page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

করটিয়া কলেজে চার বছর (৩)

আগের কিস্তি । প্রথম কিস্তি

৮.

সুন্দর সুশ্রী যুবকটি নিজের পরিচয় দিল সিরাজ সিকদারের দলভুক্ত ছাত্র বলে

কিছু দিন পরের ঘটনা। সারা দিন ধরে ঝির ঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে।

কী কারণে কলেজ বন্ধ ছিল সে দিন। বাসায় বসেই কাজ করছিলাম। প্রতি বছরের মতো এবারও কলেজে সরকারি অডিট টিম এসেছিল কিছু দিন আগে। যথারীতি সব কিছুতেই টিক মার্ক দিয়ে গেছেন তারা। কিন্তু কলেজের অভ্যন্তরীণ সম্পদ কোথায় কী আছে এবং কী অবস্থায় আছে তা জানার একটা আগ্রহ ছিল আমার। সে জন্য বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি থেকে একজন করে শিক্ষক নিয়ে একটা ইন্টারন্যাল অডিট টিম গঠন করেছিলাম আমি।

অডিট টিমের কাজ অগ্রসর হচ্ছিল এবং কিছু কিছু ব্যাপারে টিম মেম্বাররা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল।

এই সব ব্যাপারে আমার নিজের অবগতির জন্যে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্যে আমি প্রতিদিন কলেজ অফিস থেকে কিছু মোটা মোটা হিসাবের বই বাসায় নিয়ে আসতাম।

বাসায় বসে ওই দিন এই ধরনের একটা মোটা বইতে নজর বুলাচ্ছিলাম।

বৃষ্টির মধ্যেই একটি আঠার-ঊনিশ বছরের ছেলে দ্রুত বেগে আমার রুমে ঢুকল এবং সালাম দিয়ে বসবার অনুমতি চাইল। আমি তাকে সোফায় বসতে দিলাম এবং নিজেও টেবিল ছেড়ে সোফার অন্য প্রান্তে বসলাম।

সুন্দর সুশ্রী যুবকটি নিজের পরিচয় দিল সিরাজ সিকদারের দলভুক্ত ছাত্র বলে। তার সাথে একটি অটোমেটিক চাইনিজ রিভলবার যা এক সঙ্গে এক ঝাঁক গুলি করতে পারে তা দেখিয়ে বলল, আমার পাশের রুমেই যে ছয়জন সশস্র পুলিশ রয়েছে এটা তার জানা আছে। তবে সে এসব ভয় করে না। ভয় করলে এখানে আসত না সে।

gate-sadat-c

সা’দত কলেজ।

আমি তার আসবার কারণ জানতে চাইলাম।

যুবকটি তার রিভলবারে হাত রেখেই বলছিল তার দল জানতে পেয়েছে যে সরকারি অডিট টিমের হাতে আমাদের অনেক গলদ ধরা পড়েছে এবং সেইগুলোকে ধামা চাপা দেওয়ার জন্যে আমি এবং আরও কিছু শিক্ষক কলেজের খাতাপত্রে তথ্য পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি।

আমি হেসে বললাম যে সে ভুল শুনেছে। ওর অবগতির জন্য আমি বললাম, সম্প্রতি কলেজে অডিট হয়েছে আগের বছরের অর্থাৎ কলেজে আমার যোগদানের আগের সময়ের অডিট। সেই সময়ের তথ্য বদলিয়ে আমার লাভ কী? তাছাড়া কলেজের প্রিন্সিপাল কলেজের খাতা দেখতে পারবে না এটা কেমন কথা?

খুব শান্ত ভাবে আমি ছেলেটিকে বললাম কলেজের শিক্ষক কিংবা প্রিন্সিপাল মেরে তাদের বিপ্লব সাধিত হবে না। বিপ্লবের জন্যে চাই জনমত। মানুষ যাদেরকে ভালবাসে তাদের মেরে ফেললে দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু আতঙ্ক দিয়ে বিপ্লব হবে না।

ছেলেটি আমাকে বলল আমাকে মারতেই এসেছিল কিন্তু সে ইচ্ছা করেই মারে নি।

আমি জানতে চাইলাম, কেন?

