page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

কেমন যাচ্ছে ওপেকের অর্থনীতি?

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন ড. বিপ্লব দাসগুপ্তের কাছে শুনেছিলাম, ১৯৬০ সালে ওপেক গঠনের পর কোনো কোনো দেশে তেল রপ্তানির অতিরিক্ত অর্থ নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। এমন একটি দেশ হচ্ছে নাইজেরিয়া।

১৯৮৮ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্যাব্যাটিক্যাল লীভ নিয়ে নাইজেরিয়ার সকোতু ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিলাম এক বছরের চুক্তিতে। শিক্ষকদের জন্যে ইউনিভার্সিটির বিশাল ফার্নিসড বাসা খালি থাকা স্বত্ত্বেও আমাকে স্বপরিবারে চার মাস ফাইভ স্টার হোটেলে রাখা হয়েছিল। বিদেশ থেকে আগত শিক্ষকদের যত বেশিদিন হোটেলে রাখা যায় তত বেশি কমিশন পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন কর্মকর্তা। হোটেল কতৃপক্ষের জন্যেও এটা ছিল লাভজনক।

সকুতো বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন রফিকুল ইসলাম মোল্লা ইকনমিকসের চেয়ারম্যান। পরবর্তীকালে তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিকসের চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া ইনজিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে ছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এম এস উ চৌধুরী এবং প্রাণরসায়ন বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মতিউর রহমান সাহেব। হাসান সাহেব নামে একজন বাংলাদেশী অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন জাতিসঙ্ঘের কী একটা প্রজেক্টে। এছাড়া ছিলেন বাংলাদেশী শিক্ষক কাবেলী সাহেব, সিনহৌসি সাহেব ও মোস্তফা সাহেব। অনেক যাতায়াত ছিল এঁদের বাসায়। জারিয়াতে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষক ড. গনি সাহেব।

ali ahmad rushdi png

আমরা সাধারণত ডাইনিং রুমে গিয়েই খাওয়া-দাওয়া করতাম। আমাদের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবরা আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন ডাইনিং রুমে না গিয়ে খাবার নিজ রুমে সার্ভ করানোর জন্যে। প্রথম দিকে রুম সার্ভিস একটা ঝামেলা মনে হতো। কারণ খাবার শেষে খাবারের ট্রে আবার রুমের বাইরে রাখাটা একটা বাড়তি কাজ ছাড়াও মনে হতো একটা অশোভনীয় ব্যাপার। তাছাড়া আমার তিন মেয়ের দৌড়াদৌড়ি করারও অসুবিধা হতো বাইরে খাবারের ট্রে ফেলে রাখলে।

কিছু দিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলাম রুম সার্ভিসের সুবিধা কোথায়। আমাদের বাংলাদেশী বন্ধুরা তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে আসতেন হোটেলে আমাদের সাথে দেখা করার জন্যে। অনেক সময় তারা বাড়িতে রান্না করা বাংলাদেশী খাবার সঙ্গে নিয়ে আসতেন আমাদের জন্যে কিংবা একত্রে বসে খাবার জন্যে। অনেক দিন একটানা খাওয়ার ফলে হোটেলের খাবারের প্রতি আমার মেয়েদের আগ্রহ তখন অনেকটা কমে এসেছে। অন্যদিকে অতিথি ছেলেমেয়েদের হোটেলের খাবার খুব পছন্দ। কাজেই বেশির ভাগ সময়ে রুম সার্ভিসের সুযোগ নিতাম আমরা।

আন্তর্জাতিক মানের এই হোটেলে বৌ-ঝি নিয়ে থাকার সুযোগ অনেকে মনে করতেন একটা ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের আগ্রহ তখন একেবারেই শূন্যের কোঠায়। নিজে রান্না করে নিজ হাতে পরিবেশন করে নিজের স্বামী সন্তানদের খাওয়ানো ও অতিথি মেহমানদের আপ্যায়ন বাঙালী গৃহিনীদের আজন্ম সাধ। বুলবুলও এর ব্যতিক্রম নয়। ইউনিভার্সিটির বাসা পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলো সে।

