page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

“কবিতা কম লেখার কারণ হইল, আমি একই বিষয়ে আবার লিখি না।”—সাযযাদ কাদির

সাঈদ রূপু: আপনার জন্ম কত সালে?

সাযযাদ কাদির: ১৯৪৭।

সাঈদ: কত দিন যাবত লেখালেখি করেন?

সাযযাদ: ৬২ সাল থেকে মোটামুটি জাতীয় পত্রপত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হচ্ছে। কিন্তু লেখালেখি তো সেই ক্লাস ফোরে থাকতেই। মানে ১৯৫৭ সাল থেকে। পদ্য লিখতাম তখন আর কি।

সাঈদ: এই সাহিত্যে আসার আগ্রহটা কোত্থেকে?

সাযযাদ: এটা বই পড়তে পড়তে। পাঠ্যপুস্তকে থাকে না, গদ্য থাকে গল্প থাকে—এগুলো পড়তে পড়তে নিজের ভেতরে একটা যে হ্যাঁ, আমিও লিখতে পারি কিনা এইভাবে।

সাঈদ: এই মেলাতে আপনার কী বই আসছে?

সাযযাদ: এই মেলায় আমার বই আসছে অনেকগুলিই। প্রায় এগারোটার মত বই আসছে। আরো দুই একটা আসতে পারে।

boimela-logo-2016

সাঈদ: এই বইগুলো কীসের—গদ্য, কবিতা বা?

সাযযাদ: না এইবার কবিতা আসে নাই, কবিতা আমি খুব কম লিখি আর কি। কবিতা কম লেখার কারণ হইল, আমি একই বিষয়ে আবার লিখি না। দ্বিতীয় বার লিখি না। আমি ভাব ভাষার নির্মাণ কবিতার যে তিনটা—এই তিনটার কোন এক ক্ষেত্রে যদি নতুন কিছু না আসে ভাবের দিক থিকা, ভাষার দিক থিকা বা নির্মাণের দিক থিকা—আই ডোন্ট লাইক।

সাঈদ: আপনি গত বইমেলায় যে বই বের করছেন যে ভাষায় লিখছেন যে ছন্দে লিখছেন এই বইমেলাতে কি তার ব্যতিক্রম কিছু নাকি ওই ধরনের?

সাযযাদ: না, আমার, ভাষা তো একটা চর্চার ব্যাপার, এটা তো প্রতি বছরই আমি নতুন নতুন কিছু না কিছু শিখি। গদ্যের ক্ষেত্রে কবিতার ক্ষেত্রে। যেমন আমার ছন্দ সমন্ধে একটা ধারণা ছিল যে ছন্দ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমার ওই ছন্দ সম্পর্কে ধারণা এ বছর একদম পাল্টে গেছে। আমার শুরু থেকেই ছিল, শুরু থেকেই আমি মনে করতাম যে বাংলা কবিতার ছন্দ—এটা বাংলার একটা নিজস্ব ছন্দ নিশ্চয়ই আছে। আমাদের বাংলা ভাষার উপরে যে রকম সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ চেপে আছে, ইংলিশ গ্রামার—সেই রকম বাংলা ছন্দের উপরও সংস্কৃত ছন্দ চেপে আছে। কিন্তু সংস্কৃত ছন্দ বাংলা ছন্দ এক নয়।

sazzad-boi2সাঈদ: আচ্ছা, এই মেলাতে আপনার এগারোটা বই আসছে। তো এর মধ্যে উপন্যাস আছে কি?

সাযযাদ: না, উপন্যাস নাই গল্পসংগ্রহ আছে। আমি ষাটের দশকে যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম সেই সময় বেশ কিছু গল্প লিখেছিলাম। এই গল্পগুলি সে সময় অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ৭০ সালেও কিছু লিখেছিলাম, তারপরে আর লিখি নি। তারপরে গত কয়েক বছরে কয়েকটা মোটে লিখেছি। তো ৬০-এর দশকের ওই গল্পগুলি সম্পর্কে অনেকের আগ্রহ এখনও আছে।

সাঈদ: একটা গল্প সম্পর্কে শুনতে চাই, মানে জানতে চাই। গল্পগুচ্ছ যেইটা বললেন সেখান থেকে যে কোনো একটা কাহিনী।

সাযযাদ: আমার গল্প সম্পর্কে শুনতে গেলে যেটা হলো…

সাঈদ: মানে সংক্ষিপ্ত।

সাযযাদ: সংক্ষিপ্ত আমি বলছি যেটা সেটা হলো এই গল্পগুলি ব্যতিক্রমধর্মী। যেমন নর-নারীর রিলেশন বা অন্যান্য সম্পর্ক মানুষের এই সব সম্পর্কের উপরে ওই বিষয়ে লেখা। যে সম্পর্কগুলি নিয়ে কেউ কখনো লেখে নি, বা লেখার সাহসও করে নি সেইসব বিষয়গুলি নিয়ে লেখা। আমার বইয়ে একটা ইয়ে আছে ফ্ল্যাপে একটা কমেন্ট আছে আহমাদ মোস্তফা কামালের। উনি গল্প লেখেন, এই জেনারেশনের খুব একজন নামি গল্পকার। উনি লিখেছেন, এই ধরনের গল্প তখনো কেউ লিখতে পারে নাই এবং এখনো কেউ লিখতে পারবে না—উনি এই চ্যালেন্জটা করে দিয়েছেন। কাজেই গল্পের যেই বিষয়বস্তু—একদম অন্য রকম, এটা কারো সঙ্গে মিলে না।

সাঈদ: এই এগারোটা বই থেকে আপনি কোনটাকে আলাদা করে দেখছেন?

সাযযাদ: গল্পসংগ্রহ নিশ্চয়ই আলাদা বই। তারপরে আমার রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের উপর যে বইটি এটি একটি আলাদা বই।

সাঈদ: এটা কী?

সাযযাদ: এটা হলো ‘সাহিত্য ও জীবনে রবীন্দ্র-নজরুল’। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিন্ত আমাদের অনেক আগ্রহ আছে ।

সাঈদ: উনাদের কোন দিকটা তুলে আনছেন?

সাযযাদ: ওদের সাহিত্য। যেমন, অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ একটা বিষয়। তারপরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের যে বিরোধ হয়েছিল সে বিরোধ কেন হয়েছিল, কী কারণে হয়েছিল, তারপরে সেইটা মিটমাট হইল কীভাবে। তারপর রবীন্দ্রনাথ মানুষ কেমন ছিলেন। তার খাওয়া পড়া উঠা বসা পোশাক আশাক। উনি জমিদার হিসেবে কেমন ছিলেন। বা শশুর হিসেবেই কেমন ছিলেন। এই বিষয়গুলি আছে, আবার নজরুলের সম্পর্কেও আছে এরকম। তার কবিতার বিভিন্ন দিক, তার বই সম্পর্কে আলোচনা আছে। প্লাস কারাবাস—তিনি কারাগারে ছিলেন। জেলার কে কে ছিল? তার কারাসঙ্গী কারা ছিল? সেই কারাসঙ্গীরা পরবর্তীকালে যে সব বই লিখছে সেই সব বইয়ে তারা কী লিখেছে। এই যে এইরকম অনেক জিনিসের উপর আমার ব্যাপক অনুসন্ধান আছে। সেই অনুসন্ধানের বিষয়গুলি যারা কৌতূহলী পাঠক তাদের ভালো লাগবে। আমি মনে করি এটাও একটা নতুন ধরনের বই। নতুন প্রেক্ষাপটে লেখা—এটা ইতিহাস গবেষণা অনুসন্ধান যাই বলা হোক এর একটা আলাদা মূল্য আছে। এ একটি বই, আরেকটি বই আছে আমার। সেই বইটি বেরিয়েছে এইটাও ইম্পর্ট্যান্ট বই, বইটির নাম… আমি অনেক দিন ধরেই লিখছি। এই ইতিহাসভিত্তিক অনুসন্ধানমূলক লেখা। কিন্তু এটা প্রিভিউটা পার্টলি, পার্সপেক্টিভটা পার্টলি।

