page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

কেমন করে ভালো লেখা যায়

১.
আমাকে অনেকে বলেন, আমি লিখতে খুব ভালোবাসি। কিন্তু ভালো পারি না। আপনি একটু শিখিয়ে দেবেন?

আমি নিজে যে একজন কোনো বিখ্যাত লেখক, তা নয়। তবে, বহুকাল ধরে লেখালেখি করছি। বলতে গেলে, শৈশব থেকেই লেখা আমার একটা প্যাশন। লিখতে লিখতে, লিখতে লিখতে নিজে নিজেই অনেক কিছু শিখেছি। আগে ইংরিজি তেমন ভালো জানতাম না। বাংলাতেই লিখতাম। তার মধ্যে সেন্টিমেন্ট বেশি ছিল, সাবস্টেন্স ছিল কম। যেমন বাঙালিরা হয় আর কি। আবেগতাড়িত লেখা অনেক লিখেছি। সেসব লেখা পড়লে এখন নিজেরই হাসি পায়।

কতগুলো জিনিস লক্ষ্য করেছি। আর কতগুলো জিনিস নিয়েছি অন্য বড় লেখক লেখিকাদের কাছ থেকে। আর কয়েকটা এলিমেন্ট আমার নিজের ভেতরেই কখন জানি জন্ম নিয়েছে।

parthabondo-logo

লেখা কি জিনের মধ্যে থাকে? জানি না। আর্ট যখন সবার দ্বারা হয় না, যেমন ধরুন আমি কিছুতেই রাগ রাগিণী ধরতে পারি না ঐ দু চারটে ছাড়া, আর আমার ছোটবেলার বন্ধু সুব্রত লেখাপড়ায় এত ভালো ছিল, কিন্তু গান গাইতে গেলেই দাঁড়কাকের মতো আওয়াজ বেরোতো ওর গলা থেকে, তাহলে নিশ্চয়ই একটু ভগবানদত্ত ব্যাপার আছে। যাকে বাংলায় বলে জিন বা ডি এন এ।

কিন্তু, চেষ্টা করলে কী না হয়! কথায় বলে, চেষ্টা করলেই কেষ্টা মেলে। ভীষ্মলোচন শর্মা হয়তো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারবে না, কারণ তার জিন বলেছে গান মানে হচ্ছে আওয়াজখানা যেন দিল্লি থেকে বর্মা পর্যন্ত হানা দেয়। সে গ্রীষ্মকালেই গান ধরবে। বর্ষা বা বসন্তের গান সে চেষ্টাই করতে পারবে না। তার জিন তাকে সে গান ধরতেই দেবে না।

gupi-gyne-2

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৮)’ ছবিতে তানপুরা কাঁধে গুপী গাইন।

যেমন গুপী গাইন পল্লব গোঁসাই-এর কাছ থেকে তানপুরো পেয়েছিলো, কিন্তু গান শুনে রাজামশাই তাকে গাধার পিঠে চড়িয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিলো। পল্লব গোঁসাই-এর গানের জিন ছিল। ভূতের রাজা জবর জবর তিন বর দেবার আগে গুপীর সে জিন ছিলো না।

ভূতের রাজা কি গুপীর ডি এন এর ডাবল হেলিক্স-এ পয়েন্ট মিউটেশন করে দিয়েছিলেন, কোনো গোপন রেট্রোভাইরাস বা জাম্পিং জিন ব্যবহার করে?

আজ আর জানার কোনো উপায় নেই। তপেন চ্যাটার্জী, রবি ঘোষ, সত্যজিৎ রায় কেউ আর নেই যে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসবো। সেই বাঁশবনটাও আজকাল আর খুঁজে পাচ্ছি না। শুনেছি, সেখানে আই ম্যাক্স আর কে এফ সি হয়েছে।

২.
লিখেছিলাম, “কতগুলো জিনিস লক্ষ্য করেছি। আর কতগুলো জিনিস নিয়েছি অন্য বড় লেখক লেখিকাদের কাছ থেকে। আর কয়েকটা এলিমেন্ট আমার নিজের ভেতরেই কখন জানি জন্ম নিয়েছে।”

এই বিষয়গুলো নিয়ে একটু লেখা যাক।

bangkim-12

“এক ধরনের বাঙালি আছেন, তারা বঙ্কিমকে হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্গে, চরমপন্থীদের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছেন। “—লেখক

যে জিনিসগুলো লক্ষ্য করেছি, তার মধ্যে একটা হলো: জটিল লেখা, গুরুগম্ভীর শব্দ বা বাক্যবিন্যাস, আর অপরিচিত উদাহরণ বেশিরভাগ পাঠক পাঠিকা আজকাল আর বুঝতে পারেন না। আগেকার দিনে যখন বঙ্কিমচন্দ্র লিখতেন, তিনি যে ভাষায় বাংলা লিখে গেছেন, তা এখন কেউ বুঝতেই পারবে না। অথচ, যারা ভালো বাংলা জানে, বা উচ্চমানের বাংলা পড়ার জন্যে মুখিয়ে থাকে, তাদের কাছে বঙ্কিমচন্দ্র যেন ঐশ্বরিক। দুর্গেশনন্দিনী, বিষবৃক্ষ, রাজসিংহ, চন্দ্রশেখর এর মতো উপন্যাস, বা কৃষ্ণচরিত্র—এসব পড়লে মনে হয় বাংলা ভাষাটা কী অপূর্ব ছিল। পড়লে যেন থেরাপির কাজ করে।

আরো আগে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চণ্ডীমঙ্গল লিখে গেছেন। কাশীরাম দাস বা কৃত্তিবাস লিখে গেছেন বাংলা ভাষায় রামায়ণ মহাভারত। পড়লে এত আশ্চর্য সুন্দর লাগে! মনে হয় যদি একবার সেই যুগে ফিরে যেতে পারতাম, যখন মানুষের মনে পবিত্রতা ছিল, ভালোবাসা ছিল একে অপরের প্রতি, আর একটা সমাজ ছিল, যে সমাজ শত ঝড় ঝঞ্ঝাতেও ভেঙে পড়ে নি।

মাইকেল মধুসূদন দত্তর মেঘনাদবধ কাব্য অথবা শর্মিষ্ঠা পড়লেও সেই আশ্চর্য অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হয়। যেন গায়ে কাঁটা দেয়।

কিন্তু এখন বাংলা ভাষাটাকেই এমন ব্রাত্য করে দেওয়া হয়েছে, যেন ভালো বাংলা পড়তে জানাটা একটা অপরাধ। বাঙালি এখন দেখাতে ব্যস্ত—যে তারা বাংলাভাষাটা তেমন জানে না। হিন্দি বা ইংরিজিটাই তাদের নিজের ভাষা। বাংলাটা ঘটনাচক্রে এপেন্ডিক্স-এর মতো লেগে আছে, কোনো কাজেও লাগছে না, আবার ফেলেও দেওয়া যাচ্ছে না। লজ্জার ল্যাজের মতো বয়ে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে সারা জীবন।

বঙ্কিমকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র যতই উচ্চাসনে বসিয়ে থাকুন না কেন, আজকের আধুনিক বাঙালির কাছে বঙ্কিম হয় দুর্বোধ্য, নয়তো প্রাচীনপন্থী। আবার এক ধরনের বাঙালি আছেন, তারা বঙ্কিমকে হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্গে, চরমপন্থীদের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছেন। পূর্ব বাংলার অনেক মুসলমান, শিক্ষিত বাঙালিই বঙ্কিম পড়তে চান না। পশ্চিমবঙ্গেও প্রায় সেই একই অবস্থা। এ হলো নিজের ভাষা আর সাহিত্যের ইতিহাসকে অস্বীকার করা। যার চেয়ে মূর্খামি আর হতে পারে না।

নীরদ সি চৌধুরী একেই বলে গেছেন আত্মঘাতী বাঙালি। নিজের ইতিহাসকে অস্বীকার করাই হলো নিজের জাতিসত্তাকে শেষ করে ফেলা।

(চলবে)

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে আত্মজীবনী 'ঘটিকাহিনি'র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee