page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

কবি মৃদুল দাশগুপ্তের বাংলা(বি)দেশ

কাব্য এবং প্রগতিশীলতার কিছু স্বভাব দোষ থাকে। কাব্যের বেলায় আবেগ আর প্রগতিশীলতার বেলায় যুক্তি এ দোষ ঘটায়। ভারতের কবি মৃদুল দাশগুপ্তের উছিলায় সে আলাপের একটা মওকা পাওয়া গেল।

কবি মৃদুল বাংলাদেশের ব্লগার ওয়াশিকুর খুন হওয়ার পর একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ফেসবুকে। বাংলাদেশী বাংলার আর ভারতীয় বাংলার হিন্দু-মুসলমান অনেকে তাকে লাইক দিয়েছেন। তর্কও হয়েছে দেখেছি।

salahuddins1

মৃদুল দাশগুপ্ত তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন:

‘সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই
বিজয় অর্জন ঘটে গিয়েছিল
তাই অভিজিতের পর ওয়াশিকুরকে এভাবে প্রাণ দিতে হল
বাংলাদেশ ক্রমশ আরও বিদেশ হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি যথেষ্ট সেক্যুলার থাকার চেষ্টা করেছেন এ বেলা। এটা তার প্রগতিশীলতা। অন্যদিকে বাংলাদেশকে মায়ের পেট থেকে সময়ের আগেই বিয়ানো এক বাচ্চা হিসেবে দেখতে পাওয়া তার কবিগুণ। কিম্বা কবিমনে তিনি যাকে স্বদেশ ভাবতে ভালোবাসতেন তা বিদেশ হয়ে যাচ্ছে—এমন ইউটোপিয়ায় তো কবিরা ভূগবেন সবার আগে। তিনিও এখানে তাতে ভূগেছেন।

মৃদুলের প্রগতিশীলতা বেশ পরিষ্কার। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস বিষয়ে একটা বক্তব্য হাজির করছেন যে, বাংলাদেশ সময়ের আগে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। আরও প্রস্তুত অবস্থায় স্বাধীন হলে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পূর্ণ হলে, তার এমন দশা হতো না। মানে অভিজিতের এক মাসের মধ্যে ওয়াশিকুর খুন হতেন না।

shuvra 779

স্ক্রিনশট, ফেসবুকে মৃদুল দাশগুপ্তের স্ট্যাটাস

হয়ত ছয় মাসে হতেন, কিম্বা জানি না কয় মাসে হলে বাংলাদেশ সঠিক সময়ে স্বাধীন হয়েছে বলে ভাবা যেত। অথবা আদৌ খুন হতেন না তারা।

যেসব দেশ ঠিক ঠিক সময়ে স্বাধীন হয়েছে সেসব দেশে কেউ খুন হয় না—তার কথার এমন একটা সরল অর্থ দাঁড়ায়।

মৃদুলের কথায় একটা চূড়ান্ত আক্ষেপ আছে। এটা কাব্য করার দোষ। বাংলাদেশ তো এমনভাবেই স্বাধীন হলো। বই পড়ে কি আর কোনও দেশে স্বাধীনতা আসে। পলিটিক্যালি না ইসথিটিক্যালি মৃদুল সমালোচনা করলেন বোঝা গেল না । বাংলা ভাষার কবিরা এ এক গলদ তৈরি করে রাখেছেন। তারা কাব্যের আবেগ দিয়ে জটিল জটিল রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে রাখছেন। ইতিহাসকে বুঝতে চাইছেন। তার কবিতায় আবারও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কী একটা মিহি ডাক যে আছে, আর প্রতিপক্ষও মনে মনে ধরে নেয়া আছে।

তার কথার এমন সব জটিল অর্থ দাঁড় করানো থেকে মৃদুলকে রেহাই দিলাম এ বেলা। সেটা ভিন্ন কারণে। কিছুটা দয়া করে বলা চলে। তার মধ্যে অস্বস্তি বাড়ানো ঠিক হবে না বলে ভাবছি। তিনি তার স্ট্যাটাসে যে রাজনীতি গোপনের চেষ্টা চালিয়েছেন সেটা গোপন থাক। নিজে নিজে যদি বুঝে উঠতে পারেন তার রাজনৈতিক বার্তার অদূরদর্শীতা বা এর বিপদের দিকটা তো ভালো। আর যদি তা কন্টিনিউ করেন তাহলে অন্য কারুর উছিলায় তার সঙ্গে আলাপ করা যাবে তখন। তিনি বুদ্ধিমান আদমি আছেন।

এখানে যেমন তার উছিলায় অন্যদের সঙ্গে আলাপ সেরে নেয়া যাচ্ছে। যেসব ভারতীয় বাঙালি গেল বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশেকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তারা ব‌‌‌লেছিলেন বাংলা ভাষার কথা। বাংলাকে তারা নিজেদের আবেগ দিয়ে সর্বজনীন করে তুলেছিলেন প্রায়। তাদের কথার অর্থ এমন দাঁড়ায় যে, এই বাংলা বাংলাদেশকেও ছাড়িয়ে একটা মহামঙ্গলময় বাংলা, সেক্যুলার বাংলা। মানে বাংলাটা একটা শহীদ মিনার আর কি। একটা স্ট্যাচু বা নির্বাক বর্ণমালা। এদের লোকাল বা সেন্ট্রাল নাই। এর কোনও প্রমিত, অপ্রমিত নাই। দেশ বা কাঁটাতার নাই, বিএসএফ নাই।

তাদের দেশে বাংলার অবস্থা নিয়ে এখানে আলাপ করব না। কিন্তু তারা নির্জলা বাংলা-আবেগ চাপাতে চান আমাদের উপর। অথচ বাংলা নিয়ে মারামারির ভাগ নিতে চান না। আমাদের এখানে বাংলাধিপত্য বা প্রমিতাধিপত্যের প্রতি এটা তাদের একটা উস্কানিও হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়। কেমন অরাজনৈতিক এবং নির্দলীয়ভাবে তারা বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে চান।

মৃদুলরা যতই মুক্তিযুদ্ধ কিম্বা বাংলা ভাষার কথা বলুন, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের একটা তফাত তৈরি হয়ে আছে। এটা এমন কাব্য-আবেগ দিয়ে মিটানো যাবে না।

shuvra 778

কোলকাতা বইমেলায় মৃদুল দাশগুপ্ত, ২০১৪

এখানকার লেখাপত্র তারা কতটা কী পড়েন? মেইনস্ট্রিমের প্রতি অভ্যস্ততা থাকলে অনেক সময় ছোটখাট চিন্তা সহজে চোখে পড়ে না। বা নিজের তরিকার বাইরে চোখ না দিলে ছোটখাট নড়াচড়া নজরে আসে না। মৃদুলদের সিপিআই দোষ আছে কিনা সহসা সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এই দোষ থাকলেও বড় বড় বিষয়ের ম‌ধ্যে নজর আটকে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের দোষও থাকতে পারে। কেমন “রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি” টাইপ শোনাচ্ছে এই অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের আক্ষেপ। তার বাক্যে ‘খারাপের’ উপর ‘ভালো’র বিজয় হয় নি এমন ঘোষণাও ঝন ঝন করে বাজে।

মৃদুলের মত পশ্চিমবাংলার বেশিরভাগ বৃদ্ধিজীবী অথবা সাহিত্যিকের মত। তারা বাংলাদেশকে আর চিনতে পারছেন না। মুক্তিযুদ্ধ কিম্বা ভাষা দিয়ে চিনছেন। বুড়ো হয়ে গেছেন তারা কেমন মনে হয়। বাংলাদেশটা তাদের ফেলে আসা বাপের বাড়ির মতো ঠেকে যেন। মানে একটা সময়ে যা স্বদেশ ছিল, তা দিনে দিনে বিদেশ হয়ে যাচ্ছে। মানে এটা আবার স্বদেশ হওয়ার সম্ভাবনা কখনও নাকচ হচ্ছে না। ক্রমে বিদেশ হবে ঠিক, আবার স্বদেশ হয়েও তো উঠতে পারে।

shuvra 774

বাংলাদেশের সাহিত্যিক জাকির তালুকদার ও মঈন চৌধুরীর সঙ্গে ইন্ডিয়ার সাহিত্যিক মৃদুল দাশগুপ্ত ও গৌতম চৌধুরী। মার্চ ২০১৫

কীভাবে হবে কে জানে? তারা যেমন এখানে এসে বলেন, “যেন নিজের দেশে এলাম।” তাদের এই বলাবলিতে আমরা যতটা আপ্লুত হব ততটাই বাংলাদেশ তাদের স্বদেশ হয়ে উঠবে? বোঝা যাচ্ছে না কিছু।

১/৪/২০১৫

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।