page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

আরেক জমানার কথা

ফিস ফিস করে ফজলুকে জিজ্ঞেস করি, পরের কোটেশনটা কার জানি দোস্ত? নামটা বল না।

—লিখে দে যে কোনো একটা ইংরেজ মার্কা নাম।

অবাক হয়ে বলি, কী বলিস! উলটা পালটা নাম লিখলে স্যার তো ধরে ফেলবে। নাম্বার দিবে না।

—তোর কি মনে হয় স্যার এত কোটেশন মনে রেখেছে! বেকুব কোথাকার। তাছাড়া আমরা কার বই ফলো করছি স্যার কেমনে জানবে।

murad-hai-305

লেখকের পুরানো ছবি।

ভাবলাম তাও তো কথা। লাইব্রেরিতে Philip Kotler, William Stanton এর Fundamentals of Marketing ছাড়াও আরো অনেকের বই আছে। স্যার কি সব বই পড়েছে নাকি। তারপর লিখে দিলাম অমুক বলেছে, তমুক বলেছে মার্কেটিং স্ট্রাটেজি কেমন করে অ্যাপ্লাই করলে ভাল এফেক্ট পাওয়া যাবে ইত্যাদি।

লিখে খাতা ভরে ফেললাম। ভালভাবে পাশও করে গেলাম। তারপর হা হা করে হাসলাম নিজেরাই।

কলাভবনের চারতলায় ৪০২২ নম্বর রুমে বসে ইন-কোর্স পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। আগের দুইদিন পার্টির মিছিল মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ক্লাস করা হয় নাই। নোট জোগাড় করা হয় নাই। সব সময় ওয়াসিম নোটের দায়িত্ব নেয়। সুবোধ বালক। ভাবুক আর আঁতেল মানুষ। সারাদিন বইয়ের ভিতর ডুবে থাকে। ওর নোট অনেক জটিল ধরনের হয়। কিন্তু সেটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। করলে সে আর কারো জন্য নোট লিখবে না। উল্টা পরীক্ষার আগের রাতে দেখা যাবে শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছে।murad hai logo

নোট লিখিস নাই কেন জিজ্ঞেস করলে বলবে, লেখার মুড নাই।

যদি জিজ্ঞেস করি, তুই পরীক্ষা দিবি কেমনে। উত্তর দিবে, মগজের ভিতর থেকে বের করে লিখব। কোনো সমস্যা নাই।

ওর সাথে রাগারাগি করে, খেপিয়ে কোনো লাভ নাই। তাইলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই চুপ করে তার সব ভাব হজম করতে হয়। কী আর করা। পরীক্ষা তো দিতে হবে।

জগন্নাথে দৌড়ালাম আমি আর ডালিম। দিলীপের রুমে হামলা দিয়ে যা নোট পেলাম, সব নিয়ে হলে ফিরে এলাম। কিন্তু মন ভরে নাই। তবুও তা’ই পড়ে পরদিন পরীক্ষার জন্য তৈরি হলাম।

দুপুর ২.১০ এ পরীক্ষা। স্বপন ভাই’র ক্যাফেটেরিয়ায় ভাত খেয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় বেন্চে বসে পিরিচে ঢেলে ফুরুৎ ফুরুৎ করে চা শেষ করছিলাম। তারপর আবার সিগারেট শেষ করতে হবে। সময় বেশি বাকি নাই। কে যেন সিগারেটে পোরা গাঁজায় টান দিচ্ছে। হাতে হাতে ঘুরছে সেটা। আমার কাছে আসতেই পুরনো কথা মনে পড়ে গেল। আরেকবার গাঁজায় টান দিয়ে পরীক্ষার হলে লেখার বদলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভয়ে আর সাহস হল না এবার টান দিতে।

murad-hai-301

সূর্যসেন হলের গেটে।

আগের সপ্তাহে হলে অনেক ঝামেলা হয়েছে। আমাদের বিরোধী পক্ষের সাথে লাঠালাঠি হয়েছে। কয়েকটা জর্দার ডিব্বা ফাটানো হয়েছে হলে। সন্ধ্যয় খবর এল পুলিশ নাকি অস্ত্র উদ্ধারে হলে রেইড দিবে রাতের বেলা। ভয়ে পেটে কামড় দেয়া শুরু করল। হাতে সময় নাই মাল সরানোর। রুমের ক্লজেটে গিট্টুর ছোট মালটা রাখা আছে একটা গুলিসহ। যদিও ওটা কোনো কাজের না। মাল মানে একটা পুরনো পয়েন্ট টুটু পিস্তল। কিন্তু গুলি ভিন্ন। তাই কাজ হয় না। গিট্টু বলে গুলিটা চিকন তার দিয়ে পেঁচিয়ে নিলে নাকি খাপে খাপ মিলে যাবে। চেষ্টা করা হয় নাই। দরকার ও হয় নাই কখনো। গুলি করার সাহসই নাই কারো। শুধু মাঝে মাঝে পকেটে নিয়ে একে ওকে আকারে ইঙ্গিতে বোঝানো হত যে আমাদের কাছে মাল আছে, তেড়িবেড়ি করলে খুলি ফুটা করে দিব।

কাজ হোক আর নাই হোক,পুলিশ যদি রুমের ভিতর এটা পায় তাইলে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবে। অবৈধ অস্ত্র রাখা্র দায়ে জেলের ঘানি টানতে হবে। কী করা যায় ভাবছিলাম। একবার ইচ্ছা হল, জানালা দিয়ে ছুঁড়ে পাশের কাঁটাবন বস্তিতে ফেলে দেই। কিন্তু গিট্টু তাইলে আমাদের সবার জান হালুয়া করে ছেড়ে দিবে। ওর মাল ওটা। সে ওটা ভাড়া খাটায়। আমরা হলে থাকি। গিট্টু নীলখেতে তার বাবার সরকারি বাসায় থাকে।

ডালিম ভাল বুদ্ধি বাতলে দিল। বলে, মালটা হাশেমের কোমরে দিয়ে বারান্দায় শুয়ে থাকতে বল। ওকে কেউ চেক করবে না।

হাশেম হল আমাদের ব্লকের টোকাই। সবার ফাই ফরমাশ খাটে। চা সিগারেট নাস্তা কিনে এনে দেয়। ইলেক্ট্রিকের চুলায় আমাদের জন্য ভাত, ডাল, আলুভর্তা বানায়। জামা কাপড় ধুয়ে দেয়। খুব বিশ্বস্ত আর অনুগত ছেলে। রাতের বেলায় বারান্দায় লিফটের পাশে মাদুর বিছিয়ে ঘুমায়। গিট্টুর মাল সরানোর ব্যবস্থা হল।

হঠাৎ মনে হল ৩৩৪ এ বাচ্চুর রুমে খাটের নিচে কাঁথা মুড়িয়ে রাখা আছে আমাদের বড় মালটা। ওটা মনে হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের অস্ত্র। একটা এস,এল,আর। মাটির নিচে থাকায় মরিচা ধরে একদম ক্ষয় হয়ে গেছে। হঠাৎ দেখলে বোঝার উপায় নাই কোন দিক দিয়ে গুলি বের হয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। গুলিও নাই। কিন্তু এই লোহার টুকরা দূর থেকে দেখলেই ভয়ে সবাই মূর্ছা যায়। তার উপর বিরোধী পক্ষ জানে আমাদের কাছে শুধু ছোট মাল নয়, বড় মালও আছে। সেটাও বের করে হাশেমের ময়লা বিছানাপত্রের ভিতর রেখে দেয়া হল।

রাতের বেলায় ঠিকই পুলিশ এল হলে। সব রুমে রুমে ঢুকে সার্চ করা শুরু করল। আমরা যে যার রুমে বিছানায় শুয়ে বুকের উপর বই খুলে রেখে খুব পড়ুয়া ছাত্রের ভাব করে রইলাম। রুমের দেয়ালে একটা চাইনিজ নানচাকু ঝুলছিল। এক বন্ধু কারাতে প্র্যাক্টিস করত। কিছুদিন আগে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে আমেরিকায় চলে গেছে। এটা তারই স্মৃতি স্বরূপ আমাদের রুমের দেয়ালে ঝুলছিল স্যুভেনির হিসাবে। পুলিশ কিছু খুঁজে না পেয়ে সেই নানচাকুটা নিয়ে গেল। অন্যদের কারো রুমে পেয়েছে হকিস্টিক, লাঠি, ছোট ফোল্ডিং ছুরি, যা দিয়ে আম কেটে খায়। সিরাজ ভাইয়ের রুমে এক ব্যাগ ভর্তি ভাঙতি পয়সা পেল। সেটাও নিল। কিন্তু কোনো অস্ত্র পায় নাই। কারণ ওসব কিছু হলের টোকাই বাহিনীর হেফাজতে ছিল।

