page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

আসবে কি আপনার ‘সেইদিন’, ও লেখক, শিল্পী মহাশয়?

নাসিম তালেব পেশাকে দুইভাবে ভাগ করেছেন। কিছু পেশা আছে যেগুলো নন-স্কেলেবল। যেমন, একজন ডেন্টিস্ট বা কনসালটেন্ট ঘণ্টা হিসাবে যদি টাকা নেন, তাহলে দিনে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টাই বরাদ্দ থাকে তার জন্য।

ধরা যাক, ৮ ঘণ্টা তিনি কাজ করেন এবং ঘণ্টায় ২ হাজার করে চার্জ করেন। তাহলে তার আয় হবে নির্দিষ্ট। যত ঘণ্টাই কাজ করুন না কেন তার জন্য বরাদ্দ থাকবে দৈনিক চব্বিশ ঘণ্টা।

nasim-taleb-2

নাসিম তালেব (জন্ম. লেবানন ১৯৬০)

একইভাবে কেউ যদি একটা রেস্টুরেন্ট খুলে, কিংবা তালেব প্রস্টিটিউটের উদাহরণ দিয়েও বলেছেন; এই ধরনের পেশায় কোনো এক দিনের আয় এত বেশি হবে না যে ঐ ব্যক্তির গত জীবনের আয়ের চাইতে বেশি হয়ে যাবে। এইসব পেশার ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতে হয় এবং সিদ্ধান্তের কোয়ালিটির চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে নিয়মিত তার পরিশ্রম।

আবার আরেক ধরনের পেশা আছে যেগুলো তালেবের মতে স্কেলেবল। এগুলোর ক্ষেত্রে হঠাৎ করে আয় মারাত্মকভাবে বেশি হবার সম্ভাবনা থাকে, এবং একই পেশার বেশিরভাগ লোকের চাইতে বহু বহু গুণ ছাড়িয়ে যায়। যেমন, জে কে রাউলিং ‘হ্যারি পটার’ লিখেছেন। তিনি যখন লিখেছিলেন প্রথম, সে রকম আরো হাজারো লেখকেরা লিখেছে বা এখনো লিখছে। জে কে রাউলিং-এর লেখাও অনেক পাবলিশার রিজেক্ট করে দিয়েছিলেন। দ্য নিউইয়র্কারই দিনে প্রায় একশত পাণ্ডুলিপি রিজেক্ট করে, এর মধ্যে হয়ত অনেক জিনিয়াসও থাকেন। মোটকথা লেখকদের জন্য প্রকাশিত হওয়া খুব সহজ না। (বাংলাদেশের প্রকাশনী থেকে নয়। পৃথিবীর বড় প্রকাশনীদের কথা বলছি।)

কিন্তু জে কে রাউলিং সফলতা পেয়ে গেছেন ‘হ্যারি পটারে’র মাধ্যমে। এখন তাকে বারবার ‘হ্যারি পটার’ সিরিজের প্রত্যেকটা বই লিখতে হয় না। বইগুলো প্রিন্ট রিপ্রিন্ট হচ্ছে। তার আয়ের পরিমাণ পৃথিবীর হাজারো সাধারণ লেখকের চাইতে অনেক অনেক বেশি। স্ট্রাগলিং লেখকেরা যেখানে জীবন-যাপন করার মত টাকা আয় করতে পারছেন না সেখানে রাউলিং ফোর্বসের ধনীদের তালিকায় উঠে গিয়েছিলেন।muradul-islam-logo

একই কথা অভিনেতা-শিল্পীদের ক্ষেত্রেও। সে পেশাগুলোও স্কেলেবল।

এই ধরনের পেশা আপনার জন্য তখনই ভালো যখন আপনি সফল হবেন।

মানুষের জন্ম প্রক্রিয়ার মত এটা। ডিম্বানুর দিকে যখন শুক্রানুরা ছুটে যায় তখন একটাই আগে পৌঁছায় এবং ডিম্বানুকে নিষিক্ত করতে পারে। যা পরে মানুষ হয় এবং পুনরুৎপাদনে নিয়োজিত হয়। কিন্তু বাকি অসংখ্য শুক্রাণু নাই হয়ে যায় পৃথিবীর ইতিহাস থেকে। একেবারে নাই।

 

স্কেলেবল পেশার ক্ষেত্রেও অসফলেরা এ রকম নাই হয়ে যান বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।

এ ব্যাপারে আরেকটু গভীরে যাওয়ার জন্য একটি থট এক্সপেরিমেন্ট তথা চিন্তা পরীক্ষার অবতারনা করেছেন নাসিম তালেব। পরীক্ষাটা এরকম:
ধরেন একটা বিরাট বড় স্টেডিয়াম। সেখানে আপনি র‍্যানডমলি নিয়ে এক হাজার লোককে দাঁড় করালেন। আর পৃথিবীর সব চাইতে ওজনওয়ালা লোককে দাঁড় করালেন অন্যপাশে। এখন আপনার স্টেডিয়ামের একশো লোকের ওজনের চাইতে পৃথিবীর সবচেয়ে ওজনদার লোকটির ওজন কি বেশি হবে?

