page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

কেন সিটি নির্বাচন এবং কেন সাকি ভাই

‘পাঁচ জানুয়ারির’ পর থেকে বাংলাদেশ পরিস্থিতি এলোমেলো। রাজনৈতিক দলগুলোর যে কোনো কর্মসূচিকে বেঠিক মনে হচ্ছে। বিএনপির আন্দোলন “হচ্ছে না” বা “সফল হচ্ছে না” এমন জনমত যেমন রয়েছে তেমনি সরকারের পক্ষেও বেশিরভাগ জনমত হাজির নাই।

এমনকি আওয়ামী লীগেরও অনেক কাজের বিরোধিতা জোর গলায় শোনা যাচ্ছে। সুশীল সমাজ আছে কি নাই তা সবসময় বোঝা যায় না। বামপন্থীদের নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ। এই পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নানান কথা উঠেছে। বামপন্থীদের অংশগ্রহণ, তাদের হলফনামা এবং তাদের পক্ষে সমর্থন নিয়ে বিতর্ক আছে বেশ। ‘বিপ্লব না নির্বাচন’ এমন তর্ক করছেন কেউ কেউ। যে সরকার ‘অবৈধ’ তার আয়োজনের নির্বাচনে যাওয়া, কিম্বা একচেটিয়া শাসনের মধ্যে এমন নির্বাচন কি লোক ভুলানো নয়? এসব কথা উঠছে।

বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে এই লেখা। সেই সঙ্গে কেন আমি এবারের সিটি নির্বাচনে জোনায়েদ সাকিকে ভোট দিতে বলছি তারও একটা কৈফিয়ত তুলে ধরা।

salahuddins1

বিএনপি পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে যায় নি—এটা তাদের ভুল,এমন কথা বলা লোকের সংখ্যা অনেক। আওয়ামী লীগ এমন একটা নির্বাচন না করলেও পারত, এমন কথা বলা লোকের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। তবে বলাবলি পক্ষের উভয়ে একটা জিনিস কিন্তু এড়িয়ে যান দেখেছি। বাংলাদেশের বামপন্থীরাও পাঁচ তারিখের নির্বাচনে অংশ নেয় নি। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তো বটেই। কিন্তু বিষয়টা খেয়াল করা হয় নি তেমন। না করার কারণ এখানকার মিডিয়া, সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টরা সজাগ থাকতে পারেন না কেন যেন। তাদের কিছু হুঁশের অভাব তো রয়েছেই। নানা ঘটনার ডামাডোলে নিজেদের কর্তব্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলার অভ্যাসও আছে। নইলে সিপিবি বা বাসদের নির্বাচনে অংশ না-নেয়ার রাজনৈতিক গুরুত্বকে বিএনপি দিয়ে আড়াল করার টেনডেন্সি কম থাকত। যাই হোক ব্যাপারটা ঘটেছে।

জোনায়েদ সাকি

জোনায়েদ সাকি

আরও অনেক কিছু ঘটেছে যার ফয়সালার সম্ভব না প্রায়। সবকিছু এখানে লিখে সেটা বোঝানো যাবে না। চূড়ান্ত কোথাও যাওয়া, ভাগাভাগি বা আপোষহীনতার সুযোগ আসলে আমাদের কম এখন। সাবাইকে একটু ‘ছাড় দিয়ে’ এখন রাজনীতিটা করার সময় এসেছে। সামাজিক হওয়াটা আগের যে কোনো সময়ের চাইতে এখন জরুরি। এটা নিরাপত্তার জন্য দরকারি। অন্যকে সুযোগ করে দেওয়া যায় এমন পরিবেশ তৈরি হলে স্বস্তি আসবে অনেক। বিএনপির জন্য যে কারণে সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ডিসিশান রাইট আছে। এখন যে যত উদার হবে, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যতে তার ভালো করার সুযোগ তত বাড়বে। নির্বাচনের উছিলায় বিএপির নেতাকর্মীরা কিছুটা হলেও নিরাপদ থাকবে, সরাসরি জনসংযোগের সুযোগও তাদের তৈরি হলো।