সাঈদ: কীসের ইতিহাস?

sazzad-boi3সাযযাদ: আলেকজান্ডারের কাহিনী। কিন্তু আলেকজান্ডারের কাহিনীটা আলেকজান্ডারের উপর লিখছি না। আমি আলেকজান্ডারের মা, তার বোন, তার স্ত্রী ওদের কাহিনী লিখছি। ওদের পার্সপেক্টিভে আমি আলেকজান্ডারের ইতিহাসটা লিখছি। কিংবা বাংলার ইতিহাস লিখতে পারি। কিন্তু বাংলার রাজাদের কাহিনী। তাদের যুদ্ধবিগ্রহ না। রানিদের কাহিনী। এই গোপালের রানি। এই পাল বংশের রানিরা, সেন বংশের রানিরা বা এই যে আমাদের নাটোরের রানি পর্যন্ত যত রানি। ইভেন এই যে ভাওয়ালের রানি—এই রানিদের কাহিনী। এই রানিদের কাহিনী, তাদের জীবন এই জিনিসটা তুলে ধরে আমি বাংলার একটা সামাজিক ইতিহাস তুলে আনছি। পার্সপেক্টিভ আলাদা হয়ে গেল। ইতিহাস জায়গায় রাজাদের কাহিনী, তাদের যুদ্ধবিগ্রহের কাহিনী কিন্তু রানীদের কোনো কাহিনী নাই। আমি ওইটা অনুসন্ধান কইরা নিয়া আসছি। তাইলে আমি মনে করি এইটা, এই ‘রমণীমন’ যে বইটা এইটা একটা আলাদা অন্য ধরনের একটি বই।

সাঈদ: আচ্ছা, আপনি বললেন যে একবার যেই বই বের করেন বা যেই ধরনের লেখা লেখেন পরবর্তীতে সেইটা লেখেন না। সামনের বইমেলাতে আপনার কোন ধরনের লেখার ইচ্ছা আছে?

সাযযাদ: সামনে আমার যে অনেকগুলি বিষয় নিয়ে আছে, একটি বিষয় আমার খুব ইচ্ছা আছে লেখার সেটা হলো যে প্রথমে আমার কবিতার বইটা বের করার ইচ্ছা আছে। কারণ আমি মনে করি প্রকাশক আমাকে বলেছে চার ফর্মা না হলে কবিতার বই বের করা যায় না। কাজেই চার ফর্মা আমার হয়ে গেছে, কাজেই কবিতার বইটা বের করবো। আর কবিতার বইটা নতুন, কারণ আমি এটাকে নানা রকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেছি ভাষার উপরে, বিভিন্ন বিষয়ের উপরে করেছি। আর একটি বই আমার বিশেষ ভাবে লেখার ইচ্ছা আছে, সেই বইটি হলো আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বহুত জিনিস আমরা ব্যবহার করি এগুলির ইতিহাস কিন্তু আমরা জানি না। এই যে কাটা চামচ ব্যবহার করি, এটা কোত্থেকে এলো? কে প্রথম এটা নিয়ে এলো? এই সেফটিপিন, এর ইতিহাস কি আমরা জানি? জানি না। এই সেফটিপিন কোত্থেকে এলো? কে তৈরি করলো? কিংবা এই যে পেন্সিল, এরকম আছে না অনেক জিনিস? কিংবা এই যে স্কচটেপ—এটা কে আবিষ্কার করলো, কে ব্যবহার করলো? এরকম নিত্য জিনিস আমাদের ঘরের ভিতরে বহুত জিনিস আছে, যেগুলি আমরা ব্যবহার করি কিন্তু এগুলি জানি না ইতিহাসটা। এগুলির একটা অনুসন্ধান আছে—এটার উপর একটা বই লেখার ইচ্ছা আছে।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ১৬/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও

About Author

সাঈদ রূপু
সাঈদ রূপু

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় অনার্স। ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে শিক্ষানবিশ সাংবাদিক।