page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

কোন ঘটনা যে কোথা থেকে শুরু হয়

১.
কোন ঘটনা যে কোথা থেকে শুরু হয়… বোঝা যায় না। আজীব দাস্তান হ্যাঁয় ইয়ে… কাহাঁ শুরু কাহাঁ খত্তম…!

এইটা একটা স্পেশালাইজড ক্লিনিক, কার্ডিয়াক পেশেন্টদের জন্য। যাদের হার্টের সমস্যা থাকে, টরন্টোতে ফ্যামেলি ডাক্তাররা তাদের এইখানে পাঠায়া দেন, চিকিৎসার জন্য।

এই ক্লিনিকে এর আগেও আমারে কয়েকবার পাঠানো হইছিল, তবে এইবার পাঠাইছে আমার হার্ট অ্যাটাকের বছর পূর্তির উছিলায়। আইজকা এই সকালের ঘুম মাটি কইরা আমার ফলো আপ টেস্ট, আর তাতে অংশ নিতে আইসা সুবোধ বালক আমি, ডাক্তারের নিদানের অপেক্ষায় বইসা রইছি।

গড়পরতা টরন্টোর মানুষের একটা প্যাটেন্ট স্যাড ফেস থাকে, জনম দুঃখী চেহারা। তাদের পোশাক-আশাক থাকে খুবই অফ্যাশন-দুরস্ত, অমসৃণ রুক্ষ ত্বক, চোখে একটা শূন্যতা। শেষ রাতের সাবওয়ের (আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন) জানালাগুলো এই ধরনের ক্লান্ত বিধ্বস্ত মুখচ্ছবি দিয়ে বোঝাই থাকে। তাদেরই কেউ কেউ দেখতেছি হার্টের সমস্যা নিয়া আজ সকালে এই ক্লিনিক পর্যন্ত আইসা পড়ছেন।

biswajit-munshi-logo

টরন্টোর হাসিখুশি রোদ ঝলমলা মানুষগুলা কোন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে যায় কে জানে? তাকায়া দেখলে উৎসাহ পাওয়া যায়, এমন কোনো চেহারা এই স্পেশালাইজড ক্লিনিকের ওয়েটিং এরিয়ায় এখনতরি নজরে পড়ে নাই। তার বদলে একদল করুণ চেহারার মানুষের সাথে অনেকটা সময় একলগে বইসা আমি ভাবতেছিলাম… আমি এইখানে ক্যান? আমি এইখানে কী করতেছি?

“আমি কে” কিংবা “মানুষ কোথা হইতে আসিল” টাইপের দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা থিকা এই প্রশ্নের উদ্ভব হয় নাই।

যখন সকাল সকাল আরও কয়েক ঘণ্টা বাড়তি ঘুমানি যাইত, আর কেউ যেন বা শরীরের ব্লাংকেট টাইনা নিয়া গেছে, আর ওমের অভাবে ঠিক ঘুমাইতে পারা যাইতেছে না আচমকা এমন বিপদের মইধ্যে নিজেরে আবিষ্কার করলে মানুষ এইটাও ভাবে, কে তারে এই বিপদে ফালাইল, কিংবা এই বিপদরে সে এড়াইতে পারত কিনা।

আজ সকালে এই ক্লিনিকে না আইসা আমি পার পাইতাম কিনা ভাবতে গিয়া দেখলাম, আজকের এই ঘটনার শুরু আইজকা হয় নাই। এক বছর আগের একটা ঘটনার জের এইটা। এক বছর আগের সেইদিন, ঢাকা শহরের এক সকালে আমার হৃদযন্ত্র বিকল হইছিল আর অ্যাম্বুলেন্স আইসা আমারে ধানমণ্ডির স্কয়ার হাসপাতালে নিয়া গেছিল।

bishyajit-2a

“ক্লিনিকটা ছোট আর আঁটোসাটো।”

এক বছর আগের সকালের সেই ঘটনা, সেইটা কি সেইদিন সকালেই শুরু হইছিল? নাকি আগের কিংবা তারও আগের কোনো ঘটনার জের ছিল সেই দিনের সকালের আমার অসুস্থ হওয়া? কোন ঘটনা আসলে কখন শুরু হয়?

এতসব ভাবতে গেলে মাথা আওলায়া যায়, আজকের ডাক্তারি পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসাবে আমার ক্যাফেইন নেওয়া নিষেধ। ফলে নো কফি, নো চা অবস্থা।  আমি অবশ্য সাবধানতা হিসাবে গতকালও সারাদিন কফি খাই নাই। সেই জন্যই হয়ত, এই সাত সকালে আমার মাথা আরও কাজ করতেছে না। কোনো একটা ঘটনার আসলেই কোনো শুরু আছে কিনা, এই গূঢ় দার্শনিক আলাপে আপাততঃ সব বুইঝা ফেলার ভান করতেছি, আর শুধু ঘাড় নাড়তেছি। আসলে আমি কিছুই বুঝি নাই।

২.
ক্লিনিকটা ছোট আর আঁটোসাটো। ভিতরে ঢুকলেই ছোট্ট একটা ওয়েটিং এরিয়া, তার চার আনা জায়গা নিয়া রিসেপশন। কাচ দিয়া ঘিরা রিসেপশনের সামনে ‘ব ই সা  এ ক টু ও  আ রা ম  না ই’ এইরাম অনেকগুলা খটখটা চেয়ার। সেইখানে একটা লোহার চেয়ারে খুবই বেজার হইয়া বইসা,  আমি অপেক্ষা করতেছি ডাক্তারের ঘরে আমার ডাক আসার জন্য। টরন্টোর স্থায়ী বাসিন্দাদের শরীর স্বাস্থ্য  রোগ অসুখ সামলানোর কাজ OHIP (Ontario Health Insurance Plan) এর কাঁধে, OHIP এর যাবতীয় খরচ যোগায় প্রাদেশিক সরকারের মিনিস্ট্রি অব হেলথ। 

টরন্টোর এই ধরনের স্পেশালাইজড ক্লিনিকগুলা মূলতঃ মিনিস্ট্রি অব হেলথের কন্ট্রাকটর হিসাবে কাজ করে। OHIP এর যে সব রুগীদের স্পেশালাইজড কেয়ার দরকার, এই ক্লিনিকগুলা তাগোরে সেই চিকিৎসা দেওনের ঠিকাদার। OHIP  তাগোরে নিয়মিত রুগী পাঠাইতে থাকে, আর ট্রিটমেন্ট শেষে মিনিস্ট্রি অব হেলথ থিকা এই ক্লিনিকগুলা রুগিপিছু চিকিৎসা দেওনের বিল পাইয়া যায়। ফলে এই ক্লিনিকগুলারে রুগী খুঁইজা বেড়াইতে হয় না, বা চকচকা আরামদায়ক ক্লিনিক দেখায়া রুগীদের ইমপ্রেস করতে হয় না। শুধু OHIP এর বাইন্ধা দেওয়া চিকিৎসার মান নিখুঁত ভাবে মাইনা চললেই হয়। বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে চলে না বইলা এইসব ক্লিনিকের ইন্টেরিওর ডিজাইনের জেল্লা, কিংবা আরাম আয়েসের ব্যবস্থা সবটুকুই মিনিমাম। ঢাকার ক্লিনিকগুলা্র শানদার মার্বেল আর চকচকা গ্লাসের জৌলুস দেইখা অভ্যস্ত আমার চোখে এই ক্লিনিকরে তাই হয়ত খুবই ডিপ্রেসড লাগে।

ক্লিনিকে ঢুকনের টাইমে আমার মিজাজ ভালই ছিল,  আধা ঘণ্টা আগে আইসা রিসেপসনে হেলথ কার্ড দেখাইলে তারা আমারে একটা হার্ডবোর্ডের ক্লিপে চাপা রাখা দুই পৃষ্ঠার একটা ফরম ধরায়া দিছিল। তাতে আমার যাবতীয় ব্যক্তিগত ইনফরমেশন নিয়া বহুত পুছতাছ ছিল। ডাক্তারি পরীক্ষার আগে এইটা এখানকার দস্তুর। আমার নাম ধাম, কী কী রোগ অসুখ হইছিল, কী কী ওষুধ খাই… তারা আজ আমার যা যা পরীক্ষা করতে চায়, তা নিয়া আমার সম্মতি আছে কিনা—এইসব আগড়ম বাগড়ম।

কাগজের উপরে কলম দিয়া লেখালেখি খুব কষ্টের কাজ। অনিচ্ছুক ভাবে লিখার কারণে নিজের হাতের লিখা নিজেই বুঝা যায় না, অবস্থা। তবুও সেই কাগজ পূরণ কইরা রিসেপসনে সাবমিট দিছি, অনেকক্ষণ আগে। এই যে তারা আমারে দিয়া দুই পৃষ্ঠার ফরম ভরাইল, আর আমার মনে হইল সব ইনফরমেশন তো তোমাদের ডাটাব্যাংকে লোড করা আছে, কী বোর্ডের কয়েকটা টিপে তুমি এই সব পাইয়া যাইতা।  আমার সম্পর্কে  এমন অনেক কিছু তথ্য আছে, যা যা আমি নিজেও জানি না, এমন কি সেইগুলাও তোমরা চাইলেই জানতে পারতা। আর আমারে দিয়া এতক্ষণ কলম চালাইলা!

এই সব ঘটনারে, আমার উপর তাগো একটা চাপায়া দেয়া জুলুম বইলা মনে হইতেছিল। জুলুমের মধ্য দিয়া বড় হইয়া ওঠার এই এক সমস্যা, জুলুম নিয়া আমাদের একটা এক্সট্রা সেনসেটিভ বোধ জন্ম নেয়। জুলুম নিয়া আমার কনশাসনেস, আর এই যে অনির্দিষ্ট একটা অপেক্ষার পালা, যা সারা জীবনের লাইনে খাড়ায়া কাউন্টারে পৌঁছানোর আগেই টিকিট ফুরায়া যাওয়ার হতাশামূলক স্মৃতিগুলারে মনে করায়া দেয়,  মনে হয় এই সব কিছু মিল্যা, ক্লিনিকের খটখটা চেয়ারে বইসা থাকা আমারে ক্রমশঃ বেজার কইরা তুলতেছিল।

ওয়েটিং এরিয়ায় আমার আশে-পাশে যেই সব বিমর্ষ আর মলিন চেহারার মানুষ,  অসুখ কিংবা অসুখ নিয়া দুশ্চিন্তা তাগোরে কাবু বানায়া ফেলছে। উল্টাদিকে এক চৈনিক মহিলা একটা বড় সাইজের শপিং ব্যাগরে উনার জীবনের সর্বস্ব মাইনা কোলে জাপটাইয়া নিয়া বইসা আছেন। সেইদিকে তাকায়া আমার মনটা আরও একটু খারাপ হইল। মাঝে মাঝে একজন দুইজন মানুষ, বাইরে থিকা ব্যস্ত ভঙ্গিতে আইসা রিসেপশনরে কিছু না কইয়া, সরাসরি ভিত্তরে যাইতেছিল। সম্ভাব্য দুর্নীতির মাধ্যমে সিরিয়াল ভঙ্গ করার শঙ্কা কইরা, তাদের দিকে আমি খুবই সন্দেহের চোখে তাকাইতেছিলাম।

এর মাঝে এক ঘণ্টা পার হয়া গেছে, আর আমি বিলক্ষণ টের পাইতেছি, আমার মনটা বেজার থিকা বেজারতর হওয়ার দিকে যাইতেছে।  ক্যান আমি বেজার থিকা বেজারতর হইয়া একটা গুসসার দিকে যাইতেছি, সেইটার কারণ আমি সেই ‘ব ই সা  ম জা  না ই’  খটখটা লোহার চেয়ারে বইসা বইসা খুঁজতে চাইতেছিলাম। পণ্ডিতেরা এইটারে কি আত্মজিজ্ঞাসা কয়? নাকি আত্মানুসন্ধান কিংবা মনোবিশ্লেষণ কয়া থাকে?

bishyajit-2k

“ঢাকার ক্লিনিকগুলা্র শানদার মার্বেল আর চকচকা গ্লাসের জৌলুস দেইখা অভ্যস্ত আমার চোখে এই ক্লিনিকরে তাই হয়ত খুবই ডিপ্রেসড লাগে।”

যাই কয়া থাকুক, এইটা আমার কাছে অনেকটা নিজের লগে নিজের কথা কওয়ার মতন লাগে। প্রত্যেকটা মানুষের ভিত্তরে তার একটা প্রতিবিম্ব থাকে, যেইটা হইল তার প্রতিপুরুষ আর কি। নিজের সেলফ আর তার প্রতিপুরুষ যখন পরস্পর বাতচিৎ শুরু করে, আর্গু করে, ঝগড়া করে, আবার থোড়াসা রঙ ঢং খুনসুটি খোঁচাখুঁচি করে, বেজার অবস্থা কাটানিতে এইটা একটা বিরাট রিলিফ হিসাবে কাজ করে। এই নিজের লগে নিজের কথা কওয়ার কাজটা আমি প্রায়ই কইরা থাকি। এর সুবিধার দিকটা হইল, অনেক বিষয়েই নিজেরে দায়ী কইরা, নিজেরে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়া দিয়া, নিজে নিজে একটু র‍্যাশনাল হওয়ার চর্চা করা গেল, আর কি! সেই সাথে গুসসার পরিমাণ কমায়া নিজেরে একটু লাইট মুডে নিয়া যাওয়া গেল। গুসসা দেখানোর কাজটা্র মাঝে কোনো সৌন্দর্য নাই। বিচক্ষণ মানুষ গুসসা প্রকাশ করেন না, তার বদলে অপছন্দের পরিস্থিতি থেকে নিজরে উইথড্র করেন, গুটায়া নেন। মানুষের সমস্যা হইল, সে কোনো কিছুতে নিজের দোষ দেখতে পায় না।  দুনিয়ার সবাই মিল্লা জোট বাইন্ধা তারে কেমন নাস্তানাবুদ করতেছে—এইটা হইল তার চিন্তার প্রিয় খাদ্য। এই ইগোর চাটনি সে চাইটা চাইটা খাইতেই থাকে, দাঁতমুখ খিচায়া রাগে ফাইট্টা পড়ার আগ পর্যন্ত্।

৩.
দেড় ঘণ্টা একটা লোহার চেয়ারে কাউরে বসায়া রাখলে সে বোরড হয়া বিরক্ত হইতেই পারে। বছর ঘুইরা আমার হার্টের অসুখের এখন ফলোআপের সময় আইছে। এক বছর পরে আইসা আমার হৃদযন্ত্র কতটা মজবুত হইল, একটু পরেই তার পরীক্ষা শুরু হইব। সেই ডাকের অপেক্ষায় থাইকা  হয়রান হইতে হইতে আমি শুনতে ছিলাম… মাথার মধ্যে সেলফ আর তার প্রতিপুরুষের বাহাস। দুই প্রতিপক্ষের কথা কাটাকাটি… তরজার লড়াই। একজন অন্যরে কাঠগড়ায় তুলতেছে আর খুঁচাইতেছে…, এত সবুর কম ক্যান তোমার? ডাক্তরের কাছে এক দেড় ঘণ্টা বইসা থাকা তো অতি সাধারণ বিষয়। এখানে আইসা ভাব লইতেছ, য্যান জীবনে তুমি ডাক্তরের চেম্বারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইসা কাটাও নাই। পিজি হাসপাতালের বারান্দায় হাঁইটা হাঁইটা রাত পার করো নাই। বেশি ফুটানি দেখাইও না… এইখানে তারা তবুও তো একটা সিস্টেম ডেভেলাপ করছে। অ্যান্ড ইটস ওয়ার্কিং, ম্যান… মাইনষে এই হেলথ সিস্টেমের সুবিধা পাইতেছে। অ্যাট লিস্ট, শো দেম সাম রেসপেক্ট।

কুল ডাউন ব্রো… তাছাড়া তুমার নাম তো অ্যালবার্ট পিন্টো নহে, তাইলে তুমি এত গুসসা হইতাছো কিঁউ! হি হি হি…।

অ্যালবার্ট পিন্টোর কথায় ইয়াদ আইল, এককালে মুম্বাইয়ের ছোকরা কিছু ম্যুভি মেকার, দর্শকদের পেইন দিবার লাইগা আর্ট ফ্লিম নামের এক পদের আধা সিদ্ধ সিনেমা বানায়া বিস্তর আর্ট কালচার ফলাইত। আর্ট কালচার জিনিস খারাপ না, এইটা করাই যায়। তবে মাথায় রাখা উচিত, একটা সিনেমা বানানি মানে, সব কিছুর শেষে সেইটা হইল একটা প্রজেক্ট, একটা প্রডাকশন।  যারে নিজের পায়ে দাঁড়াইয়া সারভাইভ করতে হয়, তার ইনভেস্টমেন্টের রিটার্ন নিশ্চিত করতে হয়। যাতে সবাইরে দেনা পাওনা মিটাইয়া দিয়া, পরের সিনেমাটা নিয়া মাথা ঘামাইতে পারার মতো পয়সা হাতে থাকে।

সে আমলের এই সব আর্ট ফিলিমের মেকাররা বিরাট প্রগতিশীল ছিলেন, কারন তারা সবাই বামপন্থী আর সবাই মিলা কইষা আমেরিকার পুঁজিবাদরে গালাগাল করতে পারতেন। প্রগতিশীল ফিলিম মেকার তাদের দায়িত্ব বলতে সিনেমার আর্ট-কালচার ফলানি পর্যন্ত বুঝতেন হয়ত। সিনেমাকে টিইকা থাকতে হইলে যে তারে ব্যবসা বাণিজ্যেও সফল হইতে হয়… এই ব্যবসা বাণিজ্য বিষয়টাকে উনারা পুঁজিবাদী নোংরা ব্যাপার ভাবতেন হয়ত। প্রগতিশীলতা হইল গিয়া পূত পবিত্র, পুঁজির দালালি করা ব্যবসা বাণিজ্য কি উনাদের মানায়। এদিকে  তাদের একটা সিনেমা্র পিছনে প্রডিউসরদের ঢালা দশ লাখ টাকার রিটার্ন হিসাবে তাদের ম্যুভি  দুই লাখ টাকাও তুলতে পারে না। তবু এইটা নিয়া তাদের কোনো অপরাধবোধে ভূগতে হইব ক্যান? সিনেমা হলে তাদের ছবি সাতদিনও চালানি যায় না, সেটার দোষ তো পাবলিকের শস্তা রুচির।

প্রগতিশীলদের ছবিতে গণমানুষরে নিয়া কত কথা থাকে গো, আর দ্যাখো এই দেশের গণমানুষ, পুঁজিবাদের অবক্ষয়ে ক্যামনে ক্ষইয়া গেছেন গিয়া, তারা আর আর্টের সমঝদারি করেন না। ছবিতে তাঁরা খালি সেক্স খোঁজে!

৪.
সেই কালে আমার ফাসিস্ত পিতা, আমারে বিভিন্ন কাজে কামে কইলকাতা যাইতে বাধ্য করত।

একবার কইলকাতা গিয়া দেখছিলাম, রাস্তায় দোতলা বাসের গায়ে, কিংবা বিল্ডিংয়ের ছাদের হোর্ডিংয়ে সৈদ মির্জা (এই রকমই বানান লিখত) নামে এক পরিচালকের নাম। উনার একটা সিনেমা ছিল ‘অ্যালবার্ট পিন্টো কো গুসসা কিঁউ আতা হ্যায়’… বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ে লিখা থাকতো, সৈদ মির্জার বুদ্ধিদীপ্ত ছবি। ছাপাখানায় প্রুফ দেখনের টাইমে বাক্যের মাঝে কোনো শব্দ ছুইটা গেলে একটা গোল্লার ভিত্তরে সেই শব্দটারে ঢুকায়া দিয়া যেমনে একটা অ্যারো দিয়া দেখায়া দেওয়া হয়—ছুইটা যাওয়া শব্দটা কোথায় ফিট হইব—সেই ভাবে ছবির বিজ্ঞাপনের লেআউটে বুদ্ধিদীপ্ত  শব্দটা সৈদ মির্জার আর ছবি… এই শব্দ দুইয়ের মাঝে কারেক্টেড প্রুফ শিটের স্টাইলে অ্যারো দিয়া ফিট কইরা দেওয়া হইত। বিজ্ঞাপনের লেআউটের সেই আইডিয়া দেইখা বেবাক পাবলিকে ঘাড় নাড়ায়া স্বীকার করতে বাধ্য হইত—এইটা আসলেই একটা বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমা হইছে। সৈদ মির্জার বুদ্ধিশুদ্ধি নিয়া পাবলিকের মনে আর কোনো সন্দেহ থাকত না।

munshi-2d

“উনার সব ছবির নাম কেন এত লম্বা লম্বা হইত সেইটার উত্তর উনার কোনো ইন্টারভিউয়ে হয়ত পাওয়া যাইত।”

প্রায় আড়াই হাত লম্বা নামের সৈদ সাবের এই সিনেমা আমি নিজেও দেখছিলাম, যতদূর মনে পড়ে। ইন্ডিয়ার সেই স্থবির ইকনমির যুগে মধ্যবিত্ত পিন্টো সাবের কেন গুসসা হয়, এইটা ম্যুভি বানায়া জানানির মত উচ্চাঙ্গের কোনো সাবজেক্ট ছিল, তা আমার কাছে মনে হয় নাই। ইন্ডিয়ায় মাইনষের এত্ত এত্ত প্রবলেম, গুসসা তো তাদের হইতেই পারে। এতদিন পর সেই সিনেমার কোনো কিছুই আর মনে নাই অবশ্য। তবে মনে আছে উনার লম্বা লম্বা নামের আরও কয়েকটা সিনেমা ছিল। ‘মোহন জোশি হাজির হো’, ‘সেলিম ল্যাংড়ে পে মৎ রো’। উনার আর একটা সিনেমার নাম আছিল ‘অরভিন্দ দেশাই কি আজিব দাস্তান’। সেইটাও মনে হয় আমার দেখা হইছিল।

উনার সব ছবির নাম কেন এত লম্বা লম্বা হইত সেইটার উত্তর উনার কোনো ইন্টারভিউয়ে হয়ত পাওয়া যাইত। আমার আক্ষেপ, সৈদ সাবের কোনো ইন্টারভিউ আমার নজরে পড়ে নাই, কিংবা পড়লেও পড়ার ইচ্ছা হয় নাই। সেই একটা জমানা আছিল হয়ত, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষজন আড়াই হাত দৈর্ঘ্যের কমে কোনো কিছু কইয়া বুঝাইতে পারতেন না। আমাদের সুনীল গাঙ্গুলীও কম বুদ্ধিদীপ্ত আছিলেন না। সেই যুগে উনি লিখছিলেন ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’ আর একটা লিখছিলেন ‘দেবদূত অথবা বারো ঘাটের কানাকড়ি’। সুনীলের গরম ভাত নিয়া বিপ্লব দাশগুপ্ত মশায় একখানা আর্টফ্লিম বানাইছিলেন, সেই কথাও খটখটা লোহার চেয়ারে বইসা বইসা আমার মনে পড়ল।

হালের ওমপুরি কিংবা নাসিরুদ্দিনগো ঝকঝকা চেহারা দেইখা তো আমার ভালই লাগে। ইদানিং ওমপুরি সাব একেকটা মুভিতে কী হাসিটা যে হাসে গো… দেইখা মনটা জুড়ায়। আর্থিক স্বচ্ছলতা মানুষের চেহারায় বিস্তর স্নেহ যোগ করে। কম বয়সে মইরা যাওয়া স্মিতা পাতিলের কথাও অনেক মনে হয় আর আফসোস লাগে। বাঁইচা থাকলে এত এত সব গ্লোবাল মার্কেটের ঝকঝকা ব্লকবাস্টার—তার লাইফেও আইতে পারত। আহারে বেচারা পোড়াকপালি, প্যাট চিপানি ফকিরনি মার্কা আর্ট ফ্লিমের ডিরেক্টারগো হাতে পইড়া তার পুরা জীবনটা তছনছ হয়া গেছে।

৫.
আমার যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল সকাল ৯ টায়, সাড়ে দশটার কিছু পরে দেখি প্রায় দাঁত ভাইঙ্গা কেউ আমার নাম ধইরা ডাকতেছে। আমি চেয়ার থিকা উইঠা কয়েক পা আগাইলে সেই টেকনিশিয়ান, আমারে বলে, ওহে জনাব মানছি (মুনশি), এই সকালে তুমি আছো কীরাম? চলো পরীক্ষা করার ঘরের দিকে তোমারে লইয়া যাই।

অল্প বয়সী এক তরুণ, তার চেহারা আর উচ্চারণ দেইখা মনে হয় পূর্ব ইউরোপের প্রাক্তন সোভিয়েতের কোনো দেশ থিকা আগত। ভিতরে গিয়া সে আমারে কয়, তুমি কি  আগে আসছো এখানে?

munshi-2b

কার্ডিওলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ ইমরান জিয়া—ছবি. লেখক

এইগুলি কোনো সিরিয়াস প্রশ্ন নয়, কোনো জরুরি আলাপ নয়। এইগুলা হইলো স্মলটক, রুগীর সাথে একটু সহজ হওয়া, র‍্যাপোর্ট বিল্ডিং করা। সৌজন্যমূলক একটা হাসি দিয়া, পালটা একটু স্মলটক করা। এই ক্ষেত্রে আমার দিক থেকে ছিল সম্ভাব্য স্বাভাবিক উত্তর। তার বদলে আমি শুকনা মুখে নিস্পৃহ ভাবে ঘাড় নাইড়া শরীরে অ্যাপ্রন জড়াইতে শুরু করলাম। মনে মনে কইলাম, তাইতে কী আইসে যায়? এইটা কি আমার কোলস্টেরলের লেভেল মাপতে কামে লাগব? আমার অবন্ধুসুলভ শরীরী ভাষা প্রাক্তন বলশেভিক ভাইরে একটু হতভম্ব বানায়া দিছিল। উনার কানাডা বাসের জীবনে এমন কর্কশ আচরণ নিশ্চয়ই বেনজির হইয়া আছিল। তবুও নিজকে সামলায়া নিয়া উনি পেশাদারি স্বরে আমার সাথে বাতচিৎ চালাইতে লাগলেন, আমারে পরীক্ষা করার বিছানায় শুয়াইয়া বাম দিকে কাৎ হইতে কইলেন।

শরীরের উর্ধ্বাঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় আঠাইলা তারের প্রান্ত ফিট কইরা দেওয়া হইছে। আমার  কনুই ভাঁজ অবস্থায় মাথার নিচে, বাম পাশে শুইয়া আমি কয়েক হাত দূরে, দ্বিতীয় মি. মানছি’র দেখা পাইলাম। বিছানার পাশে দৌড়ানোর ট্রেডমিল, তার পাশে একটা চেয়ার, সেইখানে বইসা পা দুলাইতেছিলেন আমার প্রতিবিম্ব, আমার প্রতিপুরুষ। দূরের সাদা দেয়ালের দিকে আমি চাইয়া ছিলাম, সেখান থিকা চোখ ফিরাইতেই উনার বিদ্রূপ আর কৌতুক মাখা চেহারায় আমার দৃষ্টি আটকায়। আমার নিজের মুখোমুখি—আমারই প্রতিপুরুষ।