অবশেষে ইউনিভার্সিটির আবাসন অফিসারের শরণাপন্ন হলাম। তিনি একজন আল-হাজি মানে প্রতিবার কিংবা প্রায়ই হজ্বে যান। নাইজেরিয়ায় ধনবান ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গও সাধারণত আল-হাজি নামে পরিচিত। আল-হাজি বললেন, মানুষ হোটেলে থাকার জন্যে টাকা খরচ করে আর আপনি হোটেল ছাড়ার জন্যে আসছেন।

nigeria 22

নাইজেরিয়ার লাগোস শহরে এক ফল বিক্রেতা

আমি বললাম যেভাবেই হোক আমাকে দয়া করুন। আমার মেয়েদের লেখাপড়া নষ্ট হচ্ছে হোটেলে থেকে থেকে।

দয়া তিনি করলেন। তবে হজ্বে যাবার জন্যে কিছু সৌদি রিয়াল চেয়েছিলেন তিনি। হজ্ব করার জন্যে ঘুষ? আমি অবাক হয়েছিলাম বৈ কি! পরে মোল্লা সাহেবের কাছে শুনেছি অনেকেই এখানে হজ্বে যাবার জন্যে টাকা চায় এবং পায়।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম নিজের টাকা ছাড়া হজ্ব হয়?

তিনি বলেছিলেন, হজ্ব না হোক, বিনা শুল্কে সৌদি পণ্য এনে বাজারে বিক্রি করলে অনেক লাভ। আল-হাজি উপাধিটা বাড়তি।

ইউনিভার্সিটির যে বাসাটায় আমরা উঠলাম সেটা ছিল আমার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বড় বাসা। পাঁচ রুমের বাড়ি, সাথে বৈঠকখানা, ফ্যামিলি রুম, ডাইনিং রুম, রান্নাঘর, সার্ভেন্ট কোয়ার্টার্স এবং গ্যারাজ। বাড়ির মাঝখানে ফুল ও ফলের বাগান। বাগানের পরিচর্যা ও বাসার ভিতরে ঘষামাজার জন্যে নিয়োজিত হলো আউদো।

ইউনিভার্সিটির বাসার ইউটিলিটিজ তথা হট ওয়াটার সিস্টেম, বৈদ্যুতিক ও গ্যাস সিস্টেম, ফ্রিজ-টেলিভিশন এসব ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও ইউরোপিয়ান মার্কেট থেকে কেনা। কিন্তু কোনো জিনিস নষ্ট হলে সেগুলো সারানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সরাসরি বদলিয়ে দেওয়া হতো। তাতে করে স্থানীয় ম্যাকানিক থেকে আরম্ভ করে খুচরা বিক্রেতা, পাইকারি বিক্রেতা, আমদানিকারক এবং ইন্ডেন্টার সবাই লাভবান হতো। ক্ষতিগ্রস্ত হতো দেশের সমগ্র সম্পদের প্রকৃত মালিক গরীব জনসাধারণ। পরিকল্পনা ও সুষম বণ্টন ব্যবস্থার অভাবে নাইজেরিয়া প্রচুর তেল সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করতে পারে নি।

nigeria 23

দক্ষিণ নাইজেরিয়ার ইবাদানে পুরনো ধাঁচের কোয়ার্টার। বিদ্যুৎ বা পানির সুব্যবস্থা নাই।

আমরা দেখেছি নতুন নতুন এলাকায় প্রচুর বাড়িঘর উঠেছে অথচ বিদ্যুতের অভাবে সে সব বাড়িঘরে বসবাস শুরু হয় নাই। তৈলসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সার্ভিস স্টেশনে তেলের অভাবে দিনের পর দিন গাড়ি অপেক্ষা করতে দেখেছি। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ নাইজারে তেল বোঝাই ট্রাক চলে যেতে দেখেছি চোরাই পথে। দেখেছি বিএমডব্লিউ, পিজিও এবং মার্সিডিসের ভিড় আর দেখেছি খাবারের গন্ধ পেলেই আল-হাজিদের অবৈধ সন্তানের পাল কী ভাবে ভিড় জমায় দরজার সামনে।