আমাদের বুঝতে হবে এর বিকল্প নাই। আমাদের সাংবাদিকতা যে কাদা গায়ে জড়িয়েছে বানের জল বিনে তা ধুয়ে ওঠা যাবে না। আমাদের সুশীল সমাজ যে কোনো সময়ের তুলনায় নিস্তেজ। তরুণরা কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। যে ডাল তারা ধরতে যায় তারা সে ডাল ভেঙে পড়ে। সাহিত্য, সিনামা ইত্যাদিতেও নানা এম্বারগো আরোপ করা হচ্ছে। এমন সময়ে একটু ফুরসৎ মিলল। নির্বাচন হলো বাংলাদেশের জন্য ফেস্টিভাল। কিছুটা হলেও বাতাস মেলে এসময়।

এটা একরকম সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বামপন্থীদের জন্যও সেটা একইরম। “গণসংহতি নির্বাচনে যায় না” এমন কথার উছিলা তুলে এবার তাদের নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। লেলিনের ‘শুড উই পার্টিসিপেট ইন বুর্জোয়াজি পারলামেন্ট?’ লেখাটায় এর জবাব আছে। তাত্ত্বিকভাবে “নির্বাচন জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করবে না” অথবা সংসদ নির্বাচনের বিরোধিতা করা আর নির্বাচনে অংশ না নেয়া এক বিষয় নয়। এ জন্য দলের ইশতেহার পরিবর্তনেরও দরকার হয় না। যেখানে জনগণ, সেখানেই তো রাজনীতি হবে। কাগজে-কলমের রাজনীতির গুরুত্ব কীসে?

মীরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জোনায়েদ সাকি শুরু করেছেন তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান।

মীরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে জোনায়েদ সাকি শুরু করেছেন তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান।

ফলে গণসংহতির এই নির্বাচনে অংশগ্রহ‌‌‌ণে তাদের বিষয়ে পূর্বতন ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটার সুযোগ যেমন তৈরি হলো, তেমনি তাদের দল যে পরিসরে বেড়েছে সেটাও মনে হলো। নির্বাচনে তারা কীভাবে কী করবে সেটা তাদের ব্যাপার। আমরা যারা এর বাইরে আছি তারা কী করব? আমি বলছি, জোনায়েদ সাকিকে সমর্থন দিব। বাংলাদেশের বামপন্থীদের মধ্যে তারা র‌্যাডিকেল অংশ বলেই না। তাদের গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার যে চেষ্টা সে কার‌‌‌ণেও। এখনই সমাজতন্ত্র কায়েম করে ফেলার রাজনৈতিক অভীপ্সা তাদের নাই দেখেছি। সনাতন মার্ক্সীয় ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আপাতত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের দিকে তাদের ঝোঁক অ্যাপ্রিশিয়েটেবল। বাসদ এবং সিপিবি তো প্রায় আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। তাদের অবস্থা সুযোগের অভাবে ভালো থাকার মতো। কেবল দুর্নীতির নিন্দা দিয়ে বিষয়টা বোঝা যাবে না। কর্মসূচি, এ দুই দ‌‌‌লের ভাষা, আওয়ামী ক্যামোফ্লেজড সংগঠনগুলোর সঙ্গে রাস্তায় সুর মেলানো—সব মিলিয়ে এরা সম্ভাবনারহিত দুই দল।

তুলনায় গণসংহতি দোনামনা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের যুক্তি ও তত্ত্বের বিরোধিতা চলছে। এটা ভালো। সরকারের নানা ছলচাতুরিকে তারা যেভাবে হোক জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। প্রথাগত প্রগতিশীলতার সঙ্গে তাদের হুবহু মিলছে না। ফলে এটা এখনকার সম্ভাবনা বলে ভাবছি আমি। আর যে কোনো সম্ভাবনাকে সমর্থন দেয়া খুব বিজ্ঞানসম্মত একটা কাজ।

গণসংহতির সাকি ভাই বেশ তরুণ আছেন। তিনি তৎপর থাকলে আমাদের এদিকে রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক একটা চাঞ্চল্য আসার সম্ভাবনা আছে। গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিয়ে ওনারা কাজ করেন, আন্দোলন করেন। বাংলাদেশের সুন্দরবনসহ অপরাপর সম্পদ রক্ষায় তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন আছে। যারা আজকে এসব বাদ দিয় সিটি নির্বাচনের কথা ভাবছেন তারা চিন্তা অথবা স্বার্থপরতার অভ্যস্ততার বাইরে গিয়ে ভাবতে পারছেন না আসলে। এখানে নতুন কিছুর উছিলা সাকি ভাই। সেটা না-বুঝলে কিন্তু মুশকিল বাড়বে, কমবে না।

বাংলাদেশের বামপন্থীদের প্রতি যে ক্যাজুয়াল লুকিং আছে, এর সঙ্গে সাকি ভাইয়ের তফাৎ আছে বলে আমি মনে করি। এটা সাকি ভাইয়ের আগেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু সে আলাপ পরে। টাকা-পয়সা বা বাড়ি-গাড়ির আলাপ দিয়া সেটা বোঝা যাবে না। গরীবি ছদ্মবেশ দিয়ে তো আর প্রোপাবলিক থাকা যায় না। এটা হয় চিন্তা দিয়া। চিন্তায় যদি সাকি ভাই এগিয়ে থাকেন, তাইলে তাকে ভোট দেয়া ভালো। অন্য কিছুর আলাপও জমা থাকল। যারা সম্পদ নিয়ে খুব আলাপ করেন তারা সনাতন বামেদের মাথায় রেখে এসব আলাপ সামনে আনেন। সেসব খালি নিন্দার জন্য নিন্দা করা। যারা করেন তারা এটাও ভাবেন না যে, ভোটাররা পয়সা আছে কিনা সেটা ভাবেন না। তাদের ভাবার কাজ হলো ‌‌‌ভোটের বিনিময়ে সে কী পাচ্ছে। যে তার জন্য কাজ করবে সে তাকে ভোট দিবে। টাকা-পয়সার হিসাব এখানে মিডলক্লাস ইনফেরিয়রিটির কারণে আসে।

ভোটাররা তাদের ভোটের বিনিময়ে সেবা চায়। এটা ক্যাপিটালিস্ট কালচার। সে হিসাবে সাকি ভাই তো ঠিকই আছেন। তাকে ভোট দেয়ার মধ্য দিয়ে পাবলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ তো সর্বোচ্চ। অন্য যে কারুর তুলনায় বেশি। ভোটাররা বরং একটু সোশ্যাল হতে পারেন। নিজের এবং দেশের কথা ভেবে তাকে ভোটটা দিতে পারেন।

আনিসুল হক বা এমন যারা আছেন এনাদের তো প্রোপাবলিক কোনও কাজ নাই। এনারা হচ্ছেন মালিক। ভোট বা এরকম সময়ে যেহেতু বাংলাদেশের সুশীল, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা গোপনে মালিকদের সমর্থন দেয় আর প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতা দেখায়, ফলে মনে হয় আনিসুল হকরা জনপ্রতিনিধি। এই কালচার চেঞ্জ করা দরকার। এখন এর একটা সুযোগ পাওয়া গেল বৈকি।

আমাদের কাজ তো এখন নতুন চিন্তাকে ভোট দেয়া, নতুন কাউকে সামনে আনা। এটা সবাই মিলে না করলে হবে না। আর ভোট হচ্ছে সেই মওকা। এরে অবহেলা করলে তো চলবে না।

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।