অবশ্যই না।

এক হাজার লোকের ওজনের তুলনায় তার ওজন হবে নগণ্য।

অথবা একজন মানুষ বাৎসরিক ক্যালরি নিতে পারে প্রায় আট হাজারের কাছাকাছি। বছরের কোনোদিনই এই আট হাজারে অর্ধাংশ ক্যালরি সে নিতে পারবে না। এমনকি আপনি যদি চান ইচ্ছে করে একদিন ক্যালরি নিয়ে আট হাজারের অর্ধাংশ বা কাছাকাছি চলে যাবেন, সম্ভব না।

এই ধরনের অবস্থার নাম তালেব দিয়েছেন মেডিওক্রিস্তান।

আবার চিন্তা করেন, স্টেডিয়ামে এক হাজার লোক র‍্যানডমলি নিয়ে দাঁড় করালেন। অন্য পাশে রাখলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী লোককে, ধরেন বিল গেটসকে। এখন যদি ঐ এক হাজার জনের বাৎসরিক আয়ের সাথে বিল গেটসের আয়ের তুলনা করেন তাহলে কী দাঁড়াবে ব্যাপারটা? বিল গেটসের আয় ঐ এক হাজার জনের আয়কে ছাড়িয়ে যাবে বহুগুণে।

দেখা যাবে এই এক হাজার এক জনের মধ্যে প্রায় নিরান্নব্বই দশমিক নয় ভাগ সম্পদের মালিক একজন! তিনি বিল গেটস।

একই ভাবে যদি এক হাজার জন সাধারণ লেখক নেন আর তার বিপরীতে জে কে রাউলিংকে রাখেন, তাহলে দেখবেন রাউলিং-এর বই বিক্রির তুলনায়, এদের সবার বই বিক্রির পরিমাণ খুব নগণ্য।

এই ধরনের অবস্থা হল এক্সট্রিমিস্তান।

উপরে পেশার ক্ষেত্রে যেগুলোকে বলা হয়েছে নন-স্কেলেবল পেশা, যেমন কনসালট্যান্ট, ডেন্টিস্ট, কোনো চাকরি ইত্যাদি এগুলো মেডিওক্রিস্তানের অন্তভুর্ক্ত।

আর যেসব পেশা স্কেলেবল (ঘণ্টা হিসাবে আয় নির্ভর করে না) যেমন, লেখক, শিল্পী ইত্যাদি; এরা এক্সট্রিমিস্তানের অংশ।

van-gauge1

অপেক্ষা—ভ্যান গগের এই চিত্রের মত কী? – লেখক

এক্সট্রিমিস্তান পেশার ক্ষেত্রে ভাগ্য গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক অনেক চিত্র পাওয়া যাবে যেখানে কোনো শিল্পী তার জীবদ্দশায় ছবি বিক্রি করতে সাফল্য পান নি। ভ্যান গগ তার জীবদ্দশায় একটা মাত্র ছবি বিক্রি করতে পেরেছিলেন।

অনেক লেখকের বই বিক্রি হয় নি, মানুষ এবং সমাজ তাদের অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য করেছে। এ রকম কবিদের জন্য ফেন্চ শব্দ পয়েত মুদি (poetes maudit)। অ্যাডগার অ্যালান পো, আর্তুর র‍্যাবো—এদের পরবর্তীতে রীতিমত পূজা করেছে মানুষ ও সমাজ।

এমনও লেখক-চিন্তকদের পাওয়া যায় যাদের লেখা মৃত্যুর অনেক অনেক পরে এসেছে আলোচনায়। যেমন, সোরেন কির্কেগার্ড, ফ্রানৎস কাফকা।

এক্সট্রিমিস্তানের প্রকৃতিই এমন, এখানে ভাগ্য একটা বড় ফ্যাক্টর। এক্সট্রিমিস্তান হল উইনার টেইকস অল মার্কেট। এখানে যে সফল হতে পারে সেই সমস্ত পায়। এবং এই সাফল্য হঠাৎ করে চলে আসতে পারে আবার কখনো নাও আসতে পারে। এক্সট্রিমিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পেশা যারা বেছে নেন, তারা সবাই মনে মনে বিশ্বাস রাখেন একদিন তাদের সেই দিন আসবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশির ভাগের ক্ষেত্রে সেইদিন আসে না।

এক্সট্রিমিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পেশা নেয়া একজন লোক যে সমাজে বাস করেন সেখানে বেশির ভাগ লোকই মেডিওক্রিস্তান পেশার। তিনি হয়ত একজন বিজ্ঞানী, শিল্পী কিংবা লেখক। তিনি অনবরত হয়ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন একটা মাস্টারপিস লিখতে। তিনি এমন কাজ করছেন যা ধারাবাহিকভাবে কিংবা রাতারাতি কোনো ফল এনে দেয় না। অন্যদিকে তারই আত্মীয়, ভাই, বন্ধুরা তাদের কাজে হাতে হাতে ফল পেয়ে যাচ্ছে।

steaphen-king-23

বিত্তশালী খ্যাতিমান লেখক স্টিফেন কিং, বাড়ির গেইটে।

এমন পরিস্থিতিতে তিনি সমাজের চোখে, তার আত্মীয় পরিজনের চোখে ব্যর্থ হিসেবে পরিগণিত হন। যে সমাজ হাতে হাতে ফল প্রত্যাশী তার তীব্র আঘাতে তিনি জর্জরিত হন।

তবুও দীর্ঘদিন কোনো ভালো ফল না পেয়েও তিনি হয়ত পরিশ্রম করে যান, এই ভেবে যে তিনি মহান কিছু করছেন। এবং একদিন আসবে সেইদিন। কিন্তু এক্সট্রিমিস্তানের নিয়মই এই, বেশির ভাগের ক্ষেত্রে সেই দিন আর আসে না।

About Author

মুরাদুল ইসলাম
মুরাদুল ইসলাম

জন্ম. জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট। প্রকাশিত বই 'মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী', 'গ্যাডফ্লাই', 'কাফকা ক্লাব', 'রাধারমন এবং কিছু বিভ্রান্তি' ইত্যাদি। ওয়েবসাইট: muradulislam.me