page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

কোরবানি এবং ড্রোন-মানবের পশু-মানবিকতা

আমি কোরবানির দৃশ্য সহ্য করতে পারি না। এবং কোরবানির সময়ে দূরে থাকি। কিন্ত, খাদ্যচক্রের জন্যে প্রয়োজনীয় এই প্রাণহরণ সহ্য করতে না পারাটা আধুনিকতার একটা রোগ মাত্র।

এর সাথে ড্রোনের মাধ্যমে শত্রু হত্যার মিল আছে।

ট্রিগার টিপে বা বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে যে মানুষ একজন আরেকজনকে হত্যা করত, সেই মানুষ এখন এসি রুমের মধ্যে বসে, স্ক্রিনের মধ্যে দেখে মানুষ হত্যা করে। তার মধ্যে আর কোনো অনুভূতি জাগে না।
ঠিক তেমনি, যারা আমিষ খায় কিন্ত পশু হত্যার সমালোচনা করে, তারা মূলত এই ড্রোনের অপারেটরের মত আচরণ করে। কারণ তারা নিজেদেরকে এই হত্যার সাথে বিযুক্ত মনে করতে চায়।

আধুনিক শহরে বাস করা প্রসেসড ফুড খাওয়া ইনফরমেশান সভ্যতার মানুষ, মানবজাতির ইতিহাসে অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী একটা প্রজাতি। এরা নিজেদেরকে মানবোত্তর মনে করে, স্পেশিয়াল ভাবে। প্রকৃতির একজন সন্তান হিসেবে এরা নিজেদেরকে দেখতে পারে না।

এরা বোঝে না খাদ্যচক্রের মধ্যে মানুষ কোনো হাঙর বা শকুন বা  বাঘ বা কুমিরের মত একটা কারনিভরাস প্রাণী মাত্র।

মানুষ আশরাফুল মখলুকাত হতে পারে কিন্ত ফুড চেইনে গিয়ে সে একটা কারনিভরাস মাত্র। এইখানে নৈতিকতা আরোপের কোনো সুযোগ নাই।

zia-hassan-logo

নৈতিকতা আরোপের সুযোগ আছে, মানুষের অন্য একটা আচরণে যখন মানুষ ম্যাস প্রডিউস করে, যখন মানুষ প্রসেস ফুড তৈরির জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে প্রাণিহত্যা করে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে প্রাণী উৎপাদন করে এবং সেই খাদ্যকে নষ্ট করে। এই দায়টা ক্যাপিটালিজমের।

একটা বাঘ কখনো প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রাণী হত্যা করে না। মানুষ করে। এইখানেই অপরাধটা হয়।

এবং এই অপরাধ সব চেয়ে বেশি করে মুসলমানদের কোরবানি নিয়ে সেন্সিটিভিটি দেখানো গ্রুপটাই।

ক্যাপিটালিজমের ক্যাপিটাল খোঁজে ইফিসিয়েন্সি, ভ্যালু এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেল। সে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উৎপাদন করে। সে স্টোর করে, ধ্বংস করে।

এইখানে সে প্রাণিহত্যার সাথে তার হিউমিলিটিকে বিযুক্ত করে। একজন মানুষের জন্যে একটা প্রাণীকে হত্যা করা খুবই বিনীত একটা আচরণ হতে পারে, যা মানুষকে উপলব্ধি দিতে পারে, খাদ্যের জন্যে তাকে কত নৃশংস হতে হচ্ছে। তাই, প্রতিটা পশু হত্যা মানুষকে সেই বিনয় দেয়ার কথা। যে আমি প্রকৃতির সন্তান, আমার এবং আমার পরিবারের আমিষের জন্যে আমি আর একটা প্রাণীকে নৃশংস ভাবে হত্যা করছি, যার কোনো অল্টারনেটিভ আমার নাই।

কিন্ত মাস প্রডাকশান ক্যাপিটালিজম এবং শহুরে সভ্যতা আমাদেরকে সে বিনীত আচরণ থেকে বিযুক্ত করে।

আমরা বার্গার খেতে খেতে সেই বিনীত প্রক্রিয়াতে পাশবিকতা নির্মাণ করি।

ফলে, আমরা প্রকৃতিতে আমাদের অবস্থান বুঝতে ব্যর্থ হই।

এই বিযুক্ত মানুষটাই পৃথিবীকে ধ্বংস করে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে। একটার জায়গায় ৫টা মোবাইল ব্যবহার করে, সুইমিং পুল গরম রাখতে কয়েক গিগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। যেসব আচরন গ্লোবাল ওয়ারমিং আমাদের ভবিষ্যৎকেই শুধু ধ্বংস করে না, তার বিলাসিতাকে ধারণ করার জন্যে থার্মাল বিদ্যুৎ কোটি কোটি লিটার পানি নষ্ট করার সময়ে লক্ষ কোটি জলজ প্রাণী ধ্বংস করে। এইগুলো নিয়ে তার দায় নাই, কারণ সে প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত। সে ভাবে, সে ইন্টারনেট যুগের ইনফরমেশান মানুষ।

আলোচনাটা অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে, হয়তো আমিও গুছিয়ে লিখতে পারি নি। কিন্ত জাস্ট বোঝানোর জন্যে আমি একটা ভিডিও দিব।

এইটা পৃথিবীর সব চেয়ে বড় টার্কি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাটারবল ফাক্টরির একটা গোপন ভিডিও। এইখানে দেখবেন, কীভাবে টারকির বাচ্চাগুলো যেইগুলো যে কোনো কারণে প্রয়োজনের অতিরিক্ত, সেইগুলোকে কীভাবে ক্রাশ করে ধ্বংস করা হয়। বাটারবল কোম্পানির টার্কি মিট, ম্যাক ডনাল্ডস কেএফসি সবাই ব্যবহার করে।

অনেকে এই ভিডিওটা সহ্যও করতে পারবেন না।

আমিও পারি নি।

কিন্ত, আমি ঠিক এই পয়েন্টটাই দিতে চেয়েছি। যে এই হত্যায় কোনো হিউমিলিটি নাই। এইটা প্রাণ টিকিয়ে রাখার জন্যে প্রাণ নেয়া নয়। এইটা ইফিসিয়েন্সির জন্যে হত্যা।

এই হত্যাটাই নৃশংস বা অমানবিক হত্যা। কারণ এইটা ইকনমি অফ স্কেলের জন্যে হত্যা। অপ্রয়োজনীয় হত্যা।

আমি নিশ্চিত, এই বাটারবল ফ্যাক্টরি বছরে যেই পরিমাণ টার্কি চিককে ক্রাশ করে, মারে, সেইটা মুসলমানদের সারা বছরের প্রাণিহত্যার থেকে বেশি।
আমি এইখানে মুসলমান বা এথিস্ট নৈতিকতা আরোপ করতে চাই না।

কিন্ত পয়েন্টটা যেইটা বার বার বলতে চাই সেইটা হইল এই ধরনের ড্রোন মেন্টালিটিটা আধুনিকতার একটা দায়।

আমিষের প্রয়োজনে পশুহত্যার মধ্যে এই ধরনের ফোনি মানবিকতা আরোপ না করে মানুষ যত তাড়াতাড়ি প্রকৃতিতে তার অবস্থান বুঝে নিবে এবং ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নিতে শিখবে তখনই মানুষ প্রকৃতির সন্তান হতে পারবে।

ইউটিউবে দেখুন টার্কি ক্রাশ ভিডিও।
সাবধানতা: এই ভিডিও আপনাকে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে সমস্যা আক্রান্ত করতে পারে।

About Author

জিয়া হাসান
জিয়া হাসান

সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট এক্টিভিস্ট। সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিশ্লেষক। প্রথম উপন্যাস: 'দুর্ঘটনায় কবি'। গ্রন্থ: 'শাহবাগ থেকে হেফাজত: রাজসাক্ষীর জবানবন্দি'।