এত ঝামেলার কারণে পরীক্ষার জন্য ভাল করে পড়া হয় নাই কারোই। না পড়লেও চোথা কাগজে পয়েন্ট লিখে নেওয়ার যে রেওয়াজ ছিল, সেই কাজ আমাকে দিয়ে একেবারেই হত না। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঘণ্টা খানেক আগে পরীক্ষার হলে গেলে যে আওয়াজ শোনা যেত, আগে থেকে না জানলে যে কেউ ভাববে, ওখানে মনে হয় কাঠমিস্ত্রীরা শিরিষ কাগজ দিয়ে কাঠ ঘষে মসৃণ করছে। আসল ব্যাপার ছিল ব্লেড দিয়ে ঘষে টেবিলের পুরনো লেখা পরিষ্কার করে নতুন নকল লেখার জন্য পরিষ্কার জায়গা তৈরি করা। নকল লেখা কিন্তু রীতিমত একটা বড় ধরনের শিল্পকর্ম। অন্ততঃ আমার কাছে তেমনই মনে হত।

পরীক্ষার খাতার এক দুই পেইজের সমান বেন্চের উপর অনেকগুলি প্রশ্নের উত্তর খুব ছোট অক্ষরে লাইন বেঁধে লিখে ফেলা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। সবার দ্বারা এই কাজ সম্ভব নয়। আমাকে দিয়ে তো কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। প্রথমতঃ আমার হাতের লেখা খুব খারাপ। নিজের লেখা অনেক সময় লেখার পর নিজেই পড়তে পারতাম না। তার উপর অত সুন্দর করে গুছিয়ে খুব ছোট করে লেখা আমার পক্ষে কোনো দিন সম্ভব নয়। তাই আমি সেই চেষ্টা কোনো দিন করি নাই। শুনেছি হলের এক ছেলে অন্য কর্ম নিয়ে এত ব্যস্ত থাকত যে তার নকল লেখার টাইম হত না। তাই পরীক্ষা শুরু হলে সে কুমিল্লা থেকে নকল লেখার জন্য লোক ভাড়া করে হলে এনে ভরণপোষন দিয়ে রাখত।

murad-hai-302

হলের বারান্দায় আমি ও এনু। – লেখক

যতটুকু পারতাম মুখস্থ করে চলে যেতাম। কিছু ভুলে গেলে শেষ ভরষা ছিল ‘বেবিফুড’ মানে ফজলু। ফজলুও আমার মত নকল লিখতে পারত না। কিন্তু ওর খুব বড় একটা গুণ ছিল, যা’ই পড়ত এ্কদম দাঁড়ি কমাসহ মুখস্থ থাকত। একটা অক্ষরও এদিক-ওদিক হত না। তাই আমরা ওর নাম দিয়েছিলাম বেবি ফুড।

পরীক্ষার ভিতর বাথরুমে যাওয়ার উছিলায় সিগারেট টানার জন্য বের হতাম। বাথরুমে গিয়ে এক সিগারেট অনেকে মিলে টানতাম। টেনে গরম করে সুখ টান দেয়ার জন্য হয়ত কেউ হাত বাড়িয়েছে, ঠিক তখুনি কুদ্দুস স্যার একেবারে বাথরুমের ভিতর এসে হাজির হয়ে যেতেন। স্যারের মুখের হাসি যেন আজীবন লেগেই থাকে। উনি রেগে গেলেও হাসে। মন ভাল থাকলেও হাসে।

সেদিনও হাসিমুখেই বলে, অইছে, আর সুক টান দেওন লাইগতো ন। এবার যান, হরীক্ষা শেষ করি আঙ্গোরে উদ্ধার করেন।

পরীক্ষা দিয়ে গেইটে নেমে লাইন ধরে সিঁড়ির উপর বসে সিগারেট ধরাই সবাই।

গিট্টু অর্ধেক বড়ি ধরিয়ে দিয়ে বলে, মেরে দে। তারপর চায়ে চুমুক দে।

দশ মিনিট পর অনুভব করতে থাকলাম মাথা কেমন শূন্য লাগা শুরু হয়েছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। কে যেন বলছে, চল হলে যাই। তাস খেলুম।

ঘোরের ভিতর কারো গায়ে হেলান দিয়ে এলোমেলো পায়ে হলের দিকে হাঁটা শুরু।

এনু বলছে, আইজ কিন্তু নিরবে খামু রাইতে। বহুৎ দিন মগজ ভুনা খাই না।

হলে ফিরে ৩১৬ তে আড্ডা জমে গেল। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। দিলীপ হেঁড়ে গলায় গান গাইতে শুরু করল। গিট্টু গলা মেলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। কেরুর জিন-এর তলানিতে পানি মিশিয়ে পরিমাণ বাড়ানো হল। জহির তার ভিতর সিগারেটের ছাই ঝাড়ল। ছাইতে নাকি নেশা বাড়ায়। হাতল ভাঙা চায়ের কাপ, ফাটা কাচের গ্লাসে ঢেলে সবার হাতে হাতে ধরিয়ে দিল জহির। পিন্টু চিরাচরিত গম্ভীর চেহারায় মোটা পুরু কাচের চশমা পরা চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে তাস বাটা শুরু করল।

মামু সিরিয়াস গলায় বলে, অই সবাই আগে বোর্ড ফালা তারপর কার্ড ধরবি।

তখুনি অনেক জোরে কিন্তু ভোঁতা একটা বিদ্ঘুটে আওয়াজ হল খুব কাছে কোথাও। একজন বলে, মেঘের আওয়াজ। আরেকজন বলে, “পলাশীর মোড়ে মনে হয় ট্রাক এক্সিডেট হইছে।” একটু পর হলের গেইটে পাগলা ঘণ্টি বাজা শুরু হল। চমকে গেলাম। হলের কারো কোনো বিপদ হয়েছে কোথাও। এটা তারই সিগনাল।

নেশা কেটে গেল। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। এক লাফে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমি খাটের নিচ থেকে হকিস্টিক বের করে গেইটের দিকে ভোঁ দৌড় দিলাম। গেইটে গিয়ে শুনি আরো খারাপ খবর। জগন্নাথ হলের টিভি রুমের ছাদ নাকি ধ্বসে পড়েছে। অনেক ছাত্র চাপা পড়েছে। শুনে মাথা খারাপ হয়ে গেল। দিলীপ পরীক্ষার পর তার হলে না গিয়ে আমাদের সাথে রয়ে গেলেও আমাদের অনেক বন্ধু আছে জগন্নাথে।

আমাদের কারো গায়ে জামা নাই। পায়ে স্যান্ডেল নাই। সে সব খেয়াল না করে দৌড়ে পৌঁছে গেলাম জগন্নাথ হলের গেইটে।

দৃশ্য দেখে কখন চোখ বেয়ে পানি ঝরতে শুরু করেছে টেরই পাই নাই। চারিদিকে মৃত্যুর গন্ধ। একটু আগে নেশায় মগ্ন ছিল সবাই। এখন নিজেদের ক্যাম্পাসের দুর্ঘটনায় ভলান্টিয়ার হয়ে রাস্তার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল করা শুরু করল। আহতদের টেনে বের করায় হাত দিল। রক্ত দেয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সারা রাত না খেয়ে না ঘুমিয়ে ডিউটি করে গেল টানা চব্বিশ ঘণ্টা।

পরের সপ্তাহে একটা ইন-কোর্স পরীক্ষা ছিল। জগন্নাথ হলের দুর্ঘটনার পর পড়াশুনা কিংবা পরীক্ষায় বসার মানসিকতা আমাদের কারোই ছিল না। কিন্তু স্যার তো আর পরীক্ষা পিছাবে না। হলে না গেলে নির্ঘাত ফেইল করিয়ে দিবে। সেটা তো মেনে নেয়া যায় না। তাই নোয়াখালীর স্বপইন্নার দলের শরণাপন্ন হতে হল। ওদের অনুরোধ করলাম যেন পরীক্ষার দিন যে কোনো উছিলায় যেন আধা দিবস হরতাল ডাকে। তাহলে স্যার আর পরীক্ষা নিতে পারবে না।

