page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

ও বাক্কার ভাই রে

কদিন ধরে বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন, গভর্নমেন্ট থেকে ‘নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে চলুন’ টাইপ টেক্সট পাচ্ছি সমানে। আরে বাবা আমি কি ইলেকশানে খাড়াইছি নাকি, এর আশেপাশেও তো নাই।

চারদিকে নির্বাচনী উৎসব-প্রচারণা-ধান্ধা।

ভোটভিক্ষুকদের প্রচারণার ঢং-ঢাংও বেশ উপভোগ্য। গরমে ঘেমে, কেউ সাইকেলে, কেউ ঝাড়ু হাতে নেমে গেছে ভোটারদের মন জয়ে।

দুর্গন্ধ ভুলে প্রার্থীরা জনে জনে আজায়গায়-কুজায়গায় যাচ্ছে। কোলাকুলি করে ঘামের গন্ধ সেন্টের গন্ধ একাকার করে দিচ্ছে। মাথায় হাত বুলিয়ে মিষ্টি মধুর বাণী আর বিনয় গলে পড়ছে “ভাই, জনতাই সকল ক্ষমতার উৎস। আমরা আর কি আপনাদের সেবক, শেষ-মেশ আপনারাই সব।”

whomayuns logo

একই পাবলিকের কাছে সব প্রার্থী যায়। সবগুলা একই কথা বলতেছে। যার কাছে যায় সেও আর কী করবে অমায়িক একটা হাসি দিয়ে সবাইকে কথা দিচ্ছে। একদিনের জন্য নিজেকে মহান ভাবতেছে (সেই মহানুভবতা থেকে হয়তো ভোটও দিচ্ছে)। হেভবি সার্কাস!

কেউ কেউ কম্পোজ করে গান বানাইয়া গাওয়াইছে,
“একটা ছিল বাক্কার ভাই মায়া ভরা মন
‘বাক্কার ভাই’রে ভোটটা দিলে উনি করবেন ধন
উনার বুকে আহারে কি মায়া
তাহার কথা বলি, মোরা ভোট দিয়া তাহার পিছে চলি
তোমরা ভুল কইরো না, ও ভোটার ভুল কইরো না”
(মূল: একটা ছিল সোনার কন্যা। বাক্কার ভাই ছদ্ম নাম)

তারপর নির্বাচিত হয়ে গেলে যেই লাউ সেই কদু।

তারপর আবার নির্বাচন আসলে আবার আপনারাই সকল ক্ষমতার উৎস… আবার ফুর্তি-ফার্তি আবার সেম।

আমার সেরাম লাগে এ মহা আনন্দযজ্ঞ।

প্রার্থীদের মার্কারও সেই বাহার। তারও নানা কিচ্ছা।

কেউ আলু পাইছে তো কেউ লাউ কেউ তক্তা কেউ মোড়া কেউ ড্রাম কেউ ডিশ অ্যান্টেনা কেউ টিস্যুবক্স কেউ আলমারি কেউ পুদিনা পাতা কেউ সুপারি।

একজন বলল তাও ভাল, এক মহিলা কাউন্সিলর পাইছে ‘সিলেটি বেগুন’ তার কী হবে?

আমি বললাম, কেন? লাউ-কদুর চেয়ে ভালো না। বলে সিলেটি বেগুন দিয়া করবে কী? বলেই সবাই সেই হাসাহাসি।

নির্বাচনবিধির তোয়াক্কা না করে কেউ সমানে চালাইতেছে শোডাউন। মিলাদ-মাহ্‌ফিল, কনসার্ট, মেজবান, জনসভা, মাইকিং, মিছিলে-উৎসবে এলাকা গরম গা গ্রম।
তার অংশ হিসাবে সমর্থকদের করা দলীয় মেয়র, কাউন্সিলরের ক্লাবকে ঘিরে সভা হচ্ছে।

মাইকে তারছিড়া গান বাজছে,

“আমারও পরাণও যারে চায়, বাক্কার ভাই ও বাক্কার ভাই…
তিনি ছাড়া আর কেহ নাইইই, তিনি তাই তিনি তাই গো
ভোটটা দিয়া তারে আনা চাই”
(আমারও পরাণও যাহা চায়)

ঘুম হারাম করা ক্রিয়েটিভিটি!

সভাশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খানাপিনার আয়োজন আছে।
মাইকে জ্বালাময়ী ভাষণ হচ্ছে। আমার রাজনৈতিক বন্ধু আমাকে নিয়ে গেছে, চল ভাই চল।

আমি বললাম, কত দিবে?

সে বলল, যাওয়া উচিত না দেশের জন্য কিছু করা উচিত।

আমি বললাম, “তাই তো।” লাফাইতে লাইফাইতে গেলাম।

অনুষ্ঠানস্থলে স্লোগান হচ্ছে:

“তোমরা ভোট দাও যদি”
সবাই সমস্বরে বলতেছে:
“বাক্কার ভাই পাবে গদি”

হঠাত আমার পাশে যে আমাকে নিয়া গেছে বন্ধুর স্লোগান শুনে কেস্কি লাগল।
“ভোট তোমরা দাও যদি
বাক্কার ভাইয়ের মায়েরে চুদি”

আমি সাই করে তার দিকে তাকালাম, এইটা কী হইল! সে আমার দিকে তাকিয়ে করুণা, পাজল, অস্থির ভাব এনে বলল, “মাথামুথা ঠিক নাই রে কী থেকে কী বলতেসি! চা খাইতে হবে” বলে জোরে হাঁটা দিল।

এসময় মাইকে ঘোষণা, “আমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন সমাজ সচেতন, মেধাবী প্রতিভা, প্রাণপ্রিয়, আলোচিত, বহু পুরস্কারে ভূষিত, দক্ষ অভিনেতা পরিচালক প্রযোজক জনাব মোহাম্মাদ হুমায়ুন কবীর সাজু (পাশে দাঁড়ানো একজন শুদ্ধ করে দিল, ‘সাধু’ ‘সাধু’)।

আমি আরো অধীর আগ্রহে ছিলাম কে এই কুখ্যাত কালাকার। আমি থ-এর বাপ ধ হয়ে গেলাম। কয় কী! আমি সচেতন ঠিকাছে কিন্তু আমার সম্পর্কে এত কিছু আমি জানি না!

ঘোষনা চলছে, “পর্দায় উনি অনেক নাচ-গান করেছেন… আজ তিনি আমাদের মাঝে… তিনি এখন মঞ্চে উঠে আমাদের দু’লাইন গেয়ে শোনাবেন। আসুন বিপুল করতালি দিয়া তাকে স্বাগত জানাই।”

মাথা ঘুরতেছে, প্যান্ডেল টাঙ্গানো মঞ্চের চারপাশে পর্দা দিয়ে ঘেরা। বিপুল করতালির মধ্যে অলক্ষ্যে খিঁচে একদিকে পর্দা তুলে ফাট দিব, পর্দার ওপাশে মেয়েরা চা-সিগারেট খাচ্ছিল জানি না, উল্টে গিয়ে পড়লাম। গায়ে চা-সিগারেট মাখামাখি।

মেয়েদের চিৎকার, সেই সাথে বোম্বিং (চকলেট বোম)। কথা ছিল, বিশেষ অথিতি আসবেন বা মঞ্চে উঠবেন, মেয়েরা চিৎকার দিয়ে তালি দিবে ওদিকে বোম নিয়ে রেডি টিম বোম ফাটাবে। সব প্ল্যান্‌ড। আমি জানতাম না। মেয়েদের চিৎকার আর বোম্বিং-এ কান ঝালাপালা। আমি তো আমি, সবাই বেকুব।

আমার বন্ধু কী চা খাইয়া আইছে আল্লা জানে চোখ আরো লাল। আইসা এ অবস্থার মধ্যে।

বাসায় ঐ গান গাচ্ছি, গানগুলা মনে ধরছে। ভাইগ্নারে শুনাইলাম। সেও দেখি গায়:

“কইলজার লগে গাঁথি রাইক্কুম ভোট দিয়ারে
সিনার লগে বান্ধি রাইক্কুম তোঁয়ারে ও বাক্কার ভাই রে।”

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু