page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

একদিন সত্যজিৎ রায়ের মুখোমুখি

সত্যজিৎ রায়ের যে ছবিটি আমি প্রথম দেখি, সেটা ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’। আমার বয়স তখন খুবই কম। ১৩ বছর।

এর কিছুদিন পর দেখি ‘সমাপ্তি’। সবই ১৯৭২ সালে। সে বার লতা মঙ্গেশকরসহ ভারতের অনেক অভিনয়শিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পী ঢাকায় এসেছিলেন, মনে পড়ে।

সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখানো হয়েছিল সেই উৎসবকে কেন্দ্র করেই। আমি নিশ্চিত নই, তবে সেবার বেশ কিছু ছবি দেখানো হয়েছিলো। হতে পারে, তাঁর চলচ্চিত্রের রেট্রোস্পেক্টিভ হয়েছিল! কারণ যতদূর মনে পরে, ‘অপুর সংসার’ ও ‘চারুলতা’ও দেখানো হয়েছিলো।

তবে, সে বয়সেই ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ও ‘সমাপ্তি’ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম!

farid-kabir-logo

যে সময়ের কথা বলছি, তখন পুরোনো ঢাকায় বেড়ে ওঠার কারণে এমন ছবি আমাকে আকৃষ্ট করার কথা নয়। কেননা, আমরা বড়ই হচ্ছিলাম উর্দু আর ইংরেজি সিনেমা দেখে। নাচ-গান না থাকায়, মনে আছে, এ দুটো ছবির সময় টিভি সেটের সামনে তেমন কেউ ছিল না! আর আমি ছিলাম সিনেমার পোকা, আমি খুব মনোযোগ দিয়েই ছবি দুটো দেখেছিলাম!

কীভাবে তখন সত্যজিৎ রায়ের নাম জেনেছিলাম, মনে নেই আমার। তবে নামটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল।

পরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এবং তারও পরে নিয়মিত নানা ধরনের ছবি আমি দেখেছি। বাণিজ্যিক ছবি যেমন তাতে আছে, তেমনি আছে ভালো ও বিকল্প ধারার ছবিও। কুরোসাওয়া, ফেলেনি, গদার, বার্গম্যানসহ খ্যাতিমান এমন কোনো চলচ্চিত্রকার নেই যার ছবি আমি দেখি নি!

তবে সত্যজিৎই একমাত্র পরিচালক যার প্রায় সব ছবি আমি দেখেছি। কোনো কোনো ছবি তো একাধিকবার দেখেছি! সেই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হতে পারে, তা স্বপ্নেও ভাবি নি।

১৯৮৫ সালে আবৃত্তিলোক আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী কবিতা উৎসবের আমন্ত্রণে কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, রুবী রহমান ও আবু হাসান শাহরিয়ারসহ আমরা অনেকেই কলকাতা গিয়েছিলাম। উৎসব চলাকালীনই একদিন কথায় কথায় আমরা সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছার কথা জানালাম। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উদ্যোগে একদিন সে সুযোগও মিলল।

আমরা যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছুলাম সত্যজিৎ রায় নিজেই আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

satyajit-202

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে লেখক। কলকাতা, ১৯৮৫।

আমাদের দলটা ছিলো বেশ বড়। আমি ছাড়াও দলে ছিলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, রুবী রহমান, আবু হাসান শাহরিয়ার, সৈয়দ আল ফারুক, মনিরা কায়েস ও নাসির আলী মামুন।

আমরা সবাই তাঁর বসবার ঘরেই বসেছিলাম। তাঁর সঙ্গে আলাপের শুরুতেই তিনি বললেন, দুঃখিত, আমি আপনাদের বেশি সময় দিতে পারব না! আধঘণ্টা পরেই কিছু বিদেশি অতিথি আসবেন, তাদের সঙ্গে একটা জরুরি মিটিং আছে আমার।

কথার ফাঁকে ফাঁকে আমরা ছবি তুলছিলাম। আমি আমার সম্পাদিত ‘নির্বাচিত কবিতা’র বইটি দিলাম! দিতে দিতে বললাম, এ বইয়ের প্রচ্ছদ আমারই আঁকা। তিনি প্রচ্ছদটা দেখে নিয়ে বইয়ের পাতা ওল্টালেন। তারপর বললেন, কবিদের নিজেদের হাতের লেখা?

আমি মাথা নাড়লাম! হ্যাঁ।

বেশ কৌতূহল নিয়েই তিনি বইটা দেখলেন। আমার অন্য সহযাত্রীরাও তাঁকে বই উপহার দিলেন। সেদিন বেশিরভাগ কথা হচ্ছিল তাঁর চলচ্চিত্র বিষয়েই। গল্পের এক পর্যায়ে দলেরই কেউ আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি শামসুর রাহমানের কবিতা পড়েছেন?

সত্যজিৎ রায় একটু যেন অপ্রস্তুত! তিনি মাথা নাড়লেন। হয়তো পড়েছি, ঠিক মনে নেই।

আল মাহমুদ?

না। তাঁর কবিতা পড়া হয় নি। কবিতা বিশেষ পড়া হয় না। সত্যজিৎ রায় যেন কৈফিয়ত দিলেন।

কোন ফাঁকে সময় গড়িয়ে গেছে আমরা টেরই পাই নি। একজন এসে বললেন, তাঁর নির্ধারিত অতিথি এসে পৌঁছেছেন। আমরা উঠলাম।

সত্যজিৎ রায় যথারীতি আমাদের দরজা অব্দি এগিয়ে দিলেন। দীর্ঘদেহী সত্যজিতের পাশে আমাদেরকে বেশ খাটোই দেখাচ্ছিল!

দরজা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মনে হল, সত্যজিৎ রায় আমাদেরকে চা খাওয়াতে ভুলে গেছেন!

হতে পারে, তিনি আমাদেরকে মেহমান বলেই মনে করেন নি!

About Author

ফরিদ কবির
ফরিদ কবির

কবি ও প্রাবন্ধিক। জন্ম. ঢাকা। প্রকাশিত বই ২৭টি। উল্লেখযোগ্য বই: 'ওড়ে ঘুম ওড়ে গাঙচিল', 'অনন্ত দরোজাগুচ্ছ', 'মন্ত্র', 'ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম', 'আমার কবিতা', 'প্রেমের কবিতা', 'ফরিদ কবিরের কবিতা', 'আমার গদ্য' ইত্যাদি। সম্পাদনা: 'মন্ত্র' (ছোট কাগজ), সাপ্তাহিক কাগজ, মাসিক নতুনধারা।