page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

ইমেলদা মার্কোসের চলচ্চিত্র উৎসব ও পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন

১৯৭৫ সালের ডিসেম্বার মাসে কসমোপলিটান ম্যাগাজিন ফিলিপিনের ফার্স্ট লেডি ইমেলদা মার্কোসকে পৃথিবীর সবচাইতে ধনী দশজন নারীর একজন হিসাবে ঘোষণা দেয়। তারা এও বলে যে, সম্ভবতঃ তিনি সেই মুহূর্তে গ্রেট ব্রিটেনের রানি, অর্থাৎ দ্বিতীয় এলিজাবেথের চাইতেও বেশি সম্পদশালী এবং হয়তো তিনিই ওই তালিকায় এক নাম্বারে আছেন।

সবাই জানত ইমেলদা ধনী। তিনি নিজেও ব্যাপারটা গোপন রাখতেন না। তার দামি জিনিসের প্রতি আসক্তি ছিল অতিমাত্রায়, তিনি সেসবের লজ্জাহীন প্রদর্শনেও পিছপা হতেন না একটুও। (ফিলিপিনো সরকার যখন তাকে শেষমেশ গ্রেপ্তার করে, তখন তার কাছ থেকে প্রায় ১২০০ জোড়া জুতা বাজেয়াপ্ত করা হয়।) কারো অবশ্য ধারণা ছিল না তিনি কোথা থেকে এত টাকা পাচ্ছেন এমন যথেচ্ছ হুটহাট খরচের জন্য। একে তিনি কোনো চাকরি করেন না, দ্বিতীয়তঃ তার কোনো নিজস্ব সম্পত্তিও নাই। তার উপরে, তার স্বামী, একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোসের বার্ষিক আয় ১০ বছর যাবৎ আটকে আছে মাত্র ৫ হাজার ইউ-এস-ডলারের মধ্যেই।

তাতে অবশ্য ইমেলদার কিছু যায় আসে নাই কোনোদিন। ১৯৭৪ সালে একদিন হনলুলুতে শপিং করতে গিয়ে এক ধাক্কায় তিনি ৪০,০০০ ইউ-এস-ডলার উড়িয়ে দিলেন। একটা জামাও অবশ্য গায়ে লাগিয়ে দেখেন নাই তিনি।

imelda8t9

ফিলিপিনো ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ইমেলদা মার্কোস।

আরেকবার তিনি এবং তার এক দঙ্গল বন্ধু নিউ ইয়র্কের ব্লুমিংডেইল’সে গিয়ে সব লোকজন বের করে দিয়ে দোকানপাট সব বন্ধ করে শুধু তাদেরকেই সবকিছু স্পেশালভাবে দেখানোর আবদার জুড়ে দেন এবং পুরো স্টোরে দাপাদাপি শুরু করে যাই পছন্দ হয়, তার দিকেই আঙুল তুলে বলা শুরু করেন, “আমার, আমার, আমার!”

নিউ ইয়র্কের শপিং মলগুলিতে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘The “Mine” Girl’ নামে। টাকা নিয়ে মাথাব্যথা না থাকলেও দরাদরি করতে ভালোবাসতেন খুব। তার মাছের বাজারের মত দরাদরির স্বভাব দেখে পাথরের দোকানের মালিকরা ইমেলদা আসার খবর পেলেই তড়িঘড়ি সবকিছুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে বাড়িয়ে রাখতেন। পরে তিনি দরাদরি শুরু করলে তাকে স্পেশাল কাস্টমার হিসাবে ১৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হতো।

অসংযমী আচরণ এবং জনগণের টাকায় নিজের মাত্রাতিরিক্ত শখ ও আহলাদ পূরণের বিরুদ্ধে করা কঠোর সমালোচনাকে থোড়াই কেয়ার করতেন ইমেলদা। সরকারি ঋণ নিয়ে তিনি এমন এমন হাই প্রোফাইল প্রজেক্ট শুরু করতেন যেসবে ফিলিপিনোদের দারিদ্র দূর বা লাভ হওয়া দূরে থাক, তাদের পড়তে হতো নতুন নতুন সব সমস্যায়। এমনই এক প্রজেক্টের সমালোচনার জবাবে ইমেলদা একবার বলেছিলেন, ওদের (গরীব জনগণের) জীবনে আমিই একমাত্র আশার আলো, আমিই ওদের শেখাচ্ছি কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়!

imelda1

ইমেলদা মার্কোস, জন্ম. ১/৭/১৯২৯।

১৯৮১ সালের মধ্যে তিনি পরিণত হন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে, তার সকাল এক দেশে কাটে তো বিকাল কাটে অন্য দেশে, সকালে এক সেলেব্রিটির সাথে নাস্তা করেন তো রাতে ডিনার সারেন বারমেসে ট্যানড আমেরিকান অভিনেতা জর্জ হ্যামিল্টনের সাথে।

১৯৭৪ সালে মিস ইউনিভার্স পেজ্যান্টের জন্য ফিলিপিনের জায়গা নিশ্চিত করে তার হঠাৎ মনে হলো, এখন তাকে অতি দ্রুত ১০,০০০ সিটের একটা ফোক-আর্ট সেন্টার বানাতে হবে। সেই ভূত মাথা থেকে নামতে না নামতে তিনি তার ‘এডিফিস কমপ্লেক্স’ থেকে বানিয়ে ফেললেন ১৪টা লাক্সারি হোটেল, একটা মাল্টিমিলিয়ন ডলারের পুষ্টি ভবন, একটা সম্মেলন কেন্দ্র, একটা হার্ট সেন্টার এবং সর্বশেষে, ১৯৮১ সালে—তার বিখ্যাত ম্যানিলা ফিল্ম সেন্টার।