হরতাল ডাকা খুব সহজ ব্যাপার ছিল। কলা ভবনের মেইন গেইটের চাবি নিয়ে দরজায় একটা পোস্টার ঝুলিয়ে দিতে হয়। যাতে লেখা থাকবে অমুক নেতার মুক্তির দাবিতে আজ অর্ধ দিবস হরতাল।

ব্যস, কেউ আর তালা খোলার চেষ্টা করে না।

মাস শেষ। সবার হাত খালি। হলের গ্রুপের প্রায় সবাই মফস্বলের ছেলে। টাকা আসতে আরো দেরি হবে। ডাকপিয়ন মতিন ভাই এলে জিজ্ঞেস করার আগেই ওনার চেহারা দেখে বুঝে নিই কারো টাকা আসে নাই। গেইটের পাশের দোকানদার ইয়াসিন ভাই আর বাকি দিতে চাইছে না। হল ক্যাফেটেরিয়ার বাকির খাতাও ভরে গেছে।

আমিই শুধু ঢাকায় থাকি। দুই টাকার ভাড়ার দূরত্বে মগবাজার মোড়ে বাসা। মধুর ক্যান্টিনে পার্টির মিটিং ছিল। সবাইকে ওখানে রেখে দুই টাকা পকেটে নিয়ে রিকশায় উঠে মগবাজার যেতে বললাম।

একা না, এক রিকশায় সব সময় তিনজন করে চড়ি। একা চড়ি কি তিনজন চড়ি ভাড়া বেশি দেয়ার অভ্যাস নাই কারো। পারলে আট আনা কম দেই। সবাই মধু’র আড্ডায় মগ্ন। তাই আমি একাই বাসায় রওনা দিলাম টাকা আনতে। বাসার সামনে এসে রিকশা থামতে পকেটের শেষ সম্বল দুই টাকা বের করে হাতে দিয়ে নেমে হাঁটা দিলাম সিঁড়ির দিকে। রিকশাওয়ালা প্রায় তেড়েই এল আমার দিকে।

চিৎকার করে বলে উঠে, ইনুবারসিটি থেইকা আইছেন দেইখা কি ভারা কম দিবেন নাকি। ডরাই না। আরো আট আনা দেন।

বেটার কথার ভিতর কোনো অনুনয় ছিল না। বরং তাচ্ছিল্যের সুর যেন আমাকে আমার এলাকার বাইরে পেয়েছে বাগে। পকেটে আর একটা ফুটা পয়সাও ছিল না। সেজন্য মাথাব্যথা নাই। সকাল থেকে কিছু খাই নাই পয়সার অভাবে। তার উপর বেটার ভাব দেখে মেজাজ খিঁচড়ে গেল। ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত তুলে গলি দেখিয়ে চলে যেতে বললাম। সে এবার আরো উত্তেজিত হল।

murad-hai-303

মোহাম্মদ আলী স্যারের সাথে, সর্বডানে আমি। – লেখক

প্রায় উষ্মার স্বরেই বলে বসল, ওই দেলানে পরেন বইলা যেমুন হগ্গলের মাতা কিন্না ফালাইছেন। বিনা ভারায় রিসকায় চরবেন। আল্লায় বিচার করব আপনের।

আর সহ্য হল না। কখনো যা করি নাই সেটাই করে বসলাম। ঠাস চড় মেরে দিলাম। তারপর বাসায় ঢুকে গেলাম।

