page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

কেন আমি হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দেব না

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হবার পর চিরকাল ডেমোক্রেটিক পার্টিকেই ভোট দিয়ে এসেছি। এমনকি, যখন নাগরিক ছিলাম না, তখনও বিল ক্লিনটন, এবং তারও আগে, সেই রোনাল্ড রেগানের সময় থেকে ডেমোক্রেটিক দলকেই সমর্থন করে এসেছি।

বিশেষ করে ২০০৮ সালে বারাক ওবামার ক্যাম্পেনে আমি প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছিলাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই সন্ধিক্ষণে প্রথম এক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার ইতিহাসে আমিও সামিল হতে চেয়েছিলাম।

যদিও তার পরেই মোহভঙ্গ হলো, যখন দেখলাম, নির্বাচিত হবার পরেই ওবামা সাধারণ মানুষের কাছে দেওয়া তাঁর সমস্ত প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে সরে গিয়ে বিশাল বিশাল কর্পোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের তাঁর সরকারের প্রধান পদগুলোতে নিযুক্ত করলেন। দেখলাম, মন্স্যান্টো, গোল্ডম্যান স্যাক্স, ব্যাংক অফ আমেরিকা, জেনারেল ইলেকট্রিক জাতীয় মানবসভ্যতার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম খলনায়ক কোম্পানিগুলো তাঁর সরকারকে আক্ষরিক অর্থে দখল করে ফেলল।

parthabondo-logo

আমি নিজেকে বামপন্থী বা দক্ষিণপন্থী বলে মনে করি না, এবং অতি-বাম ও অতি-দক্ষিণপন্থীদের সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কোনো সহানুভূতি নেই। আমি তাদের মত ও পথের শরিক নই। কিন্তু, কোন কোন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি সাধারণ মানুষ ও পরিবারের পক্ষে ধ্বংসাত্মক, তা আমি বুঝি। উপরে যে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম করেছি, বর্তমান বিশ্বে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নিও-লিবারাল অর্থনীতির তারাই সব চেয়ে বড় ধারক ও বাহক। তাদের পিছনে যেসব ভয়ঙ্কর শক্তি কাজ করছে, তাদের ইতিহাস পড়লে, জানলে তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আর যাই বলি, গণতন্ত্র ও সাধারণ নরনারীর বন্ধু বলে কদাপি মনে করা যায় না।

এবং ঠিক এই কারণেই আমি হিলারি ক্লিনটনকে কখনই সমর্থন করতে পারি না। বারাক ওবামা এবং বিল ক্লিনটনের মতই হিলারির পিছনে রয়েছে মন্স্যান্টো, গোল্ডম্যান স্যাক্স, জেনারেল ইলেকট্রিক, এক্সন মোবিল, ওয়াল মার্ট, এবং প্রাইভেট প্রিজন ইন্ডাস্ট্রি। এরা বহুকাল ধরেই ক্লিনটন দম্পতিকে সমর্থন ও অর্থসাহায্য করে আসছে।

hillary-walmart

ওয়াল মার্ট কোম্পানিতে হিলারি বহুকাল ধরে কার্যনির্বাহী বোর্ড সদস্য ছিলেন।

ওয়াল মার্ট কোম্পানিতে হিলারি বহুকাল ধরে কার্যনির্বাহী বোর্ড সদস্য ছিলেন। ওয়াল মার্ট তাদের শ্রমিক সংগঠন নিষিদ্ধ করেছে, এবং সারা পৃথিবীতে তারা শ্রমিকদের বস্তুত ক্রীতদাসের মত ব্যবহার করে থাকে।

গোল্ডম্যান স্যাক্স আমেরিকার এখনকার এই ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক ডামাডোল ও বিশেষত ২০০৭-২০০৮ সালের বিশাল ধ্বসের জন্যে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। গোল্ডম্যান স্যাক্স সম্প্রতি গ্রীসের অর্থনীতিকে রাস্তার ধূলোতে টেনে নামিয়েছে। ওবামার আট বছরের শাসনকালে তাদের অপরাধের কোনো বিচার হয় নি।

মন্স্যান্টো ও তার জি এম ও (জেনেটিকালি মডিফাইড বীজ ও সার) ভারতের গরিব চাষীদের শেষ করে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ কৃষক তাদেরই বিক্রি করা কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেছে। জেনারেল ইলেকট্রিক, এক্সন মোবিল—এসব বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বের পরিবেশ দূষণ ও যুদ্ধ ব্যবসার সবচেয়ে বড় দুই পার্টনার।

হিলারি ক্লিনটন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, এই নিয়ে আমাদের দেশে উৎসাহের শেষ নেই। কিন্তু মহিলা না পুরুষ, এই দিয়ে কি রাজনৈতিক নেতা ও তাঁর সহযোগী সমর্থকদের বিচার হবে?

