page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

‘একজন খান হিসাবে’—শাহ রুখ খানের আত্মজৈবনিক রচনা

২০১৩ সালে অভিনেতা শাহ রুখ খান দি নিউইয়র্ক টাইমস এর ‘আউটলুক টার্নিং পয়েন্টস’ এর জন্য এই লেখাটি (Being a khan) লিখেছিলেন। তার নামের শেষে ‘খান’ থাকার কারণে আমেরিকার এয়ারপোর্ট কর্মকর্তাদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার পরে তিনি এটি লিখেছেন। এই লেখায় শাহ রুখ তার নিজের ধর্ম, পেশোয়ার থেকে আসা তার পিতা, তার শৈশবের শিক্ষা, তার হিন্দু স্ত্রী, দুই সন্তান, নাইন ইলেভেনের পরে সংখ্যালঘু মুসলমান হিসাবে ইন্ডিয়ায় জীবনযাপনের কৌশল ও ধর্ম সম্পর্কে নিজের দার্শনিক অবস্থান বিষয়ে অনেক কথা বলেছেন।

একজন খান হিসাবে

শাহ রুখ খান

অনুবাদ: আশরাফুল আলম শাওন

আমি একজন অভিনেতা। ইমেজ যতটা দৃঢ়ভাবে আমার দিনগুলিকে ধরে রাখে সময় ঠিক সেভাবে রাখে না।  যে স্ন্যাপশটগুলিতে আমি থাকি সেগুলিতে মুহূর্ত এবং স্মৃতিরা আমার এক্সপ্রেশনের মাধ্যমে নিজেদের চিত্রায়িত করে। আমার আর্টগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো সেগুলির দর্শকের আবেগ ও কল্পনার সাথে অণুরণিত হতে পারে এমন ইমেজ বা দৃশ্য তৈরি করা।

আমি একজন খান। এই নামটিই আমার মনের ভিতর অনেকগুলি ইমেজ তুলে ধরে— একহাতে জিন টেনে ধরে ঘোড়ায় চড়া একজন লোক, তার মাথার পাগড়ির বাইরে তার বেপরোয়া চুল বেরিয়ে আসছে, মুখের মাসলগুলি স্পষ্ট এবং বিশেষভাবে সুন্দর বড় একটি নাকের কারণে তার খুব হ্যান্ডসাম চেহারা।

shah-rukh-215

খুবই নিয়মানুবর্তী উদ্ধতভঙ্গির একজন লোক;  কোনো নাচ-গান না, কোনো মদ্যপান না, তার ঠোঁটের ফাঁকে কোনো সিগারেট না, না একগামিতা, অ-ধর্মীয় কোনো কিছুই না; একটি সুন্দর, নীরব মুখ সহিংস ক্রোধের ধোঁয়ায় দৃঢ় হয়ে আছে। একটি বিজলী চমকানোর মত সে তার সৃষ্টিকর্তার নামে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। আমার মনে তারপর আসে আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্টের নামে নামকরণকৃত আমেরিকার বিশাল একটি এয়ারপোর্টের পিছনের রুমে আমাকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইমেজ (আরেকটি প্যারালাল ইমেজ—লি নামের একজন ব্যক্তির দ্বারা প্রেসিডেন্টের হত্যা, ভাগ্য ভালো সে মুসলিম নয়, অনেকেই আবার ভাবতে পারে— কিন্তু সে চাইনিজও নয়।  আমি তাড়াতাড়ি সেই রুমের ইমেজটি আমার মাথা থেকে সরিয়ে দেই।)

আমার পোশাক খুলে নেওয়া, হয়রানি এবং অনেক প্রশ্ন করার পরে আমাকে একধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল: “আপনার নাম আমাদের সিস্টেমে পপ আপ করেছে, আমরা দুঃখিত।” আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি আসলে তাই, এখন কি আমি আমার আন্ডারওয়্যার ফেরত পেতে পারি প্লিজ?  তারপর আমার মনে আসে যে ইমেজটি আমি বাস্তব জীবনে সবচেয়ে বেশি দেখি, আমার নিজের দেশে আমি—মেগাস্টার হিসেবে স্বীকৃত, অনেক ভালোবাসা পাওয়া এবং মহিমান্বিত একজন মানুষ, আমার ভক্তরা আমার জন্য ভালোবাসা এবং প্রশংসা নিয়ে ভিড় করে।

আরো পড়ুন : আমার নিরাপত্তা কখনোই আমার উদ্বেগের বিষয় না—শাহ রুখ খান

আমি একজন খান।

আমি বলতে পারি এইসব ইমেজের প্রত্যেকটির সাথেই আমি মিলে যাই—আমি ছয় ফুট লম্বা ঘোরার জিন টেনে ধরা কেউ হতে পারতাম—ওকে, কিছুটা বাদ দিতে হবে, ছয় ইঞ্চি থেকে অন্তত তিন ইঞ্চির মত বাদ দিতে হবে, আর যদিও ঘোড়ায় চড়া নিয়ে আমি বেশি একটা জানি না। একবার একটি ঘোড়া আমাকে নিয়ে টগবগ করে ছুটছিল আর আমি এটার উপর অসহায়ভাবে ঝুলে ছিলাম এবং ‘আর কখনো ঘোড়ায় চড়ব না’ এই বাক্যটি আমি চিরদিনের জন্য আমার খাতায় লিখে নিয়েছি।

shah-rukh-220

৪৯ জন্মদিনে মুম্বাইয়ের বাড়ি মানাত-এর বেলকনিতে ভক্তদের হাত নাড়াচ্ছেন শাহ রুখ খান।

আমার মুখ অনেক পেশীবহুল, আমার বাচ্চারা প্রায়ই এটা আমাকে বলে থাকে, এবং আমি ফর্সাও ছিলাম, কিন্তু এখন আমার রঙ চিরস্থায়ীভাবে তাম্র বর্ণের অথবা আমি বলতে পছন্দ করি জলপাই রঙের হয়ে গেছে—যদিও আমার হাতের ভাঁজগুলিতে সেই ফর্সা থাকার অবশিষ্ট চিহ্ন আমি এখনো খুঁজে পাই। সঠিক ধরনের আলোতে  দাড়ালে আমি হ্যান্ডসাম এবং আসলেই আমার আলাদা করা যায় এমন বড় একটি নাক আছে। মেগাস্টার হিসেবে আমি কোথাও প্রবেশ করতে গেলে আমার আগেই আমার নাক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আমার আগমন ঘোষণা করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার নাক, আমার নাম— এগুলি আমার কাছে কোনো অর্থই বহন করে না যতক্ষণ না আমি এটাকে কনটেকচুয়ালাইজ করি বা যতক্ষণ না কোনো পরিস্থিতির সাথে এটাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলি।

আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি তার নিয়ম হলো সরলীকরণ করা এবং কনটেকচুয়ালাইজিং করা— এই  পৃথিবীতে সংজ্ঞা বা পরিচয় নিরাপত্তার কেন্দ্র হয়ে গেছে। খুবই সামান্য জ্ঞান এবং আগে থেকেই ঠিক করে রাখা স্ট্যান্ডার্ড বা মাপকাঠি দিয়ে কোনো ঘটনা, বস্তু এবং মানুষকে সংজ্ঞায়িত করে আমরা আরাম পাই। এইসব সংজ্ঞা থেকে সাধারণভাবে যে অনুমান উঠে আসে তা আমাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদের একধরনের নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়।

আমরা আমাদের নিজেদের ছোট ছোট ইমেজ বক্স তৈরি করি। এই ধরনের বাক্সের আকৃতি বর্তমানে আরো অনেক ছোট হয়ে এসেছে। এই বক্স কোটি কোটি মানুষের মনের মধ্যে আমার ধর্মের ব্যাপারে একটি ইমেজ ধারণ করে আছে।

shah-rukh-216

‘মাই নেম ইজ খান’ ছবিতে শাহ রুখ খান

পরিচয় বা সংজ্ঞায়িত হওয়ার পদ্ধতির আরো ছোট হয়ে আসার বিষয়টি আমি প্রতিবার এনকাউন্টার করেছি এভাবে যে— আমার দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বারা তাদের মডারেশনের ব্যাপারটি পাবলিকলি প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন। যখনই ইসলামের নামে কোনো সহিংস ঘটনা ঘটেছে, আমাকে ডাকা হয়েছে তার উপর আমার মতামত দেওয়ার জন্য, মুসলিম হওয়ার হওয়ার কারণে সেই ধারণা নিরসন করার জন্য। আমি এই ধরনের কান্ডজ্ঞানহীন নৃশংসতা ক্ষমা করে দেই। এইসব ঘটনায় যাতে অন্যান্য সম্প্রদায়কে তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত রাখা যায়, সে উদ্দেশ্যে আমার সম্প্রদায়কে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বেছে নেয়া কণ্ঠস্বরগুলির মধ্যে আমি একজন। আমাদের সবার প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া এমন যেন না হয় যে আমরা সহিংসতা করছি অথবা একটি ধর্মের নামে ঘটানো অপরাধের জন্য আমরা দায়ী। এই অপরাধগুলি আমরা প্রত্যক্ষ করছি এইসব ঘটনার অপরাধীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে।

মাঝে মাঝে আমি রাজনৈতিক নেতাদের অসাবধানতার শিকার হয়ে যাই। তারা ভারতের মুসলমানদের নিয়ে যা ভাবে তা ভুল এবং দেশপ্রেমহীন-  এই উদাহরণ তৈরি করার জন্য তারা আমাকে বেছে নেয়। অনেক বার আমার নিজের দেশের চেয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশের প্রতি বেশি আনুগত্যের জন্য আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে—যদিও আমি ভারতীয় এবং আমার বাবা ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। অনেক মিছিল বা বিক্ষোভ হয়েছে- সেখানে নেতারা আমাকে  আমার দেশ ছেড়ে সেখানে ফিরে যেতে বলেছেন যেটাকে তারা আমার ‘আসল দেশ’ বলে। অবশ্যই প্রতিবার আমি তা ভদ্রভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছি। এই ঘটনাগুলি আমি আমার বাড়িতে এমন কৌশলে মোকাবিলা করেছি, এমন ভাষা ব্যবহার করে এগুলি নিয়ে কথা বলেছি যে এইসব আক্রমনের ভিতর দিয়ে যাওয়ার পরে তা ধুয়ে ফেলার জন্য যে গোসল করতে হয়, আমাকে আর তা করতে হয়নি। যদিও আমি জানি না কতদিন এই অজুহাত বা এই কৌশল সবকিছু ধরে রাখতে পারবে।

আরো পড়ুন: শাহ রুখের সিনেমায় আসা

আমি আমার ছেলে এবং মেয়ের এমন নাম (ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের এবং ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের) দিয়েছি যাতে এইসব জাতিগত ব্যাপার তারা সহজেই পার হয়ে যায় — আরিয়ান এবং সুহানা। ‘খান’ নামটি আমি তাদের অর্পণ করেছি যাতে তারা এটা বাদ দিতে না পারে। মুসলিমরা যখন জিজ্ঞাসা করে তখন আমি এটা আমার আলজিভ থেকে উচ্চারণ করি এবং অমুসলিমরা জিজ্ঞাসা করলে আরিয়ান নামটি তাদের সামনে ছুঁড়ে দেই তাদের গোত্রের প্রমাণ হিসাবে।

আমি মনে করি এটা আমার সন্তানদেরকে ভবিষ্যতে অন্যায় আক্রমণ এবং যত্রতত্র ফতোয়া থেকে রক্ষা করবে। এটা আমার দুই সন্তানকে পুরোপুরি সংশয়েও রাখবে। মাঝে মাঝে তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে তারা কোন ধর্মের এবং হিন্দী ছবির একজন আদর্শ নায়কের মত আমি আমার চোখ ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তুলি এবং দার্শনিকভাবে বলি, তোমরা প্রথমে ভারতীয় এবং তোমাদের ধর্ম হলো মানবতা অথবা তাদের পুরাতন হিন্দী সিনেমার একটি গান শোনাই, ‘তু হিন্দু বানেগা না মুসলমান বানেগা—ইনসান কি আওলাদ হ্যায় ইনসান বানেগা’ -গ্যাংনাম স্টাইলে।

এটা তাদের কোনোরকম স্পষ্ট ধারণা দেয় না, এটা শুধু তাদের আরো সংশয়ে ফেলে দেয় এবং তাদের বাবা  সম্পর্কে তাদেরকে আরো সতর্ক করে তোলে।

এই স্বাধীন দেশে সম্মানিত হওয়ার জন্য আমি অনেকবার আমন্ত্রিত হয়েছি, হঠাৎ করে এমন কিছু বুঝতে পেরেছি  যেটা আমাকে আলাদা একটি কনটেক্সটে রাখে। যেমন, এয়ারপোর্টের দেরির জন্য আমাকে আমার ভাড়া বহন করতে হয়েছে।

shah-rukh-218

দীপিকা পাডুকানের সঙ্গে শাহ রুখ খান

কিছু উদ্ভ্রান্ত সন্ত্রাসী কাকতালীয়ভাবে আমার নামের শেষ অংশ বহন করে বলে আমাকে ভুলভাবে নেওয়ার ঘটনায় আমি আহত হয়েছি। একটা পয়েন্ট প্রমাণ করার জন্য সেটা নিয়ে আমি একটি ছবি বানিয়েছি যার নাম মাই নেইম ইজ খান (অ্যান্ড আই অ্যাম নট এ টেরোরিস্ট)। পরিহাসমূলকভাবে আমি যখন আমেরিকায় প্রথমবারের মত ছবিটি প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম আমাকে আমার নামের শেষ অংশের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমি অবাক হই যাদের নামের শেষে ম্যাকভেইগ (টিমোথি-তে যেমন) আছে তাদের প্রত্যেকের সাথেই একই আচরণ করা হয় কিনা।

কোনো সেন্টিমেন্টে আঘাত করার ইচ্ছা আমার নেই, কিন্তু সত্য বলতে হবে। আক্রমণকারী এবং জীবনগ্রহণকারী তার নিজের মনের ইচ্ছায় এসব করে। এর সাথে একটি নামের, একটি স্থানের অথবা তার ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এই মনের নিজস্ব শৃংখলা আছে, নিজের মত করে সঠিক থেকে ভুলকে আলাদা করার ব্যাপার আছে এবং নিজস্ব আদর্শের একটি সেট আছে। আসলে, এটা নিয়ে বলা যায়, এই সন্ত্রাসের নিজেরই একটা ‘ধর্ম’ আছে। এই ধর্মগুলির সাথে মসজিদে বা চার্চে শিক্ষা দেওয়া শত শত বছরের ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এইসব ব্যক্তিদের আত্মায় আজানের ডাক বা মানুষের কথার কোনো তাৎপর্য নেই। তার আত্মা অশুভ শক্তি দ্বারা তাড়িত। আমি এই ক্ষেত্রে তার অবস্থানকে কন্টেকচুয়ালাইজ করি না বা কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে দেখি না।

আমি একজন খান।

আমি ছয় ফুট লম্বাও না, হ্যান্ডসামও ন্‌ (যদিও আমি বিনয়ী) আমি সেই মুসলিমও না যে অন্য ধর্মগুলিকে ছোট করে দেখে। আমাকে আমার ধর্ম শিক্ষা দিয়েছে আমার ছয় ফুট লম্বা, হ্যান্ডসাম পেশোয়ারী পাঠান পিতা। এখনো সেই পেশোয়ারে তার এবং আমার গর্বিত পরিবার বসবাস করে। তিনি ছিলেন অহিংস পাঠান আন্দোলন ‘খুদায়ে খিদমতগার’ এর একজন সদস্য এবং গান্ধীজি ও খান আব্দুল গাফফার, যাকে সীমান্তের গান্ধী বলা হতো, দুজনেরই অনুসরণকারী।

তার কাছে থেকে আমার ইসলামের প্রথম শিক্ষা ছিল নারীদের এবং শিশুদের সম্মান করা এবং প্রতিটা মানুষের মর্যাদাকে উপরে রাখা। আমি অন্যদের বৈশিষ্ট্য এবং ভদ্রতা সম্পর্কে শিক্ষা পেয়েছিলাম, শিখেছিলাম তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের দর্শন এবং তাদের ধর্ম আমার নিজের ধর্মের মতই সম্মান দাবি করে ও তাদেরকে খোলা মনে গ্রহণ করতে হবে। আমি আল্লাহর ক্ষমতা এবং দয়ায় বিশ্বাস করতে শিখেছি এবং আমার অধীনস্ত মানুষদের প্রতি ভদ্র হতে, যারা আমার চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত তাদেরকে আমার নিজের থেকে দিতে এবং অন্যের একই ভাবে জীবন কাটানোর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে সম্পূর্ণ সুখের, উচ্ছ্বাসের, হাসির ও আনন্দের জীবন কাটানোর শিক্ষা পেয়েছিলাম।

shah-rukh-212

দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে ছবির দৃশ্য

তাই আমি একজন খান, কিন্তু আমি কে সে ব্যাপারে আমার ধারণায় কোনো সরলীকৃত, বাঁধাধরা বা ছোট বক্সের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত কোনো ইমেজ নেই। বরং আমার জীবন কাটানোর পদ্ধতির কারণে আমি ইন্ডিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা গভীরভাবে পেয়েছি। আমার সম্প্রদায় ইন্ডিয়ার জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু এই সত্যটাকে অগ্রাহ্য করে গত বিশ বছর ধরে আমি এই ভালোবাসা অনুভব করে আসছি। আমি জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক সীমানার বাইরেও এই ভালোবাসা দ্বারা স্নাত হয়েছি, সুরিনেম থেকে জাপান এবং সৌদি আরব থেকে জার্মানি পর্যন্ত, এমন সব জায়গায় যেখানে মানুষ আমার ভাষা পর্যন্ত বোঝে না। একজন এন্টারটেইনার হিসাবে আমি তাদের জন্য যা করেছি তারা তার প্রশংসা করেছে—এটাই সব। আমার জীবন আমাকে দেখিয়েছে এবং বুঝিয়েছে যে ভালোবাসা একদম শুদ্ধভাবে বিনিময় হয়, সংজ্ঞায়িত করার আঘাত থেকে মুক্ত থাকে এবং সংকীর্ণ চিন্তার বন্দিত্ব থেকে মুক্ত থাকে। আমাদের প্রত্যেকেরই যদি এই শুদ্ধ ভালোবাসা গ্রহণ করার এবং ফিরিয়ে দেয়ার অনুমোদন থাকত তাহলে আমাদের নিরাপত্তার দেয়াল তৈরি করার জন্য কোনো ইমেজ বক্সের দরকার হত না।

আমি বিশ্বাস করি এত পরিমাণ ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাওয়ার কারণে আমি আশীর্বাদপ্রাপ্ত। কিন্তু আমি এটাও জানি যে এই মাপকাঠি অপ্রাসঙ্গিক। সাধারণভাবেই মানুষ হিসাবে, ছোট ছোট ভাবে আমাদের জীবন যেভাবে অন্যদের জীবনকে স্পর্শ করে এবং আমাদের আলদা আলাদা ধর্ম ও আমাদের সংজ্ঞায়িত করা নামের শেষ অংশ যে স্পর্শ করে না তার জন্য আমাদের একে অন্যকে প্রশংসা করা উচিৎ।

আমার সুপারস্টারডমের আবরণের ভিতরে আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমার হিন্দু স্ত্রী’র সাথে আমার ইসলাম বোধের কোনো সংঘর্ষ হয় না। গৌরির সাথে আমার শুধু আমাদের লিভিং রুমের দেয়ালের রঙ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে,  কিন্তু ইন্ডিয়ায় মসজিদ থেকে মন্দিরের সীমানা নির্ধারণকারী দেয়ালের অবস্থান নিয়ে নয়।

আমরা আমাদের মেয়েকে এমনভাবে বড় করছি যে নিজের ব্যালে ড্যান্সের পোশাক নিজেই তৈরি করে এবং নিজের ব্যালে নৃত্যের কোরিওগ্রাফি নিজেই করে। সে পশ্চিমা গান গায় যেগুলি আমাকে হতবুদ্ধি করে দেয় এবং সে একজন অভিনেত্রী হতে চায়। সে যখন এমন কোনো মুসলিম দেশে থাকে যে দেশ হিজাব পড়ার ব্যাপারটি প্র্যাকটিস করে, সে তখন হিজাব পড়ার জন্য জেদ করে, এটা সত্যিই অনেক সুন্দর এবং ইসলামের সবচেয়ে ভুল বোঝা একটি মতবাদ।

shah-rukh-211

নিজের পরিবারের সঙ্গে শাহ রুখ খান

আমাদের ছেলের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি তার পাঠান বংশের প্রতি ইঙ্গিত করে,  যদিও একজন যোদ্ধার জিনগত  কিছুটা পরিবর্তনসহ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সে সারাদিন কাটায় হয় রাগবিতে লোকজনকে ধাক্কা দিয়ে, তায়-কোন-দো-তে কারো পিছনে লাথি মেরে অথবা কল অব ডিউটি ভিডিও গেমে অনলাইন দুনিয়ায় অজানা কাউকে বাতিল করে দিয়ে গেমের দুনিয়া হ্যান্ডেল করে। এবং তারপরও গতবছর মুম্বাইয়ের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আমার মুসলমান হওয়া নিয়ে কিছু ধর্মান্ধের বাজে আচরণের প্রতিক্রিয়ায় ছোটোখাটো বিশৃঙ্খলা করার জন্য সে আমাকে দৃঢ়ভাবে অনুযোগ করেছিল।

আমরা চারজন আলাদা আলাদা কিছু গ্রহণযোগ্যতা এবং সঠিকতার বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব করি—কোনো ব্যাপারের সূক্ষ্ণতার মধ্যে ভালোবাসার বিনিময় হলে তা মানুষকে বড় করে তোলে। অথচ এই ব্যাপারগুলি অন্যভাবে সবার জন্য সাধারণ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

Untitled-1আমি বিশ্বাস করি, আমাদের ধর্ম চূড়ান্তভাবেই ব্যক্তিগত পছন্দ, আমরা কে তা মানুষের কাছে ঘোষণা করার বিষয় না। এটা একজন ব্যক্তি হিসেবে আমার বাবার দৃষ্টিভঙ্গি যিনি বিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন। আমি মনে করি সেই দৃষ্টিভঙ্গিগুলি আমার সবচেয়ে বড় পুরষ্কার এবং তার স্মৃতি, তার দেয়া শিক্ষা এবং পাঠান হওয়ার সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত সম্পদ। আমি কখনো আমার বন্ধুদের সাথে এগুলি তুলনা করি নি, তাদের পিতামাতা এবং দাদা-দাদিদের উত্তরাধিকারসূত্রে একই রকম সম্পদ রয়েছে। আমি কখনো বলিনি আমার বাবার দৃষ্টিভঙ্গি তোমার মায়ের শাড়ির চেয়ে ভালো। তাহলে ধর্মের ব্যাপারে আমাদের এরকম তুলনা কেন থাকা উচিৎ, যখন ধর্ম আপনার গুরুজনের স্মৃতির মতই ব্যক্তিগত এবং পুরস্কারস্বরূপ একটি বিশ্বাস। আমরা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করতে নামের শেষ অংশ ব্যবহার করার পরিবর্তে কেন শেষ শব্দ হিসেবে ভালোবাসা ব্যবহার করব না? আপনাকে ভালোবাসা দিতে পারার জন্য একজন সুপারস্টার হতে হয় না। এর জন্য শুধু একটি হৃদয়ের প্রয়োজন এবং আমি যতদূর জানি, পৃথিবীতে কোনো শক্তিই এই জিনিস থেকে কাউকে বঞ্চিত করে রাখতে পারে না।

আমি একজন খান, এবং এটা হওয়ার অর্থ যা আমি তাই-ই, শুধু আমাকে ঘিরে যে সরলীকৃত ইমেজগুলি আছে সেগুলি বাদ দিয়ে। খান হওয়া হলো ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়া—এই প্রতিজ্ঞায় যে আমার জন্য পরকালের কোথাও কুমারীরা অপেক্ষা করছে।

পড়ুন: বিনোদনের আরো লেখা

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।