বাসায় আসি শুধু টাকার দরকার হলে। মাসের বরাদ্দ পাঁচশ’ টাকা। সে তো এক সপ্তাহেই শেষ হয়ে যায় বেহিসাবি খরচে। তারপর বই, খাতা, ক্যালকুলেটর, বার বার পরীক্ষার ফর্ম ফিল আপের বাহানায় আরো টাকা নেই। আমার অত্যাচারের চোটে বহুকাল আগে রিটায়ার্ড অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা আমার আওয়াজ শুনলেই ঘুমের ভান করে উলটা দিকে ফিরে শুয়ে থাকে। আমি এমন সময় হিসাব করে টাকার জন্য বাসায় যাই যেন বাসা পুরা খালি থাকে। তাহলে বাবাকে পটাতে সুবিধা হয় আমার। অথচ অন্য সময় যখন বাবা একা তাঁর চেয়ারে বসে একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে,আমরা কেউ ভুলেও বাবার আশেপাশে যাই না। যদি উনি দেখে ফেলে, তাহলে ডাক দেয়। শুনি নাই এমন ভাব করে কেটে পড়ি। আজ তো নিজের ঠেকা আছে। তাই সোজা বাবার রুমে ঢুকে বাবার পাশে বসে খোঁজ খবর নেই। নাস্তা খেয়েছেন কিনা জানতে চাই।

তারপর আস্তে করে বলি, বাবা টাকা লাগবে। হলের খাবারের টাকা বাকি পড়েছে। মাস শেষ।

অসহায়ের মত অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে বাবা। তারপর বালিশের তলা থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা দেয়। মনে হল যেন আগে থেকেই জানত আজ আমি আসব। তাই টাকা রেডি করে রেখেছে। নির্দয়ের মত টাকাগুলি পকেটে ভরে বের হয়ে যাই।

বাসার সামনে কীসের যেন শোরগোল শোনা যাচ্ছে। অনেক মানুষের গলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। বাবার রুম বাসার একদম পিছনে। সামনের দিকে বারান্দা। সেখানে দাঁড়ালে গলির মুখ দেখা যায়। বারান্দার দিকে এগুতেই আমার ছোট বোন ভীত চেহারা নিয়ে আমার দিকে দৌঁড়ে এল।

বলে, দাদা আপনে কি কাউকে মেরেছেন নাকি! অনেক রিকশাওয়ালা এসেছে। আমাদের বাসার দিকে তাকিয়ে কাকে যেন বের করে দিতে বলছে।

উঁকি মেরে চেয়ে দেখি আমার সেই রিকশাওয়ালা। সাথে আরো অনেকে গলির মুখে জড়ো হয়েছে। হুমকি ধমকি দিচ্ছে। আমাকে বের হতে বলছে। কেটে ফেলবে। মেরে ফেলবে বলছে।

বুঝলাম, কেইস খারাপ হয়ে গেছে। এখন বের হলে নির্ঘাত বিপদ হবে। আমাদের বাসার ফোন বাবার ঘরে। তালামারা থাকে। ব্যবহার করার উপায় নাই। উপায় থাকলেও বাবার সামনে কাউকে কিছু বলা যাবে না। তাই পাশের ফ্ল্যাটে গেলাম। দরজায় বেল টিপলাম। খুলছিল না। এবার ঘুষি মারা শুরু করলাম দরজায়। কাজ হল। দরজা খুলে দিল বিরক্ত চেহারা নিয়ে প্রতিবেশী ভদ্রলোক, যিনি আমাকে মোটেও পছন্দ করেন না। কিন্তু মুখে সেই কথা বলেন না। চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাতে আমি শুধু মুখে বললাম, ফোন ব্যবহার করতে হবে, খুব জরুরি। তারপর আর অনুমতির অপেক্ষা না করে টেবিলের উপর রাখা কালো রঙের ফোনের রিসিভার কানে সংখ্যায় আঙুল ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডায়াল করলাম রহমতের বাসায়।

ভাগ্য ভাল, তাকে বাসায় পেয়ে গেলাম।

সে বলে, আমি এখুনি ক্যাম্পাসে রওনা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ কী দরকার হল যে ফোন করেছিস?

