page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

কাবুল ভাই

কাবুল ভাই আর আমার সম্পর্ক একদিনেই গড়াইছে বহদূর। কাবুল ভাই সম্বন্ধে আমগো এলাকায় এক রকম আলাদা মনোভাব আমি দেখছি। দেখছি যে, লোকে কাবুল ভাইরে ভয় পাইয়াই আরাম বোধ করে।

কেন ভয় পায়? এই প্রশ্ন আমার ভেতরে জাগল। ভাবলাম, ব্যাপারটা আমি বাহির করব। কিন্তু কাবুল নামের ভদ্রলোকটির ক্যাটেগরি ভিন্ন মনে হয়। এলাকার মধ্যেই তার নিবাস বটে কিন্তু এরপরেও উনি আসলে এলাকার বাইরে থাকেন। কাবুল ভাইরে দেইখা মেয়েরা ত্রস্ত পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করে। বুড়োরা যত সম্ভব মৃদু ভঙ্গিমায় আগায়।

কাবুল ভাইয়ের আচরণে একটা ব্যাপার দেখা যায়, উনি বাচ্চা দেখলেই অদ্ভুত আদর করতে চান। ধরেন এক মহিলা তার ছোট বাচ্চারে নিয়া দোকান পর্যন্ত যাবেন। পথিমধ্যে কাবুল ভাই আছেন। যেহেতু কাবুল ভাই বাচ্চাটারে দেইখা ফেললেন। ফলেই অরে নিয়া পাশের একটি দোকানের সামনে গিয়া দাঁড়াইলেন। জিগাইলেন, কী খাবা তুমি বাবা?

saad rahman logo

কাবুল ভাইয়ের এই টাইপ আচরণরে লোকে সমাদর করতে পারত। কিন্তু তা তো করে না। এই ব্যাপারটাই আমি ভাবি। আসলে কী হইতে পারে? লোকে তারে ডরাইব কেন? তিনি তো গলির মুখে দাঁড়ায়া চিল্লাচিল্লি করেন না। উপরন্তু এলাকার অন্য সব পাওয়ারফুল লোকদের মতন হিসাব-নিকাশ তার নাই। মোটকথা, অন্য সব বাজে আচরণের মাঝখান দিয়া তারে যাইতে হয় না। কিন্তু এরপরেও কাবুল ভাইয়ের সামনে প্রায় সকলের গতি শ্লথ হয়ে যায়। এমনকি আমারও। আমি জানি না, তিনি সন্ত্রাসী, নাকি রাজনীতিবিদ, নাকি সমাজসেবক।

একদিন রাইতে আমি বাসায় ফিরব। দেখি কাবুল চায়ের দোকানটিতে বইসা আছেন। আমার ফেভারিট চায়ের দোকান এইটা। এইখনে বইসা বইসা আমি বিল্ডিংয়ের দিকে তাকায়া বেশ কয়েকটা প্রেমের বা সম্পর্কের অবতারণা ঘটাইছি। চায়ের দোকানে কাবুল নামক ভদ্রলোকরে দেইখা আমি আগায়ে গেলাম। বইলা উঠলাম, “হাই মিস্টার কাবুল। হাউ আর ইউ?” তারে কতখানি আপসেট কইরা দেওয়ার মনোবাসনাতেই আমি এমন ডায়লগ ছুঁড়ে দিলাম। কিন্তু আমার থ্রোয়িং ডিসমিসাল হইল না। কাবুল ভাই “ওহ ম্যান” বলতে বলতে আমার দিকে তার হাতের মুঠি বাড়ায় দিলেন। আমি হাত মুঠি কইরা তারে মৃদু একটি ঘুষি দিতেই উনি বসতে কইলেন আমারে। “বসেন” বললেন, আর চা অলারে চা দিতে কইলেন।

আমি আসলে কাবুল ভাই সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান না রাইখাই তার দিকে আগায় গেলাম। ব্যাপারটা বোধহয় উনি বুইঝা ফেললেন। আমি যে আসলে কাবুল ভাইয়ের ব্যাপারে জানতে চাইয়া তার সাক্ষাতে গেছি। এইটা উনি বুইঝা ফেলার ফলে আমার মুসিবত হইল। তথা খুব ইজিলি আমি কাবুল ভাইয়ের আটা গিলা ফেললাম। অনেক কথা-টথা আমাদের হইল। ওই রাত ছিলো পূর্ণ শীতের রাত। এই শীতের পরিবেশে ফিটফাট পোশাক পইরা কাবুল ভাই আমারে কত গল্পই না শোনাইলেন। বিভিন্ন বিষয়ে, বিভিন্ন মাত্রায়, হরেক কিসিমের গল্প শুইনা যখন ওই রাতে আমি বাসার দিকে যাই তখন মনে মনে আমি বলতেছি, মাল একটা! আমি মুগ্ধতায় হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া ফেলছি। অথচ তখনো পর্যন্ত কাবুল ভাই তার আসল প্রকৃতির একফোঁটাও ঝাড়েন নাই।

কিন্তু এইটারে আফসোসে রূপ দিয়া লাভ নাই। আমি যে আস্তে কইরা কাবুল ভাইয়ের চামচা বা শাগরেদ হইছি। বা উনার টোপ আমি গিলা ফেলছি। ব্যাপারটা পজিটিভলিও নেওয়া যাইতে পারে। আমি একসময় এইটারে ইতিবাচকতায় পর্যবসিত কইরা নিছি। তাতে কাবুল ভাইয়ের হরেক কাজকম্ম আমার পক্ষে ইনজয়ের হইয়াই দেখা দিছে।

এর কিছুদিনের মধ্যে আমি কাবুল ভাইয়ের বাসায় গেলাম। সেইদিন গেলাম সন্ধ্যার টাইমে। আমি উঠতেছি উনার বাসার সিঁড়ি দিয়া। দেখি এক মহিলা নামতেছেন। ধারণা করলাম, বউ হইতে পারেন। আমি যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাইখা একটু ছিনাল ভাব কইরা হাসি দিলাম। সেইসঙ্গে সালাম। সালামের প্রত্যুত্তরে উনি ওড়নারে নতুন কইরা পরলেন। এবং নাইমা গেলেন নিচের দিকে। আমি অনেকটা শিউর যে ইনি কাবুল ভাইয়ের বউ। আবার মনে মনে ভাবলাম, তার বউ আমারে দেইখা এমন কইরা ঠিক করল কেন? ভাবলাম, কিছু কি বোঝাইল? ব্যাপারটা ভালোই লাগল আমার। আমি কাবুল ভাইয়ের বাসায় লক ঘুরায়া ঢুইকা পড়লাম। চারতলা, এবং কোণার একটি ঘরে উনি থাকেন। আমার পায়ের শব্দে উনি শুদ্ধ বাংলায় ভিতরে আমন্ত্রণ জানাইলেন। আমি বাইরের জুতার পরিবর্তে ঘরের কাপড়ের একটি জুতা পরিধান কইরা কাবুল ভাইয়ের ঘরের দিকে আগাইলাম।

kabul-3

উনি একটা পাতলা কম্বল চাপা দিয়া গুগলিং করতেছিলেন। আমার দিকে না দেইখাই বলে উঠলেন, “ওহ ম্যান! শ্যানেল মানে ওই শ্যানেলই। শ্যানেল ছাড়া নায়ক-নায়িকা কাপড় পিনবে কোত্থিকা?” আমি জিগাস করলাম, “ফ্যাশন ডিজাইনের শ্যানেলের কথা কইতেছেন?” কাবুল ভাই মাথা দুলাইলেন। অতপর ইউটিউবে গিয়া শ্যানেল ফ্যাশন শো সার্চ কইরা লম্বাচওড়া মেয়েদের হাঁটাহাঁটি ও দিগম্বরতা দেখতে লাগলেন। জিগাইলেন, একটা সিগ্রেট খাইবেন সাদ? আমি সিগ্রেট নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায়ে দিলাম। এরই ফাঁকে সুযোগে বইলা উঠলাম, আপনের বউরে তো দেখছি। কাবুল ভাই আমার কথায় একটু অবাক হইতে হইতে হাইসা উঠলেন। ঘুইরা তাকায়া লাইটার জ্বালাইতে সময় হাসির গতি আরেকটু উচ্চে তুইলা বললেন, বউ পাইলেন কই?

যা হোক। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হইল। জানা গেল, কাবুল ভাইয়ের বউ আত্মহত্যা করছে। কেন করছে? এই প্রশ্নে আমি যাই নাই। ভাবলাম, দিন গড়াইলেই বোঝা যাইব সব। আরেকটা ব্যাপার আমার মাথায় আসল। কাবুল ভাইয়ের আড়ালে আমি একটা ক্লু পাইলাম, জনগণ কেন তারে ভয় পায়। বুইঝা নিলাম, এই বিষয় আমার জানাই নাই। হয়ত ঘটনাটি ঘইটা গেছে যখন, তখনও আমি ছোট। একবার চাহিদা হলো জিজ্ঞাস করি, কাবুল ভাই, আপনের কি কোনো পিচ্চি-টিচ্চি আছিল? পরে আর জিগাইলাম না। ধারণা করলাম। হু, থাকতেই পারে। এবং কাবুল ভাইয়ের বাচ্চাপ্রেমের উৎসও হয়ত ওইটাই।

প্রথম দিনের মতো আলাপ-সালাপ সাইরা বের হইতে যামু। কাবুল ভাই আমারে মদের নিমন্ত্রণ করলেন। কবে? জানতে চাইলে বললেন, যে কোনোদিন। উনি সিঁড়িতে আমাকে নামায় দিতে আসলেন। আমি জুতা পরিবর্তন করতেছি। কাবুল ভাই একটু রহস্যের আমেজ নিয়া বললেন, ওই মহিলা আমার কাছেই আসছিল। আমি একটু ইতস্ততঃর সহিত কইলাম, “অ।” কাবুল ভাই পুনরায় কইলেন, “ওই-ই তো আমারে শ্যানেলের সন্ধান দিছে। অরও একটা ফ্যাশন হাউজ আছে।”

এই সকল ঘটা ঘটনার মাঝখানে চলতে চলতে, প্রায় দিন রাতে কাবুল ভাইয়ের বাসায় থাকতে থাকতে আর মদ পান করতে করতে ব্যাপারগুলো ইজি হইতে চলল। লক্ষ্য করলাম যে, মাঝেমধ্যেই আমাদের সঙ্গে মদ পান করতে আসেন অন্য কেউ। তাতে বেশির ভাগ মেয়ে থাকেন। ছেলেরাও আসেন। আমার মতো এত বেশি না। আমি তো সুযোগ পাইলেই। কাবুল ভাই আমারে একদিন বলেন, সাদ, তোমারে যেহেতু আমার ভাল্লাগছে। তাই তুমি আমারে কিছু কাজ কইরা দিবা। আমিও তাহারে কিছু কইরা দিই। যেমন, কখনো উনার বাসায় উঠতে গেলে সিগ্রেট নিয়া উঠি। কখনো টাকা-পয়সাও ক্যারি করি। একবার মধুপুর যাইতে হইল। কাবুল ভাই আমারে বললেন, একা পারবা? নাকি আর কাউরে দিব? আমি হাসতে হাসতে একটু দুষ্টামির সঙ্গে বললাম, মেয়ে হইলে দিতে পারেন। উনি ‘ওকে’ জানায়া মাথা কাইত করলেন। এর পরদিন আমি ইয়াসমিন নামের এক মেয়ের সঙ্গে মোমেনশাহির মধুপুরে রওনা দিলাম। কিছু টাকা পয়সা আনতে হইছে। কর্জ হিসাবে। আর মধুপুরে গিয়া একটি হোটেল দেইখা আসতে হইছে। কিছু ছবি তুলছি আমরা, দেখছি দেয়াল ফাটা কিনা। মনে মনে গেজ করছি, কাবুল ভাই ওই হোটেল ক্রয় করবেন। বা কাউরে দিয়া কিনাইবেন। ইয়াসমিন আর আমি সকালে গেছি। রাতে চইলা আসছি। তবে সন্ধ্যার পরে বাসে ইয়াসমিন আমার কাঁধে নিশ্চিন্তে ঘুমাইছিল।

ঘটনাদি গড়াইতে লাগলে। একদিন দেখি পুলিশ আইসা নকাইতেছে আমগোর বাসার দরোজায়। ভাবি পুলিশ কি তাহলে কাবুল ভাইরে অ্যারেস্ট করতে নিল? সবচে সমস্যার ব্যাপার যেটা হইল, এক মেয়েও ছিল তখন। আমরা সিনেমা দেখতেছিলাম, বড়লোকের হলে তখন ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ চলে। আমরাও সেইটা দেখি। কাবুল ভাই ওয়াশ রুমে গেছেন। পুলিশ আইসা মৃদুস্বরে দরোজায় নকাইতে লাগল। আমি একটু চিন্তিত হইলাম। কেননা, ঘরের মেয়েটারে কী মনে করে পুলিশ। কে জানে! অথচ কাবুল ভাইয়ের মাঝে এই চরিত্র কখনোই পাই নাই। অনেক বার অনেক মেয়েরে তার কিনারে দেখছি। কোনোদিন কাছাকাছি হয়ে বসবারও বাসনা পরিলক্ষণ করি নাই। আর আজকে এই মেয়ে কেসে যদি ফাঁইসা যান কাবুল ভাই? তার লগে লগে আমিও। আমি জলদি কইরা কাবুল ভাইয়ের টয়লেটের চিপায় মুখ রাইখা খবর জানাইলাম। কাবুল ভাই গম গম স্বরে বিরক্তির সঙ্গে কইল, দোর খুইলা ভিতরে বসতে দাও!

kabul-2

সেইবার কিছুই ঘটল না। পুলিশ আর কাবুল ভাই নিরুদ্বেগভাবে কথা বললেন। স্বাভাবিক পন্থায় কথা শেষ হইলে পরে কাবুল ভাই নিজ হাতে কফি বানাইলেন। কফি আমরাও খাইলাম। পুলিশ চলে গেল। আমরা ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াসের বাকি অংশ দেখতে বসলাম। দেখার পরে ছবির আমেজ নিয়া আমি আর কাবুল ভাই মদ টেনে নিলাম। মেয়েটা বিদায় দিয়া চইলা গেল। কিন্তু পুলিশের বিপত্তি রয়ে গেল। আমি হঠাৎ করেই বললাম, কাবুল ভাই, ওই মহিলাটা কই? ওই যে আমি আপনের বউ ভাবছিলাম।

মহিলার প্রসঙ্গটা ওইদিন পুলিশ চইলা যাওয়ার পরে আমি তুললাম। এইটা নিয়াই আমার দ্বিধা কাটে না। কেন আমি জিগাইলাম? ভালো করছিলাম আমি এমন প্রশ্নে, নাকি খারাপ।

কাবুল ভাই কিছুক্ষণ হাইসা আমারে বলছিলেন, ওকে, কালকে যাইয়ো তার বাসায়। বোতল নিয়া যাইয়ো।

স্বভাবতই আমি ঝলমল কইরা উঠলাম। মনে বাজতে থাকল কেন আমারে যাওয়ার কথা কইলেন কাবুল ভাই। কাবুল ভাই তো নিজ থিকা কখনোই এমন কইরা বলেন নাই। এক মাসের বেশি হইছে তার সঙ্গে। এতদিনে তিনি আমার প্রতি এমন নেকের নজর দিলেন। আনন্দ আমার হয় না অত, এমন সেক্স কিম্বা কাছাকাছি হইতে পারলে। কাবুল ভাইরে বললাম, আপনে কয়া দিলে কেমন না? বরং নাম্বার দেন। আমি ফোন করি, উনি চাইলে পরেই আমি উনার বাসায় যাব। কাবুল ভাই নাম্বার দিলেন।

পরদিন ওই মহিলার সম্মতিতেই আমি তার বাসায় গেলাম। দেয়ালে দেখলাম টেইলর সুইফট। আরো কেউ কেউ। বোতল ছিল একটা, ওইটা খাইয়া পরে ফিরে আসতেছি। বাসা থিকা বের হওয়া মাত্রই দেখি আমার জন্য পৃথিবী খালি খালি মনে হয়। কাবুল ভাইকে ফোন দিলাম। একটু ধন্যবাদ দিব। তাছাড়া মদও গিলছি খানিক।

কাবুল ভাই ফোন ধইরাই বললেন, কী সমস্যা? ভাবলাম উনিও মদ খাইছেন। তাই এমন কইরা কথা বলতেছেন। কিন্তু উনি তো মদ খান নাই তখন। তাহলে? সমস্যা কী? ভাবলাম সমস্যা হইল ওই ফ্যাশন ডিজাইনার কাবুল ভাইয়ের বউ লাগেন। তার বউ তো আত্মহত্যা করছে। আমি ওই শীতের রাইতের চায়ের দোকানে গিয়া—যা কিনা আমার ফেভারিট, বুড়া চা অলারে জিগাইলাম, কাবুল ভাইয়ের বউ কি আত্মহত্যা করছে? বুড়া “হুর” বইলা উঠলেন। “হের বউ তো আহে এইখানে, চিনো না তুমি?”

আমি কইলাম, থাকে কই?

বুড়া বললেন, আঃ রে বাসাবো।

আমি এইমাত্র রাইখা আসা বাসাবোর দিকে একবার তাকাইলাম।

About Author

সাদ রহমান
সাদ রহমান

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৬। কবিতার বই: 'কাক তুমি কৃষ্ণ গো' (২০১৬)।