page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড – ২

(আগের পর্ব)

সিজন ১, এপিসোড ২ – (চেস্টনাট)

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সেকেন্ড এপিসোডের নাম ‘চেস্টনাট’। প্রথম পর্ব ‘দ্য অরিজিনাল’-এ থিম পার্ক ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’-কে যতটা সিনথেটিক বা আর্টিফিশিয়াল বা কৃত্রিম মনে হচ্ছিল, দ্বিতীয় পর্বে সে রকম মনে হয় নাই। ওয়েস্টওয়ার্ল্ডেরও যে একটা রিয়ালিটি আছে এবং সেই রিয়ালিটি বাইরের রিয়ালিটি থেকে আলাদা—এই অনুভূতি দ্বিতীয় পর্বে পাওয়া গেছে।

আমি বলব, ওয়েস্টওয়ার্ল্ড থিম পার্ক কীভাবে কাজ করে—এই আইডিয়ার সাথে দর্শকদের ওরিয়েন্টেশন ঘটায় প্রথম পর্ব। আর ওয়েস্টওয়ার্ল্ড থিম পার্কের ভিতরের জগত কেমন তার সাথে ওরিয়েন্টেশন ঘটিয়েছে এই সেকেন্ড পর্ব।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রস্টিটিউট হোস্ট মেইভ ও ক্লেমেন্টাইন

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রস্টিটিউট হোস্ট মেইভ ও ক্লেমেন্টাইন।

লোগান ও উইলিয়াম, দুই বন্ধু ট্রেনে করে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের বাইরের স্টেশনে এসে পৌঁছায়। নিউ কামার হিসেবে তারা ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে ঢুকবে।

লোগানের আচরণে বোঝা যায় ব্যাপারটা তার কাছে একটা সাধারণ ট্যুরের মত। কিন্তু উইলিয়ামের আচরণে মনে হয় সে কিছুটা কনফিউজড।

উইলিয়ামকে স্টেশন থেকে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে নিয়ে যাওয়ার সময় এক সুন্দরী হোস্টের সাথে উইলিয়ামের আলাপ চলতে থাকে। সেই হোস্ট উইলিয়ামকে জানায়—দ্য অনলি লিমিট হিয়ার ইজ ইয়োর ইমাজিনেশন। আপনার কল্পনাই এখানে আপনার একমাত্র সীমানা। আপনি কতদূর যেতে চান তা সম্পূর্ণভাবে আপনার উপর নির্ভর করছে।

এটা থেকে পরিষ্কার যে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে যারা নিউ কামার, যারা পৃথিবীর এই রিয়ালিটি থেকে ডলারের বিনিময়ে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে যায়, তারা সেখানে, হোস্টদের সাথে যে কোনো কিছু করতে পারবে।

মাইকেল ক্রিচটনের সিনেমার মূল কাহিনির কিছু জিনিস ক্রিয়েটর জোনাথন নোলান এবং লিসা জয় নোলান পরিবর্তন করেছেন। যেমন, তারা এই সিরিজে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের হোস্টদের বা প্রোগ্রাম করা মানুষদেরকে কোনো অবজেক্ট হিসেবে না দেখিয়ে মানুষ হিসাবেই দেখাতে চেয়েছেন। ক্রিচটনের সিনেমায় হোস্টদের আলাদা চিহ্ন দেওয়া থাকত, বোঝা যেত কে হোস্ট আর কে বাইরে থেকে যাওয়া নিউ কামার। এখানে সে রকম কিছু নেই।

movie-review-logo

সুতরাং, এই ব্যাপারটা কাহিনির একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। সব সময় একটা সংশয় বা অনির্দিষ্টতা থাকতেছে কাহিনিতে। উইলিয়ামের আচরণও সে রকম, সব সময় একটা সংশয় কাজ করতেছে তার মধ্যে। আমি বলব যে, উইলিয়ামের মাধ্যমে আসলে দর্শকদের সাইকোলজি নির্ধারণ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের রিয়ালিটিকে, হোস্টদেরকে দর্শকরা কীভাবে দেখবে সেইটা উইলিয়ামের মাধ্যমে খুব সূক্ষ্মভাবে নির্ধারিত হয়ে যায়।

যেমন, উইলিয়াম সেই সুন্দরী হোস্টকে প্রশ্ন করে, আর ইউ রিয়াল?

সেই হোস্ট উত্তর দেয়, ওয়েল, ইফ ইউ ক্যান’ট টেল, ডাজ ইট ম্যাটার?—আপনি যদি বলতে না-ই পারেন আমি আসল কি আসল না, তার কোনো গুরুত্ব আছে আর?

এই উত্তরে উইলিয়াম আরো কনফিউজড হয়ে যায়।

westworld-2lসেই হোস্ট ঘনিষ্ঠ হয়ে, অত্যন্ত ডিসেন্টভাবে উইলিয়ামকে ইঙ্গিত দেয় যে উইলিয়াম চাইলে সে সেক্সুয়ালি অ্যাভেইলএবল।

কিন্তু উইলিয়াম যেহেতু রিয়াল আর আন-রিয়ালের মধ্যে একটা ভার্চুয়াল সাইকোলজিতে আছে, উইলিয়াম এই প্রস্তাবে স্বস্তি বোধ করে না।

উইলিয়ামের মাধ্যমে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। ওয়েস্টওয়ার্ল্ড মোরালিটির বা নৈতিকতার ব্যাপারেও দর্শকদেরকে একটা দ্বিধার মধ্যে নিয়ে যায়। উইলিয়ামের বন্ধু লোগান উইলিয়ামকে বলে, কেউ সত্যিকারের মানুষ নাকি হোস্ট, এই সন্দেহ যদি হয় তাহলে আগে গুলি করতে হবে, তারপর জিজ্ঞাসা করতে হবে। অর্থাৎ, কাউকে মারার পারমিশন আছে কিনা এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার আগেই তাদেরকে মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এটা নির্ভর করতেছে কোনো একজনের মোরালিটির উপর? নাকি মোরালিটি ব্যাপারটাই পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে?

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সেই গুরুত্বপূর্ণ হোস্ট ডোলোরসের একটি পুরাতন ম্যাসাকারের কথা মনে পড়ে। রাস্তার ওপরে অনেক লাশ পড়ে আছে। ডোলোরসের প্রোগ্রাম বারবার রিস্টার্ট করার পরেও তার কাছে পুরাতন স্মৃতি ফিরে আসছে। এটা থেকে প্রায় নিশ্চিত যে ভবিষ্যতে হোস্টরা অস্বাভাবিক কিছু করবে।

অন্যদিকে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রোগ্রামার ও ক্রিয়েটিভ ডিজাইনারদের মধ্যে হালকা উদ্বেগ কাজ করে, আগের পর্বের সেই পিটারের প্রোগ্রামে কোনো বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে কিনা? কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে স্যাবোটাজ করেছে কিনা।

মেইভ হচ্ছে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের একজন নিয়মিত প্রস্টিটিউট। কিন্তু সে কোনো নিউ কামারকে আকর্ষণ করতে পারছে না। মেইভকে কয়েকবার ল্যাবরেটরিতে এনে তার পার্সোনালিটি, এক্সপ্রেশনে কিছু পরিবর্তন করা হয়।

westworld-4মেইভের প্রোগ্রামেও সম্ভবত কোনো ঝামেলা হয়েছে। তার কাছেও আগের কিছু স্মৃতি ফিরে আসতে থাকে। আগে, মেইভের মধ্যে অন্য প্রোগ্রাম থাকা অবস্থায় যা ঘটেছিল, মেইভ দুঃস্বপ্নে সেইসব দেখতে থাকে। তার বাচ্চা মেয়েসহ তাকে কয়েকজন আক্রমণ করেছে, তারা দরজা বন্ধ করে ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। এমন সময় মেইভের স্বপ্ন ভেঙে যায়, সে দেখে সে অপারেশন টেবিলে শুয়ে আছে। আশেপাশে অন্য হোস্টদের বডি পড়ে থাকতে দেখে মেইভ শকড হয়।

প্রথম পর্বে এড হ্যারিসের যে রহস্যময় ক্যারেক্টার দেখানো হয়েছিল, এই পর্বেও সে আপাতভাবে রহস্যময়ই আছে। ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের শেরিফ যখন এক হোস্টের ফাঁসি কার্যকর করছে তখন সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে সেই রহস্যময় নিউ কামার। সেই অপরাধী হোস্টকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। তাকে ব্ল্যাকমেইল করে একটা মেইজ বা নকশার ব্যাপারে জানতে চায়।

রহস্যময় লোকটি জানায়, তিরিশ বছর ধরে সে এখানে আসছে, এবার সে আর বাইরে ফিরবে না। সে একটা মেইজ বা নকশার সন্ধান জানতে চায়। সেই হোস্টের স্ত্রীকে হত্যা করার পরে তার বাচ্চা মেয়ে তাকে মেইজের ব্যাপারে ক্লু দেয়। এই ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের মূল কাহিনি এবং ক্রাইসিস সম্ভবত ইন্টারেস্টিং হতে যাচ্ছে।

এখন পর্যন্ত যতদূর মনে হয়, এই লোকটা সম্ভবত ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সোর্স কোডের, অর্থাৎ যে প্রোগ্রামিং কোড দিয়ে ওয়েস্টওয়ার্ল্ড তৈরি করা হয়েছে সেটার সন্ধান করছে। অথবা তার হয়ত অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।

রহস্যময় চরিত্রটি যখন ফাঁসি হতে যাওয়া সেই হোস্টের পরিবারকে অত্যাচার করে, সেই দৃশ্যে তথাকথিত ‘ভায়োলেন্স’ অনেক বেশি। এই দৃশ্যের সাথে কম্পিউটার গেমসের ভায়োলেন্ট দৃশ্যগুলির মিল আছে। কম্পিউটার গেমসে গেমার যেমন অসংখ্য মানুষ মারতে পারে, অথচ গেমারের কিছু হয় না, এই দৃশ্যে এড হ্যারিসের ভায়োলেন্সের ধরনও সে রকম।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের থিম পার্কের আইডিয়া আর কম্পিউটার গেমসের আইডিয়া আসলে একই আইডিয়ার আলাদা দুইটা রূপ। কম্পিউটার গেমসের গেমার আর ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে যাওয়া নিউ কামারের মধ্যে একটা ছাড়া আর কোনো পার্থক্য নাই। পার্থক্যটা মাত্রার বা ডাইমেনশনের। যে কম্পিউটারে গেমস খেলছে সে সরাসরি গেমের ভিতরে যেতে পারে না, বাইরে থেকে তার সামনের মনিটরের দুই মাত্রার জগতে অংশগ্রহণ করছে। আর, ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে যে নিউ কামার সে থিম পার্কে, তিন মাত্রার একটা জগতে ঢুকে সরাসরি অংশগ্রহণ করছে।

ওপেন ওয়ার্ল্ড বা ওপেন এনভায়রনমেন্ট গেমের এই ব্যাপারটি বার বার ঘুরে ফিরে আসে এই ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রধান ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর রবার্ট ফোর্ড ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের রিয়ালিটিকে সম্ভবত আরো নিখুঁত করতে চায়।

প্রোগ্রামার লি সাইজমোর যখন ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের ভিজিটরদের আরো এন্টারটেইনমেন্টের উদ্দেশ্যে নতুন একটা ইভেন্ট তৈরি করে, রবার্ট ফোর্ড সেটাকে সস্তা থ্রিল বলে বাতিল করে দেয়।

রবার্ট ফোর্ড বলে, গেস্টরা কোনো স্টোরির জন্য ওয়েস্টওয়ার্ল্ড ভিজিট করতে আসে না। তারা নিজেরা কে সেটা জানার জন্য ভিজিট করতে আসে না। তারা ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সূক্ষ্মতা, ডিটেইলিং এর জন্য আসে। (দে অলরেডি নো হু দে আর। দে আর হিয়ার বিকজ দে ওয়ান্ট আ গ্লিম্পজ অব হু দে ক্যুড বি।)

এই পর্বের শেষে প্রোগ্রামার বার্নাড যখন ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের ভিতরে হাঁটতে হাঁটতে ফোর্ডকে নতুন স্টোরি লাইনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে, ফোর্ড জানায় সে ভবিষ্যতের জন্য একেবারে অরিজিনাল একটা কিছু নিয়ে কাজ করছে।

westworld-2r

ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইনসেপশন’ ছবিতে লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও’র ক্যারেক্টার মি. কব বলে, “আই ওয়েন্ট ডীপ ইনটু রেসেস অব হার মাইন্ড অ্যান্ড ফাউন্ড দ্যাট সিক্রেট প্লেস। অ্যান্ড আই ব্রোক ইন অ্যান্ড আই প্ল্যান্টেড অ্যান আইডিয়া। এ সিম্পল আইডিয়া দ্যাট উড চেইন্জ এভরিথিং। দ্যাট হার ওয়ার্ল্ড ওয়াজন’ট রিয়াল।”  (আমি তার মনের সবচেয়ে গভীরে গিয়েছিলাম এবং সেই গোপন জায়গাটা খুঁজে পাই। এবং আমি সেখানে ঢুকি এবং একটা আইডিয়া রেখে আসি। একটা ছোট সরল আইডিয়া যা সবকিছু বদলে দিতে পারে। সেটা হল, তার এই জগত বাস্তব না।)

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের চরিত্ররা কি এই সত্য-টাই জানতে পারবে? এই পুরানো আইডিয়াই কি ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের মূল কাহিনি হবে?

যদি তাই হয় তাহলে ওয়েস্টওয়ার্ল্ড-কে আর ভালো বলা যাবে না।

মনে হয় না সেটা হবে।

(পর্ব ৩)

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।