page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

কিম জং উন—উত্তর কোরিয়ার নবীন ডিকটেটর

২০১১ সালে পিতা কিম জং ইলের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করার পরে শুরু থেকেই কিম জং উন তার অদ্ভুত ধরনের নৃশংসতার জন্য আলোচিত। তার ক্ষমতা গ্রহণের তিন বছরের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার অন্তত ১০০ জন এলিটকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ, সামরিক অফিসার এমনকি তার আত্মীয়দের মধ্যে অনেককেই নৃশংস উপায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন কিম জংউন।

কিম জং উন ছোটবোন কিম ইয়ো-জং এর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে

অতি সাম্প্রতিক এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিও ইয়ং চোল। এপ্রিল ৩০, ২০১৫ তে উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিও ইয়ং চোলকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। শুরুতে এ খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে পৌঁছায়নি। ১৩ মে, ২০১৫ তে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা এই খবর প্রকাশ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস জানায়, একটি অয়ান্টি এয়ারক্রাফট গান ব্যবহার করে উত্তর কোরিয়া গণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিও ইয়ং চোলকে হত্যা করেছে।

এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সেখানে উত্তর কোরিয়ার কয়েকশ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সূত্র উল্লেখ করে সে দেশের একটি পত্রিকা জানিয়েছে, একটি সামরিক অনুষ্ঠানে ঘুমিয়ে পড়ার অভিযোগে হিও ইয়ং চোলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

kim-yu

একটি সামরিক অনুষ্ঠানে ঘুমিয়ে পড়ার অভিযোগে হিও ইয়ং চোলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

 

এই ঘটনার দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি কিম জং উনের সরকারের বিরোধীতা করার কারণে ১৫ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার খবর শোনা যায়।

কিছুদিন আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল হিও মস্কোতে উচ্চ পদস্থ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের সাথে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল। তবে তার বিরূদ্ধে ঘুমিয়ে পড়ার পাশাপাশি কিম জং উনের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এবং আড়ালে তার বিরুদ্ধে কথা বলার অভিযোগও ছিল।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিও ইয়ং চোল কিম জং উনের পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। চীনের সাথে উত্তর কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও পরিচালনা করতেন হিও ইয়ং চোল।

হিও ইয়ং চোলকে ফায়ারিং রেঞ্জে চার ব্যারেলের অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান দিয়ে গুলি করা হয়। তার পরিবারের সদস্য—যাদের মধ্যে কিউবা ও মালয়েশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রদূতেরাও ছিলেন—তাদেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

হিও ইয়ং চোলকে ফায়ারিং রেঞ্জে চার ব্যারেলের অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান দিয়ে গুলি করা হয়।

অনেকে আবার হিও ইয়ং চোলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে সন্দেহ করছেন। কিন্তু গত ১৫ মে, ২০১৫, শুক্রবার উত্তর কোরিয়া থেকে একটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাস্যোজ্জ্বল কিম জং উন সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি মাছের খামার পরিদর্শন করছেন, কিন্তু ছবিটিতে তার আশেপাশে কোথাও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে না।

২.
দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, সামরিক অনুষ্ঠানটিতে হিও রাষ্ট্রপতি কিমের নির্দেশ পালন করছিলেন না এবং ঝিমিয়ে পড়ছিলেন।

তবে এই ঘটনার ফলে উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীতে অফিসারদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস কমে যাবে এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপরও নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের বিশ্বাস কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ উত্তর কোরিয়ার শাসন ব্যবস্থায় চেইন অব কমান্ড অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।

এনকে নিউজ ডিরেক্টর অব ইন্টেলিজেন্স জন গ্রিসাফি বলেছেন, সংবাদ অনুযায়ী বোঝা যাচ্ছে হিও-এর মৃত্যুদণ্ড ১৫ জন অফিসারের সাথে কার্যকর করা হয় নি। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা সে দেশের সরকারকে ১৫ জন কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের খবর জানিয়েছে ২৯ এপ্রিল- যে এটি আগে ঘটেছে- এবং তারপর এখন বলছে হিওকে ৩০ এপ্রিল মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার এই গোয়েন্দা সংস্থাটি আরো একটি উল্লেখযোগ্য ভুল করে। তারা সরকারকে গত সপ্তাহে জানায় রাশিয়ার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে কিম জং উনের মস্কো সফরের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের এই ঘোষণার পরের দিনই ক্রেমলিন ঘোষণা করে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে কিম জং উনের সফরটি বাতিল করা হয়েছে।

৩.
মৃত্যুদণ্ডের সাজা পাওয়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিওকে শেষ দেখা যায় ২৯ এপ্রিল, ২০১৫ তে পিয়ং ইয়ং এর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে। এর আগে প্রতি মাসে অন্তত দুই থেকে ছয় বার করে তিনি উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যমে হাজির হতেন।

গত জুন থেকে হিও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।

উত্তর কোরিয়ায় সামরিক শাস্তির ক্ষেত্রে কখনো কখনো অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান ব্যবহারের কথা শোনা যায়।

কিম জং উন: স্ত্রী রি সল-জুর সঙ্গে।

২০১৫ এর মে’র শুরুর দিকে ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি মানবাধিকার বিষয়ক এনজিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে স্যাটেলাইট ইমেজে উত্তর কোরিয়ায় অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ আছে।

সেই রিপোর্টে উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ কুকমিন ইউনিভার্সিটির আন্দ্রেই ল্যানকভ বলেছেন, তা যদি সত্য হয় তাহলে কিম জং উন সিগন্যাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে তাকে হেলাফেলা করা যাবে না।

যদিও ল্যানকভ বলেছেন যে, তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেন নি যে এইভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাগুলি ঘটছে।

তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করতে ইচ্ছুক যে এগুলি ঘটছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত হতে পারি নি। আমি শাস্তির ঘটনাগুলিকে অতিরঞ্জিত করব না।

৪.
স্বৈরশাসক কিম জং উন শাস্তি ও নৃসংশতার ক্ষেত্রে তার পিতার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছেন। কিম জং উনের পিতা কিম জং ইলের সাবেক দেহরক্ষী লি ইয়ং গাক ২০১৪ এর ৭ নভেম্বর সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, কিম জং ইল খুশি থাকলে স্বর্ণ দিতে পারেন আবার তার মেজাজ খারাপ থাকলে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন, এই ধরনের মানুষ ছিলেন। লি ইয়ং গাক আরো জানান নৃশংসতা এবং স্বেচ্ছাচারীতার দিক থেকে কিম জং উন তার পিতা কিম জং ইলের চেয়েও খারাপ।

কিম জং উনের স্বৈরাচারীতা এতটাই প্রকট যে উত্তর কোরিয়ায় ‘জং উন’ নাম বহনকারী সবাইকে তাদের নাম পরিবর্তন করতে হয়েছে। আইন অনুসারে শুধুমাত্র কিম জং উনেরই ‘জং উন’ নাম থাকবে।

২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়ার উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা জ্যাং সং থায়েককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জ্যাং সং-থায়েক সম্পর্কের দিক দিয়ে কিমের ফুপা ছিলেন।

২০১২ সালে উত্তর কোরিয়ার সহকারী প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে খুব কাছে থেকে মর্টার দিয়ে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। এই মৃত্যুদণ্ডের কারণ ছিল কিমের বাবা কিম জং ইলের শোক অনুষ্ঠানে তিনি মদ্যপান করেছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ান সংবাদপত্র চোসান ইলবো জানায়, নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কোনো চিহ্ন যেন অবশিষ্ট না থাকে।

তবে কিম জং উনের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ব্যাপারে কিছু গল্প মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তর কোরিয়ার উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা জ্যাং সং থায়েককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জ্যাং সং-থায়েক সম্পর্কের দিক দিয়ে কিমের ফুপা ছিলেন। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পদ্ধতি হিসেবে শুরুতে গুজব উঠেছিল যে জ্যাং এর উপরে ১২০টি হিংস্র কুকুর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তবে জ্যাং এর মৃত্যুদণ্ডের কারণ ছিল উত্তর কোরিয়ার প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রে বয়স্কদের প্রভাব কমানো, যারা আমলাতন্ত্রে তরুণদের উত্থানের পথে বাঁধা হয়ে ছিলেন।

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম না উল্লেখ করে সিএনএন গত ১২ মে, ২০১৫ তে জানিয়েছে জ্যাং সং থায়েকের স্ত্রী কিম কিয়ং হুই তার স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারে অভিযোগ করায় কিম জং উন তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার নির্দেশ দেন। কিম কিয়ং হুই ছিলেন কিম জং উনের ফুপু। ওই কর্মকর্তা আরো জানান, শুরুতে এই আদেশের কথা শুধু কিমের বডিগার্ড ইউনিটের সদস্যরা জানলেও এখন সকল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানেন। গত নভেম্বরে কিম ইয়ং হুই স্ট্রোকে মারা যান বলে খবর প্রকাশিত হয়।

মৎস্য খামারে কিম জং উন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিও ইয়ং চোলের কথিত মৃত্যুদণ্ডের পরের ছবি।

উত্তর কোরিয়ায় সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ।

তাছাড়া ২০১৫ এর এপ্রিলের শেষের দিকে কমিটি ফর হিউম্যান রাইটস ইন নর্থ কোরিয়া স্যাটেলাইটে ধারণকৃত ছবি প্রকাশ করে। সেই ছবিতে দেখা যায় গত অক্টোবরে ফায়ারিং রেন্জে খুব ছোট একটি টার্গেটকে খুব কাছে থেকে ছয়টি অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান দিয়ে গুলি করা হচ্ছে। তারা ধারণা করে, এটি কোনো একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এবং কার্যকর করার সময় উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেই রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয় এটি ২৪টি মেশিনগান দিয়ে একসাথে গুলি করার সমান। এটিকে নৃশংস বললেও কম বলা হবে।

বিবিসির ভাষ্যমতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার হিসাবে প্রতি সপ্তাহে উত্তর কোরিয়ায় কমপক্ষে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।