কিছুদিন অাগে তোলা উঁচু উঁচু গাছে ঘেরা ঘন অরণ্যের কিছু ছবিতে ফুটে উঠেছে গাছেদের ডালপালা ও পাতা দিয়ে সৃষ্টি হওয়া দুর্দান্ত কিছু নকশা।

ভূমি থেকে আকাশের দিকে তাক করে তোলা ছবিগুলি দেখলে মনে হয় যেন একেবেঁকে ছড়িয়ে যাওয়া কোনো নদী। প্রাকৃতিক এই ঘটনার নাম ‘ক্রাউন শাইনেস’।

গাছেদের এই ‘লজ্জা’ বিজ্ঞানীরা প্রথম খেয়াল করেন ১৯২০ সালে। তারপর থেকেই তারা এমনটি ঘটার যথার্থ কারণ খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে এখনও নিশ্চিত কোনো একটা জায়গায় পৌঁছায়নি তাদের গবেষণা।

ভূমি থেকে আকাশের দিকে তাক করে তোলা ছবিগুলি দেখলে মনে হয় যেন একেবেঁকে ছড়িয়ে যাওয়া কোনো নদী

ক্রাউন শাইনেস কেবলমাত্র পূর্ণবয়ষ্ক এবং বিশেষ কয়েক প্রজাতির গাছের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। এই ঘটনায় গাছগুলির উপরিভাগ কেউ কাকে স্পর্শ না করে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বেড়ে ওঠে। ‘ক্রাউন শাইনেস’ এর ফলে ঘন অরণ্যে পাশাপাশি থাকা গাছগুলির উপরিভাগে একটা শিরা উপশিরার মতো বিস্তৃত রেখার সৃষ্টি হয়। আর এর ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে বলে নিচ থেকে দেখলে মনে হয় যেন সেগুলি নদীপথ।

এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সাধারণত একই প্রজাতির গাছেদের মধ্যে ঘটে থাকে। তবে ভিন্ন প্রজাতির গাছেদের মধ্যেও এই ঘটনার কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে।

ধারণা করা হয়, সবচেয়ে উঁচুতে থাকা ডালপালাগুলির পরস্পর ঘর্ষণের কারণেই এমনটা ঘটে থাকে। বাতাসপ্রবণ এলাকার গাছগুলি পরস্পর ঘর্ষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। আর একারণেই হয়ত প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই ক্রাউন শাইনেসের উৎপত্তি।

অস্ট্রেলিয়ান বন কর্মকর্তা এম আর জ্যাকবস্‌ ইউক্যালিপটাস গাছের ক্রাউন শাইনেস নকশা নিয়ে বহুদিন কাজ করছেন। ১৯৫৫ সালে তিনি ‘গ্রোথ হ্যাবিটস অফ দ্য ইউক্যালিপটাস’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তার মতে, বাড়ন্ত ইউক্যালিপটাসের ডালপালা ও পাতা ঘর্ষণে স্পর্শকাতর থাকে। আর এর ফলেই এমন ক্রাউন শাইনেসের সৃষ্টি হয়।

১৯৮৬ সালে এ বিষয়ে আরেক গবেষণার ফল প্রকাশ করেন ড. মিগুয়েল ফ্রাংকো। তিনি বলেন, Picea sitchensis এবং Larix kaempferi প্রজাতির গাছ ঘর্ষণের ফলে প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি এর ফলে অনেক ডাল মরেও যায়। ‘ফিলোসফিকাল ট্রানজেকশন অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি’ জার্নালে প্রকাশিত তার গবেষণাটিতে ড. ফ্রাংকো বলেন, “প্রতিবেশি গাছের অস্তিত্ব খেয়াল না করলে পরস্পর ঘর্ষণের ফলে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর কিছু পরিস্থিতিতে, এর ফলে, ভিজুয়ালি একধরণের ‘লজ্জা’ প্রকাশ পেতে পারে।”

তবে বিজ্ঞানীমহলে অনেকেই এই তত্ত্বকে উড়িয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, স্পর্শ এড়িয়ে দূরত্ব সৃষ্টির কারণ আসলে পাতাখেকো পোকার হাত থেকে বাঁচা। যেমন, নিজেদের শরীর দিয়ে সেতু তৈরি করে পিঁপড়েরা এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাতায়ত করে থাকে। অন্যান্য পোকারাও দলবদ্ধ হয়ে নিজেদের পা জোড়া লাগিয়ে ধীরে ধীরে এক ডাল থেকে প্রায় ৪ ইঞ্চির মতো বা তারও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। পাতাগুচ্ছগুলির মধ্যে ফাঁক রেখে এবং পরস্পরকে স্পর্শ না করার মতো দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে গাছগুলি এই ব্যাপারটিকে প্রতিরোধ করে।

অন্য কিছু তত্ত্ব মতে, আলোক উৎসের প্রতি পরস্পরের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার ফলেই প্রতিবেশি গাছেদের মধ্যে ‘ক্রাউন শাইনেস’ ঘটে থাকে।

বর্ণালির সর্বোচ্চ লাল প্রান্তের একটি আলোক তরঙ্গের নাম ‘ফার-রেড লাইট’। নির্দিষ্ট এই তরঙ্গের মাধ্যমে গাছেরা বুঝতে পারে পাশে থাকা প্রতিবেশি গাছেদের সাথে তারা কত কাছে বা দূরে আছে। গাছের ‘ফাইটোক্রোম ফটোরিসেপ্টর’ এর ক্রিয়ার মাধ্যমে এটি ঘটে থাকে বলে ধারণা করা হয়। আর বর্ণালির অন্য প্রান্তে থাকা নীল রং ব্যবহার করে একই সাথে তারা ছায়ার দিকে ঝুঁকে পড়া থেকেও বিরত থাকে।

এই ব্যাপারগুলির সমন্বয়ে গাছেরা হয়ত তাদের প্রতিবেশি গাছের ব্যাপারে সতর্ক থাকে এবং তাদের দিকে ঝুঁকে না গিয়ে একটা দূরত্ব বজায় রেখে আলোর খোঁজে সোজা বেড়ে উঠতে থাকে।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here