page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

“কোনো প্রকৃত কবিই পাঠকের জন্য কবিতা লেখেন না, কবিতা লেখেন নিজের জন্য।”—মাহবুবুল হক শাকিল

সাদ রহমান: আপনার এই বইমেলায় যেই বইটা আসলো, এই বইটার নামটা একটু জানতে চাই।

মাহবুবুল হক শাকিল: এই বইটার নাম ‘মন খারাপের গাড়ি’।

সাদ: এটা তো কবিতার বই?

শাকিল: কবিতার বই।

সাদ: এটা তো আপনার, দ্বিতীয় কবিতার বই।

শাকিল: এটা আমার দ্বিতীয় কবিতার বই। গতবছর আমার প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছিলো, অন্বেষা প্রকাশনী থেকে। সেটির নাম ছিল, ‘খোরোখাতার পাতা থেকে’।

সাদ: ‘মন খারাপের গাড়ি’। এই যে, মানে নামটা, নামটা এই সময়ের কবিতাকেই একধরনের ধারণ করে। এটা কি আপনার মনে হয়?

boimela-logo-2016

শাকিল: আসলে আমি ওইভাবে চিন্তা করি নাই নামটা দেওয়ার সময়। আর আমি সবসময় যে কথাটি বলি যে, আমি ঠিক প্রচলিত অর্থে কবি বলতে যা বোঝায়, সে অর্থে আমি কবি নই। আমি মূলত আমার নিজের সঙ্গেই কথাবার্তা বলি। নিজের সঙ্গে কথোপকথন হয়। এবং দেখা গেছে যে, বেশিরভাগ সময়ে নিজের সঙ্গে কথাগুলি আমি বলছি, আমি যখন বিষণ্ন থাকছি। আমার যখন মন খারাপ থাকছে। সব মিলিয়েই কবিতাটাকে আমি যদি একটি বই, দুইমলাটের একটি বইকে আমি যদি মনে করি কবিতার বাহন—যেহেতু বেশিরভাগ কবিতা মন খারাপের—তো আমার মনে হলো যে বাহনটি ‘মন খারাপের গাড়ি’ হতে পারে।

সাদ: এই বইয়ের কবিতাগুলো বিশেষভাবে আপনার বিষণ্নতাকে ধারণ করছে। কিন্তু আপনার এর বাইরে, আরো যত জীবনের যত কবিতা, ওগুলোও কি এমন? যেমন গতবছরের যে বইটা।

shakil-boiশাকিল: গতবছরের কবিতাতে বিষণ্নতার একটি সুর ছিল, কিন্তু বিষণ্নতার সুরের চাইতেও প্রবল ছিল একধরনের প্রেম এবং ভালোবাসার সুর। সে জায়গায় হয়তো ওই ধারাটি থেকে আমি বেরিয়ে এসছি। এবং কবিতা মূলত এখন দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, বেদনা সেটাকেই বেশি করে ধারণ করছি। অনেকটাই বেরিয়ে আসছি আমি। প্রেমের যে কবিতা বা ভালোবাসার যে কবিতা, সেক্ষেত্রে হয়তো ঠিক বেরিয়ে আসছি এ কথাটি বলাও আমার বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। একটা মোড় অতিক্রম করে চলে এসেছি আমি।

সাদ: এভাবে এভাবে দেখা যাবে যে আরো কিছু মোড়ের সঙ্গে আপনি যুক্ত হচ্ছেন, যাচ্ছেন।

শাকিল: আসলে জীবন তো থেমে থাকে না। জীবন চলে। এবং আমরা যে চলি, যখনই আমরা থেমে যাই, তার মানেই হচ্ছে মৃত্যু। আপনি যখন চলবেন, তখন অনেকগুলো বাঁককে অতিক্রম করেই কিন্তু আপনার চলতে হবে। কে জানে ভবিষ্যতে কোন বাঁক অপেক্ষা করছে।

সাদ: এই যে বিশেষভাবে বিষণ্নতা ব্যাপারটা, বা মন খারাপের গাড়ির মতো এই যে ব্যাপারটা, এটা আপনার সাথে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলা কবিতারও কি এরকম একটা গুণ যে বাংলা কবিতা বিষণ্ন। এটা কি আপনার মনে হয়?

