page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

কার টাকায় কে মরে কে কান্দে

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ—ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-কে ২০টি দেশের ৫১টি প্রতিষ্ঠান সামরিক রসদ সরবরাহ করছে। আমেরিকার সহায়তা নিয়ে ইসরাইল আইএস-এর গুটি নাড়বার বিষয়টাও দুনিয়ার মিডিয়ায় এসে গেছে ইতোমধ্যে।

ধন-সম্পদ-টাকা-পয়সা-সম্মান-প্রতিপত্তি এক শব্দে আরবীতে مال (মাল)। এই মাল দুনিয়ার নীতি-নৈতিকতা ধর্ম কর্ম সব কিছুকে কানে ধরে ঘুরায় দেখা যায়। মালের জন্যে বহু ভেলকি, বহু তামাশা। মালের কারণে মায়াও আছাড় খায় পথে-ঘাটে। মাল দ্বারা মালামাল মানে মালওয়ালা বা মালদার।

ইসরাইল মালদার দেশ। আরব দেশগুলো মালদার, আরো আছে দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশপিতা ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসান বলখিয়া একজন বিস্ময়কর মুসলিম মালদার। তার আছে বিশাল রাজপ্রাসাদ, যেখানে সোনালেপা অনেক কক্ষ, আছে সোনালেপা গাড়ি এবং সোনালেপা বিমান।

abudhabi-theke-1

মালের দাপটে ইসরাইলের ইহুদিরা এই যুগে বেশ আছেন। অসাধারণ ব্রেইনি ইহুদি ত সব যুগে জন্ম নিয়ে আসছেন। বনি ইসরাইলের বংশধর বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও। তার হাইয়ার ফিজিক্সের সূত্র দুনিয়ার রঙ রূপ পাল্টাইছে। ইহুদি বাপ মার সন্তান বিজ্ঞানী ফাইনম্যান ইহুদি ধর্মের বাইরে নিজেকে রাখতেন। কনভেনশনাল ধর্ম তার বুঝে পড়ত না। কোনো ‘জাতি’ পরিচয়ের লেবেল লাগিয়ে বইয়ে বা তালিকায় লিখতে মানা করতেন। কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডায়নামিক্সে বিশেষ অবদান রাখায় ১৯৬৫ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে ‘জিউইশ উইনার’ বলতে দেন নি। তিনি ইহুদিদেরকে ‘চুজেন পিপল’ মনে করতেন না।

sarwar-3-d

ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসান বলখিয়ার সোনালেপা লিমুজিন।

বাদশাহ সুলাইমান, তিনিই নবী সুলাইমান আঃ। সেই সময়েও নবীর রাজ্য ‘কিংডম অব ইসরাইল’, এর সাথে পালাএস্টিনা রাষ্ট্রের শত্রুতা তীব্র ছিল। তখনকার আশেপাশের অন্য রাজ্যগুলোর সাথে অতটা দুশমনি ছিল না। বর্তমান গাজা এলাকাটি হলো সেই প্রায় দুই হাজার বছর আগের পালাএস্টিনা। বাদশাহ সুলাইমানের শাসনামল খৃষ্টপূর্ব ১০৪৭ – ১০০৭ পর্যন্ত। ওই বিশাল অঞ্চলের ভাষা তখন আরবি ছিল না। মিশরের আদি ইজিপশিয়ান ভাষাটাও আরবি না। নবী ঈসা আঃ এর ভাষা ছিল আরামায়িক। কোরআনে আরামায়িক ভাষার শব্দ বাক্য আছে। যেমন সূরা ইউসুফে “হায়তা লাকা”। অর্থ ‘আমি তোমার জন্যে প্রস্তুত’। (তফসীর ইবনে কছির)

এভাবেও বলা যায়, ওইখানে আগে, বহু আগে, বর্তমান ইসরাইলিদের আবাসভূমি ছিল না, ফিলিস্তিনি আরবদেরও ছিল না। গ্লোবাল হিউম্যান মোবিলিটি হাজার হাজার বছর ধরে হয়ে আসছে। কোথাকার ব্যাটা কোথায় গিয়ে বংশ বিস্তার করে তার নিশ্চয়তা আছে কি?

পশ্চিম এশিয়ার ওই বিশাল ভূখণ্ড যুগে যুগে বহু গোষ্ঠীর দখলে থেকে শাসিত হয়ে আসছে। এই জায়গায় প্রাচীন কেনানদের দখলে ছিল, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রদেশ ছিল, অ্যারিস্টটলের ছাত্র ‘মহাবীর’ আলেকজান্ডারের দখলে ছিল—তখন গ্রিস থেকে শুরু করে মিশরসহ পুবদিকে একেবারে বর্তমান পাকিস্তান পর্যন্ত আলেকজান্ডারের দখলে ছিল। ইহুদি আর খৃস্টান ধর্মের জন্মস্থানও ওই অঞ্চল। গ্রিক শব্দ পালাইস্টাইন বা ল্যাটিন শব্দ পালাএস্টিনার নির্ধারিত অঞ্চলটাও বেশ পুরানা আর বড়।

