টেকনিক্যালি রাঘব বোয়াল এবং কুমির প্রজাতির অ্যালিগেটর ও ক্রোকোডাইলরা মরে না। জৈবিক বয়স বৃদ্ধির বদলে তাদের কেবল শারীরিক বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। তবু, পৃথিবীভর ক্রোকোডাইলরা কেন মারা যাচ্ছে?

সিনেসিন্স বা বার্ধক্য

বাস্তবে আমরা তাদের মরতে দেখি। তার মানে, এই কথাও বলা যায় যে চিরকাল বেঁচে থাকার ক্ষমতাও তাদের আছে। তা বুঝতে আমাদেরকে প্রথমে পরিচিত হতে হবে সিনেসিন্স টার্মটার সঙ্গে।

সিনেসিন্স টার্ম ব্যবহৃত হয় বয়সের সাথে শরীরের ধারাবাহিক ক্ষয় হতে থাকাকে বোঝাতে। সহজভাবে বললে, আপনি এটাকে ‘বয়স হওয়া’ বলতে পারেন। বিশেষত, পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া, সক্রিয়তা হ্রাস পাওয়া, সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া এবং বয়সসংক্রান্ত অসুস্থতা পশুদের সিনেসিন্সের লক্ষণ। বেশিরভাগ প্রাণির মধ্যেই সিনেসিন্স দেখা যায়। তাই, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুর্বল হতে থাকা লাইফ প্যারামিটারগুলি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়—মানুষ সিনেসিন্স দেখায়, ক্রোকোডাইলরা দেখায় না।

নেগলিজিবল সিনেসিন্স বা যৎসামান্য বার্ধক্য

কিন্তু পৃথিবীতে আমাদের সঙ্গে বাস করা অল্প কিছু প্রাণি আছে যাদের মধ্যে নামে মাত্র বার্ধক্য দেখা যায়। অর্থাৎ, বার্ধক্যের কোনো লক্ষণই তারা প্রায় দেখায় না। বা বলা যায়, তারা ‘জৈবিকভাবে চিরজীবী’। এই ধরনের প্রাণিরা একমাত্র মারা যায় রোগ, দুর্ঘটনা বা শিকারির কবলে পড়ে।

এই ধরনের প্রাণিদের মধ্যে আছে সি আর্চিন, লবস্টার (গলদা চিংড়ী), ক্ল্যাম (ঝিনুক) এবং হাইড্রা। টর্টয়েজ, টার্টেল, ক্রোকোডাইল, অ্যালিগেটর, রাফায় রক ফিশ এবং রাঘব বোয়ালের মত মেরুদণ্ডী প্রাণির মধ্যেও শারীরিক বয়োবৃদ্ধির কোনো লক্ষণ না দেখানোর বিষয়টি দেখা গেছে। যেই কারণে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কলকাতা চিড়িয়াখানায় ২৫৫ বছর বয়সী একটা টর্টয়েজ ছিল।

গাছের মধ্যে আলাদাভাবে এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ সম্ভবত মেথিউসেলাহ ট্রি। যেটা ৪৮০০ বছর যাবৎ বেঁচে আছে। আমাদের হাত থেকে রক্ষা করতে এর সঠিক অবস্থান গোপন আছে। অন্যদিকে, আরেকটি গাছ প্রায় ৮০ হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে। এটা সবচেয়ে ভারি জীব হিসেবেও পরিচিত।

সাইড নোট: টার্ডিগ্রেডরা অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থায়ও বেঁচে থাকে ‘ক্রিপ্টোবায়োসিস’ নামে এক ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা মরে গিয়েও একেবারে বেঁচে ফিরতে পারে।

বয়স বলে ক্রোকোডাইলদের কিছু নেই

দ্রুততা এবং অন্যান্য লাইফ প্যারামিটার বিবেচনায় একটা ৭ বছরের ক্রোকোডাইল একটা ৭০ বছর বয়সী ক্রোকোডাইলৈর সমান। বয়সের কোনো ধরনের প্রভাব তাদের উপর নেই। যদিও স্বাভাবিক বয়োবৃদ্ধিতে তারা মরে না কিন্তু আবার চিরকাল বেঁচেও থাকতে পারে না। তাদেরকে মারার অন্য পদ্ধতি আছে প্রকৃতির। তারা মরে অনাহারে বা রোগাক্রান্ত হয়ে।

বেঁচে থাকার পুরো সময়টা তারা বড় হতে থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে তাদের খাদ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। যত বয়স হয় তত বাড়ে, তত বেশি খাবারের প্রয়োজন হয় তাদের। যখন ওই পরিমাণ খাবার আর পাওয়া যায় না, তারা তখন খাদ্যের অভাবে মারা যায়। ঠিক এই কারণেই কোনো ১০০০ বছর বয়সী ৫০ ফুট লম্বা ক্রোকোডাইল আমরা দেখি না। তবে, ১৯৫৭ সালে অস্ট্রেলিয়ায় একজন শিকারি ৮.১ মিটার বা ২৮ ফুট লম্বা একটা ক্রোকোডাইল ধরেছিলেন।

মানুষের শারীরিকভাবে চিরজীবী হওয়া যদিও অনেক বিতর্কিত আলাপ, বিজ্ঞানীরা তবু বসে নেই। নামেমাত্র সিনেসিন্স প্রদর্শন করে এমন প্রাণিদের নিয়ে গবেষণায় করতে তারা খুবই আগ্রহী, কারণ বিজ্ঞানীরা চান প্রাণিদের জিনের গঠন নকল করে মানুষের জন্যেও এমন কোনো বয়স থামিয়ে দেয়ার উপায় খুঁজে বের করতে। হয়ত অদূর ভবিষ্যতেই আমরা প্ল্যানারিয়াম ফ্ল্যাটওয়ার্মের মতো মানুষের মধ্যেও মাত্রাহীন টেলোমিয়ার পুনরোৎপাদনের ক্ষমতা দেখানোর উপায় খুঁজে পাব।

Recommended Posts

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *