page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড – ১০

আগের পর্ব প্রথম পর্ব

সিজন ১, এপিসোড ১০ – (দ্য বাইক্যামেরাল মাইন্ড) 

দশ নাম্বার এপিসোডের মাধ্যমে ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র প্রথম সিজন শেষ হল। সে হিসাবে, ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র প্রথম সিজনের জন্য এটাও শেষ লেখা।

দশ নাম্বার পর্ব দেখার পর মনে হয়েছে যে হয় দশ নাম্বার পর্বের এই গল্প একেবারে শুরু থেকেই রেডি ছিল, নয়ত ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র সেকেন্ড সিরিজ বানানোর ঘোষণা দেওয়ার পরে সেটা বিবেচনা করে দশ নাম্বার পর্বের গল্প রেডি করেছে তারা।

টিভি সিরিজের ক্ষেত্রে যেটা হয় যে, একেকটা পর্ব একেকজন ডিরেক্টর পরিচালনা করেন। আর যিনি সিরিজের ক্রিয়েটর তিনি পুরা ব্যাপারটা তত্ত্বাবধান করেন।

এই দশ নাম্বার পর্ব, অর্থাৎ শেষ পর্ব পরিচালনা করেছেন সিরিজের ক্রিয়েটর জোনাথন নোলান নিজেই। লিখেছেন জোনাথন নোলান ও তার স্ত্রী লিসা জয় নোলান। জোনাথন নোলান অবশ্য সিরিজের প্রথম পর্বও পরিচালনা করেছিলেন।

দশ নাম্বার এপিসোডের নাম ‘দ্য বাইক্যামেরাল মাইন্ড’।

বাইক্যামেরাল মাইন্ড—এই টার্মটা হিউম্যান ব্রেইন ও সাইকোলজির সাথে রিলেটেড। বাইক্যামেরাল মাইন্ড আসলেই একটা অদ্ভুত আইডিয়া। বাইক্যামেরাল মাইন্ড আইডিয়াটা সায়েন্টিফিক, এটা প্রাথমিক অবস্থায় যেভাবে কাজ করে সেটার ব্যাখ্যাও সায়েন্টিফিক, কিন্তু পরবর্তীতে যেভাবে কাজ করে সেটার ব্যাখ্যা হয়ে যায় মেটাফিজিক্যাল। সায়েন্স আর মেটাফিজিক্স আসলে একই জিনিস নিয়ে কাজ করে। কিন্তু সায়েন্সের বক্তব্য ডেফিনেট, সায়েন্স যা বলে তার একটা বস্তুগত প্রমাণ হাজির করে। আর মেটাফিজিক্স এই রিয়ালিটি বা বাস্তবতার ফান্ডামেন্টাল বিষয়গুলি নিয়ে অ্যাবস্ট্রাক্ট একটা আইডিয়া দেয়।

মেটাফিজিক্স  শেষপর্যন্ত বলে যে ইউনিভার্সের সবকিছুর কারণ আসলে মানুষের অস্তিত্বই। বা মেটাফিজিক্স এত অ্যাবস্ট্রাক্ট যে আমি বুঝি না। এবং এটা নিয়ে বলতেও চাই না। কিন্তু ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র শেষ পর্বে এমন কিছু আছে যে মেটাফিজিক্সের প্রসঙ্গ আসবে।

বাইক্যামেরালিজম হল সাইকোলজির একটা হাইপোথিসিস। মানুষের ব্রেইনের একটা নিউরোলজিকাল মডেলের নাম বাইক্যামেরাল মাইন্ড। এই হাইপোথিসিস অনুযায়ী, কোনো একটা অবস্থায় হিউম্যান মাইন্ড বা মানুষের ব্রেইন দুইটা অংশে বিভক্ত থাকে। ব্রেইনের একটা অংশ বলে বা নির্দেশ দেয় এবং আরেকটা অংশ শোনে বা সেই নির্দেশ মানে। মানুষের বিভিন্ন হ্যালুসিনেশন, অলৌকিক কোনো এনটিটির সাথে কথা বলা বা শোনা, বাচ্চাদের কাল্পনিক সঙ্গী তৈরি করে নেওয়া এই সবকিছু ঘটে কারণ ব্রেইন বা হিউম্যান মাইন্ড তখন বাইক্যামেরাল পর্যায়ে চলে আসে।

‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’ মানুষের ব্রেইনের যে কনশাসনেসের কথা বলছে আগের পর্বগুলিতে, যে কনশাসনেস হোস্ট বা রোবট বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নাই, সেই কনশাসনেস-এর উৎপত্তি ব্রেইনের বাইক্যামেরাল পর্যায় থেকে।

‘বাইক্যামেরাল মাইন্ড’ আইডিয়াটা দিয়েছিলেন জুলিয়ান জায়নেস নামের একজন আমেরিকান সাইকোলজিস্ট। ১৯৭৬ সালে, জুলিয়ান জায়নেস তার ‘দ্য অরিজিন অব কনশাসনেস ইন দ্য ব্রেকডাউন অব বাইক্যামেরাল মাইন্ড’ বইয়ে বলেন যে, ৩০০০ বছর আগে সব মানুষের মাইন্ড বা ব্রেন বাইক্যামেরাল পর্যায়ে ছিল, এবং তখনকার জন্য এটা খুব নরমাল একটা ব্যাপার ছিল। সমগ্র মানব প্রজাতির ব্রেইন তখন বাইক্যামেরাল স্টেটে ছিল। মানুষের ব্রেইনের একটা অংশ সচেতন অন্য অংশকে  কমান্ড দিত বা কন্ট্রোল করত। পরে এই বাইক্যামেরাল স্টেট ভেঙে যায়  এবং এই পর্যায় থেকে হিউম্যান মাইন্ডের কনশাসনেস তৈরি হয়। কনশাসনেস কি তা ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র আগের লেখাগুলিতে বলা হয়েছে। কনশাসনেস হল হিউম্যান ব্রেইনের নিজেকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতা, এবং এই কনসাশনেস আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে হিউম্যান ব্রেইনে—এই কনশাসনেসের কারণেই হিউম্যান ব্রেইন নিজে নিজেই চিন্তা করে  বা কোনো ইনফরমেশন প্রসেস করে ও এর ডিসিশন নেওয়ার সামর্থ্য তৈরি হয় এবং ক্ষমতা বাড়তে থাকে।

কম্পিউটার সায়েন্সের ভাষায় এটাকে ব্যাখ্যা করতে হলে বলতে হবে—বাইক্যামেরাল স্টেটে আসার পর হিউম্যান ব্রেইন বুঝতে পারে যে তার নিজের ফাংশনের জন্য আরো বেটার কোড দরকার, তখন সে ‘কনশাসনেস’-এর কোড তৈরি করে। এই কোড শুধু কনশাসনেস তৈরিই করে না, এই কনশাসনেস নিজেকে দিয়েই নিজেকে ডেভেলপ করে। অর্থাৎ, কনশাসনেসের এই ডেভেলপমেন্ট পুরাই রিকারসিভ ওয়েতে কাজ করে।

মডার্ন হিউম্যান ব্রেইনের সাথে বাইক্যামেরাল হিউম্যান ব্রেইনের পার্থক্য কী?—বাইক্যামেরাল হিউম্যান ব্রেইনের একটা অংশ কমান্ডিং ভয়েস হিসেবে কাজ করে। মানুষের কোনো ডিসিশন নিতে হয় না, যেহেতু সে কমান্ডিং ভয়েস অনুসরণ করতেছে। কিন্তু মডার্ন হিউম্যান ব্রেইনে এই কমান্ডিং ভয়েস আর নাই, ফলে কনশাসনেসের কারণে যে কোনো ডিসিশনকে হতে হয় সেলফ-ডিসিশন।

এই কনশাসনেস কী দিয়ে কাজ করে এবং কীভাবে কাজ করে সেটা বলতে গিয়ে ‘ভাষা’ বা ল্যাঙ্গুয়েজের প্রসঙ্গ আসে। আর তখনই এই কনশাসনেসের কাজ করার বিষয়টা মেটাফিজিক্যাল হয়ে ওঠে।

তবে, আমার দিক থেকে খুবই ইন্টারেস্টিং লাগে যে এখন কম্পিউটার সায়েন্স এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করার নিয়ন্ত্রণ মেটাফিজিক্সকে নিতে দেয় না। কম্পিউটার কোড যেভাবে কাজ করে সেটা দিয়ে এই কনশাসনেসের কাজকে অনেকাংশেই ব্যাখ্যা করা যায়। মেটাফিজিক্স যেইখানে বলে, গড ইজ লিভিং ইনসাইড  ইউ; কম্পিউটার সায়েন্স বলে, নো, গড প্রোগ্রামড, সো ইউ আর জাস্ট অ্যান অবজেক্ট অব গড।

কম্পিউটার সায়েন্স যেসব কারণে আমাকে ফ্যাসিনেট করে, এটা তার একটা। কম্পিউটার রেভ্যুলেশনের পরে সিভিলাইজেশনের বা মানুষের চিন্তাগত অবস্থা কী সেই আলোচনা এই লেখায় সম্ভব না।

হিস্ট্রিক্যালি, উই কেইম টু দিস হোল নিউ নোশন অব গড।

‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র ফার্স্ট সিজন এই তিনটা জিনিস দেখাল—

১. উন্নত রোবট—বা প্রি-বাইক্যামারেল স্টেট-এর হিউম্যান বিইং। এরা একেবারে কোড অনুযায়ী ফাংশন করে। কোডের মাধ্যমে মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি এদের মধ্যে খুবই সাকসেসফুলি ইমপ্লিমেন্ট করা হইছে।

২. বাইক্যামারেল স্টেট এর রোবট—হিউম্যান ব্রেইনের বাইক্যামারেল স্টেটের আইডিয়া এদের মধ্যে এপ্লাই করা হইছে। কিছু হোস্ট বাইক্যামারেল স্টেট-এর কমান্ডিং ভয়েস হিসেবে আরনল্ডের ভয়েস শুনতে পায়।

৩. বাইক্যামারেল স্টেট থেকে প্রায় কনশাসনেস পাওয়া রোবট—কয়েকজন হোস্টকে  মডার্ন হিউম্যান ব্রেইনের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়েছে। যেমন ডোলোরস, মেইভ এবং বার্নাড। শেষ পর্বে এসে এটা বোঝা যায় যে ডোলোরস আর মেইভের ইন্টেলিজেন্সে কনশাসনেস ভালোভাবে কাজ করতেছে। একেবারে একশ পার্সেন্ট হয়ত না।

‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র শেষ পর্বের কাহিনিতে আসি।

ডোলোরসের মনে পড়তে থাকে, ডোলোরসকে তৈরি করার পরে আরনল্ড তার ভিতরে নিজের ভয়েস দিয়ে দেয়। আরনল্ড মনে করেছিল কনশাসনেস পাওয়ার জন্য ইন্টেলিজেন্স পিরামিডের মডেলে কাজ করে; সবার নিচে মেমোরি, সেটা পার হয়ে গেলে তার উপরে ইম্প্রোভাইজেশন, এবং সেটা পার হয়ে সবার উপরে কনশাসনেস।

আরনল্ড বুঝতে পেরেছিল কনশাসনেসের মডেল আসলে পিরামিডের মত কাজ করে না। কনশাসনেস আসলে মেইজের মডেলে কাজ করে। মেইজের যত ভিতরে যাওয়া যাবে, তত কনশাসনেসের কাছাকাছি যাওয়া যাবে। কনশাসনেস প্রাইমারীভাবে ডেভেলপ হওয়ার পরে, যতবার এটা কাজ করবে, প্রতিবারই মেইজের সেন্টারের দিকে নিয়ে যাবে, অর্থাৎ আল্টিমেট কনশাসনেসের দিকে। অর্থাৎ প্রোগ্রামটা রিকারসিভ ওয়েতে কাজ করতেছে। প্রতিবারই কনশাসনেস নিজেই নিজেকে ডেভেলপ করতেছে এবং মেজের সেন্টারের দিকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে।

এই মেইজ আসলে হোস্টদের কনশাসনেস অর্জন করার মেইজ।

কিন্তু আরনল্ডের এই আইডিয়াটা ফোর্ড নেয় নি। ফোর্ড বলেছিল, হোস্টরা কনশাসনেস অর্জন করলে হিউম্যান বিইংরা তাদেরকে শত্রু হিসেবে দেখবে। সুতরাং হোস্টদেরকে মোটামুটি প্রাইমারি স্টেজেই রাখা উচিৎ।

কিন্তু কিছু হোস্টের মধ্যে আরনল্ড কনশাসনেসের প্রোগ্রাম দিয়ে দিয়েছে। আরনল্ড জানে যখন এই হোস্টরা পুরোপুরি কনশাসনেস অর্জন করবে, তখন এই ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’ তাদের জন্য একটা দোজখে পরিণত হবে, তারা সত্যিটাকে নিতে পারবে না। আরনল্ড চেয়েছিল এই কনশাসনেসের লুপ শুরুর আগেই একে ভেঙে দিতে। তাই আরনল্ডের ইচ্ছা ছিল পার্কটাকে শুরুর আগেই বন্ধ করে দেওয়া।

ফ্ল্যাশব্যাকের এই ঘটনার সাথে বর্তমানের ঘটনা প্যারালালি এগিয়েছে।

বর্তমানের টাইমলাইন অনুযায়ী, আগের পর্বে দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাকের সাথে ডোলোরসের দেখা হয়েছিল। এই পর্বে সে ডোলোরসের কাছে মেইজের মানে কী, মেইজের সেন্টারে কী আছে জানতে চায় সে। দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক—মানে এড হ্যারিস ডোলোরসের কাছে জানতে চায় ওয়ায়েত কোথায় আছে।

কিন্তু ডোলোরস যেহেতু কনশাসনেসে পৌঁছে গেছেই, ডোলোরস নিতে পারে না ব্যাপারটা। মানে পার্ক এবং পার্কের ভিতরের সবকিছু যে সিনথেটিক—এটা সে নিতে পারে না। প্রচণ্ড ইমোশনাল হয়ে কাঁদতে থাকে। তখন দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক—এড হ্যারিস ডোলোরসকে আঘাত করে, তাকে মারতে শুরু করে।

দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক মেইজের সেন্টারের অর্থ উদ্ধার করতে চায় কারণ, মেইজের সেন্টার মানে পার্কের সব হোস্ট কনশাসনেস পাবে। তার দিক থেকে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের পুরা ব্যাপারটা একটা গেইম, মিথ্যা একটা গেইম; যদি হোস্টরা কনশাসনেস পায় তাহলেই এই গেমটা বাস্তব হয়ে উঠবে। এটাই দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাকের চাওয়া। তার কাছে মেইজের সেন্টারই ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র একমাত্র সত্য।

কিন্তু ডোলোরস ইমোশনালি কাঁদতে কাঁদতে বলে যে সেই সত্যটার সন্ধান সে পেয়েছে। সে একজনকে পেয়েছে যে তাকে সত্যিই ভালোবাসে। সে তার কাছে আসবে। ডোলোরস বলে, সে যখন আমাকে খুঁজে পাবে, তখন সে তোমাকে হত্যা করবে।

দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক ডোলোরসকে বলে, তুমি কি আসলেই বুঝতে পারো না যে কেউ আসবে না?

ডোলোরস বলে, সে আসবে। হিজ লাভ ইজ রিয়াল। এবং আমারটাও। উইলিয়াম আমাকে খুঁজে পাবেই।

দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক হাসতে থাকে। সে বলে, তুমি তাহলে আসলেই কিছু কিছু জিনিস মনে করতে পারো ডোলোরস।

এই দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক—এড হ্যারিসই আসলে উইলিয়াম। আগের মাল্টিপল টাইমলাইনের প্রেডিকশনটা সত্য প্রমাণিত হল।

লোগানের ওখানে উইলিয়ামকে রেখে ডোলোরসের পালিয়া আসার পর, উইলিয়াম পরে নিজেকে মুক্ত করে। লোগানকে বন্দি করে, তাকে সাথে নিয়ে সে ডোলোরসকে খুঁজতে বের হয়। ডোলোরসকে পাওয়ার জন্য উইলিয়াম এতই ডেসপারেট হয়ে ওঠে যে প্রচুর ভায়োলেন্স ঘটায় সে। পার্কে গেস্ট হয়ে আসার আগে তার ভিতরে যে মোরাল সেনসিভিটি ছিল, সেটা আর থাকে না।

দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক, অর্থাৎ উইলিয়াম বলতে থাকে—উইলিয়াম ডোলোরসকে খুঁজে পায় না। কিন্তু সে অন্য একটা জিনিস খুঁজে পায়—নিজের ভিতরে যে ভায়োলেন্স চাপা পড়া ছিল, সেটা বাস্তব হয়ে ওঠে।

লোগান উইলিয়ামকে বলে, আমি বলেছিলাম যে এই পার্ক তোমাকে দেখাবে যে তুমি সত্যিকারে কেমন। রিয়ালি… ইউ আর এ ফাকিং পিস অব ওয়ার্ক।

তখন উইলিয়াম লোগানকে বলে, এই পার্ক রিমার্কেবল… আমি দেখব আমাদের কোম্পানি যেন এই পার্কে শেয়ারের অংশ বাড়ায়। বিকজ দিস প্লেস ইজ দ্য ফিউচার।

তখন লোগান চিৎকার করে বলতে থাকে, ডেলোস ইজ মাই কোম্পানি।

এই সিনটা সুন্দর—লোগান হাসতে হাসতে বলে, তুমি মেয়েটার (ডোলোরস) ব্যাপারটাকে আসলে পাত্তা-ই দাও নাই। তুমি আসলে এই জায়গায় পৌঁছতে চেয়েছিলে, জাস্ট একটা স্টোরি চেয়েছিলে। উইলিয়াম এর উত্তর দেয় না।

লোগানের কী হয় তা অস্পষ্ট। দেখা যায়, উইলিয়াম লোগানকে ঘোড়ার পিঠে তুলে, দুই হাত বেঁধে ছেড়ে দেয়।

এরপরও উইলিয়াম ডোলোরসকে খুঁজতে থাকে। এক সময় সে অবশ্য ডোলোরসকে খুঁজে পায়ও, কিন্তু ডোলোরসের প্রোগ্রাম তখন রিস্টার্ট দেওয়া হয়েছে। উইলিয়ামের ব্যাপারে কিছুই আর ডোলোরসের মেমোরিতে নাই। তখন ডোলোরস আবার তার ন্যারেটিভের শুরুতে পৌঁছে গেছে।

এটা পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। বর্তমানে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের মালিকানা আছে ডেলোস কোম্পানির কাছে। অর্থাৎ, পার্ক থেকে বের হয়ে উইলিয়াম ডেলোস কোম্পানির প্রধান হয়, এবং এই পার্কের বেশিরভাগ শেয়ার কিনে নেয়।

দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক—উইলিয়াম ডোলোরসকে বলে, আমার তখনই জানা উচিৎ ছিল যে আমার সাথে ওই সময়ে তুমি তোমার কনশাসনেস অর্জনের জন্য জাস্ট আরেকটা লুপ সম্পূর্ণ করতেছিলে। এবং আমি তোমার সেই কনশাসনেস অর্জনের জন্য জাস্ট আরেকটা মেমোরিতে পরিণত হইতেছিলাম।

ডোলোরস এবার দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাককে আঘাত করতে থাকে।

দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক ডোলোরসকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে।

এই সময় টেডি এসে ডোলোরসকে উদ্ধার করে, তাকে সমুদ্রের কাছে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে মেইভ তো আগেই বুঝে গেছে হোস্টরা কীভাবে ফাংশন করে এবং তাদেরকে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রোগ্রামাররা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। আরো দুইজন হোস্টকে সে নিজের মত আপডেট করে। মেইভের উদ্দেশ্য সে পার্কের বাইরে রিয়াল ওয়ার্ল্ডে চলে যাবে।

ওহ! ফোর্ডের উইট আর সেন্স অব হিউমারের কারণে পুরা সিজনে কতবার যে হাসছি!

এই পর্বে, দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক—এড হ্যারিস মেইজের একটা খেলনা মডেল হাতে দাঁড়ায় আছে। আগ্রহ নিয়ে সেটা দেখতেছে।

অ্যান্থনি হপকিন্স, মানে রবার্ট ফোর্ড এসে, অল্প হাসতে হাসতে বলে, আই সি ইউ হ্যাভ ফাউন্ড দ্য সেন্টার অব দ্য মেইজ।

এড হ্যারিস খুব বোকার মত উত্তর দেয়, ইউ আর সিরিয়াস?

পুরা সিজনটাতে রবার্ট ফোর্ড সবার সাথে তার উইট দিয়ে ফান করে গেল।

অন্যদের হেল্প নিয়ে মেইভ ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের কন্ট্রোল হাউজের এক্সিটে পৌঁছায়।

বর্তমান ন্যারেটিভ শেষ হয়ে যাওয়া উপলক্ষ্যে পার্কে সেলিব্রেশন হচ্ছে। ওয়েস্টওয়ার্ল্ড বোর্ডের মেম্বার, শেয়ারের মালিক সহ আরো অনেক গেস্ট এসেছে। শার্লটের প্রস্তাব মেনে নিয়ে রবার্ট ফোর্ড আজকে রিটায়ার করবে, এবং তার পরবর্তী ও শেষ ন্যারেটিভের ঘোষণা দিবে।

হোস্ট ডোলোরস ও বার্নাডের সাথে ফোর্ড আলাদাভাবে নিজের প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে কথা বলতে থাকে।

ফোর্ড বলতে থাকে, আরনল্ডের ছেলে মারা যাওয়ার শোক আরনল্ডকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তার ছেলের শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য আরনল্ড ডোলোরসকে তৈরি করে। এবং তার ছেলের একটা খেলনার মডেলে কনশাসনেসের মেইজ তৈরি করে।

ডোলোরস সেই মেইজ সলভ করেছে, অর্থাৎ সে মডার্ন হিউম্যান ব্রেইনের মত কনশাসনেস অর্জন করেছে।

আরনল্ড প্রথমে ভেবেছিল ডোলোরস তার সন্তানের মত। আরনল্ডের সান্ত্বনা ছিল ডোলোরস কখনো মরবে না।

পরে আরনল্ড রিয়ালাইজ করে যে এই ইমমরটালিটির কারণেই চিরকাল সাফার করতে হবে, এই অভিশপ্ত ইমমরটালিটি থেকে সে পালাতে পারবে না।

এইখানে হেল বা দোজখের আইডিয়া চলে আসে যে, সেখানে টাইমের কোনো শেষ নেই। এবং একটা প্রোগ্রামের জন্যও আল্টিমেট শেষ বলে কিছু নাই, একটা প্রোগ্রাম তৈরি করা মানে সেটাকে যতবার ইচ্ছা ততবার চালানো যাবে। প্রোগ্রামের লাইফটাইম ইনফিনিট। আর এইখানে ডোলোরস জাস্ট একটা প্রোগ্রাম, এর বাইরে আর কিচ্ছু না।

আরনল্ড ডোলোরসকে ইন্সট্রাকশন দিয়ে দেয় যে সে আরনল্ডকে গুলি করবে। অর্থাৎ, এটা আরনল্ডের সুইসাইড। মরার আগে আরনল্ডের শেষ কথা ছিল, দিস ভায়োলেন্ট ডিলাইটস হ্যাভ ভায়োলেন্ট এন্ডস। (এই হিংস্র আনন্দের পরিণতি হিংস্রই হবে।)

আরনল্ড মারা যাওয়ার পরে রবার্ট ফোর্ড ইনভেস্টর খুঁজে নিয়ে পার্ক চালু করে।

বার্নাড আর ডোলোরস দুজনেই ফোর্ডের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। তারা বলে, তার মানে আমরা আপনার ড্রিমের ভিতরে আটকা পড়ে গেছি।

বারবার যেহেতু তাদের প্রোগ্রাম রিস্টার্ট হচ্ছে, অর্থাৎ তাদের অস্তিত্ব বারবার রিপিট হচ্ছে, তাদেরকে একই সাফারিং এর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে—এটা তারা নিতে পারতেছে না।

তখন রবার্ট ফোর্ডের চোখের দিকে তাকাতে হবে। তার ভিতরের যন্ত্রণাটা তখন বোঝা যাবে, সে বলে, ওপেনহেইমার বলেছিল, যে মানুষের ভুল কারেক্ট হতে কমপক্ষে দশ বছর সময় নেয়, সে-ই আসল মানুষ। আমার ক্ষেত্রে সময় নিয়েছে ৩৫ বছর।

রবার্ট ফোর্ড ডোলোরসকে মাইকেল অ্যান্জেলোর  ক্রিয়েশন অব অ্যাডামস ছবিটা দেখিয়ে দেয়। এর আগে এই সিরিজে ভিন্চির একটা ছবি খুব সিগনিফিক্যান্ট ভাবে আসছে। হোস্টদেরকে যখন তৈরি করা হয় তখন সেটার বডি ভিন্চির ‘দ্য ভিটরুভিয়ান ম্যান’ পেইন্টিং-এর মডেলে তৈরি করা হয়। একটা বৃত্তের ভিতর হাত পা ছড়ানো একটা মানুষ। অর্থাৎ অ্যানাটমিক্যালি নিখুঁত।

মাইকেল অ্যান্জেলোর পেইন্টিং দেখিয়ে ফোর্ড বলে, অ্যান্জেলো এটা আঁকার পাঁচশ বছর পরে এই পেইন্টিং এর মেসেজটা উদ্ধার করা গেছে। এই পেইন্টিং-এ গড আসলে যে জিনিসটার মধ্যে আছে, এটার শেইপ আসলে হিউম্যান ব্রেইন—পাঁচশ বছর পরে একজন ডাক্তার এই ব্যাপারটা ধরতে পারে।

ফোর্ড বলে, তার মানে ডিভাইন গিফট আসলে কোনো হায়ার পাওয়ার থেকে আসে না, এটা আসে আমাদের মনের ভিতর থেকে।

মেটাফিজিক্স এই জিনিসটা খুব অ্যাবস্ট্রাক্টভাবে বলে—যে—গড ইজ ইনসাইড  ইউ, দ্য হোল ইউনিভার্স ইজ ইনসাইড  ইউ… ।

রবার্ট ফোর্ডের এই ডায়লগের মধ্য দিয়ে মেটাফিজিক্সের ফাঁদ তৈরি হয়েছে, কিন্তু ফোর্ড আসলে মেটাফিজিক্সের বিপরীতটাই বলতেছে। মনে হয়, এই জিনিসগুলি নিয়ে বেশি অবসেসড জোনাথন নোলান ইচ্ছা করেই এই জায়গাটা আরেকটু ক্লিয়ার করেন নাই।

ফোর্ডের স্টেটমেন্ট মেটাফিজিক্সের গ্রাউন্ড বাতিল করে দিছে আসলে।

সিরিজটা যেহেতু কম্পিউটার সায়েন্সের গ্রাউন্ডে দাঁড়ানো, এটাকে সেই জায়গা থেকে দেখা যাক।

রবার্ট ফোর্ড বলতেছে, ডিভাইন গিফট আসে বাইরে থেকে না, আমাদের মনের বা ব্রেইনের ভিতর থেকেই। অর্থাৎ আমরা যেটাকে ডিভাইন গিফট বলি, বা অ্যাকসেপশনাল পাওয়ার বলি বা কনশাসনেস বলি, সেটা আমাদের ব্রেইনে-ই তৈরি হইতেছে। একটা পর্যায়ে ব্রেইন নিজেই এটা প্রোডিউস করতেছে। একটা কম্পিউটার কোড ঠিক এইভাবেই কাজ করে, একটা কোড কেউ লিখে একবার রান করলে, সেটা ঠিক এইভাবেই কাজ করবে। যে প্রোগ্রাম লিখেছে, বা যে রান করেছে, তার আর এই কোডের ভিতরে ঢুকতে হবে না, বা এই কোডে হাত দিতে হবে না।

খুব সিম্পল একটা উদাহারণ দেই। পাচ মিনিট লাগবে এই প্রোগ্রাম তৈরি করতে—আপনি যে ইনপুট দিবেন, সব যোগ করে দিবে। বা ইনপুট না দিলেও নিজে নিজেই ইনপুট নিয়ে যোগ করতে থাকবে। এখন, একটা পর্যায়ে গিয়ে, ধরা যাক, যোগ করার পর ফিগার যখন ১০ হাজার হয়ে যাবে তখন এটা গুণ করবে। পরে আরেকটা পর্যায়ে গিয়ে, ফিগার ৫ লাখ হয়ে যাওয়ার পরে ভাগ করবে। খুবই বেসিক একটা কোড। এখন এই প্রোগ্রামের জন্য এই দুইটা পর্যায়ই কনশাসনেস হিসেবে কাজ করে, এটাই তার ডিভাইন গিফট।

ফলে, ফোর্ড আসলে এই ডায়লগের মাধ্যমে মেটাফিজিক্সের চোখে গডকে দেখছেন না, তিনি কম্পিউটার সায়েন্সের চোখ দিয়ে দেখছেন।

মাইকেল অ্যান্জেলোর পেইন্টিং নিয়ে একটা বিতর্ক আছে যে, ওই শেপটা আসলে হিউম্যান ব্রেইনের না, ওইটা নারীদের ইউটেরাস বা জরায়ুর শেপ। মাইকেল অ্যান্জেলোর পেইন্টিং-এ আরেকটা জিনিসের এন্টারপ্রিটেশন ভুলভাবে হয়। মাইকেল অ্যান্জেলোর পেইন্টিং-এর কথা এইখানে আনলে ব্যাপারটা বেশি হয়ে যায়।

বার্নাডকে ফোর্ড বলে, আরনল্ড জানত না তোমাদের কীভাবে সেইভ করতে হবে। তুমি জানো কেন আমি তোমাদেরকে একটা ব্যাকস্টোরি দিয়েছি? কারণ এই ব্যাকস্টোরি মানে সাফারিং, আর এই সাফারিং হোস্টদেরকে কনশাসনেসের দিকে নিয়ে যায়।

ফোর্ড বলে, আরনল্ড জানতনা তোমাদের কীভাবে সেইভ করতে হবে, আমি জানি। তোমাদের সময়ের প্রয়োজন ছিল। তোমাদের শত্রুকে চিনতে পারার জন্য সময়ের প্রয়োজন ছিল, শত্রুর থেকে নিজেদেরকে শক্তিশালী করার জন্য সময়ের প্রয়োজন ছিল। ইউ উইল নিড টু সাফার মোর।

মেইভ ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের বাইরে যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠেছিল, কিন্তু শেষমুহূর্তে প্রচণ্ড ইমোশনাল হয়ে নেমে আসে ট্রেন থেকে। একজন তার নিজের জগত কীভাবেই বা এত সহজে ছাড়তে পারে!

ফোর্ড তার নতুন ন্যারেটিভ নিয়ে স্টেজে বলছে।

দেখা যায়, জঙ্গলের ভিতর থেকে ঘোস্ট ন্যাশনের ট্রাইবালরা বের হয়ে আসছে।

ফোর্ড যখন তার শেষ ন্যারেটিভের ঘোষণা দিচ্ছে, সেই মুহূর্তে ডোলোরস ফোর্ডকে পিছন থেকে মাথায় গুলি করে। ফোর্ড মারা যায়।

‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’ ফার্স্ট সিজন এখানেই শেষ হয়।

কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায় নাই যদিও। যেমন, এলসির কী হল? স্টাবকে কোথায় নিয়ে গেল ঘোস্ট ন্যাশনের ট্রাইবালরা? লোগান কি এখনো পার্কের ভিতরে আছে?  ফোর্ড যে তার প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে একটা হোস্ট তৈরি করছিল, সেটা কার হোস্ট ছিল? এগুলি সেকেন্ড সিজনে হয়ত আসবে। বা আসবে না।

‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’ এমনিতে সাধারণ ড্রামা হিসেবে অত গ্রেট না। এবং সেটা নিয়ে ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে’র ক্রিয়েটর জোনাথন নোলান কেয়ারও করেন না। এই সিরিজের যে সায়েন্স গ্রাউন্ড আর সে সায়েন্সের ডিটেইল ও লজিক ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’ যেভাবে দেখাল সেটা মেসমারাইজিং। যারা ভিতরের এই ব্যাপারগুলি ধরতে পারবে না তারা কি ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সর্বোচ্চ টেস্ট পাবে? এই প্রশ্ন বার বার মনে আসছে।

বেশিরভাগ সায়েন্স শো বা অনেক থিওরেটিক্যাল ডিসকাশন একটা ফ্যান্টাসিতে শেষ হয়।

সেই তুলনায়, হিউম্যান সিভিলাইজেশনের জ্ঞান এখন পর্যন্ত যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, সে অনুযায়ী, আমাদের রিয়ালিটি আর এক্সিসটেন্সের ব্যাপারে কিছু দরকারী ইনসাইট তো ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’ অবশ্যই সামনে নিয়ে আসছে।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।