কাবেলী সাহেবদের বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে এমন একটা দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছিলাম একবার। সেখানে কথা হচ্ছিল কী ভাবে দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে কচি কচি মেয়েদের দেহ ভোগ করে শহরের আমির ওমরা ও তাদের বিপথগামী ছেলেরা। ধর্মের দোহাই দিয়ে কিংবা মিথ্যা কুলীনতার দেয়াল টেনে এইসব মেয়ে ও শিশু সন্তানদের পথের ভিখেরি করে দিতে তাদের বাঁধে না এক রত্তিও।

পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাব দেখেছি নাইজেরিয়ার সর্বত্র। তেলসমৃদ্ধ এই দেশে মার্সিডিসের মালিকদেরও দেখেছি জেরিক্যান হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে চলমান গাড়ি থেকে তেল ধার করার জন্যে। কারণ গাড়ির ট্যাঙ্ক কখন তেলশূন্য হয়ে যাবে তা তাদের জানা নেই।

নামাজের সময় হলেই রাস্তাঘাট কিংবা খেলার মাঠ যে যেখানে আছে নামাজে দাঁড়িয়ে যেত। নামাজের যায়গা ঘাস, পাথর কিংবা বালি কিছুই পরোয়া করত না। বুঝি মানুষে মানুষে নাই ভেদাভেদ এই সেই দেশ।

একবার সকুতো বাজার থেকে গাড়িতে ফেরার পথে চৌধুরী ভাবি বুলবুলকে দেখিয়েছিলেন এক নামাজির দৃশ্য। নামাজি একজন প্রাপ্তবয়স্কা মহিলা। দারিদ্রের কারণে তার পরনে উপরের অংশে কোনো কাপড় নেই কিংবা যা আছে তা দিয়ে কিছুই ঢাকা যায় না। মহিলা যখন রুকুতে ঠিক সেই মুহূর্তেই চৌধুরী ভাবি বুলবুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। আমিও সেই মুহূর্তে কিছু না ভেবেই সেই দিকে তাকিয়েছিলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলাম লজ্জায়। একটা অপরাধবোধ চেপে ধরেছিল আমাকে সেই মুহূর্তে। স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির এই যে মিলন সেখানে আবরণ নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু আবরণ প্রয়োজন সমাজের স্বার্থে, সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে। যে সভ্যতা মানুষের প্রয়োজনীয় আবরণ যোগাতে অক্ষম সে কেমন সভ্যতা?

ওপেকের সৃষ্টি এইসব দরিদ্র হতভাগাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয় নি। বিশ্বমানবতার ধর্ম ইসলাম এই সব দীনহীনদের ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও, আল-হাজিদের বংশদর হওয়া সত্ত্বেও, অন্যতম তেলসমৃদ্ধ দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এদের দেখার কেউ নাই। অথচ তাদেরই স্বগোত্রীয় নাইজেরিয়ানরা প্রতি মাসে নিয়মিত ভাবে প্যারিস, লন্ডন ও নিউইয়র্কে যাচ্ছে বাজার করার জন্যে। তাদের ও অন্যান্য তেলসমৃদ্ধ দেশের টাকায় ফুলেফেঁপে উঠছে পাশ্চাত্যের ব্যাংকগুলি। তাদের অর্থনীতি সজীব হচ্ছে আর নিজেদের অর্থনীতি অর্থের অভাবে শুকিয়ে মরছে।

মোল্লা সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নাইজেরিয়ার দুরাবস্থার জন্যে দায়ি কে?

তিনি বলেছিলেন যে কোনো অবস্থার জন্যে কোনো এক ব্যক্তিকে দায়ী করা যাবে না। তবে প্রধানত দায়ী হচ্ছে নাইজেরিয়ার অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচি এবং দুর্নীতিবাজ আমলা শ্রেণী।

সত্তরের দশকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে একটা দারুণ উলটপালট শুরু হয়ে গিয়েছিল। তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রায় সব জিনিসের দামই বেড়ে গিয়েছিল। বিশ্বজনীন মূল্যস্ফীতির ফলে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই টাকার মূল্যমান কমে যায়। মানুষ তখন টাকার বিনিময়ে স্বর্ণ কিনে রাখা শুরু করলো। ফলে স্বর্ণের দামও বৃদ্ধি পেয়ে যায়। এজন্যে তেলের আরেক নাম পড়ে গেল ব্ল্যাক গোল্ড। অর্থাৎ তেলই যেন স্বর্ণ।

তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে তেল রপ্তানীকারক দেশে আগের তুলনায় বেশি অর্থ সমাগম হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু পাশ্চাত্যের শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের ক্যাপিটেল গুডস ও শিল্পোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম অনেক বেশি বাড়িয়ে তেলের দামের বৃদ্ধিজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সমর্থ হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো দেশ, যাদের না আছে তেল না আছে ক্যাপিটে্‌ল, তাদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেবলই ঋণগ্রস্ত হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না এবং নাই।

ব্ল্যাক গোল্ডের দাম বাড়াতে দেশ থেকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করার এক অপূর্ব সুযোগ আসে নাইজেরিয়ান সরকারের হাতে। এক ব্যারেল তেলের দাম ১৯৭০ সালে যেখানে ছিল এক ডলার ৪০ সেন্টের মতো, ১৯৭৩ সালে সেই তেলের দাম উঠে যায় ১০ ডলার ৪৬ সেন্টে। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ব্যারেল প্রতি তেলের দাম আরও পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়।

এর ফলে নাইজেরিয়াসহ বেশ কিছু তেল রপ্তানিকারক দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করে অপচয় করা শুরু করে। তাদের ধারণা ছিল তেলের দাম এভাবেই বাড়তে থাকবে।

কারণ হিসাবে বলা যায়, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি তেলের দাম কমা শুরু করে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের ফলে যুদ্ধের খরচ যোগানোর জন্য উভয় দেশই বেশি হারে তেল উত্তোলন শুরু করে। দেখাদেখি অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশও নিজেদের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ধরে রাখার জন্যে বেশি হারে তেল উৎপাদন শুরু করে।

একই সময়ে বৃটেন ও কানাডায় তেল উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে তেলের বাজারে চাহিদার তুলনায় যোগানের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে নাইজেরিয়ার মতো অনুন্নত ও একমাত্র তেলনির্ভর দেশগুলি বিপদে পড়ে যায়।

নাইজেরিয়ার মোট জাতীয় আয়ের ৯০ শতাংশ আসে তেল থেকে। ১৯৮০ সালে তেল রপ্তানির আয় ছিল মোট ২৬ বিলিয়ন ডলার। ১৯৮২ সালে তা হ্রাস পেয়ে ১২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ১৯৮৩ সালে আরও কমে এই আয় দাঁড়ায় মাত্র পাঁচ বিলিয়ন ডলারে। নাইজেরিয়ার এই নাকাল অবস্থার সাথে পাল্লা দিয়েই সম্ভবত সরকারি কর্মচারীরা অধিক হারে দুর্নীতি করা শুরু করে, যাতে তাদের আয়ের ঘাটতি কমে আসে।

মেক্সিকোর অবস্থাও ছিল নাইজেরিয়ার মতোই অনেকটা। ১৯৮০ সালে মেক্সিকো ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানীকারক দেশ এবং একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা। তেলের দামে সত্তর দশকের ঊর্দ্ধগতি আশির দশকেও বজায় থাকবে এই ধারণা নিয়ে মেক্সিকোর জাতীয় তেল কোম্পানি পেমেক্স (PEMEX) ১৯৭৬-৮১ সময়ের মধ্যে ২২ বিলিয়ন ডলার ধার করেছিল। ১৯৮৫ সালে মেক্সিকোর আনুমানিক তেলের মজুদ ছিল ৭২ বিলিয়ন ব্যারেল, মোটেই সামান্য নয়, তবে মোট ঋণ ছিল ৯৬ বিলিয়ন ডলার, মোটেই স্বস্তিকর নয়।

সৌদি আরব সহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্র বুঝতে পেরেছিল হ্রাসপ্রাপ্ত রাজস্বের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলি কাটছাঁট করা ছাড়া উপায় নাই। উন্নতির গতি বজায় রাখার জন্যে অনেকে আগের জমানো টাকা খরচ করেছে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে ধার করেছে।

অর্থনৈতিক চাপের মুখে নাইজেরিয়া, গেবন সহ অনেক সদস্যই নিজস্ব কোটার চেয়ে বেশি তেল ওপেকের নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে বিক্রয় করা শুরু করে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেছিলেন এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওপেক ভেঙে পড়বে। কিন্তু সৌদি তেলমন্ত্রী আহমেদ জাকি ইয়ামনির দূরদর্শিতার ও যাদুকরি নেতৃত্বের কারণে সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিল। ইয়ামনি তেলের চাহিদার স্থিতিস্থাপকতার ওপর ভিত্তি করে ওপেকের সামগ্রিক উৎপাদনের পরিমাণ ও দাম নির্ধারণ করেন। পরে নাইজেরিয়ার মতো যেসব দেশের কোটার চেয়ে বেশি বিক্রয় করা একান্ত প্রয়োজন তাদেরকে বেশি বিক্রি করতে দিয়ে ওই পরিমাণ উৎপাদন সৌদি আরব নিজের কোটা থেকে কম উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

yameni z

শেখ আহমেদ জাকি ইয়ামনি (জন্ম. ১৯৩০)

১৯৮৪ সালে সৌদি আরব দৈনিক ৪.৭ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন করেছে অথচ ১৯৮০ সালে দৈনিক উৎপাদন ছিল ১০ মিলিয়ন ব্যারেল। একই সময়ে রেভেন‍্যু ১০২.২ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে ৪৪.৬ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছিল।

জাকি ইয়ামনির ফরমুলায় ইকনমিকসের কী আছে জানতে চেয়েছিল আমার মেয়ে লুনা। আমি বললাম, জ্বালানী তেলের সামগ্রিক চাহিদা ইনইলাস্টিক অর্থাৎ দাম কমলে মোট রেভিন্যু কমে যাবে আর দাম বাড়লে মোট রেভিন্যু বৃদ্ধি পাবে। মনে রাখতে হবে এখানে মোট চাহিদার কথা বলা হয়েছে। যদি ওপেকের অন্য সব সদস্যদের উৎপাদন ও দাম অপরিবর্তিত থাকা অবস্থায় কোনো একজন সদস্য দাম কমায় তখন সেই দেশের তেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং রেভিন্যুও আগের তুলনায় কম হ্রাস পাবে কিংবা বাড়তেও পারে।

লুনা জিজ্ঞেস করেছিল, আর যদি সবাই দাম কমায় তাহলে?

আমি বললাম, তাহলে তো আর কার্টেল থাকলো না এবং প্রত্যেক দেশেই তেলের রেভিন্যু কমে যাবে। অর্থনীতির ভাষায় ইনইলাস্টিক ডিমান্ড মানেও তাই।

বিভিন্ন সময়ে তেলের দাম ওঠানামা করলেও ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ১৪০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। গত বছর জুন মাসে দাম ছিল ১১৫ ডলার। বর্তমানে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪৯.১৪ ডলারে (২ এপ্রিল ২০১৫)। ভবিষ্যতে তেলের দাম বাড়বে না কমবে তা নির্ভর করে ওপেকের বাজারশক্তির ওপর। অর্থাৎ যোগানের পরিমাণ কমিয়ে রাখার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে একতা বজায় আছে কিনা তার ওপরে।

এছাড়া ওপেকের বাইরে যেসব তেলসমৃদ্ধ দেশ ও যোগানদাতা রয়েছে তাদের তরফ থেকে কী ধরনের প্রতিযোগিতা আসবে তার ওপরেও নির্ভর করবে ভবিষ্যতে তেলের দাম কী হবে।

সাধারণতঃ কোনো দুই দেশে যুদ্ধ লাগার উপক্রম হলে কিংবা রাজনৈতিকে ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ, চীনের অপ্রতিরোদ্ধ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা কোরিয়ার আন্তর্জাতিক মিসাইল নিক্ষেপ তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ ছিল। আবার যখন অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় তখন তেলের দামেও তার প্রভাব পড়ে।

প্রশ্ন উঠতে পারে এই যে গত বছরের তুলনায় এখন তেলের দাম প্রায় অর্ধেক তার মানে কি এখন পৃথিবীতে উত্তেজনা কম।

আমি বলবো, ঠিক তা না। এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশে গত এক বছরে তেলের চাহিদা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। যার ফলে তেলের দাম কমে এসেছে। এ ছাড়া গত কয়েক বছর ধরে বেশি দাম থাকার ফলে অনেক ব্যবসায়ী উত্তোলন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এইসব নতুন পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত ব্যয় বান্ধব।

উত্তর আমেরিকার ডাকোটা ও আলবার্টাতে এই নতুন পদ্ধতি (হাইড্রোক্রেকিং এবং হরাইজন্টাল ড্রিলিং) ব্যবহার করে তেল উৎপাদন করা হচ্ছে। যেসব তেলের খনিতে আগে প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদন অলাভজনক ছিল (hard-to-extract crude) এখন সেইসব খনি থেকে লোকসান না দিয়েই উৎপাদন করা যায় (breakeven price)।

বন্ধু-বান্ধবরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে থাকে, তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়াতে যদি নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে তাহলে এখন তেলের দাম কমার কারণে নতুন ব্যয়বান্ধব পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে? নাকি চলবে?

সুন্দর প্রশ্ন, তবে উত্তরটি কঠিন।

ব্যবসা বাণিজ্যের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে কোনো বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্তব্য অর্থের পরিমাণ (return) সেই বিনিয়োগের সমগ্র খরচের চেয়ে বেশি হতে হবে। কোনো বিশেষ সময়ে ব্যবসায়ীদের সামনে যে কয়েকটা প্রজেক্ট থাকে সেগুলোকে প্রাপ্তব্য লাভের হার অনুপাতে সাজানো হয় এবং সবচেয়ে বেশি লাভজনক প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা হয়। এই সাধারণ নিয়মের প্রায়োগিক বাস্তবতা হচ্ছে, বিনিয়োগের প্রকৃত খরচ কত হবে এবং প্রাপ্তব্য রেইট অব রিটার্ন (Rate of Return) কত হবে কিংবা সেই রিটার্নকে বর্তমান মূল্যে রূপান্তরিত করার জন্যে কী ডিসকাউন্ট রেইট ব্যবহার করা হবে তা জানা আবশ্যক এবং তা নির্ণয় করা সুকঠিন ব্যাপার। এজন্যে তারা একাধিক ফোরকাস্ট বা পূর্বানুমান করে থাকে যাতে করে একটা মধ্যম পন্থা অবলম্বন করলে কী দাঁড়ায় তা দেখা যায়।

বলাবাহুল্য, এই সব ফোরকাস্ট একেক এলাকার জন্য একেক রকম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফোরকাস্ট বিভিন্ন রকম। এই কারণে আগামিতে তেলের দাম বাড়বে না কমবে তা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।

সম্প্রতি তেলের দাম কমার ফলে আমেরিকা ও কানাডায় শিলা (shale oil, tight gas, tight oil) থেকে প্রাপ্তব্য তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে কিনা এটা একটা বিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের জানতে হবে এইসব খনিতে আগে উৎপাদন শুরু হয় নি কেন। সহজ উত্তর, হয় মানুষ আগে জানতো না এখানে তেল আছে অথবা এসব খনিতে তেল উৎপাদন অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল ছিল। শেষোক্ত কারণটিই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ব্যয় যখন কমেছে তখন উৎপাদন শুরু হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন শুরু হওয়ার ফলে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যার ফলশ্রুতিতে তেলের দাম কমে গেছে।

দামের এই নিম্নগতি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলিকে কিছুটা নিরুৎসাহী করেছে বটে তবে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা নতুন অভিজ্ঞতাও লাভ করেছে। নতুন এই পদ্ধতিগুলির খুটিনাটি অনেক বিষয় যা ওদের আগে জানা ছিল না এখন তা জানতে পেরেছে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় লার্নিং বাই ডুয়িং (Learning by Doing or Chenery Model)।

এইসব বিনিয়োগকারীরা ঠিক কখন উৎপাদন বন্ধ করবে আন্ডারগ্রাজুয়েট ক্লাসে বহুবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি আমি। বরাবরই আমি নোবেল লরিয়েট জোন রবিন্সনের (Joan Robinson) উদ্ধৃতি দিয়েছি। যদিও আরো অনেকেই উৎপাদন ব্যয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

উৎপাদন ব্যয় দুইভাবে বিভক্ত। প্রথমত, যে কোনো ব্যবসার জন্যে কিছু স্থায়ী বিনিয়োগের দরকার যেমন জমি, যন্ত্রপাতি, বিল্ডিং, ইন্স্যুরেন্স প্রভৃতি। এই শ্রেণীর ব্যয়কে বলা হ্য় অপরিবর্তনীয় বা ফিক্সড খরচ। দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের জন্যে প্রয়োজন শ্রমিক, কাঁচামাল, জ্বালানী প্রভৃতি। এই শ্রেণীর খরচকে বলা হয় পরিবর্তনশীল খরচ বা ভেরিয়েবল কস্ট।

pipeline2

বাড়ির পাশে পাইপলাইন, নৌকায় দুই শিশু। নাইজেরিয়া।

ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করার আগে চিন্তা করে এই বিনিয়োগ থেকে উৎপাদনের সামগ্রিক খরচ (Fixed + variable) মিটানো সম্ভব কিনা। কিন্তু বিনিয়োগ করে ফেলার পর যদি যথেষ্ট মুনাফা না হয় তাহলে ব্যবসা ছেড়ে দেবার চিন্তা করবে। কিন্তু ব্যবসা ছেড়ে দেওয়াও সব সময় সহজ ব্যাপার নয়। এমতাবস্থায় মালিক দেখবে ব্যবসা চালিয়ে গেলে অন্ততঃ ভেরিয়েবল কস্ট উঠে আসে কিনা। যদি ভেরিয়েবল কস্ট মিটানোর পর কিছু বাকি থাকে তা দিয়ে তাহলে ফিক্সড কস্টের কিছুটা হলেও আদায় করা সম্ভব।

এই অবস্থায় অবশ্য দীর্ঘদিন চলতে পারবে না। যখনই নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে তখনই সে দেখবে যে প্রাপ্তব্য আয় তার সব খরচ পুষিয়ে লাভজনক হবে কিনা। অর্থাৎ বিক্রয়লব্ধ টাকা দ্বারা সামগ্রিক ব্যয় (Fixed + variable) মিটানো সম্ভব কিনা।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA) মনে করে ১৯১৫ সালে আমেরিকান শিলা তেল উৎপাদন দৈনিক ৯৫৫,০০০ ব্যারেলে নেমে আসবে, ১৯১৩ সালের শেষের দিকে যা ছিল ৩.২২ মিলিয়ন ব্যারেল। অন্য দিকে সৌদি আরব আশা করছে তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমেরিকার বর্তমান তেজি ভাব (boom) অচীরেই নিস্তেজ হয়ে আসবে।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।