ইয়াকুব নবী আ. ছিলেন কেনানের বাসিন্দা। ইয়াকুব আ. এর ভাষা ছিল হিব্রু। জেরুজালেম বাদশাহ সুলাইমানের রাজধানী ছিল। মসজিদুল আকসা ক্যাম্পাসে উনার মাজার রয়েছে। ওই ভূখণ্ড এশিরিয়, ব্যবিলনীয়, পারস্য, বনি ইসরাইল, সুন্নি আরব, রোমান, বৃটিশ প্রভৃতির দখলে ছিল। আরবে তো আগে আরবি ভাষাও ছিল না। আরামায়িক ভাষা ছিল বর্তমান আরব দুনিয়ার লিংগুয়া ফ্রাংকা। বর্তমান ইসরাইলিরা সুলাইমান আ. এর সেই কিংডমের দাবি করে। এই ধরনের দাবি মানলে তো আলেকজান্ডারের বংশধরেরা দাবি করতে পারে গ্রিস থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত তাদের পূর্বপুরুষের দেশ। ওসমানীয় আর আব্বাসীয় খেলাফতের আমলের সাম্রাজ্যে যাওয়ার দাবি করতে পারে মুসলমানরা। রোমান শাসকরা ইহুদিদেরকে ওই অঞ্চল থেকে তাড়িয়েছিল। তারা দেশহীন থাকে বংশ পরম্পরায়। আমেরিকার সাহায্য নিয়ে ইহুদিরা এসে আরব ফিলিস্তিনের বাসিন্দাদের তাড়িয়েছে।

ইসরাইলের এসপিওনেজ তৎপরতা দুর্দান্ত বিবেচিত। বলা হয় সারা দুনিয়ায় আছে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ এর গুপ্তচর। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শক্তিশালী দেশগুলোকে কব্জায় রেখেছে ইসরাইল কৌশল ও মালের দ্বারা। আরব ব্যবসায়ী লোকটা সেদিন সাফ বললেন—”নাহনা মুশ মজবুত, মাফিশ আখলাক ঈনদানা”, মানে, “আমরা ঠিক না, আমাদের চরিত্র ঠিক না।”

শেখদের অবস্থা হল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মালদার থাকতে চায়। আরব লীগ প্রকাশ্যে ইসরাইলের সাথে বয়কট দেখালেও ধনী আরবদেশগুলো ইসরাইলের সাথে ক্লেন্ডেস্টাইন ট্রেড বা চোরাপথে ব্যবসা ঠিকই করে আসছে। ইনডাইরেক্ট ব্যবসা আমেরিকা বৃটেন প্রভৃতি দেশের মাধ্যমে আরবরা করছে ইসরাইলের সাথে। ইসরাইলের অর্থনীতি “ভেরি হাইলি ডেভেলপড” ক্যাটাগরিতে জাতিসংঘের হিসাবে। ইসরাইলের ডায়মন্ড ইন্ডাস্ট্রি সাংঘাতিক সমৃদ্ধ। আমেরিকার বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশাল ইনভেস্ট করেছেন ইসরাইলে।

tel-aviv-2

তেল আবিব।

arabs-oil

ইসরাইলের এক জেনারেল ২০১৪-তে মশকারি করছিলেন—”আরবরা কান্দে কেন গাজায় মানুষ মরতে দেখে! ইসরাইলের ট্যাংক চলে আরবের তেলে।

ইসরাইলের এক জেনারেল ২০১৪-তে মশকারি করছিলেন—”আরবরা কান্দে কেন গাজায় মানুষ মরতে দেখে! ইসরাইলের ট্যাংক চলে আরবের তেলে। আমাদের কাছে তেল বেচে মাল কামায় আবার ফিলিস্তিনের জন্যে কান্দে হাহ! এইটা তো মুনাফিকি।” আরবের মুনাফিকিও দেখিয়ে দিচ্ছে তারা।

আমেরিকা ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ দোস্ত কেন? ইসরাইলের আমেরিকান লবি, মানে আমেরিকায় ইসরাইলের পক্ষের পলিটিক্যাল অ্যাকশন গ্রুপ এত শক্তিশালী কেন?

কারণটাও পয়লা নম্বরে অই মাল বা টাকার জোর। আমেরিকার সব বিলিয়নিয়ারের অর্ধেকই ইয়াহুদ ধর্মানুসারী। ইউএস সরকারি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদেও ইহুদিরা আছেন। প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ তাদের। আরও আছে বিশ্বের জায়েন্ট কোম্পানিগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে। তার মানে, ইসরাইলের মানুষ আমেরিকান হয়ে ইসরাইলের দরদে জান মাল মেধা কোরবান করছেন।

About Author

সারওয়ার চৌধুরী
সারওয়ার চৌধুরী

কবি, কথাশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ ১৯৯৩-৯৭। জাপানি কথাশিল্পী হারুকি মুরাকামির গল্পের অনুবাদ বই ও তুর্কি কথাশিল্পী এলিফ সাফাকের উপন্যাস' ফোরটি রুলস অব লাভ' অনুবাদ করেছেন। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও অনুবাদসহ মোট ছয়টি বই তার প্রকাশিত। ইউএই প্রবাসী ১৮ বছর ধরে। তিনি ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, আরবি ভাষাও জানেন।