ইমেলদা চাইছিলেন ম্যানিলাকে ‘কান’-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দাঁড় করিয়ে পৃথিবীর চলচ্চিত্র রাজধানী হিসাবে নাম কামাবেন। ২৫ মিলিয়ন ইউ-এস-ডলারের বাজেট নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের নামে ম্যানিলা ফিল্ম সেন্টার বানানোর একটা প্ল্যানও দাঁড় করিয়ে ফেললেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের তারিখ ধার্য হলো ১৮ জানুয়ারি ১৯৮২। পুরো প্রজেক্টটিই ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং অতি আড়ম্বরপূর্ণ। ম্যানিলা বে’তে তিনি যেই ভবনটি চাইছিলেন, তা যেন হুবহু পার্থেননের মত দেখতে হয় তা নিয়েও তিনি উতলা ছিলেন খুব।

imelda-43

ইমেলদা ও ফার্দিনান্দ।

এদিকে একটা না একটা ঝামেলা চলতেই থাকল ফিল্ম সেন্টারে। ডেডলাইন কাছে এগিয়ে আসছে, সময়মত অনুষ্ঠান শুরু করতে তার দরকার ৪,০০০ শ্রমিক, যারা কাজ করবেন তিন শিফটে, ঘড়ির কাঁটা ধরে ধরে।

সেদিন নভেম্বরের ১৭ তারিখ, রাত তিনটা। বিল্ডিং-এর স্ক্যাফোল্ডিং ভেঙে পুরো ভবন ধ্বসে পড়লো সমস্ত শ্রমিকদের গায়ের উপর। ভেজা সিমেন্টে ডুবে গেলেন যারা কাজ করছিলেন তাদের সবাই। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শ্রমিকদের শরীর তখনো গেঁথে ছিলো ভেঙে পড়া বিল্ডিং-এর স্টিল বারে।

ইমেলদাকে খবর দেওয়া হয় সাথে সাথে। জানানো হয়, সমস্ত লাশ সরাতে সময় লাগবে প্রচুর! সময়, যা একদমই হাতে নেই তার। তিনি সময় ক্ষেপণ করতেও রাজি নন এতটুকু। ইমেলদা জানালেন, নির্মাণকাজ থামানো যাবে না, আগে যেভাবে চলছিল সেভাবেই চলবে সবকিছু; আর যা লাশ আছে, তা—১৬৯ জনের লাশ তো হবেই, তার উপরেই কংক্রিট ঢেলে কাজ চলবে।

manila-film-2

ম্যানিলা ফিল্ম সেন্টার

imedlda-201

ম্যানিলার মাকাটিতে তার অ্যাপার্টমেন্টে ইমেলদা মার্কোস, ২০১৪

অনেকে ধারণা করেন, যারা ভেজা সিমেন্টের উপর স্টিল বার সমেত পড়ে গিয়েছিলেন, তখনো বেঁচে ছিলেন তারা, তাদের জীবন্ত কবর দিয়েই এগিয়ে চলছিল ম্যানিলা ফিল্ম সেন্টারের কাজ। অযথা কুসংস্কার ঠেকাতে ও মৃতদের অতৃপ্ত আত্মাদের তুষ্ট করতে তিনি অবশ্য ওঝা ডেকে ভবনটি ঝাড়ফুঁক করান।

পুরো গল্পটা কেউই কোনোদিন জানতে পারে নি। সাংবাদিক, মিডিয়া, উদ্ধারকর্মী এবং অ্যামবুলেন্স দলের কাউকেই ঘটনার নয় ঘণ্টা পর্যন্ত এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হয় নি। এরমধ্যে সরকারি দল সামরিক আইন জারি করে ঘটনা ধামা চাপা দিয়ে, সমস্ত সাক্ষীদের চুপ করিয়ে, সমস্ত খবর সেন্সর করিয়ে নিজেদের মনমত পুরো ঘটনার একটি অফিসিয়াল ভার্শন বানিয়ে ফেলে।

সবকিছুর পরেও পূর্ব নির্ধারিত দিনে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ইমেলদার চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ব্রুক শিল্ড, ফ্রাঙ্কো নিরো, বেন কিংসলি এবং রবার্ট ডুভাল। অনুষ্ঠানের প্রথম চলচ্চিত্র ছিলো ‘গান্ধী’। দর্শকরা অবশ্য টের পান নি তারা মৃত শ্রমিকদের সমাধির উপর বসেই গান্ধীর জীবন দেখছিলেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন ইমেলদা পরেছিলেন জো সালযারের ডিজাইন করা কালো ও পান্না সবুজ রঙের টেরনো (ফিলিপিনোদের ঐতিহ্যবাহী লম্বা জামা)। জামার গলায় সেলাই করা ছিলো শত শত ময়ূরের পাখা, স্কার্টে বসানো ছিলো হীরা ও বিভিন্ন রঙের দামি পাথর।

এরপরের বছর অবশ্য অ্যাক্সিডেন্ট কেলেঙ্কারির কারণে উৎসবের তহবিলের ৫ মিলিয়ন ইউ-এস-ডলার আটকে দেয় ফিলিপিনো সরকার। ইমেলদার খরচের ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। কিন্তু অনুষ্ঠান চালানোর জন্য টাকা লাগবেই, আর তাই খরচ জোগাতে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে হলভর্তি দর্শককে পর্নোগ্রাফি ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করেন ইমেলদা মার্কোস।

বলাই বাহুল্য, সেটাই ছিলো তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানের আয়োজন।

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।