শাকিল: ঠিক ওই অর্থে বাংলা কবিতাকে আমার, বাংলা কবিতা বিষণ্নতার প্রতীক, বা বিষণ্নতার ধারার প্রতিনিধিত্ব করে সেটি আমি ওইভাবে মনে করি না। বাংলা কবিতায় আপনি দেখুন, আমাদের প্রধানতম কবি যারা, রবীন্দ্রনাথ বলুন, বা নজরুল বলুন, বা আধুনিক কবিতার ভিতরে যারা রয়েছেন, সেক্ষেত্রে কিন্তু শুধুমাত্র বিষণ্নতা নয়, একধরনের ইতিহাসচেতনা, একধরনের বিদ্রোহ, একধরনের ভেঙে ফেলার গান, প্রেম, ভালোবাসা, দেশপ্রেম, নর বা নারীর প্রতি প্রেম—এই সবকিছুই কিন্তু বাংলা কবিতার বিষয়বস্তু। এবং এই অনেকগুলো বিষয়বস্তুর মধ্যে বিষণ্নতা একটি বিষয়বস্তু।

সাদ: বাংলা কবিতার তো একটা মোটামুটি দীর্ঘ সময় হয়ে এসেছে। তো মানে শুরুর দিক থেকে, বা আরো অনেকদিন আগের থেকেই এই সময়ের বাংলা কবিতা কি বিশেষভাবে কোনো কিছু করতে পারছে?

শাকিল: বাংলা কবিতা… আসলে আমি যেটা মনে করি, আমি বলবো যে গত দুটি দশক ছিল অনেকটাই বন্ধ্যাত্বের দশক। এবং এই দশকে এসে আবার মনে হয়েছে যে বেশ কিছু তরুণ শক্তিমান লেখক আমরা পেয়েছি। এবং বাংলা কবিতা নিয়ে এই মুহূর্তে অন্তত বাংলাদেশে, বিভিন্ন ধরনের প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে কিন্তু কবিতা যাচ্ছে। এবং যখনই কবিতা দীর্ঘ একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে যায়, কবিতাকে যখন বিভিন্নভাবে অধ্যয়ন করার একটি প্রবণতা তৈরি হয় তখন আমার মনে হয় যে কবিতা তার সেই বন্ধ্যাত্বের সময়টা অতিক্রম করে সামনের দিকে যাচ্ছে।

সাদ: আপনার, মানে কবিবন্ধু, বা ওইদিক থেকে হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে যে আপনার বই বের হচ্ছে দ্বিতীয় দশকে এসে। কিন্তু আপনার বই আরো আগে বের হওয়ার কথা ছিল। এই ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখেন?

শাকিল: আসলে ওইভাবে বই বের করার বিষয়টা নিয়ে আমি খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না কোনোদিনই। কবিতা লিখতাম, বন্ধুবান্ধব, খুব কাছের বন্ধুবান্ধব যারা, হয়তো দেখা গেল বন্ধুদের সঙ্গে, কবিবন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি, তখন হয়তো কাউকে একটা কবিতা দেখালাম। সেটা নিয়ে একটু আলোচনা হলো, কথা হলো। বা বেশিরভাগ কবিতাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলো। গতবছর আমার জীবনের বিশেষ একজনের অনুরোধে, অনেকটা তার পীড়াপিড়িতে আমি প্রথম কবিতার বই বের করি। আর লেখকের জন্য, আপনি নিজেও জানেন, একবার একটি বই বের হওয়ার পর, তার একধরনের নেশার মতো হয়ে যায়, যে আমার কবিতাগুলো, আমার লেখাগুলো পাঠক পড়ুক, পাঠকের কাছে যাক। এই যে পাঠকের কাছে কবিতাকে নিয়ে যাওয়ার যে আকুতি, সেটার থেকেই ‍মূলত এই কবিতাগুলো দুই মলাটবন্দি হয়েছে।

সাদ: পাঠকের কাছে কবিতা নিয়ে যাওয়ার আকুতি, এবং লোকচক্ষুর আড়ালেও কবিতা থাকে, তো দুই জায়গার কবিতা কি দুই রকম হবে? মানে পাঠকের ব্যাপারটাকে ধারণ করার পরে কবিতা কি ভিন্ন হবে?

শাকিল: কবিতা আসলে আমি মনে করি যে, কোনো প্রকৃত কবিই পাঠকের জন্য কবিতা লেখেন না, কবিতা লেখেন নিজের জন্য। কবিতাগুলো অবিকৃত অবস্থায় নিজের জন্যই থাকে। এরপর একসময় তিনি চান যে, তার… কবিতা কী? কবিতা হচ্ছে মূলত একজন কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। তার সবচাইতে, আমি বলবো তার সবচাইতে নরম যে অনুভূতিগুলো, সবচাইতে স্পর্শকাতর যে অনুভুতিগুলো, সবচাইতে কান্নামুখর বিনিদ্র যে রাত সেটি তিনি তার কবিতায় নিয়ে আসেন। তারপর একসময় তার মনে হয়, আচ্ছা আমার সঙ্গে আমার যে কথোপকথন, সেটা অন্যরাও জানুক না! সেখান থেকেই মূলত কবিরা বই করতে আসে।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ১৯/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও

About Author

সাদ রহমান
সাদ রহমান

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৬। কবিতার বই: 'কাক তুমি কৃষ্ণ গো' (২০১৬)।