ওবামা কৃষ্ণাঙ্গ, কিন্তু তার আমলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ নিধন কি বন্ধ হয়েছে? জাতিবিদ্বেষ কি শেষ হয়েছে? বরং তা আরো বেড়ে গেছে।

ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ভারতে মহিলাদের কি কোনো বিশেষ উন্নতি হয়েছিল? না, তাঁর দীর্ঘ কুড়ি-পঁচিশ বছরের শাসনকালে ভারতে লিঙ্গবৈষম্য ও পুরুষ-নারীর অর্থনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্যের কোনো রকম তফাৎ ঘটেছিল?

hillary-netaniahu]

নেতানিয়াহুর সঙ্গে হিলারি। 

হিলারি ক্লিনটন তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, তাঁর সেনেটর থাকার সময়ে বা সেক্রেটারি অফ স্টেট থাকার সময়ে আমেরিকার বা পৃথিবীর গরিব মানুষের জন্যে কি তেমন কিছু কাজ করেছেন? যুদ্ধ বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো রাস্তা দেখাতে পেরেছেন? বরং, তাঁর সাথে হেনরি কিসিনজার ও এই সব কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধিদের অন্তরঙ্গ ওঠাবসা দেখলে বোঝা যায়, বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী ও যুদ্ধব্যবসায়ীদের অঙ্গনেই তাঁর আসল পদচারণা। সিরিয়া, লিবিয়া, মালি প্রভৃতি দেশে আই এস ও অন্যান্য যেসব মারাত্মক জঙ্গি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, সেক্রেটারি অফ স্টেট থাকার সময়ে তাঁর চূড়ান্ত ব্যর্থতাই কি তার জন্যে অনেকাংশে দায়ী নয়? তিনি কি এই দায় অস্বীকার করতে পারেন?

ডেমোক্রেটিক পার্টি আমাকে হতাশ করেছে। একদিকে ভারতের কংগ্রেস পার্টির মত দুর্নীতি ও অযোগ্যতা, সাধারণ মানুষের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, আর অন্য দিকে বড় বড় কর্পোরেশন ও বিশাল ধনীদের আরো ধনী ও শক্তিশালী করে তোলা—এই প্রক্রিয়া চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত তিরিশ বছর ধরে। আশির দশকে আমেরিকার রেগান ও বৃটেনের মার্গারেট থ্যাচার যে পথ রচনা করেছিলেন, সেই পথেরই পথিক হয়েছেন আধুনিক আমেরিকার ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্টরা। এমন কি শেষ জীবিত ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও ক্লিনটন, ওবামা প্রেসিডেন্সির কর্মপদ্ধতির তীব্র নিন্দা করেছেন।

"তাঁর সাথে হেনরি কিসিন্জার ও এই সব কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধিদের অন্তরঙ্গ ওঠাবসা দেখলে বোঝা যায়, বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী ও যুদ্ধব্যবসায়ীদের অঙ্গনেই তাঁর আসল পদচারণা।"

“তাঁর সাথে হেনরি কিসিন্জার ও এই সব কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধিদের অন্তরঙ্গ ওঠাবসা দেখলে বোঝা যায়, বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী ও যুদ্ধব্যবসায়ীদের অঙ্গনেই তাঁর আসল পদচারণা।”

আজকে বার্নি স্যান্ডার্স আমেরিকায় এক বিশাল জনজাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু ডেমোক্রেটিক পার্টি ও তার ধনী ও শক্তিশালী কুশীলবরা নানা উপায়ে তাঁকে বঞ্চিত করে হিলারিকেই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী করতে চলেছেন। এ এক ঐতিহাসিক স্ক্যান্ডাল।

হিলারিকে ভোট না দিলে জাতি ও ধর্মবিদ্বেষী ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে যেতে পারেন। সে সম্ভাবনা ষোলো আনা। রিপাবলিকান পার্টি সেই আশাতেই দিন গুনছে এখন। আমরা কেউ ট্রাম্পকে চাই না।

আরো পড়ুন: হেনরি কিসিনজারের ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ নিয়ে হিলারি ক্লিনটন

কিন্তু, ট্রাম্পকে রোখা যেমন দরকার, আমার মতে হিলারির মত রাজনৈতিক নেত্রী, যিনি চিরকালই মুখে এক কথা বলে এসেছেন, আর কাজে ঠিক উল্টোটাই করেছেন, যাঁর পিছনে পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো কাজ করছে, তাঁকে নিজের বিবেক স্বচ্ছ রেখে সমর্থন করা যায় কি?

আমি তা কখনই পারব না। অনেকদিন আমি এদেশে আছি। অনেক আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছি। রাস্তায় নেমে অনেক লড়াই করেছি জীবন ও ক্যারিয়ার বিপন্ন করে।

জেনেশুনে আবার একটা ভুল সিদ্ধান্তের ফাঁদে আমি আর পড়তে চাই না।

হিলারি ক্লিনটন আমার নেত্রী নন।

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে আত্মজীবনী 'ঘটিকাহিনি'র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee