুলো হচ্ছে নিতান্তই হাউস বিল্ডিং ফিনান্স কর্পোরেশন। বা মৎস্য উন্নয়ন সংস্থা। কোনো পরিকল্পনা নেই—চলছে। সবসময় বিদ্বেষের মধ্যে থাকে। যে, আমার কী লাভ, ওর তো লাভ! এর আগে আমি একটি জাতীয় একাডেমির প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। শুধু বাংলা একাডেমি হলে চলবে না। জাতীয় ভাষা একাডেমি দরকার। বাংলাই এদেশের একমাত্র ভাষা নয়। এটি রাষ্ট্রভাষা, প্রধান ভাষা। আরো বহু ভাষা আছে। আমাদের উচিত সমস্ত ভাষাগুলোর উপাত্ত সংগ্রহ করা, বিশ্লেষণ করা, সব ভাষার বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করা। কে এ নিয়ে মাথা ঘামায়! আমাদের রাজনীতিবিদরা তো সারাক্ষণ তাদের পারস্পরিক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত, আমাদের একাডেমিগুলো হচ্ছে কতগুলো পশুর মতো প্রাণী। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে এখন ঘোলা পানিতে মাথা ডুবিয়ে বিশ্রাম করছে। এখন বাংলা একাডেমি আমার বিরুদ্ধে চার কোটি টাকার মামলাও করেছিল। আমি একটি লেখায় বলেছিলাম বোধহয় এটি একটি গো-শালা।

সাজ্জাদ

আপনি মেয়েদের বিষয়ে আকর্ষণ বোধ করেন এখনো?

হুমায়ুন

মেয়েদের সম্পর্কে আকর্ষণ বোধ না করার তো কারণ নেই। তবে আমি দেখলেই পাগল হই না।

রাইসু

স্যার পরের জন্মে কি বাঙালি হয়েই জন্মগ্রহণ করার ইচ্ছা?

হুমায়ুন

পরের জন্ম বলেই কিছু নেই, কাজেই জন্মাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মৃত্যুতেই সব শেষ। আর কোনো উত্থান নেই।

সাজ্জাদ

আপনাকে কেউ যদি বলে আপনাকে আরেকবার জন্ম দেওয়া হবে, এ রকম কোনো পদ্ধতি বের করা হল, ইউরোপে জন্মগ্রহণ করবেন না বাংলাদেশে? কারণ আপনি বলেছেন যে মহৎ বাঙালি মাত্রই ইউরোপিয়ান।

হুমায়ুন

সেক্ষেত্রে আমার বিশেষ কোনো দেশের প্রতি আকর্ষণ নেই।

সাজ্জাদ

পাপুয়া নিউগিনি, স্যার? বা প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো দ্বীপপুঞ্জে?

হুমায়ুন

আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি জানি এটা হাস্যকর।

রাইসু

সেক্ষেত্রে হাসলেন স্যার, জন্ম নেওয়ার পর হাসতে থাকলেন।

হুমায়ুন

হাঃ হাঃ। যেমন আমার ওই বইটিতে আমি লিখেছি, আমাকে যদি কেউ বলে তোমাকে বাল্যকালে আবার ফিরিয়ে নেয়া হবে, ওই তোমার অত সুখকর জীবনে। আমি আর রাজি হব না। আবার সেই স্কুলে যাওয়া! আবার সেই খাতা বহন করা। আবার পরীক্ষা দেওয়ার যন্ত্রণা। এগুলিতে আমি আর যাব না। আবার জন্ম নিয়ে আবার তোমাদের মুখোমুখি সাক্ষাৎকার, আমি তাতে রাজি না!

সাজ্জাদ

এটাতে আমরা কেউই আর রাজি না, স্যার!

ঢাকা , ১৬ জুন ১৯৯৭

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক