page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

একতরফা রবীন্দ্রনাথ থিকা মাকসুদ যেভাবে আমাদের রেহাই দিলেন

[গত বৈশাখে আমি বণিক বার্তায় কাজ করি। সে অফিসের তখনকার ম্যানেজিং এডিটর গোলাম ফারুকের নির্দেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাকসুদুল হকের গাওয়া দুইটা বৈশাখি গান নিয়া লিখতে হইছিল। লেখার পর লোকজন পড়ছিলও বেশ। মাকসুদ ভাই ফেসবুকে আমার লগে যোগাযোগ করছিলেন। আমরা এখন ফেসবুক বন্ধু। আইজ দেখলাম মাকসুদ ভাই তার মেলায় যাইরে গান নিয়া এনটিভির অনলাইনে একটা ইন্টারভিউ দিছেন। আমার তখনকার অনুমানের লগে তার বক্তব্যের অনেকাংশে মিল পাইলাম। তবে পুরান লেখাটা আমি এডিট করছি এবারে। বক্তব্যটা একটু ধারালো করার চেষ্টা করছি, মূলত ভাষাটা বদলাইছি।]

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো—বৈশাখের পয়লা দিনে এমন একটাই গান শুনার বাধ্যবাধকতা থিকা বাঙালিরে (বাঙলা ভাষার গান অর্থে) রেহাই দিছিলেন ব্যান্ড দল ফিডব্যাক। তাদের এক সময়ের তারকা গায়ক মাকসুদের গাওয়া ‘মেলায় যাইরে’ নববর্ষ বরণের উৎসবে অরাবিন্দ্রীক সুর হয়ে বেজে চলেছে সেই ১৯৮৮ সাল থেকে।

salahuddins1

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গাইতে গেলে যেমন ‘অজু’ করে আসা থেকে শুরু করে, তাল-লয়-সুর এলোমেলো না হওয়ার রেওয়াজ আছে, তদুপরি পরিপাটি থাকারও শর্ত আছে। মাকসুদের গানে এসব বালাই নাই, অনেকটা ‘গাইলেই হইল’ টাইপ। রবীন্দ্রনাথের গানে লাগে ভক্তি, মাকসুদে জোশ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অভ্যুদয়ের সঙ্গে যদিও জড়ায়ে আছে রবীন্দ্রনাথের এ গান। একে অস্বীকার কিম্বা অবজ্ঞার সুযোগ নাই, উদ্দেশ্যও নাই। একইভাবে মাকসুদের উচ্ছ্বাসেরও গুরুত্ব অবহেলা করা যাবে না। বুদ্ধিজীবীরা যতই এসব না-বইলা থাকেন না কেন, দুইটা গানই কিন্তু টিকা আছে। মাকসুদের গানের বয়স কম হইলেও, তার আরও ঢের কাল টিকা থাকার সম্ভাবনা টের পাওয়া যাইতেছে। দুই প্রজন্মের দুই স্মারক বাংলার নববর্ষের যেন ‘ঐতিহ্য’ আর ‘আধুনিকতা’।


মেলায় যাইরে – ইউটিউব ভিডিও

রবীন্দ্রনাথের মতো আসন তার নাই, কিন্তু এই একটা দিনে তার গানটাও তো গাওয়া হয়। আমার ধারণা বেশিরভাগেই গাওয়া হয়। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবনের দরকার তো আছে।

ষাটের দশকে বাংলা নববর্ষ পালনের যে রাজনৈতিক গুরুত্ব আছিল, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের উপায় হিসাবে আয়োজন হইত এ অনুষ্ঠান। কিন্তু তারপর সকল আন্দোলন স্থগিত থাকলেও মাকসুদ তার মধ্যে কীভাবে যেন তারুণ্যের মুভমেন্ট ধারণ করতে সক্ষম হইলেন। এটা টের করার দরকার ছিল। তখন যে নানারকম বদল ঘটতে শুরু করল, বিভিন্ন অভিমুখ খুলতে থাকে—এ গান তার একটা নিশান।

তারা গানটা বাজারে আনছিলেন ’৯০ সালে। লেখার অনুপ্রেরণা মাকসুদেরই বলে জানা যায়। সুরও করেছিলেন তিনি। ভাবছিলেন তরুণদের জন্য বাংলার এ বছর শুরুর উদযাপন কালরে কীভাবে তিনি ‘প্রাসঙ্গিক’ কইরা তুলতে পারেন। যে ভাষা রবীন্দ্রনাথে নাই, যে সমাজ নাই তার গানে, যে উচ্ছ্বাস আর অবদমন, রাগ ও সংক্রমণ পাওয়া যায় না কবির গানে। এই যে পরিবর্তন ঘটে গেল এত এত—তার স্মারক কোনও গান কি লিখে রাখা যায় না! মাকসুদ প্রমাণ করলেন যায়। গেয়ে এবং বাজিয়ে তারা জানান দিলেন, অগোচরে হইলেও বেড়ে উঠছে একদল তরুণ-মন, যারা আর আগের সংকটে পতিত নাই, নতুন সংকট ও আবেগ তাদের ভেতর জাগছে। তারা নাগরিক হয়ে গেছেন। সেই নাগরিকদের সুর বানাইলেন মাকসুদ ও তার দল। তরুণরা এ গানের মধ্য দিয়া নিজেদের খুঁইজা পাইল। তাদের যে রবীন্দ্রথের চাইতে আলাদা ভাষা আছে, ভাব আছে তার প্রমাণ পাইল।

রবীন্দ্রনাথ ‘গ্লানি’ মুছায়ে দেয়া কিম্বা ‘জরা’ ঘুচায়ে দেয়ার ডাক দিছিলেন তা নিষ্ঠার ডাক। এটা পরমের প্রতি নিজের আত্মসমর্পণ। গড় মানুষ এখানে হাজির। মাকসুদের গানে এসব নাই। তিনি সুনির্দিষ্ট ক্রাইসিস নিয়া কথা বলতেছেন। ‘এসো হে বৈশাখ’ যে সার্বজনীন আহ্বান জানায়, তত বড় পরিসরে মাকসুদের গান না। তা লোকাল, আধ্যাত্মিক না। তার আলাদা একটা মাজেজা আছে। ‘বখাটে ছেলেদের ভিড়ে ললনাদের রেহাই’ না-পাওয়ার মতো বাস্তবতা তার গানে আছে। এমন সময়ে তারা গানটা গাইছেন, যখন মানুষ ঢাকায় ভিড় করতে শুরু করছেন । শহরের বাস্তবতায়, শিক্ষায়, বাণিজ্যে আচার-সংস্কৃতির বদল ঘটতেছে। গ্রামের সেই মেলায় যাওয়ার মজা দিন দিন সরে যাইতেছে তফাতে। তারপরও যখন বৈশাখ আসল, তখন মনে পড়ে মেলার কথা। মেলার ভিড়ের কথা। মেলায় তরুণীদের বিরক্ত হওয়ার কথা। বৈশাখ মানে যে মেলা, রাবীন্দ্রিক ভাবের ঘোরে তা যে ভুলতে গেছিল নাগরিকরা, তা হইতে দিলেন না মাকসুদ।

শহুরে মানুষের মনের মধ্যে ঘুমায়ে থাকা মেলারে ডাইকা তুললেন যেন তিনি। একটা হাহাকার বাজল। রমনায় যাওয়া বা না-যাওয়া নাগরিকরা মাকসুদের গান শুনে ভাবল মেলার কথা। তাছাড়া এ গানের শুরুর দিকের মিউজিক শুনলে মনে হয়, যেন মেলায় যাওয়ার বাদ্য, ঢাক বাজতেছে, আওয়াজ আসতেছে একটা দূরাগত। এই ডাকের আবার ক্লাস নাই, বোঝার সমস্যা নাই। তো বৈশাখরে এমনে ছায়ানট থিকা উদ্ধার করা কম গুরুত্বপূর্ণ কীসে?

barshabaran 2014

মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৪২১ (২০১৪ ইং)

মাকসুদ একবার এ গান বিষয়ে বলছিলেন—”১৯৯৫ সালের আগে বৈশাখে ওপেন এয়ার কনসার্ট নিয়ে খুব একটা ভাবা হতো না। মূলত এটা শুরু হয় ১৯৯৭ সাল থেকে। তখন ব্যান্ড সঙ্গীত যারা করত, ছায়ানটের পাশাপাশি তারাও বর্ষবরণে অংশ নিতে শুরু করে।” তার এই কথা থিকা একটা বিষয় বোঝার আছে। সেটা ছায়ানটের আধিপত্য। বৈশাখরে রাবীন্দ্রিক কইরা তোলার যে চর্চা তাদের ছিল, সেখানে ব্যান্ড অথবা পপ সঙ্গীত যারা করেন, তাদের প্রবেশে বেশ একটা সময় লাগছিল বলে মাকসুদের কথায় টের পাওয়া যায়। ‘এসো হে বৈশাখ’-এর বাইরে অন্য কোনও গানরে সহজে ঠাঁই দিতে নারাজ ছিলেন নববর্ষ উদযাপন আয়োজনের সঙ্গে যুক্তরা।

অন্যদিকে তরুণদের নতুন ভাবনা ও চিন্তার ছটফটানিও ভালোই শোনা যাইতেছিল সেসময়। নাগরিক জীবনের নানা চাওয়া আর না-পাওয়ার টানাপড়েন বৈশাখের রোদের মতো চড় চড় করতেছিল মাথার ওপর। সেই অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা আড়াল করা আর সম্ভব হয় নাই ছায়ানটের। ফলে বৈশাখে ব্যান্ড দলগুলারে কনসার্টের আয়োজনে নিতে বাধ্য হইল প্রতিষ্ঠানগুলা। আর এ গানের বাঙালিয়ানাও অস্বীকার করা যাইতেছিল না।

রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের যে মাহাত্ম্য তা বোঝার এলেম সবার হবে না। অথচ মাকসুদের গান পপুলার। বিস্তর লোক এই গান শুনেছে, শুনছে। এ গানের অর্থ বোঝার জন্য তারে বিশেষ শ্রেণীর লোক হইতে হইল না। বিশেষ কোনও ভঙ্গিতে বসতে হইল না। হারমোনিয়ামের তালে তালে সুর মিলায়ে গাওয়ার প্রয়োজন পড়ল না। যার যেমন খুশি তেমন গাওয়া গেল।

পুঁজিবাদের ভূমিকাও এখানে গৌণ। সুচিন্তিত পুঁজিবাদ আমাদের এখানে এখনও তেমন দাঁড়ায় নাই। তখনও ছিল না। তখন বরং শুরু হইতেছিল গোছালো ব্যবসা-বাণিজ্য। পুঁজিবাদ চাইলেও তো পারতেছে না একটা প্যারালাল ‘ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’ বানাইতে। অতএব এই গানের এমন পসার, মাকসুদের মানে শিল্পীর নিজ গুণে ঘটছে। উছিলার দরকার পড়ে নাই।

মাকসুদের ইন্টারভিউ লিংক
২৫ বছরে ‘মেলায় যাইরে’: রবীন্দ্রনাথ বৈশাখকে বরণ করেছেন, আমি মেলাকে : মাকসুদ
(এনটিভি অনলাইন)

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।