ওজন কমানো
আমি ৬ মাসে ৩০ কেজি ওজন কমানো আয়মান আসিব স্বাধীন। গত কয়েক মাস যাবত এটাই আমার সবচাইতে “লক্ষণীয়” পরিচয়।

আমি ৬ মাসে ৩০ কেজি ওজন কমানো  আয়মান আসিব স্বাধীন। গত কয়েক মাস যাবত এটাই আমার সবচাইতে ‘লক্ষণীয়’ পরিচয়। এ লেবেল লেগে যাওয়ার পর থেকে পরিচিত, আধাপরিচিত ও স্ট্রেঞ্জাররা আমার কাছে খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চান, ঠিক কী উপায়ে আমি এত এত লোকের চোখের সামনে আক্ষরিক অর্থেই আপাদমস্তক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলাম।

আমার বরাবরের উত্তরটা একঘেঁয়ে আর খুবই অপ্রযোজ্য: ডায়েট ও জিম। কেউ আসলে এই জানা উত্তর চান না। গন্ডগোলটা প্রশ্নের ধরনে।  সবাই যে কথাটা জানতে চান, কিন্তু ঠিকমতো আর্টিকুলেট করতে পারেন না, সেটা হলো— নিজেকে ঠিক কী ধরনের দিকনির্দেশনা দিতে পারলে সহজেই খাবারদাবার ও কায়িক শ্রমের ব্যাপারে আপোস করায় অভ্যস্ত হওয়া যায়।

আপনি ঠিক কোন কোন খাবার খাবেন, সেজন্য নিউট্রিশনিস্ট আছেন। জিমে গেলে জিমের ইন্সট্রাক্টরই আপনার চাহিদামাফিক দেখিয়ে দিতে পারবেন, আপনার কোন ধরনের এক্সারসাইজগুলি করা দরকার। কিন্তু আমি সেসব নিয়ে না, আলাপ করতে চাই আপনার মাইন্ডসেট শিফট করা নিয়ে।

জিম করতে ভালোই লাগে; আয়নার মধ্যে ঘিরে থেকে যন্ত্রপাতি উঠানামা করিয়ে দারুণ একটা ম্যাস্কুলিন আবেশে সময় পার করা যায়। ঠিকমতো খাবার না খেয়ে থাকার মধ্যেও আত্মতৃপ্তি আছে, বিশেষ করে আশেপাশের সবাই যখন জানবে আপনি কতটা সচেতনতার সাথে এই ব্যাপারে এফোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ডিসাইড করা। আজকে জিমে যাবেন, নাকি ডে অফ রাখবেন? আজ চিট মিল খাবেন, নাকি কালকে? বন্ধুর জন্মদিনের দাওয়াত বা বিয়ে বাড়িগুলি কি একের পর এক এড়িয়ে যেতে থাকবেন, নাকি একটায় গিয়ে একবার ভরপেট খেয়েই দেখবেন?— কয়েক সেকেন্ডের এরকম দোদুল্যমানতার পর গৃহীত সিদ্ধান্তই আসলে আপনার মাইন্ডসেটের নির্ণায়ক।

এই সিচুয়েশনগুলিতে, এবং সব মিলিয়েই আপনাকে সাহায্য করতে পারে এমন কিছু মাইন্ডসেট ও টিপস নিয়ে নিচে আলোচনা করলাম। কিন্তু পূর্বশর্ত হলো, আমি ধরে নিতেছি আপনার ব্লাড প্রেশারের সমস্যা, ডায়াবেটিস কিংবা কিডনি, হার্ট, ফুসফুস ও  অন্যান্য অঙ্গজনিত কোনো ক্রনিক রোগবালাই নাই। এসবের কোনওটা থাকলে অবশ্যই আগে আপনার রেগুলার ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তার পর নিচের টোটকাগুলি ফলো করবেন।

বাইরের কোনো কিছু খাবেন না প্লিজ

রুল অফ থাম্ব: যেসব খাবারের স্বাদ মুখে লেগে থাকে, ধরে নিবেন সেসব খাবার বাই ডিফল্ট আপনার জন্য অস্বাস্থ্যকর। তাই ভাত, রুটি, আলু কম খাবেন। আরো ভেঙে বললে, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট খাওয়া একদম কমিয়ে দিবেন। আর এই পরম্পরা মানতে হলে একদম শুরু থেকেই বাইরের খাবার খাওয়া বাদ দিতে হবে।

দোকান থেকে কিনে কোনো খাবার খাবেন না। সেটা প্যাকেটজাত কিছু হোক, কিংবা কোনো ফুড কোর্টের প্ল্যাটারই। বন্ধুদেরকে জানিয়ে দেন আপনি ডায়েটে আছেন। তাদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় বিচ্ছিন্ন না থাকার জন্য দরকার হলে পানি কিনে খান। কোক, পেপসি, স্প্রাইট বা এধরনের সব রকম সফট ও এনার্জি ড্রিংক—কার্বোনেটেড বেভারেজ আপনার জন্য পুরাপুরি নিষিদ্ধ। মনে করে নেন, ২৫০ মি.লি. সফট ড্রিংক আপনার ৭ দিনের ডায়েট নষ্ট করে দিতে পারে।

বাড়তি চিনি ও মিষ্টি খাবার খাওয়া একদম বাদ দিয়ে দেন

চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে একটু কষ্ট হবে এক্ষেত্রে। তবে চা যদি আপনার নিয়মিত কাজে মনোযোগের জন্য একান্তই অনিবার্য হয়, তাহলে লেবু চা খাইতে পারেন। লেবু আপনার এম্নিতেও খাইতে হবে। প্রতিদিন অন্তত এক গ্লাস লেবুর শরবত খাবেন; তবে এর সবই চিনি ছাড়া। এছাড়া দিনে অন্তত এক কাপ গ্রিন টি খাওয়া দরকার।

কিন্তু চিনি ছাড়া চা যতটা না উপভোগ্য, তার চাইতে শুগার-ফ্রি কফি কিন্তু বেশ চলনসই। কফি খাওয়ার অভ্যাস (না থাকলে) করতে পারেন। সবাই কফির কথা বললে নেসক্যাফে ছাড়া কিছু দেখতে পান না, তবে চিনি ছাড়া খাওয়ার জন্য নেসক্যাফের চাইতে ম্যাক কফি (Mac Coffee) রেকমেন্ড করব আমি।

ফ্যাশন সচেতন হোন

পরের এই দুইটা পয়েন্ট শুধু তাদের জন্য যারা “দেখতে” মোটা ও শারীরিক গড়ন পাল্টাতে চান। উনারা নিজেদের কাপড়চোপড়ের পছন্দে পরিবর্তন আনতে পারেন। দেহের আকারের জন্য যেসব কাপড় পরে খুব একটা স্বস্তি পান না, ওজন কমিয়ে সেসব পরতে পারাকে আপনার উদ্দেশ্য হিসাবে নিতে পারেন আপনি।

তাছাড়া নিজের পোশাক রীতি নিয়ে সচেতন হওয়া অন্তত একদিক দিয়ে নিজের শরীরের প্রতিই আপনার পর্যবেক্ষণ বাড়ায়। কেতাসচেতন বন্ধু বা কলিগদের সাথে আলাপ বাড়ান। তাদের কাছ থেকে সাজেশন নেন।

মোটিভেশনাল ভিডিও ও লোকদেরকে দেখেন, মোটিভেটেড হন

ওকে, বডি ট্রান্সফরমেশনের ভিডিও দেখাটা কার্যকরী। কেউ শুধু ওজন কমানোর মাধ্যমেই দেখতে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাচ্ছে, এই ধারণাটা সহজাতভাবেই চমৎকারিক। যারা সাকসেসফুলি ওজন কমিয়েছেন, তাদের ইন্টারভিউ দেখেন। যেমন, প্রাথমিক অবস্থায় অভিনেতা ক্রিস প্র‍্যাটের এক্সারসাইজ নিয়ে বলা কথাগুলি আমার কাছে অনেক ইনসাইটফুল মনে হয়েছিল:

“পেছনে তাকালে ৮ মাস বা ৬ মাস কিছুই মনে হয় না। অথচ সামনের কথা চিন্তা করলে ৮ ঘন্টাও অনেক লম্বা সময় লাগে৷ আপনি ফিট হওয়ার চেষ্টা করেন বা না-ই করেন, সময় কিন্তু একই গতিতে আগাতে থাকবে। এখন তাহলে ভেবে দেখেন, ৮ মাস পর নিজেকে কীরকম দেখতে চান আপনি?”

আমার ধারণা ছিল, এমন কিছু লোক আছেন যাদের দেহের গড়নটাই এমন যে তারা যতই ওজন কমান না কেন, তাদের দেখতে সবসময় “মোটা” গোত্রেরই লাগতে থাকবে; যেমন অভিনেতা জোনাহ হিল। অথচ ২০১৭ তে এসে মিস্টার হিল নিজেই আমার ধারণার ভুল ধরিয়ে দিলেন।

ওজন কমানো
অভিনেতা জোনাহ হিল এর বডি ট্রান্সফরমেশন

এছাড়া আরও কিছু ভাবনাগত সুবিধা আমি পেয়েছিলাম। আমার প্রিয় লেখক ও ফিল্ম ক্রিটিক রজার ইবার্টকে একবার ডিরেক্টর ভিনসেন্ট গালো “মোটা শুওর” বলে গালি দেন, কারণ গালো’র সিনেমা “দ্য ব্রাউন বানি” নিয়ে ইবার্ট তার রিভিউতে নেগেটিভ মন্তব্য করেছিলেন। এর জবাবে ইবার্ট বলেন, “একদিন আমি চিকন হয়ে যাব, কিন্তু ভিনসেন্ট গালো তো সবসময়ই ‘দ্য ব্রাউন বানি’ সিনেমার ডিরেক্টর থেকে যাবেন।”

ওজন কমানো
৮৬ পাউন্ড কমানোর আগে-পরে রজার ইবার্ট

ওই ঘটনার দেড় বছর পর ইবার্ট জানান, “কথাটা বলার পর থেকে ৮৬ পাউন্ড ওজন কমিয়ে ফেলেছি আমি। কিন্তু ভিনসেন্ট গালো দেখা যাচ্ছে এখনো ‘ব্রাউন বানি’র ডিরেক্টরই রয়ে গেছেন।”

যাই হোক, শুধু আমার পরিবর্তন দেখেই এখনো পর্যন্ত জিমে ভর্তি হয়েছেন চারজন, আর খাবারের ব্যাপারে সচেতন হওয়াদের সংখ্যা তো তার থেকেও বেশি। তাই সেলেব্রিটিই হতে হবে এমন কোনও আবশ্যকতা নাই; নিজের পছন্দের ব্যক্তিত্বদের ছাড়াও আশেপাশে থাকা বন্ধু, আত্মীয় এবং কলিগদের মধ্যে এই প্রকারের অ্যানেকডোট খুঁজে দেখেন পান কিনা। কাজে দিবে।

পানি খান, অনেকবার করে

প্রতিদিন আপনার শরীরে সবচেয়ে বেশিবার প্রবেশ করা উপাদানটি হতে হবে পানি। দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার পানি খান। এত পানি কীভাবে খাবেন? বাসায়  ও অফিসে এমন সব গ্লাস সংগ্রহ করে রাখুন, যেগুলিতে একবারে অন্তত ২৫০ মি.লি. পানি ভরা যায়। এভাবে করে প্রতি দুই গ্লাসে আপনি হাফ লিটার পানি খেয়ে নিতে পারবেন।

খুব বেশি ঠান্ডা পানি খাবেন না। আর কখনোই শুধু এক গ্লাস পানিতে ক্ষান্ত দিবেন না। যখনই পিপাসা পাবে, অন্তত দুই গ্লাস পানি খান। প্রতি বেলায় খেতে বসার দশ-পনেরো মিনিট আগে দুই গ্লাস করে পানি খেয়ে নিবেন। হ্যাঁ, এত পানি খেলে টয়লেটে আসা-যাওয়া বাড়বে অবশ্যই; সেদিকটা মাথায় রাখবেন।

নো চিট মিল

যারা ডায়েট ও জিম করেন, তাদের কাছে “চিট মিল” টার্মটা অনেক বেশি পরিচিত। রুটিনের একঘেয়েমি থেকে নিবৃত্ত হবার জন্য সপ্তাহের বা মাসের কয়েকটা নির্দিষ্ট দিনে তারা পেট ভরে পছন্দের খাবার খান। ইন্টারেস্টিং তরিকা যদিও, কিন্তু আপনার মূল উদ্দেশ্যের জন্য সমস্যাজনক।

চিট মিল যদি খেতেই হয়, তাহলে সময়ের হিসাবে না, লক্ষ্যের হিসাবে খান। সপ্তাহে একদিন না খেয়ে আপনার ছোট ছোট টার্গেটগুলি পূরণের পর খাবেন। ধরেন, শুরুতেই ঠিক করে নিলেন, আপনার ওজন ৩ কেজি না কমা পর্যন্ত চিট মিল খাচ্ছেন না। এভাবে করে একেকটা টার্গেট সেট করে নিন; একেকটাতে পৌঁছাবেন, আর চিট মিল খেয়ে নিজেকে পুরষ্কৃত করবেন। তবে চিট মিলকে আবার ‘চিট ডে’তে পরিণত করে ফেলবেন না প্লিজ। যা খাবেন, ওই একবেলাতেই। বাকি দুই বেলা ডায়েট অনুযায়ী চলার চেষ্টা করেন।

পরিবারের সহায়তা নেন

নিজের খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তই নেন না কেন, পরিবারের সদস্যদেরকে এর সাথে জড়িত করে ফেলেন। প্রতিদিনকার খাবার নির্বাচনে পরিবর্তন আনা মানে কিন্তু আপনার সম্পূর্ণ লাইফস্টাইলই পালটে ফেলা। কাজেই আপনার যাপন রীতি পাল্টাবেন, অথচ ফ্যামিলির লোকরা লক্ষ করবে না, এই দুরাশায় থাকাটা নিষ্প্রয়োজন।

সকালে, বিকাল, রাত ও দুপুরে ভিন্ন ভিন্ন রকমের খাবার খাওয়া এবং দিনের নির্দিষ্ট সময় ব্যয়াম করা— এর তাৎপর্যই হলো আপনি একটা রুটিনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন। সেই রুটিন থেকে ছোট ছোট বিচ্ছিন্নতাও আপনার মুড সুইং করাবে। সেটা সামাল দেওয়ার জন্য হলেও তো সাপোর্ট দরকার আপনার।

সব ধরনের মুদ্রাদোষ থেকে বের হয়ে আসার ট্রাই করেন

আপনার মাঝে যে রকমের কম্পালসিভ আচরণই থাকুক না কেন, সেটা বদলানোর চেষ্টা করতে হবে। সবকিছু গুছিয়ে রাখা বা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আশেপাশের জিনিসপাতি পরিষ্কার করা—  এরকম শুচিবায়ূ জনিত সমস্যা থাকলেও সেদিকে বাড়তি মনোযোগ দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেন।

এমনকি দাঁত দিয়ে নখ কাটা বা আলাপের সময় একই শব্দ বারবার ব্যবহার করার মতো সাধারণ বদভ্যাসগুলি দূর করাটাও আপনার লাইফস্টাইলে প্রভাব ফেলবে। কারণ আত্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া ওজন কমানো সম্ভব না আসলে, আর এসব গৌণ পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত আপনার মেজাজকে মজবুত করে।