ত্বক, পেশি এবং স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা উচিৎ। পানি রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে এবং কোষগুলিকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান শোষণ করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন কয়েক গ্লাস উষ্ণ অথবা গরম পানি পান করলেও অনেক সুফল পাওয়া যেতে পারে।

যদিও গরম পানি পান করার সুফল সম্পর্কে খুব অল্প গবেষণা হয়েছে। তবুও অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বাস্থ্য ভাল রাখার একটি সহজ উপায় গরম পানি।

হাজার বছর ধরে মানুষ উষ্ণ কিংবা গরম পানীয় গ্রহণ করে আসছে। প্রাচীন লোকগাথাগুলিতে স্বাস্থ্য ভাল রাখতে গরম পানির ভূমিকার অনেক উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সবে মাত্র এই বিষয়ে গবেষণা করতে শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ের সে সব গবেষণার উপর নির্ভর করে গরম পানি পান করার ৮টি সম্ভাব্য সুফল এবং তাদের পিছনের থিয়োরি বা ধারণা তুলে ধরা হল:

১. হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি
যদি কেউ পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করে তাহলে খাদ্য এবং পানীয় থেকে দেহ যে পানি পায় তার প্রায় সবটুকুই ক্ষুদ্রান্ত্র শোষণ করে নেয়। এর ফলে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হতে পারে এবং অন্ত্রে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী পানিশূন্যতার কারণে দীর্ঘমেয়াদের কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। তা থেকে অন্ত্রের ব্যথা এবং অন্যান্য অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। যেমন হেমোরোইডস বা অর্শরোগ এবং ব্লটিং বা উদরস্ফীতি।

পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলে এ সকল রোগ হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

২. শরীর থেকে ক্ষতিকারক উপাদানসমূহ দূরীকরণ
বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন, গরম পানি শরীর থেকে ক্ষতিকারক উপাদান দূর করতে সাহায্য করে। পানি কোনো ব্যক্তির দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করার মত গরম হয়ে উঠলে তা ঘামের সৃষ্টি করে। ঘামের ফলে শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকারক উপাদানগুলি বের হয়ে যায়।

৩. রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি
গরম পানি রক্তনালী সম্প্রসারণ করে যার ফলে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। এটি পেশি সঞ্চালনকে আরামদায়ক করে এবং ব্যথা কমায়। যদিও গরম পানির সাথে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধির যোগসূত্র নিয়ে কোনো সরাসরি গবেষণা হয় নি, তবুও ধারণা করা হয় রক্তনালীর ক্ষণস্থায়ী সম্প্রসারণের ফলেও পেশি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্য দিয়ে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।

৪. ওজন কমানো
দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকেরা দাবি করে আসছেন, পানি বেশি পান করলে ওজন হ্রাস পায়। এর একটি কারণ হতে পারে, পানি পান করলে খিদে কম লাগে। এছাড়াও পানি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান শোষণ করতে এবং দেহ থেকে অপ্রয়োজনীয় উপাদান বের করে দিতে সাহায্য করে।

২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায় ঠাণ্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানির চাইতে গরম পানি পান করলে ওজন হ্রাসের হার বেড়ে যায়। গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে খাওয়ার আগে ৫০০ মিলি. পানি পান করলে খাদ্য পরিপাকের হার ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

পানির তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি করলে পরিপাকের হার বেড়ে যায় ৪০ শতাংশ। পরিপাকের এই হার ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

৫. ব্যথা কমাতে সাহায্য করে
গরম পানি বিশেষত আঘাত প্রাপ্ত পেশিতে রক্তের প্রবাহ এবং সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। তবে ব্যথা কমাতে গরম পানির ভূমিকা নিয়ে কোনো সরাসরি গবেষণা নেই।

যা হোক, মানুষ ব্যথা কমানোর জন্যে নিয়মিত হিট প্যাক এবং গরম পানির বোতল ব্যবহার করে। গরম পানি পান করলে হয়ত অভ্যন্তরীণ ব্যথা কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে তাপ দেয়ার ফলে আঘাতপ্রাপ্ত অংশ স্ফীত হয়ে উঠতে পারে।

৬. ঠাণ্ডার কবল থেকে বাঁচতে এবং সাইনাসের সমস্যা হ্রাস করতে
ঠাণ্ডা লাগার ফলে এবং অ্যালার্জির কারণে সাইনাসের উপর যে চাপ সৃষ্টি হয় তা উপশম করতে তাপের বেশ ভাল ভূমিকা রয়েছে। ধোঁয়াও এক্ষেত্রে সুফল দিতে পারে।

গরম পানি পান করলে মিউকাস বা শ্লেষ্মা জাতীয় পদার্থ নরম হয় কিংবা গলে যায়। এর ফলে কাশি ও সর্দি বেড়ে যায় এবং ভিতরে জমে থাকা পদার্থ দ্রুত বের হয়ে আসে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়।

৭. কফি এবং চা পানের অভ্যাস বৃদ্ধি
চা কিংবা কফিতে যে গরম পানি থাকে তা স্বাস্থ্যের জন্যে অতিরিক্ত কিছু সুফল এনে দিতে পারে। কফি এবং ক্যাফেইনযুক্ত চা দেহকে আদ্রতাশূন্য করতে পারে, বিশেষ করে অতিমাত্রায় পান করলে। কিন্তু পরিমিতভাবে পান করলে সুফল পাওয়া যায় অনেক।

২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে কফি খাওয়ার সাথে দীর্ঘ আয়ু লাভের একটি যোগসূত্র আছে। পরিমিত মাত্রায় কফি পান পার্কিনসন্স রোগ, কয়েক ধরনের ক্যান্সার, টাইপ-২ ডায়বেটিস, যকৃতের কিছু রোগ এবং কিছু হৃদরোগের হার কমে যায়।

চা পানের ফলে স্ট্রোক, হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং যকৃতের রোগের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। কিছু গবেষণা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর সাথে চায়ের যোগসূত্র স্থাপন করেছে। যদিও এই বিষয়ে নিশ্চিত করে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না।

৮. স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে
এক কাপ গরম পানি ক্লান্তি এবং দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারে। একটি পুরনো গবেষণা থেকে দেখা যায় গরম পানীয়, যেমন চা কিংবা কফি স্ট্রেস কমাতে ও দুশ্চিন্তা হ্রাস করতে সাহায্য করে।

গবেষণায় বলা হয়, এর কিছুটা ঘটে ক্যাফেইনের প্রভাবে। তবে এক্ষেত্রে উষ্ণতারও ভূমিকা রয়েছে।

গরম পানি পানের সমস্যা

গরম পানি পান করার প্রথম সমস্যাটি হল পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। আঙুলের ডগায় যে উষ্ণ পানিকে আরামদায়ক বলে মনে হয় সেই পানিও জিহ্বা বা গলা পুড়িয়ে দিতে পারে। ফুটন্ত বা প্রায় ফুটন্ত তাপমাত্রার পানি পান করা যাবে না। এছাড়াও গরম পানি পান করার আগে একটি ছোট্ট চুমুক দিয়ে পানির তাপমাত্রা দেখে নিতে হবে।
ঢাকনাসহ কাপে করে গরম পানি খেলে পানি ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায় বলে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে।
কফি কিংবা ক্যাফেইনযুক্ত চা বেশিমাত্রায় পান করলে শরীরে ক্যাফেইনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ও স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
চা ও কফির পরিমাণ কমিয়ে এগুলিকে প্রতিরোধ করা যায়। অথবা ক্যাফেইনযুক্ত পানির বদলে শুধু গরম পানি পান করে।

পানির সঠিক তাপমাত্রা

গরম পানীয় যেমন চা ও কফি বেশিরভাগ সময়ই গ্রহণ করা হয় প্রায় ফুটন্ত তাপমাত্রায় থাকা অবস্থায়। গরম পানির সুফল ভোগ করতে গিয়ে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেয়ার প্রয়োজন নেই। যারা গরম পানি পান করতে পছন্দ করেন না তারা দেহের তাপমাত্রা কিংবা তার চাইতে একটু বেশি তাপমাত্রার পানি পান করতে পারেন।
২০০৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় কফি পান করার জন্যে আদর্শ তাপমাত্রা হল ১৩৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৫৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

গরম পানি পান করলে কোনো রোগের উপশম হবে না। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত পানি পুড়িয়ে ফেলার মত উত্তপ্ত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত গরম পানি পানে কোনো সমস্যা নেই। বরং সুফল অনেক। তাই যারা আগে থেকেই গরম পানির উপকারিতা উপভোগ করছেন আর যারা স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য সহজ কোনো উপায় বেছে নিতে চান তারা সবাই নিশ্চিত থাকতে পারেন যে এর মাধ্যমে সুফল পাওয়া যাবেই।

যত বেশি মানুষ এই পদ্ধতি অনুসরণ করবে তত বেশি এই নিয়ে গবেষণা হবে।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here