যখন আর কোথাও যাওয়ার নাই, তখন সুখী আপুর কাছে আইসা থাকি, থাকছি আগেও। এবারও তেমন ছিল। আর কোত্থাও আমার যাওয়ার ছিল না।

তখন ভোর। বরিশালের হলুদ অটোতে বইসা দেখতেছি চোখফোলা এক মধ্যবয়সী মহিলারে। তড়িঘড়ি কইরা সে আমার দিকে আগাইতেছে না। আগাইতেছে স্বাভাবিক গতিতে। আমি ট্রলিব্যাগটা রাস্তার ওপর রাইখা নামলাম। মনে আনন্দ, তাই চেহারায় উচ্ছ্বাস। ভেঙে-ভেঙে, জোরে ডাকলাম, “সু-খী-আ-পু।”

সুখী আপু কাছে আইসা ভ্রু কুঁচকাইয়া বলল, “দাঁড়ায়া আছোস ক্যান? ভাড়া দ্যাস নাই?”

“তুমি ব্যাগ নিয়া বাসায় চইলা যাও। আমি পরে আসব।”

“কী অদ্ভুত! কই যাবি এই সকালে?”

“ত্রিশ গোডাউন। ওইখান থিকা ওপার।”

“আচ্ছা। নাস্তা খাইয়া নিস।”

আমি হাসলাম। অটো ঘুরায়ে শাই শাই করে চলা শুরু করল।

সুখী আপু আমার খালাত বোন। পাঁচ নাম্বার খালার বড় মেয়ে। আমার প্রতি অসম্ভব দুর্বল। আর আমার সব শেষের একমাত্র আশ্রয়। বয়স ত্রিশের ওপাশে কয়েক ঘর চইলা গেছে। দুই মেয়ের মা। বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে এবং ইনিসী খালামনি যেদিন আসবে, সেদিন সে কিছুতেই স্কুলে যাবার কথা ভাবতে পারে না। খালামনির বইয়ের কবিতার নামগুলি সিরিয়ালি তার মুখস্থ। তার মা’র কাছ থিকা জানা গেছে, বই সে পাওয়ার পরেই ‘খতম’ দিছিল।

এখন কী মাস চলে তা হুট কইরা আমার জানতে ইচ্ছা করে। গরম পড়তেছে। বৃষ্টি মাঝে মধ্যে অবশ্য হচ্ছে। অটো চলতে চলতে আমার এইটাকে অন্য কোনো অজানা মাস বইলা মনে হয়। যে মাস আগে কখনো আসে নাই। ভবিষ্যতে যদি আসে, তাও কবে আসবে বলা মুশকিল। আমি রিল্যাক্স হয়ে বসে ভাঙা রাস্তার ঝাঁকি খাই। বড় সড় খাদ দেখলে ড্রাইভারকে বলি, “ভাই, সাবধানে। দেইখেন। যে রকম ভাঙা, তাতে এইখানটাতে প্রতিদিন অ্যাক্সিডেন্ট হবার কথা।”

ড্রাইভার আমার সাথে একমত হন। মাথা ঝাঁকান।

“হ আপা। আমার এক বন্ধুর অটো-গাড়িই অ্যাকসিডেন্ট করছে কিছুদিন আগে।”

শোনার পরও আমার ভালো লাগা কমে না। ভাটিখানা থিকা স্ব-রোড, তারপর সদর রোড, বেলস পার্ক, ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোড, মেডিকেলের পেছন দিয়া অটো ত্রিশ গোডাউন চইলা আসে। একদম নদীর পাড় পর্যন্ত না গিয়া আগেই থামতে বলি। থামে। ভাড়া দিই। নামি। মুগ্ধ হই। এত সুন্দর একটা রাস্তা এই শহরে আছে ভাবলে কী যে আনন্দ হয়। আমি জোরে গেয়ে উঠি—

“আজ রে-ব্যান দিয়ে তুমি যতই ঢেকে রাখো চোখ
লুকোতে পারবে না
এন্টালি সিনেমার পেছনের বস্তির
মৌলালির মালা”

এইখানে এক বৃহৎ বটগাছ, পেছনে কীর্তনখোলা। সকাল ছয়টার মত বাজে। চারদিক ফাঁকা। পাতাকুড়ানি মহিলা আছে কিছু। কী হাসি হাসি মুখ! রাস্তায় পড়ে থাকা ফুলের নাম জিজ্ঞেস করতে গিয়া তাদের সাথে কথা হয়। আমার মনে হচ্ছিল, ওনাদের যেরকম ভালোবেসে খালা ডাইকা ফেললাম, ঢাকায় এইটা পারি না। খালা ডাকতে তো পারি, কিন্তু এত ভালোবাসা সেইখানে থাকে না।

ত্রিশ গোডাউনের রাস্তা ধইরা সোজা হাঁটলে চানমারী খেয়াঘাট যাওয়া যায়। আগে যাওয়া যাইত না। ব্রিজ ছিল না। যাওয়ার রাস্তার পাশে পাশে নড়বড়ে ঘর। উদাস মুখের কয়েকজন মানুষ। আগের বার আইসা যখন এইখানে বইসা ছিলাম, ছয়-সাত বছরের একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করতেছিল, আমার স্বামী কই গেছে। আমি তারে বললাম, কীর্তনখোলায় ডুইবা মরছে। সে কষ্ট পাইছিল। তেমন ছন্নছাড়া কষ্ট ঘরগুলির গায়ে লেপটায়ে আছে। তারপরও, এইগুলির মাঝে, এক মহিলা ‘চটা’ ভাজতেছে। এই জিনিস আমার অতি পছন্দের। চালের গুঁড়ির ওপর হাতের ছোঁয়ার ছাঁচ… আম্মু বানাইত। সবকিছু ভাইবা কেবল আনন্দ হইতেছে। আমি চটা কিনলাম না, খাইলাম না। হাঁটতেছি। চানমারী খেয়াঘাট যাব।

রাস্তা থিকা ব্রিজটা একটু উঁচু। প্রাসের মত হইয়া তা আবার নাইমাও গেছে। খেয়াঘাটে খেয়া নাই। আছে ইঞ্জিনের ট্রলার। এইগুলি ওপারে যায়। রিজার্ভ যায়, আবার অনেক লোক নিয়াও যায়।

রিজার্ভে গেলাম। আস্তে চালাইতে বললাম। ঝুঁইকা পইড়া পানিতে হাত দিতেই পানি ছিঁটতে শুরু করল। ইঞ্জিন, তাই। আমি হাত দিয়াই রাখলাম। রোদ পড়ছে পানিতে। চিকচিক করতেছে। এইখানেই যেন জীবন ফুরায়ে গেছে। কিছুসময় আমি ধার কইরা আনছি। ধার কইরা সময়, আমি নদীর জলে ভাসতেছি। হইতে পারে, এটা মৃত্যুর পর ঘটতেছে, সমস্তটাই। তাই হয়ত, আমি বলতে চাইতেছি শুধু আমারে, যেহেতু আমিই ধারণ কইরা আছি সব, যেমন নিজেরে, তেমন নিজের প্রেম আর প্রেম থিকা হওয়া আরও অধিক প্রেমরেও।

বরিশালের ওপারের নাম কাউয়ার চর। কাগজ-কলমের নাম চরকাউয়া। এইখানে আসলে আপনার মনেই হবে না, ওপারে বরিশাল। শহর। এত অনুন্নত। তাই যা স্বপ্ন তার মতই সুন্দর। যেইখানে নামলাম, তাও নিশ্চয়ই খেয়াঘাট। ওইখানকার দোকানপাটও বন্ধ। সরু পিচঢালা রাস্তা। সোজা গেছে। কোথায় গেছে জানি না। হাঁটতে শুরু করলাম। আগে আরেকবার কোথায় আইসা বসছিলাম তা খোঁজার চেষ্টা করলাম। আগে আইসা যেইখানে বসছিলাম, সেই জায়গার নিশানাস্বরূপ একটা খেঁজুর গাছ পাইলাম, কিন্তু এখন ওইখানে যাওয়ার অবস্থা নাই। তারচেয়ে রাস্তা দিয়া হাঁটতে থাকা ভালো। রাস্তার পাশের মাঠগুলিরে বলে ‘দিগন্ত-বিস্তৃত’। চোখ বাঁধা পায় না। দেখতে পায় আদি আর শেষ হইতে থাকা অনন্ত। অনেক দূরে যেন গহীন বনের অন্ধকার, তা দূরে, বেশ দূরে, এর আগে যে মাঠ, গড়নের ভেতরে ধুলোকাদা সে ধরে রাখছে, ধরে রাখছে দিনের থিকা আলাদা কইরা ভোরকে। ভোর কমলে দিন বাড়ে, রোদ আইসা পড়ে, তারে দেখবার মত করে মেলে ধরে রাখে সে।

খুব সামাজিক কোনো পাড়ায় ঢুকে গেছি। গৃহস্থের বউ, ছেলেমেয়েদের দেখা যাইতেছিল। ফেরার জন্য আরেকটা অটোতে চইড়া বসলাম। খেয়াঘাট নিয়া যাবে। ওপারে যাব। শহরে। বরিশালে।

ঘাটের আরও দূরে ছোট, কম-প্রশস্ত একটা জায়গা ছিল। নির্জন। আগেরবার গেছিলাম। এবার সেই জায়গা আর খুঁইজা পাই নাই।

বরিশাল আইসা নাস্তা কইরা ঘড়ি দেখলাম। দশটা বাজে তখন। এরমধ্যে নিজের সমস্ত অসুস্থতা নাই বইলা মনে হইতেছিল। অসুস্থ বইলাই বরিশাল আসছিলাম আমি। যখন আর কোথাও যাওয়ার নাই, তখন সুখী আপুর কাছে আইসা থাকি, থাকছি আগেও। এবারও তেমন ছিল। আর কোত্থাও আমার যাওয়ার ছিল না।

দুপুরে বাসায় ফিইরা আসছি তারপর। আইসাও তেমন, দেখি সুখী আপু নির্লিপ্ত মুখে মেয়েদের জামাকাপড় ভাঁজ করতেছে। গলায় কোনো ভাঁজ ছাড়াই বলল, “টেনশন হইতেছিল। ঘুরতে ডিস্টার্ব হবে তাই আগে ফোন দিই নাই। খালামনি জিজ্ঞেস করতেছিল, হসপিটাল থিকা সবে রিলিজ পাইল, অসুস্থ তো, অত ঘোরার কী দরকার। আমি মুখচোখ দেইখা বুঝছি, কী দরকার। কারও তো বুঝতে হয়… যা গোসল কর।”

আমি গোসল করলাম।

একটা দিনের শেষে প্রথম মনে হইল, চারপাঁচদিন কেটে গেছে। চারপাঁচদিন স্বপ্নের মত আনন্দে কেটে গেছে।

কভার. সানজিদা আমীর ইনিসী