ওকে ফোনে পেয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার বিপদের কথা জানালাম। তারপর বললাম যেন তাড়াতাড়ি মধু’র ক্যান্টিনে গিয়ে সবাইকে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। রহমত তখন একটা মোপেড (Type of motorcycle) চালাতো। সেটা চালিয়ে সে লালবাগ থেকে মধুতে পৌঁছে আমার বিপদের কথা জানালো বন্ধুদেরকে। অল্প কিছুক্ষণের ভিতর বেশ কয়টা মোটর সাইকেল এসে হাজির হল আমাদের বাসার গলিতে। ওদের সাথে ভিড়ের ভিতর মিশে আমি হাওয়া হয়ে গেলাম।

জানি, মনে হবে আমি খুব অন্যায় করেছি সেদিন রিকশাওয়ালাকে মেরে। হয়ত সেই সময় আমার ভিতর স্বাভাবিক মনুষ্যত্ববোধ কাজ করে নাই টগবগে যুবক বয়সের উন্মাদনার কারণে। সেই অপরাধের কথা মনে করে আমি এখনো অনুশোচনায় ভুগি। শুধু তাই নয়। পরিচিতজনদের বলি, কেউ যেন রিকশাওয়ালাদের না ঠকায়। ওরা আসলেই গতরের শক্তিতে বৈরি আবহাওয়ায় গরমে সেদ্ধ হয়ে মানুষ নামের বোঝা টেনে নিজেদের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করে। আমার অনেক শ্রদ্ধা, ভালবাসা এমন খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য। নিজে যখন খেটে খেতে শিখেছি, তখন জেনেছি আমি কাউকে সম্মান না দিলে, নিজেও কারো কাছ থেকে সম্মান পাওয়ার আশা করা উচিৎ নয়।

murad-hai-304

কলাভবনের গেটে।

রোজার জন্য ভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেলেও আমরা কেউ হল ছেড়ে যেতাম না। সেই সময়ে নিজের বাসাবাড়ি নয়, হলের চিলেকোঠাকে মনে হত স্বর্গ। ভাই বোন আত্মীয় স্বজন নয়, হলের বন্ধুদের মনে হত সব চাইতে আপন জন। হল ক্যাফেটেরিয়ার ডালের পানি, মুরগির ডানা যাকে আমরা বলতাম ‘হেলিকপ্টার’ প্রতিদিন খেতে একটুও খারাপ লাগত না। হল গেটের পাশে টং দোকানের মাছিবসা বনরুটি, কলা, কেরুর খালি বোতলে মান্নানের দোকানের চা অমৃতের মত লাগত।

ঈদ যত এগিয়ে আসত এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট তত জমজমাট হত। প্রায় সারা রাত সব দোকানপাট খোলা রাখত মালিকেরা। পকেটমার, হাইজ্যাকারদের উৎপাত বাড়ত তখন। শুনেছি, হলের ছেলেদের রুমে গেস্ট হিসাবে থাকা অনেক মানুষ এসব অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল। মাঝে মাঝে আমরা দল বেঁধে রাতের বেলায় ঘুরতে বের হতাম। শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বলাকা, নিউমার্কেট হয়ে নীলখেতে ভাত খেয়ে হলে ফিরতাম। আহা, কী সুখের সব দিন ছিল।

আমার রুম মেইট ডালিম খুলনা থেকে আসা। স্মার্ট এবং শার্প ছেলে। কিন্তু খুব রগচটা টাইপ ছিল। হলের সব টয়লেটের পানির ফ্লাশ সব সময় নষ্ট থাকত। তার উপর টয়লেটের ভিতর কোনো পানির কল ছিল না। যে যার বদনায় পানি ভরে টয়লেটে যেতে হত। এক বদনা পানিতে পরিষ্কারের কাজ শেষ হত না। অনেক ছেলে আলসেমি করে দ্বিতীয়বার পানি নিয়ে তার ময়লা পরিষ্কার না করে চলে যেত নির্বিকারভাবে। এটা একটা মাথাব্যথা ছিল সবার। ডালিম মাঝে মাঝে গোয়েন্দাগিরি করত। ধরে ফেলত কেউ কুকর্ম করে চলে যেতে লাগলে। ওর কাণ্ড দেখে হেসে খুন হতাম আমরা। সে পারলে অপরাধীকে ধরে মলমূত্র খাইয়ে দেয় আর কি! ধরা পড়া ছাত্র এমন শিক্ষা পেত যে জীবনে আর ভুল করত না।

