page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

কণক, শ্যামল কান্তি ভক্ত ও আমাদের অপমানের সংস্কৃতি

আমার বন্ধু দেবপ্রিয়া বসু কয়েক মাস আগে সোহোর একটা পাবে বইসা আমারে আধা মাতাল হইয়া ফিস ফিস কইরা বলতেছিলেন, তার বাবা মা যদি আজকে থিকা ১৩ বছর আগে লন্ডন বা ইয়োরোপের কোনো শহরে থাকতেন, তাইলে তার ছোট ভাই কণকরে মারা যাইতে হইত না।

আমি রহস্যের গন্ধ পাইয়া আগাইয়া গেলাম, “তোমার বাবা মা তোমার ভাইরে খুন করছিলেন?”

খুন? হ্যাঁ, খুনই তো!

কেমনে খুন করলেন? পোলিস টের পায় নাই?

কণক খুব ক্রিকেট খেলত, জানো? পড়ালেখা বাদ দিয়া সারাদিন মাঠে দৌড়াদৌড়ি করত। একবার কাঠের বল লাইগা ওর মাথাও ফাটছিলো!

খুন করলেন কেমনে? তোমার সামনে খুন করলেন উনারা?

সামনে? না, আমার সামনে খুন করেন নাই। কণক ঘরের দরজা বন্ধ কইরা ফ্যানের সাথে ঝুইলা পড়ছিল।

আত্মহত্যা করছিলেন তোমার ভাই?

‘না, আত্মহত্যা না। আমার বাবা মা ওরে খুন করছিল!’ বলতে বলতে চিৎকার দিয়া কানতে শুরু করলেন দেবপ্রিয়া। পাবে সবাই কান্নাকাটি করেন, কেউ বিশেষ মনোযোগ দিলেন না আমাদের দিকে। দেবপ্রিয়া কানতে কানতেই গল্প বলতেছিলেন।

01. logo nadia png

মাতালের প্রলাপ আমি পাত্তা দিব নাকি দিব না এই ভাবতে ভাবতে আমি ওর কথা শুনতেছিলাম।

১৩ বছর বয়সের একটা ছেলে কী দুঃখে আত্মহত্যা করতে পারেন আমি ভাইবা পাইলাম না। দেবপ্রিয়া কইলেন ওর ভাইরে ক্রিকেট খেলার এবং পরীক্ষায় ফেলের অপরাধে ওর বাবা ও মা সেইদিন সমস্ত কাপড় খুইলা বাসার সামনে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে কান ধরায়া দাঁড় করাইয়া রাখছিলেন।

পুরান ঢাকায় থাকতেন উনারা। বাসার সামনে দিয়া কণকের বন্ধুরা, বন্ধুর বাবা মা’রা, প্রতিবেশীরা হাঁইটা গেছেন। কেউ কিছু বলেন নাই। বাপে শাস্তি দিলে কার কী ঠেকা পড়ছে নাক গলানোর। কণকের কান্না তাই বৃষ্টিতেই মিশছে। সেই রাত্রেই তিনি ফ্যানের সাথে মা’র শাড়ি বাইন্ধা আত্মহত্যা করেন।

না, আত্মহত্যা উনি নিশ্চয়ই করেন নাই। বাংলাদেশে বাবা মা’দের কাঠগড়ায় দাঁড়া করানো গেলে উনারা ‘ম্যানস্লটার’-এর অভিযোগে অভিযুক্ত হইতেন। এইটা আত্মহত্যা অবশ্যই না।

এখন বলেন, শ্যামল কান্তি ভক্তকে আওয়ামী লীগের এম-পি সেলিম ওসমানের কান ধইরা উঠবস করানো দেখতে আপনাদের খারাপ লাগতেছে কেন ? অপমানের সংস্কৃতি কি উপমহাদেশে নতুন? শ্যামল কান্তি ভক্ত একজন পরম পূজনীয় শিক্ষক। তাই আমাদের গায়ে লাগতেছে এত? তাই আমরা সবাই কান ধইরা ফেইসবুক প্রোফাইল পিকচার দিতেছি? এই শিক্ষকরাই যে প্রতিদিন বাচ্চাদের কান ধরাইয়া ইস্কুলে দাঁড়া করাইয়া রাখেন তখন আমাদের খারাপ লাগে না কেন, লজ্জা লাগে না কেন?

অপমান শুধু শিক্ষকদের হয়? রিক্সাচালকদের কাপড় খুইলা মারলে তার অপমান হয় না? বাপ মা নিজের বাচ্চাদের অন্যের সামনে পিটাইলে বাচ্চার অপমান হয় না? নাকি শিক্ষকরাই দেশের একমাত্র মানুষ?

আপনারা যারা সেলিম ওসমানরে কানে ধরাইয়া উঠবস করাইতে চান, আমি তারও বিরোধিতা করি। চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত খুবই আদিম, কুরুচিপূর্ণ এবং অদরকারী শাস্তি।

শাস্তি দেওয়ার জন্য দেশে আইন রাখা হইছে। আইন মারফত সমস্ত অন্যায়ের বিচার হোক। অপমানের সংস্কৃতি বন্ধ হোক বাসা থিকাই। শিক্ষক, ছাত্র, রিক্সাওয়ালা, মন্ত্রী, আদিবাসী, হিন্দু, মুসলিম, শিশু, বৃদ্ধ, খুনী, ধর্ষক কাউরেই যাতে অন্যের কাছে অপমানিত না হইতে হয়।

শ্যামল কান্তি ভক্ত, আমি আপনার এবং আপনার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাই। আপনি শিক্ষক বইলা না, আপনি একজন মানুষ বইলা। আপনার অপমানের দায়ভার সেলিম ওসমানের একলার না, বাংলাদেশী হিসাবে আমারও, বাংলাদেশের প্রতিটা বাপ মায়েরও—যারা নিজেদের সন্তানদের মানুষ বইলা মনে করেন নাই, প্রতিটা নাগরিকেরও—যারা রাস্তায় চুরির দায়ে, ধর্ম অবমাননার দায়ে মেয়েদের, রিক্সাওয়ালাদের, পকেটমারদের কাপড় খুইলা লজ্জা দিয়া অপমান কইরা পিটাইছেন, এই দায়ভার আপনার নিজেরও।

আপনি ও আপনারা যেইসব ‘শিশু’ ছাত্রদের কান ধরাইয়া অপমান করছেন, তারাই একদিন অশিক্ষিত ফ্যাশিস্ট সেলিম ওসমান হিসাবে বড় হইয়া আপনার ও আপনাদের ‘জয় বাংলা’ বইলা কান ধরাইছেন।

মানুষরে অপমান করার যেই ‘দৃষ্টান্তমূলক’ সংস্কৃতি আমরা চালু করছি, তাতে এই ঘটনায়, আমাদের দায় সবার।

সবার।

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।