page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

ক্যাম্পাসের সেই রইদগুলা

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ।’ পৌষ মাস সর্বনাশের বিপরীতার্থক হিসাবে ব্যবহার করার মানে হইল বাঙালির কাছে এইটা আসলে আনন্দ উৎসবের সময়। আবার মাঘ মাস তত আনন্দের না, তখন শীত কনকনা হইয়া যায়, আমার আম্মা বলতেন, “মাঘের শীতে বাঘে কাঁপে।”

২০১১ সালের ১লা জানুয়ারি প্রকৃতি নতুন কুঁড়ি নার্সারি স্কুলে প্রথম দিন ক্লাসে যায়। তারে প্যাকেট কইরা নিয়া যাইতে হইছিল।—লেখক

ছোটবেলায় আমি শীতের ভয়ে ভীত ছিলাম না। শহরের পাশ দিয়া যাওয়া ব্রহ্মপুত্রে তখন শীতকালেও পানি থাকত আর নদীর পাড়ের কালিবাড়ি প্রি ক্যাডেট ইশকুলে যাইবার সময় আমরা একটা মাত্র লাল সোয়েটার আর জুতা মোজা পইরা যাইতাম। ইদানীং বাচ্চাদেরে কানটুপি, মাফলার, হাত মোজা ইত্যাদি পিন্দায়া ইশকুলে নিতে হয়। আমি আমার মেয়েরে প্রথম ইস্কুলে নেওনের দিন দুইটা সোয়েটার পিন্দায়া নিছিলাম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শীত গরম দুইটাই চরম হইয়া গেছে। কিংবা ব্রহ্মপুত্র শুকাইয়া যাওনের আফটার এফেক্টও হইতে পারে।

বয়স বাড়লে নাকি মানুষের রক্ত ঠাণ্ডা হইয়া যায়, তখন তাদের এমনেই শীত বেশি অনুভূত হয়। আম্মা বেশি শীত পড়লে বলতেন “বুইড়া মারা শীত”—মানে যে শীতে বৃদ্ধ লোকজন মারা পড়বেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন ভর্তি হইছি তখন আমি বুড়া তো না-ই, বরং খুবই জোয়ান। টিনএজের পোলাপানেরেও বাচ্চা ভাবা হয় এখন, যে বয়সে আমাদের মায়েদের জেনারেশনের মেয়েরা বিয়া হইয়া এক দুইটা বাচ্চা পয়দা কইরা ফেলতেন সেই বয়সে আজকালের মেয়েরা টেডি বিয়ার দিয়া সাজাইন্যা ঘরে বইসা পাউটিং কইরা সেলফি তোলে আর ক্যাপশন দেয় “মিসিং মাই মম।” জাহাঙ্গীরনগরে পড়তে শুরু করছি সময় আমার টিনেজও পার হইয়া গেছে, কাজেই কোনো হিসাবেই আমি তখন শিশু না।

তবুও প্রথমবার যখন বড় একটা ছুটির পরে (কিসের ছুটি ছিল মনে নাই, ঈদের হইতে পারে) ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে জাহানারা ইমাম হলে ফেরত গেলাম আমি আক্ষরিক অর্থেই চক্ষে অন্ধকার দেখতে থাকলাম।

শীতে পুরাই কাবু হইয়া গেলাম। পানি গরম করার কোনো বড় পাতিল আমার ছিল না। ঠিক দুপুরে রইদ যখন কড়কড়া হয় তখন গোসল কইরা নিব সেই উপায়ও নাই, তখন অধিকাংশ সময় আমি হলের বাইরে থাকি, আর হলে থাকলেও গোসলখানায় সিরিয়াল দিতে আমার ভাল লাগত না।

আমার জুতা ছিল না, স্যান্ডেল পিন্দা মোজা পরার প্রচলন মফস্বল শহরে আছে, চাচিদের অনেকরে দেখছি পরেন। ক্যাম্পাসে তখন সেইটা ক্ষ্যাত লাগলেও হয়ত পরতাম, কিন্তু আমার মোজাও ছিল না।

ক্যাম্পাসে আমার শেষ শীত ২০১০ এর জানুয়ারিতে… কনভোকেশনের গাউন ফিরত দিতে যাইতেছি সময় শিউলি আপা বলল “মৌ আসো তোমার সঙ্গে ছবি তুলি।”—লেখক

জাহাঙ্গীরনগরের প্রথম শীতে বেশ কয়েকদিন গোসল করতে না পাইরা আমার সর্দি লাইগা গেল। জীবনে সবচে বেশিদিন গোসল না কইরা ছিলাম ২০০২ সালের শীতে, সেইটা শীতের ভয়ে না—পা কাইটা গেছিল, স্টিচটাও শুকাইতেছিল না, হাঁটাচলা যেমন ঝামেলার, তারচে বেশি ঝামেলার ছিল স্টিচের উপরে পলিথিন পেঁচাইয়া তারে পানি থাইকা বাঁচাইয়া গোসল করা।

কিন্তু জাহাঙ্গীরনগরের শীতের দৌলতে আমার সেই রেকর্ড ভাইঙ্গা গেল। আমি প্রায় সাতদিন গোসল না করতে পাইরা সর্দি লাগাইয়া ফেললাম। অবশেষে বাসায় আইসা দুই পাতিল গরম পানি চল্লিশ লিটারের বালতিতে নিয়া গোসল কইরা সর্দিমুক্ত হইলাম। তখন আমি প্রায়ই মমেনসিং চইলা আসতাম। দুই তিন দিনের ছুটি পাইলেই আসতাম, কারণ হিসাব কইরা দেখছিলাম যে তিনদিন ক্যাম্পাসে থাকলে খাওয়ার যে খরচ তারচেয়ে কম খরচে মমেনসিং ঘুইরা আসা যায়।

২০০৪ সালের ১২ই জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে ট্রান্সপোর্টে তোলা ছবি। তুলেছিলেন বন্ধু পল জেমস গোমেজ।—লেখক


এই রকম একদিন মমেনসিং থাইকা রওনা দিছি দুপুরে। যাইতে যাইতে সন্ধ্যা হইয়া গেছে। নামছি প্রান্তিক গেইটে, সেইখান থাইকা হলে। পরদিন ক্লাস শেষ কইরা নতুন কলাভবন থাইকা ট্রান্সপোর্টের দিকে যাইতে যাইতে দেখি রেজিস্ট্রার অফিসের সামনের ঝিলটা একেবারে শুকাইয়া গেছে। হাঁটতে হাঁটতে ট্রান্সপোর্টের দিকে যাইতে যাইতে আমি ভাবলাম, এই ঝিলগুলা অগভীর সেইটা জানতাম, তাই বইলা এত অগভীর যে শীত আসলেই শুকাইয়া মাটি বাইর হইয়া যাবে? এইটা ভাবতে ভাবতে আরেকটু আগাইয়া দেখি, খোদা—মাটি কই? এ তো অতিথি পাখি। শত শত বক জাতীয় পাখি ঝিলের পানিতে বইসা আছে বা সাঁতরাইতেছে, অনেকে ডুব দিয়া মাছ বা পোকা টোকা খাইতেছে।

আমি খানিকক্ষণ মুগ্ধ হইয়া চাইয়া থাকলাম। সম্ভবত আমারে আরো মুগ্ধ করার জন্যেই প্রকৃতি একটা খেলা দেখাইলো… পোস্ট অফিসের সামনের ব্রিজে যখন উঠছি (সেইটারে লন্ডন ব্রিজ বলত, নাকি ট্রান্সপোর্ট ব্রিজ বলত মনে নাই) আমার মাথার উপর দিয়া এক ঝাঁক অতিথি পাখি সশব্দে উইড়া চইলা গেল।

পাখির ডাককে অনেক সুন্দর শব্দে প্রকাশ করা হয়, কুজন, কলকাকলি… এমন অনেক কিছু। কিন্তু আমার কাছে তাদের সেই উইড়া যাওয়ার আওয়াজরে কোলাহল মনে হইছে। আওয়াজটা সুন্দর সন্দেহ নাই, কিন্তু সেইটা আনন্দময় হইলেও অত সঙ্গীতময় না।

ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে আমি আমার বোন মুমুর ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে পিকনিকে গেছিলাম, উনারা খাতির কইরা আমার চান্দা নেন নাই । আমাদের দুইপাশে ফরিদ (বামে) আর মামুন।—লেখক

সবসময় শুনছি লোকে নাকি অতিথি পাখি দেখতে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে যায়। আমি নিজে কোনো দিন যাই নাই। ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাইতেই এত ঝামেলা পোহাইতে হইছিল যে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসকে আমার কাছে অতি দূরের একটা এক্সোটিক জায়গা বইলা মনে হইছে। সেই দিন কুয়াশাঢাকা সকালে (সকাল ঠিক না, বেলা বারোটার বেশি হবে, দুপুরই প্রায়) ক্যাম্পাসে সেই পাখিদের জয়ধ্বনি ধরনের শব্দ করতে করতে উইড়া যাওয়া দেখাটা আমার জীবনের অল্প কয়টা আনন্দময় মুহূর্তের মধ্যে একটা হিসাবে খুব স্মরণীয় হইয়া আছে।

শীতের সকালে ক্যাম্পাসে খুব চমৎকার খেজুর রস খাইছি, সেই স্বাদের খেজুর রস আমি আর কোথাও খাই নাই। শীতের ভয়ে জাহানারা ইমাম হলের জানলাগুলাতে চাদর বা কাঁথা ঝুলাইয়া রাখতে হইত। তবু শির শির কইরা কোন দিক দিয়া জানি ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকত। রুমে হিটার চালানের অনুমতি ছিল না, তবু কেউ কেউ লুকাইয়া হিটার জ্বালাইত, ইলেকট্রিশিয়ান মামাকে কিছু টাকা দিয়া। একেক সময় পায়ে মোজা আর মাথায় মাফলার পেঁচাইয়াও ঘুমাইতে হইছে। 

সার্কিট হাউজের মাঠে এমন অপসৃয়মান রইদেগরে দেখতে পাওয়া যায়, তবে এরা ক্যাম্পাসের রইদেগর মতন না… ছবির প্রকৃতি চার বছর বয়সী ২০১১ তে।—লেখক

তবুও সেই শীতের কেমন জানি একটা অদ্ভূত সৌন্দর্যও ছিল। ভারি কুয়াশায় ছাইয়া থাকা মাঠ, ফজিলাতুন্নেসা হলের সামনের চিতই পিঠার চুলা লইয়া বসা খালা, বরফশীতল পানি বের হওয়া কল, (খানিকক্ষণ ছাইড়া রাখলে আবার কম ঠাণ্ডা পানি আসত) সকালে বিকালে মাথার উপর দিয়া সুদূর দেশ থাইকা উইড়া আসা পক্ষীকুলের উড়াউড়ি… সবই আশ্চর্য সুন্দর।

বিকাল পইড়া আসতে থাকলে, মানে দুপুর দুইটার পরের রইদটা হইল সবচাইতে সুন্দর। সেইটার মধ্যে একটা বিষাদ মিশ্যা থাকতো।    

জাহাঙ্গীরনগর ভাবলেই আমার সেই রইদগুলির কথা মনে পড়ে। যেই রইদগুলি চৌরঙ্গী আর পুরানা কলাভবনের পিছন দিয়া পিছলাইয়া কই জানি চইলা যাইত… যেই রইদগুলি দিনের শেষবার কোলাহল করতে থাকা নাইয়রি পক্ষীগর পাখা ছুঁইয়া হারাইয়া যাইত… যেই রইদগুলি লম্বা একটা রাইতের হাতে আমগর মতন সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত মানবমানবীদেরে তুইল্যা দিয়া নিজে কই জানি ডুব মারত… লেপমুড়ি দিয়া ঘুমাইতে যাইত মনে হয়।

জাহানারা ইমাম হলের একটা ব্লকের সিঁড়িঘর থাইকা তোলা ছবি। বেশি কুয়াশা পড়লে এক ব্লকের এক দিকের বারিন্দা থাইকা অন্য দিক দেখা যাইত না। ছবি. শুকুফে ইসলামের ফেইসবুক থাইকা নেওয়া।—লেখক

জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে এখন নাকি হিম উৎসব হয়। ফেইসবুকে সেই হিম উৎসবের ছবি দেইখ্যা ক্যাম্পাসের শীতের কথা মনে পড়ল। আমি রাজশাহী যাই নাই, লালমনিরহাট গেছি বর্ষাকালে… তীব্র শীত কারে বলে আমি জানি না। অনেকেই বলেন জাহাঙ্গীরনগরের শীত কোনো শীতই না… যাইতা অমক জাগায়, কিংবা তমক জাগায়, বুঝতা শীত কারে বলে। যারা বিলাত বা আম্রিকা থাইকা ঘুইরা আসছেন তারা আরেক কাঠি সরেস। শীতের ব্যাপারে তারা সর্বজ্ঞ। আমার জানার পরিধি ছোট, ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা কম, তাই তাদের কথা শুইন্যা আমি চুপ হইয়া যাই। 

খালি বটতলা থাইকা আসবার সময় আল বেরুনি হলের জানলায় জ্বলতে থাকা বাতিগুলার কথা মনে কইরা, ঝিলের উপরে জলকেলি করতে থাকা বকদের কথা ভাইবা আর দুপুরের ঠিক পরেই দৌড়াইয়া পলাইয়া যাইতে থাকা রইদের চেহারা মানসচক্ষে দেইখ্যা আমি জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসের শীতযাপনের স্মৃতি উদযাপন করি।

সেই রইদগুলার জন্যে আমার মন খারাপ হয়। শহরে কোথাও সেই রইদগুলার মতন রইদেরা আসে না…।        

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।