সেই সময় ডাকসু’র সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দীন বাবলু ভাইও আমাদের ব্লকে থাকত। আরো থাকত এরশাদের আমলে ট্রাক চাপায় খুন হওয়া সেলিম ভাই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সচিব আব্দুস সোবহান গোলাপ ভাই। এরাসহ আমরা কেউই এক দলের সমর্থক ছিলাম না। প্রায় সবাই ভিন্ন ভিন্ন দলের সমর্থক। অথচ সবাই পাশাপাশি রুমে থাকতাম আপন ভাইয়ের মত। ছোট বড় সবাই সবার সামনে সিগারেট টানত অনুমতি নিয়ে। কিন্তু বড়দের সম্মান করতাম গুরুর মত।

বাবলুভাই আসতে যেতে পথে যতবার দেখা হত,প্রতিবার বলত, ভাল আছো তো? সুপার জেন্টেলম্যান ছিলেন উনি। অন্য সব দল করেও আমরা সবাই ডাকসু নির্বাচনে বাবলু ভাইকেই ভোট দিয়েছিলাম। সেই মানুষ যখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় রাতের অন্ধকারে আমাদের সবাইকে পুলিশের গুলির সামনে রেখে আর্মির গাড়িতে চড়ে পালিয়ে গেলেন এই খবর আমাদের সবার কাছে শুধু অবিশ্বাস্য ছিল না, বরং হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়ে গেছিল আমাদের সবার। বিদেশে এসে সবার মুখে এই কথাটা খুব শুনি, শিট হ্যাপেনস। এখন বুঝি কেন এই কথা বলে ওরা। বেশি বিশ্বাসের জায়গাতেই বিশ্বাস ভঙ্গ হয় বেশি। এখন আর এমন খবরে আশ্চর্য হই না মোটেও।

মারামারি লেগে রক্তারক্তি হলে সরকার অনির্দিষ্ট কালের জন্য ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দিত। তাতে সমস্যা ছিল না। কিন্তু যখন হল ছাড়তে বলত, মনে হত যেন কেউ আমাকে আমার ঘর থেকে জোর করে উচ্ছেদ করে দিচ্ছে। ঢাকার বাইরের বন্ধুদের তাদের বাড়িতে চলে যেতে হত। আমাকে মগবাজারে ফিরে যেতে হত। একদম ভাল লাগত না বাসায় থাকতে। মনে হত যেন আমাকে চৌদ্দ শিকের ভিতর আটকে রাখা হয়েছে। দম বন্ধ লাগত। পাগল হয়ে যেতাম হলে ফিরে আসার জন্য। এত প্রেম জীবনে আর কোনো কিছুর জন্য আসে নাই। মাস্টার্স-এর ক্লাস শেষ হলে যে দিন চিরদিনের জন্য হল ছেড়ে বাসায় চলে গেলাম—মনে হয়েছিল যেন আমার হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। এত দুঃখ জীবনে আর কিছুতে পাই নাই যা পেয়েছি আমার প্রিয় সূর্যসেন হল ছেড়ে চলে আসার সময়।

মধুর ক্যান্টিন।

মধুর ক্যান্টিন।

তারপর জীবনের অনেক কতগুলি বছর কেটে গেছে। অনেক বলিরেখা পড়েছে কপালে। চুল পেকে ঝরেও গেছে। দেখা হয়েছে পৃথিবীর অনেক ঐশ্বর্য। কিন্তু জানেন, কোনো কিছুর সাথে তুলনা খুঁজে পাই নাই আমার গুরুগৃহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের—পাই নাই সেই অপরিসীম সুখ যা পেয়েছি আমার প্রিয় রুম ৩১৬ তে।

এখনো জাবর কাটি সূর্যসেন হলের মধুর স্মৃতি রোমন্থন করে। সেই স্মৃতি আসলে কোনো দিন অম্লান হবে না আমার হৃদয়ে। আর সেজন্যই গল্পের ছলে বন্ধুদের বলেও বেড়াই—ইস, যদি আমার জীবনের সব কিছুর বিনিময়ে আরেকবার ফিরে পেতাম সেই জীবন, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় লুফে নিতাম দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে। একই আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে আমার সেই সময়ে সখ্য হওয়া, এখনো অটুট থাকা সব বন্ধুদের।

নিউইয়র্ক, ৭ আগস্ট, ২০১৬

পড়ুন: সাম্প্রতিক ডটকমে মুরাদ হাই এর আরো লেখা

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।