—তোমার মনে আছে, ডা. মোহাম্মদ ইমরান জিয়া, তোমার যিনি কার্ডিওলজিস্ট… প্রথম দিন উনার নাম শুইনা তুমি খুবই আপসেট হইছিলা। ক্যান তোমার ভাগ্যে একজন পাকি ডাক্তার পড়ল! নাম শুইনাই তুমি ঠাওরাইয়া ছিলা, উনি নিশ্চয়ই পাকিস্তানি।  তোমার কথা সত্য হইতেও পারে, উনি হয়ত সত্য সত্যই পাকিস্তানি… কিন্তু এথনিক পরিচয় দিয়ে কাউকে বিচার করার মত বর্ণবাদী চর্চা তুমি ক্যামনে করতে পারো? দুই চার পাতা বিদ্যাশিক্ষা তো করছো—বর্ণবাদ জিনিসটা বুঝো নিশ্চয়ই।

আর সাদা চামড়ার ডাক্তারের প্রতি, তোমার বাড়তি ভক্তির রিজনটা কী? বিনা ক্রিটিকে তাগোর শ্রেষ্ঠত্ব মাইনা নিতে তোমার কোনো আপত্তি নাই। ইভন এই কথাও হয়তো সত্যি নয়। সব সাদা চামড়া নির্বিশেষ তোমার প্রভু নয়। সাদা চামড়া যদি খাঁটি ইউরোপের হয়, তার প্রতি তোমার শ্রদ্ধা অপার। পূর্ব ইউরোপের লোকজন তো একটা ভাইঙ্গা পড়া সোভিয়েতের লুজার সিটিজেন, ফলে তার সৌজন্যের আচরণকে পাত্তা না দিয়া, তার সাথে রুড আচরণ তো করাই যায়। তারে কোল্ড শোল্ডার তো দেওয়াই যায়। এই যে তোমারে দেড় ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হইছে, তুমি তাইতে মহা আপসেট। তোমার এই বিবেচনা নাই, একটা ক্লিনিকের একজামিনেশন প্রসেসে কত কত আনফোরশিন ঘটনা থাকতে পারে। চেইন রিএ্যকশানের মত এই সব ঘটনা, পরবর্তী সব ঘটনারে বিলম্ব ঘটায়া দেয়, অথচ তুমি নিশ্চিত, তোমার পূর্ব ইউরোপিয়ান টেকনিশিয়ান জাইনা বুইঝা সিদ্ধান্ত নিয়া তোমারে বসায়া রাখছে! তোমারে অবহেলা করছে!!

এত অবিবেচক তুমি ক্যামনে হইতে পারো, ম্যান!

আমার এত ক্লান্ত লাগতেছিল, আমি জোর কইরা চোখ বুজলাম। আমি ভয় পাইতেছিলাম, এত এত ঝাড়ির মুখে যদি আমার ব্লাড প্রেসার বাইড়া যায়, তা হইলে আমার আর বাসায় ফিইরা যাওয়া লাগবে না। আমাকে শিউর অ্যাম্বুলেন্স ডাইকা হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠায়া দিবে।

আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, একজামিনের কাম শেষ হইলেই, আমি এক্স সোভিয়েত ভাইয়ের কাছে দুঃখ প্রকাশ কইরা তার কাছে আন্তরিক ভাবে মাপ চায়া নিব। আমি বাসায় ফিইরা আমার বাকি ঘুম ঘুমাইতে চাই, আমি অবশ্যই হাসপাতালে যাইতে চাই না। আয়াম সরি ব্রো… আমার বিবেকের কসম, আমি বর্ণবাদী হইতে চাই না।

আমি চাই, বর্ণবাদী চিন্তা আমার মাথা থিকা নিপাত যাক।

About Author

বিশ্বজিৎ মুনশি
বিশ্বজিৎ মুনশি

জন্ম বাংলাদেশের দিনাজপুরে, ১৯৬২ সালে। ছোটবেলার দীর্ঘ সময় কেটেছে বাংলাদেশের বাইরে। ১৯৭৬ সাল থেকে ছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজকল্যাণে অনার্স এবং মাস্টার্স। সক্রিয় ভাবে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বাইরে। প্রথমে ছিলেন লন্ডন ইউনাইটেড কিংডম, সেখানে বাংলা ইংরাজি ইন্টারপ্রেটিং-এ ডিপ্লোমা করেন। ২০১০ সাল থেকে আছেন কানাডার টরন্টো শহরে।