বললো, ওর ঘরে ঢুকবার পর আমি যখন চেয়ার ছেড়ে এসে ওর পাশে বসলাম তখন ওর মনে হয়েছে ক্ষমতার দম্ভ আছে এমন লোক এ কাজটি করবে না। তা ছাড়া তার মনে হয়েছে সততা না থাকলে রিভলবার দেখেও তাদের সাথে অমন নির্ভয়ে কেউ কথা বলতে পারে না।

ছেলেটি তখন জানতে চাইল আমার কোনো রিভলবার আছে কিনা।

আমি বললাম, “না।”

সে নিজের রিভলবারটি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে ওটি রাখার জন্যে অনুরোধ করল।

আমি বললাম, না। রিভলবার রাখতে হলে আমি সরকারি লাইসেন্সেই রাখতে পারি কিন্তু আমি মনে করি না রিভলবার আমাকে রক্ষা করতে পারবে। আমার পূর্বসূরী সামসুল আলমের বাসায় দু’বার আক্রমণ হয়েছিল ওনার রিভলবারটি হাত করার জন্যে। রিভলবার থাকলেই বরং অন্যেরা এসে এটি নেবার জন্যে আমাকে মারবে।

ছেলেটি তখন আমার পা ছুঁয়ে সালাম করল এবং নির্ভিক চিত্তে বের হয়ে গেল।

 

৯.

রক্তচোষার আক্রমণ

আরেক সন্ধ্যার ঘটনা। সেদিনও যথারীতি খাওয়া দাওয়ার পর বারেক ও বীরু চলে গেছে। বাচ্চু পাঁক ঘরে একা, আমি খাওয়ার টেবিলে গেলে আমাকে খাবার পরিবেশন করবে সেই অপেক্ষায় বসে আছে। আমি বাসার অফিসঘরে কাজ করছি। হঠাৎ বাচ্চুর চিৎকার।

বাচ্চুকে নিয়ে এমনিতেই আমরা একটু ভয়ভীতির মধ্যে ছিলাম। কারণ বাচ্চুর বয়স তখন দশ কি এগার। এই বয়সের বাচ্চাদের সম্পর্কে তখন তুমুল গুজব। ছেলেধরারা নাকি তাদের ধরে নিয়ে যায়।

কেউ কেউ এই ছেলে ধরাদের নাম দিয়েছে রক্তচোষা। তখন অনেককেই বলতে শুনেছি সরকার বিরোধী যে সব চোরাগুপ্তা বাহিনী মাঠে ময়দানে ছিল পুলিশ বি ডি আর বাহিনীর সাথে সংঘাতের ফলে তাদের অনেকেই মারাত্মক ভাবে আহত হতো। গোপন বাহিনীর সদস্য বলে সরকারী কিংবা বেসরকারী হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা সম্ভব ছিল না। গোপন ভাবে চিকিৎসার জন্যে প্রয়োজনীয় রক্ত তাদের কাছে ছিল না বা খোলা বাজারে কেনাও সম্ভব ছিল না। এমতাবস্থায় প্রয়োজনীয় রক্ত সংগ্রহের জন্যে ছেলেধরা ছিল একটি উপায়।

আমি দ্রুতবেগে বাচ্চুর কাছে যেতেই সে বলে উঠল “ছেলেধরা!” “ছেলেধরা!”

বাসার অন্যান্য সবাই “ধর” “ধর” করে একযোগে চিৎকার দিয়ে উঠল।

অনতিবিলম্বে হিন্দু হোস্টেলের ছেলেরা, প্রফেসর কলোনি থেকে শিক্ষক ও তাদের ছেলেরা, অন্যান্য হোস্টেলের ছেলেরা সবাই এসে হাজির।

বাচ্চুকে অক্ষত দেখে সবাই খুশি। বাচ্চুর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে অনেকেই অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল, বাচ্চু,  রক্তচোষা দেখতে কেমন?

 

১০.

হাতে-কলমে ইকনমিকস

সাদাত কলেজে আমার যোগদানের পর আট নয় মাস অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে কলেজের প্রশাসনিক ও আর্থিক অবস্থায় কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসছিল। মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে কাজ করার দিন আর নাই। কলেজের মালিকানাধীন জমি থেকে ফসল আসা শুরু হয়েছে যা বিগত বেশ কয়েক বছর যাবত একে বারেই বন্ধ ছিল।

কোনো বছর খরায়, কোনো বছর বন্যায়, কোনো বছর উলফা কিংবা কোনো বছর ইঁদুরের উপদ্রবে ফসল আর ঘরে আসত না। বর্গাদারদের কান্না শুনে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভাবতেন তাদের কাছ থেকে জমি ছাড়িয়ে নিলে ওরা মাঠে মারা যাবে। গত বছরের ক্ষতি পোষিয়ে নেওয়ার জন্যে আগামী বছরও ওরাই চাষ করুক, এই ছিল কর্তৃপক্ষের মনোভাব।

আমি ইকনমিকস অনার্সের ছাত্র-ছাত্রীদের এ কাজে লাগিয়ে দিলাম। অতি উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তারা হাতে-কলমে ইকনমিকস শিক্ষার কাজে ব্রতী হয়ে গেল।

উন্নত বীজ, ভারসাম্যপূর্ণ সার, সেঁচ ও উন্নত মানের ব্যবস্থাপনা সোনার ফসল নিয়ে এলো ঘরে। ফসল কাটার দিনে আমরা শিক্ষকরাও গিয়েছিলাম ছেলে-মেয়েদের সাথে। কী আনন্দ, কী উৎসব! এমন অনাবিল আনন্দ আর কখনও সাদাত কলেজের জীবনে এসেছিল কিনা আমার জানা নাই।

কলেজ পাড়ার বিভিন্ন স্থানে অনেক খেজুর ও সুপারি গাছ ছিল। বহুদিন যাবত এদের কোনো বাপমা ছিল না। খেজুর গাছগুলোকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে কলেজ এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি কিংবা খেজুরের রস সংগ্রহের কোনো চেষ্টা ছিল না।

সুপারি গাছের সুপারি কোথায় যেত তার কোনো হদিস ছিল না। আমি বয় বেয়ারাদের ডেকে বললাম, এখন থেকে এই সব গাছের দায়িত্ব তোমাদের। খেজুরের রস ও সুপারি বিক্রির টাকাও তোমাদের। এই টাকা তোমাদের জন্যে গঠিত ওয়েলফেয়ার ফান্ডে জমা হবে।

আমি লক্ষ্য করলাম এই খাতে টাকার পরিমাণ হয়ত খুব বেশি ছিল না কিন্তু উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল প্রচুর। কলেজের ভাগ্যের সাথে নিজেদের ভাগ্য জড়ানোর যে আনন্দ এবং এই কলেজ আমার কলেজ এই চিন্তার সাথে যে অহঙ্কার তার দাম টাকার অঙ্কে মাপা যাবে না।

 

১১.

সব বেতন মাফ করে দিলে কলেজ চলবে কী করে?

দেখতে দেখতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসল। আমাদের কলেজ থেকে সেবার মোট আড়াই হাজার ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষা দেওয়ার কথা। এই সব ছাত্রদের একটা তালিকা করে ছাত্র সংসদের ভি পি ও জি এস আমার কাছে পেশ করল অফিস স্টাফকে নির্দেশ দেওয়ার জন্যে যে এদের সবাইকে কেবল মাত্র বোর্ড ফি নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হউক।

আমি জানতে চাইলাম, এরা সারা বছর কেন বেতন দেয় নি?

উত্তর সহজ, এরা সবাই গরীব। কোনো রকমে বোর্ডের নির্ধারিত ফি জোগাড় করেছে। কলেজের ফি দিতে গেলে ওদের আর পরীক্ষা দেওয়াই হবে না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, সব বেতন মাফ করে দিলে কলেজ চলবে কী করে?

তাদের জবাব সহজ। বলল, এত দিন এভাবেই চলে এসেছে।

আমি ভাইস প্রিন্সিপালের পরামর্শ চাইলাম।

তিনি বললেন, গত দুই বছর যাবত আগের প্রিন্সিপালও তাদের চাপের মুখে ওভাবে লিখে দিতে হয়েছিল, কেবল মাত্র বোর্ড ফি আদায় করে পরীক্ষার ফরম জমা নেওয়ার জন্যে। তিনি নিজেও গতবারের পরীক্ষার সময় অমনটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

আমি ব্যাপারটা অন্যান্য শিক্ষকদের সাথেও আলাপ করলাম এবং কিছু ছাত্র-ছাত্রীর সাথেও আলাপ করলাম।

গার্লস হোস্টেলের কিছু ছাত্রী বুলবুলের একাকীত্ব কাটাবার জন্যে ওর সাথে বেডমিন্টন খেলতে আসত বাসায়। তাদের কাছ থেকে এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে জানতে পারলাম আসল ঘটনা।

বেশির ভাগ পরীক্ষার্থীই ভি পি জি এসের কাছে তাদের সাধ্যানুসারে বেতন ও পরীক্ষার ফি বাবদ টাকা দিয়েছে। মোট চব্বিশ মাসের পাওনার মধ্যে কেউ দশ মাস, কেউ পনের মাস, কেউ বা বিশ মাসের বেতন দিয়েছে। বাকি টাকাটা মাফ পাইয়ে দেবার জন্যে ভি পি ও জি এসের শরণাপন্ন হয়েছে।

chhatrinibas-sadat-c

ছাত্রীনিবাস।

আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য চার সদস্য বিশিষ্ট একটি রেয়ায়েত বোর্ড গঠন করলাম। একজন সিনিয়র শিক্ষক, একজন জুনিয়র শিক্ষক, ভি পি এবং জি এস এই চার জন সদস্য। চেয়ারম্যান হিসাবে আমি নিজেই থাকলাম। বললাম, আমরা প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর সাক্ষাৎকার নেব এবং প্রয়োজন বোধে চব্বিশ মাসের বেতনই মাফ করে দেব। কিন্তু প্রত্যেক পরীক্ষার্থী আমাদের সামনে আসতে হবে এবং কেন সে রেয়ায়েত চায় তার বিবরণ দিতে হবে।

আমার এই ঘোষণায় ছাত্র সংসদ বিপদে পড়ে গেল, কারণ পরীক্ষার্থীরা আমাদের সামনে আসলেই তাদের গোমর ফাঁক হয়ে যাবে। তারা রেয়ায়েত বোর্ডের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া শুরু করল।

আমি তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম, প্রয়োজন বোধে আমি চাকরি ছেড়ে দেব, কিন্তু আমার নীতি অটুট থাকবে। কলেজের শিক্ষক কর্মচারী সবাই একযোগে আমার কাজের অনুমোদন ও সমর্থন দিতে লাগল। দু’এক জন ভিন্নমতের থাকলেও তা আমার সামনে কেউ উচ্চারণ করে নি।

রেয়ায়েত বোর্ড গঠন করার সাথে সাথেই আমি প্রত্যেক ছাত্রের বাড়ির ঠিকানার রেজিস্টার্ড পোস্টে চিঠি পাঠালাম।

চিঠিতে জানালাম বার বার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও  এই ছাত্রের আবেদন পত্র এখনো কলেজ অফিসে পৌঁছায় নি। নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে তাদের পরীক্ষার আবেদন পত্র রেয়ায়েত বোর্ডের মাধ্যমে দাখিল না করলে সে আর এ বছর পরীক্ষা দিতে পারবে না। এ জন্যে কলেজ কতৃপক্ষ কোনো ক্রমেই দায়ী থাকবে না।

ভি পি জি এস প্রথমে স্লোগান ও প্রেসার সৃষ্টি করে এবং পরে রাতের অন্ধকারে আমার পায়ে পড়ে থেকেও যখন আমার টনক নাড়তে পারল না তখন তারা আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া শুরু করল। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার তেমন কিছু ছিল না তাদের। কেবল মোদের দাবি মানতে হবে নইলে গদি ছাড়তে হবে এটাই ছিল একমাত্র এবং বিভ্রান্তিকর স্লোগান।

দাবিটা কী এটা মিছিলে শরীক হওয়া অনেক ছাত্রেরই জানা ছিল না।

আমি শিক্ষকদের সভা ডাকলাম এবং বললাম আমি যা করেছি তা সবাইর ভালর জন্যে এবং কলেজের ভালর জন্যেই করেছি। আমি দায়িত্ব ছেড়ে দিলে যদি কলেজ শান্ত থাকে এবং কলেজের উন্নতি হয়, বাস! আমার পদত্যাগ পত্র লেখাই ছিল, আমি তা সবার সামনে টেবিলের ওপর রাখলাম।

শিক্ষকদের অনেকেই আবেগে কেঁদে ফেললেন এবং সবাই একযোগে পদত্যাগ পত্র লিখে আমার হাতে তুলে দিলেন।

আমার পদত্যাগের খবর দ্রুত বেগে ছড়িয়ে গেল। মিটিং থেকে এসে অধ্যক্ষের অফিসে ঢুকে দেখি, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী্রাও একযোগে পদত্যাগ করেছেন। শিক্ষক ও কর্মচারীদের দাবি একটাই, এই প্রিন্সিপাল না থাকলে আমরা কেউ চাকরি করব না।

আমি টেলিফোন করে জেলা প্রশাসক শাহ ফরিদকে সম্পূর্ণ ঘটনা জানালাম। তিনি বললেন, কোনো চিন্তা করবেন না, আই উইল টেক কেয়ার। আপনি ঢাকা যান এবং ওদিক সামলান।

এক ঘণ্টার মধ্যেই জেলা প্রশাসকের আদেশে কলেজের সমস্ত রুম তালা বদ্ধ করে সীল গালা করে দেওয়া হল এবং সম্পূর্ণ কলেজ এলাকায় পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হল। ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটেছিল যে ছাত্র সংসদ বা তাদের পরামর্শদাতারা তাল ঠিক রাখতে পারে নি।

পর দিন ঢাকা গিয়ে প্রথমেই মিনিস্টার মান্নান সাহেবকে সব জানালাম। তিনি বললেন ভালই হয়েছে, আমি এমনটা হবে আশা করতে ছিলাম।

পরে বললেন এ ব্যাপারে উচ্চ পর্যায়ের একটা মিটিং হওয়া দরকার। পর দিন মিটিং হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। শিক্ষামন্ত্রী প্রফেসর ইউসুফ আলী, শিক্ষা সচীব প্রফেসর কবীর চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক এস বি হোসেন এবং ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন এই সভায়।

উপস্থিত সবাই আমার নেয়া পদক্ষেপের খুব প্রশংসা করলেন কিন্তু আমার পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করা যাবে না একথাও  জানিয়ে দিলেন আমাকে।

ইউসুফ আলী সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কী চাই।

আমি বললাম, ঢাকা বোর্ডে পরীক্ষার ফরম পাঠানোর শেষ তারিখ সমাগত। আমাকে আরো সময় দিতে হবে।

এম সি কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। পরীক্ষা শুরু হওয়ার দুদিন আগে ফরম জমা দিলেও তোমার কলেজের পরীক্ষা নেওয়া হবে।

মিটিং শেষে মান্নান সাহেব গেলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে। আমিও সাথে ছিলাম। ব্যাপারটা দীর্ঘদিন দিন ধরে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে নি জেনে তিনি খুশি হলেন। সেখান থেকে আমরা গেলাম আওয়ামী লীগের তদানীন্তন জেনারেল সেক্রেটারি জিল্লুর রহমান সাহেবের ধানমণ্ডিস্থ বাসায়।

তিনি সব শুনে বললেন, আমি চাইলে দুই দিনেই সব ঠাণ্ডা করে দেওয়া যায়। মান্নান সাহেব বললেন, না, বাহিনী পাঠিয়ে উৎপাত বাড়াবার দরকার নেই। প্রিন্সিপাল সাহেব নিজেই সামাল দিতে পারবেন।

আমার ব্যবস্থাপনার ওপর তার বিশ্বাস দেখে আমার ভালই লেগেছিল সেদিন। আমার মনে পড়েছিল ১৯৬৬ সালে ছাত্র সংসদের তদানীন্তন ভি পি শাজাহান সিরাজকে এমনি কোনো বাহিনী দিয়ে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তার ফলাফল ভাল হয় নি কলেজের জন্যে।

পরের দিন জাতীয় দৈনিকগুলিতে বিরাট হেডিং দিয়ে খবর বের হয়েছিল করটিয়া সাদত কলেজের সমগ্র শিক্ষক কর্মচারীদের এক যোগে পদত্যাগ এবং জেলা কর্তৃপক্ষের আদেশে কলেজ অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা।

পরের সপ্তাহেই মান্নান সাহেব করটিয়া আসলেন এবং কলেজের শিক্ষক কর্মচারীদের সাথে একত্রিত হলেন। তিনি গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে, নিজের পক্ষ থেকে এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সবাইকে অনুরোধ করলেন পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার করার জন্যে। কলেজের সকল সমস্যার আশু সমাধানের নিশ্চয়তা বিধানের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার করলাম।

পরদিন কলেজ খুলে দেওয়া হল। সাধারণ ছাত্ররা ক্লাস করা শুরু করল এবং পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার ফরম জমা দেওয়ার জন্যে রেয়ায়েত কমিটিতে হাজির হতে লাগল।

ছাত্র সংসদের ভি পি মনসুর ও জি এস মকবুল কিছু দিনের জন্য গা ঢাকা দিয়ে রইল। কারণ তাদেরকে পেলেই পরীক্ষার্থী ছাত্ররা মারমুখী হয়ে টাকা চাইতে থাকে, অথচ টাকা তারা আগেই খরচ করে বসে আছে।

রেয়ায়েত কমিটি অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে সকল পরীক্ষার্থীর আবেদন বিবেচনা করেছিল। যথেষ্ট রেয়ায়েত দেওয়ার পরেও ছাত্র বেতন বাবদ কমপক্ষে চার লক্ষ টাকা উসুল হয়েছিল সে যাত্রা।

আমাদের সাহসী ভূমিকার জন্যে আমরা সাদত কলেজের সকল শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে অনেক বাহবা পেয়েছিলাম।

 

১২.

আনন্দে এ চাঁদের নাম দিলাম লুনা

এই সময়ে বুলবুল গর্ভাবস্থায় ছিল এবং হাসপাতালে যাওয়ার তারিখ ছিল খুবই সন্নিকটে।

আমাকে প্রায় রোজই ঢাকায় থাকতে হচ্ছে বিভিন্ন কাজে। তাই বুলবুলকে মির্জাপুর কুমুদিনী হাস্পাতালে রেখে যাই ড. সামাদ সাহেবের তত্ত্বাবধানে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সম্মান করে আর পি সাহের মেয়ের জন্য সংরক্ষিত কক্ষটি বরাদ্দ করেছিল।

দুদিন থাকার পর বুলবুলের আর ওখানে ভাল লাগে নি। লন্ডনের সেন্টস্টিফেন হাসপাতালে আমাদের প্রথম সন্তান জন্মেছিল। বাংলাদেশে এসে তার কাছে আর কোনো হাসপাতাল ভাল লাগে নি।

luna-biru-bacchhu

বাচ্চু, লুনা ও বীরু।

এদিকে আমি ঢাকা থেকে মির্জাপুর আসি ওকে দেখার জন্যে। ইচ্ছা ছিল ওখান থেকে আবার ঢাকা চলে যাব। মির্জাপুরে নেমে সোজা ড. সামাদের বাসায় যাই এবং জিজ্ঞেস করি ওনার রোগী কেমন আছে।

ওনার কাছেই জানতে পারি দুদিন থাকার পর সে ড. সামাদকে না জানিয়ে করটিয়া চলে গেছে।

আমার আর ঢাকা ফিরে যাওয়া সম্ভব হল না। বাধ্য হয়ে করটিয়া চলে যাই বুলবুলকে দেখার জন্যে। গিয়ে দেখি চাঁদের কণা নেমে এসেছে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে । আনন্দে এ চাঁদের নাম দিলাম লুনা (Luna)।

লুনার জন্মের সময় প্রফেসরস কলোনি থেকে সমস্ত ভাবিরা, ভাইস প্রিন্সিপাল নিজে এবং তার স্ত্রী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন সারা রাত ধরে।

কয়েক জন অভিজ্ঞ ধাত্রী ও ডাক্তার সারাক্ষণ বুলবুলকে সেবাদান করেছেন। এমন সেবা, যত্ন ও মনযোগ এক মাত্র পন্নী ফ্যামিলীর বেগম সাহেবরাই পেয়ে থাকেন, করটিয়াবাসীর অমনটিই ধারণা।

(চলবে)

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।