page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

ওয়েলকাম, ড্রোন বিধ্বংসী লেজার কামান!

জর্ডান গোলসন-এর লেখা থেকে অনুবাদ
অনুবাদ:

আপনার ড্রোনেই বইসা থাকেন। যেহেতু ভেতরে মানুষ না থাকা ড্রোনরে ভস্ম করবে এমন লেজার কামান বানাইছে বোয়িং।

নিউ মেক্সিকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অ্যারোস্পেস কোম্পানির নতুন এই অস্ত্র প্রযুক্তিটার মহড়া হইছে এই সপ্তাহে, জনসমক্ষে। স্টার ওয়ারসে আপনারা যেমন দেখছেন, ব্যাপারটা ঐ রকম আকর্ষণীয় না—এখানে কোনো ছুটন্ত আলোর স্তম্ভ নাই, “পিউ” “পিউ” শব্দও নাই । তারপরও এইটা লেজার কামানই, কাজের। আপনার ড্রোনরে মাটিতে নামাইতে পারে। লোকে এমন এমন জায়গায় ড্রোন চালায় যেখানে এইসব চালানোর কথা না। যেমন যেইসব রুটে এয়ারপোর্টের ফ্লাইট, ভয়াবহ আগুন লাগছে যেখানে তার উপর দিয়া অথবা হোয়াইট হাউজের লনে।

laser-98

লেজার কামানের পরীক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত ড্রোন।

ভাগ্য ভালো যে এইসবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো মারাত্মক কিছু ঘটে নাই। মানে বেসামরিক মানুষ বিহীন কোয়ার্ডকপ্টার কিংবা প্লেনে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটে নাই।

তবে সরকার এবং সামরিক বাহিনী বিস্ফোরক এবং রাসায়নিক অস্ত্রবাহী ড্রোনের সম্ভাবনা নিয়া যথেষ্ট ভীত। এখন তো পর্নোগ্রাফি নিয়াও—মানে যেখানে যেগুলা থাকার কথা না সেইখানে সেসবের থাকাজনিত—ভয়।

এখন এইসব ড্রোন সামলানোর শ্রেষ্ঠ পথ নিয়া নানা রকম থিওরি আছে। আইডাহোর একটা কোম্পানি বিশেষ ধরনের অ্যান্টি-ড্রোন শটগান শেল তৈরি করছে। কিছু কিছু সংস্থা জ্যামিং টেকনোলজি নিয়া কাজ করতেছে, তারা চাইতেছে দূর থেকে চালানো এই যানগুলার অপারেটর আর যন্ত্রটার মাঝে যোগাযোগের মাধ্যমটারে আটকায় দিতে।

নিউইয়র্কের ফায়ার ফাইটাররা ড্রোন মোকাবেলার কায়দাটা একদম সহজ রাখছেন। আগুন লাগা বাড়ির উপর কৌতূহলী এই উপদ্রবগুলার দিকে তারা হোস পাইপ তাক করেন।

এই সমস্ত কায়দা ভুইলা যাইতে পারেন। বোয়িং এর মতে ড্রোন মারার সব থেকে ভালো পথ হইতেছে নিখুঁত লেজার দাগায়ে সেটারে খুঁত কইরা নিচে নামানো। তার মানে বোয়িং এমনই একটা অস্ত্রপ্রযুক্তি প্রস্তুত করছে যেটা আসলে এটাই করতে পারে—ফলস্বরূপ প্রযুক্তিটা হয়তো একসময় লাগোরাদিয়া থিকা পেন্টাগন সর্বত্রেই বসানো হইতে পারে।

বোয়িং বুধবার সকালে নিউ মেক্সিকোর আলবাকার্কিতে তাদের এই কম্প্যাক্ট লেজার অস্ত্রপ্রযুক্তিটা সংবাদমাধ্যমরে দেখায়। এইটা আকারে বেশ ছোট, এই অস্ত্রপ্রযুক্তিটা আগের বছরে তাদেরই উচ্চশক্তিসম্পন্ন বহনযোগ্য যে লেজার ডেমোনস্ট্রেটর দেখাইছিল তার থিকা অনেক বেশিমাত্রায় বহনযোগ্য।

laser-57

বোয়িং এর লেজার কামান

মহড়ায় বোয়িং, এইটা যে কত দ্রুত ড্রোনরে ছারখার করতে পারে তার নমুনা দেখায়। সেই জন্য তারা এই লেজার একটা নিশ্চল, পুরু ইউএভি (আনম্যানড অ্যারিয়েল ভেহিকেল) শেলের উপর দাগায়, এর সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে মাত্র দুই সেকেন্ডে টার্গেটরে গলায় ফেলে। নিরাপত্তার খাতিরে সেইখানে ভিড় করতে দেয়া হয় নাই, দুই কিলোওয়াট অদৃশ্য লেজারে যেন কেউ অন্ধ না হয়ে যায় সেই ব্যাপারেও সাবধানতা জারি করা হইছিল।

কোনো বিস্ফোরন না, না কোনো দৃশ্যমান রশ্মি। স্টার ওয়ার্সের অ্যালডেরান নিশ্চিহ্ন করার মত মোটেই না। বরং খুব দামি আতস কাচ দিয়ে একটা পিঁপড়া পোড়ানোর মতই অনায়াস।

যদিও নির্ধারিত লক্ষ্যে তীব্র লেজার দাগাইতে পারে, কিন্তু সেই হিসাবে এটা বেশ ছোট আকৃতিরই। চাইরটা স্যুটকেস সাইজের বাক্সে এটারে আঁটানো যায়। আর দুইজন সেপাহি কিংবা টেকনিশায়ান কয়েক মিনিটের মধ্যে সেইটারে জোড়া লাগাইতে পারে। আপাতত এই প্রযুক্তির লক্ষ্য হচ্ছে স্পর্শকাতর জায়গাগুলা থেকে ড্রোন তাড়ানো।

এই নয়া অস্ত্রপ্রযুক্তিটা স্লেজহ্যামারের থিকা ধারালো। একটা “গিম্বল” যেটা মূলত চাইরদিকে ঘুরতে পারা মটর। এটা লেজার এবং ক্যামেরা যে কোনো দিকে ঘুরাইতে পারে। এইটা লক্ষ্য নির্ধারণ করে একদম মাপমত জায়গা ঠিক কইরা ফেলতে পারে টার্গেটের। এখন আপনার পেছনে স্পাই ড্রোন লাগছে, তারেও খসায় মাটিতে ফেলতে পারবেন। বিস্ফোরক বহন করতেছে এমন ড্রোনরে যদি আপনি পুরাপুরি ধ্বংস করতে চান তাও পারবেন। বোয়িং এইটার রেন্জ ঠিক কইরা দেয় নাই। এদের প্রতিনিধিরা জানাইছে, আপনি যদি বায়ানোকুলার দিয়াও দেখতে পারেন, এমন টার্গেটরে এইটা মারতে পারবে।


Boeing’s Compact Laser Weapons System: Sets up in minutes, directs energy in seconds

টার্গেটের গতি ও দূরত্বভেদে এইটা এক দুই ইঞ্চি এদিক ওদিক লক্ষ্যে লেজার ছুঁড়তে পারে। যেহেতু লেজারের গতি আলোর গতির সমান, সেই কারণে এটার নিখুঁত হওয়াটা সোজা—আপনার টার্গেটরে ঐভাবে অনুসরণ করার দরকার নাই। এখন এইটার সীমাবদ্ধতা যেইটা আপাতত, গিম্বলের গতি, যেটা একটু শ্লথই।

একটা সাধারণ এক্সবক্স৩৬০ আর কাস্টম টার্গেটিং সফটওয়্যার ইন্সটল থাকা একটা ল্যাপটপ থাকলেই এই লেজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এক্সবক্স৩৬০ এর সুবিধা হইলো একটা ভাইঙ্গা গেলে পরে আপনি ব্যারাক থিকা আর একটা নিয়া আইসা সহজেই এরে বদলাইতে পারবেন। লক্ষ্য একবার আওতায় আসলে, প্রযুক্তিটা স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠে। এখনকার যে নমুনাটা দেখানো হইছে তাতে এটা কেবল স্থির জায়গা থেকে লক্ষ্যভেদ করতে পারে। তবে অল্প কিছু মেরামত করেই এরে চলন্ত গাড়ি কিংবা জাহাজ অথবা উড়োজাহাজ থেকেও ব্যবহার করা যাবে।

বোয়িং লেজার অ্যান্ড ইলেক্ট্রো অপটিক্যাল সিস্টেমস-এর পরিচালক ডেভিড ডেইয়ং বলতেছেন যে এটা কম দামে ড্রোন হুমকি প্রতিহত করার একটা উদাহরণ। বোয়িং এর দাম এখনো জানায় নাই। তবে জানাইছে যে খরচটা এককালীন।

প্রযুক্তিটা কিইনা ফেললে পরে খরচটা খালি বিদ্যুৎ। যেহেতু প্রযুক্তিটার গিম্বলটাই একমাত্র ঘোরে, তা বাদে বাকি অংশগুলা নিশ্চল তাই সাধারণ মেইনটেনেন্সে রাখলেই এইটা বেশ কয় বছর কাজ করবে বলেই আশা করতেছে কোম্পানিটা। সামরিক যানের ভেতরে জেনারেটর থেকেও তা নেয়া যাইতে পারে, একেবারে বহনযোগ্য বানাইতে চাইলে ব্যাটারি প্যাকও ব্যবহার করা যাইতে পারে। এর জন্য বোয়িং অনেক রকম ব্যাটারি সমাধান বের করছে, যখন যেমন লাগতে পারে। কিন্তু সবগুলার ক্ষেত্রেই অল্প কয়টা লেজার শটের জন্য বেশ ভালো রসদ জোগাইতে হয়।

boing-company

ছবিতে বোয়িং-এর শিকাগো হেডকোয়ার্টার। বোয়িং দুনিয়ার সব থেকে বড় অ্যারোস্পেস কোম্পানি। বাণিজ্যিক জেট ও প্রতিরক্ষা, মহাকাশ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির মার্কেট লিডার। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম রপ্তানিকারক বোয়িং কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাথে সম্পর্ক থাকা ১৫০ টা দেশে তার বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সেবা রপ্তানি করে। সংস্থার বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সেবাগুলির মধ্যে আছে বাণিজ্যিক ও সামরিক বিমান, স্যাটেলাইট, অস্ত্র, ইলেকট্রিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, বিশেষ রকমের উন্নত তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আর দক্ষ লজিস্টিক এবং প্রশিক্ষণ।

স্টার-ওয়ার্সে অনুপ্রাণিত প্রযুক্তিটার ব্যাপারে কোম্পানির প্রত্যাশা এইটা বছর দুই একের মধ্যে বাজারজাত করা যাবে। অবশ্য এর ঘষামাজা চলতে থাকবে তারপরেও কয়েক বছর। তবে লেজার কখনোই এখনকার যে অস্ত্র প্রযুক্তিগুলা আছে যেমন ধরেন রেথিয়নের প্যাট্রিয়ট মিসাইল কিংবা ইসরাইলি আয়রন ডোমের বিকল্প হবে না। ডেইয়ং এক্ষেত্রে বলতেছেন, যেইটার কাজ যেটা, সেইটা সময় ও পরিস্থিতি বুইঝা তাই থাকতেছে। মিসাইলের কাজ মিসাইল, লেজারের কাজ লেজারই করবে।

যেহেতু এইটা সমরাস্ত্র, বিদেশের কোনো সরকারের কাছে বিক্রির আগে তাদের অস্ত্র রপ্তানির বিধিনিষেধ নিয়ে কাজ করতে হবে। বেসামরিক সংস্থা যেমন বিমানবন্দর কিংবা জেলখানার এখনকার যে বিধিনিষেধ আছে তার মধ্যে থিকা এসব তারা ব্যবহার করতে পারবে কিনা সেই জায়গাটাও পরিষ্কার না, এমনকি এই রকম কিছুতে কোন আইন প্রয়োগ হবে তাও জানা যায় নাই।

সব থিকা আশাভঙ্গের জায়গা এইটাই যে এই লেজার “পিউ” “পিউ” শব্দ করে না। অবশ্য একজন বোয়িং প্রতিনিধি জানাইছেন তারা কন্ট্রোল স্টেশনে বেশ কয় রকম সাউন্ড ইফেক্ট যোগ করার কথা ভাবতেছেন। এইটা অবশ্য ঐখানকার অপারেটরদের সুবিধার জন্য। তারা অনেক রকম কাজ করেন যেহেতু, যখন লেজার প্রযুক্তিটা স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠবে তারা যেন সেইটারে চোখে চোখে রাখতে পারেন।

এমনও তো আশা করা যাইতে পারে, বোয়িং লেজার-প্রেমীদের হতাশা কমাইতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইট অ্যান্ড ম্যাজিক ভাড়া কইরা ফেললো।

সূত্র: wired

About Author

ফারুক আব্দুল্লাহ
ফারুক আব্দুল্লাহ

জন্ম ১১ জুলাই ১৯৮৮। ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র।