page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ক্ষুধা

মানুষের যত অনুভূতি আছে, তারমধ্যে খুব সম্ভব সবচে’ পাওয়ারফুল অনুভূতি হচ্ছে ক্ষুধা।

ক্ষুধার জন্য বরফে আটকা পরা মানুষ অন্য মরা মানুষের গোশত কেটে কাঁচা খেয়ে বেঁচেছে—এমন ঘটনাও ঘটেছে।

ক্ষুধাই খুব সম্ভব একমাত্র অনুভূতি যেটা একটা মানুষকে খুব সহজে অমানুষে ট্রান্সফার করতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে জীবনে মোট তিনবার ক্ষুধা’র কষ্ট কী জিনিস হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

প্রথমবার যখন প্রথম বিদেশ গিয়েছি।

farjana mahbuba logo

বাবা-মা থেকে শুরু করে সমাজ-আত্মীয়স্বজন বলতে গেলে মোটামুটি পুরা পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করে বিদেশ যাওয়া। একটা অবিবাহিত মেয়ে বিদেশে একলা একলা পড়তে যাবে—যে সার্কেলে বড় হয়েছি, সে সার্কেলের মানুষদের জন্য মেনে নেয়াটা অত সহজ ছিল না।

যত রকমের লজিক খাটানো যায় সব লজিকে না পেরে শেষে ফতোয়া পর্যন্ত ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিলো। মুহরিম ছাড়া একটা মেয়ে একলা একলা বিদেশে পড়তে যাওয়া তো দূরের কথা, একলা একলা বিদেশে যাওয়াই তো হারাম!

যেভাবেই হোক যুদ্ধে জিতেছিলাম।

কিন্তু বাস্তবতা কাকে বলে তা প্রথম মাসেই টের পেয়েছিলাম হাড়ে হাড়ে।

আব্বু যে হাতখরচ দিয়ে গিয়েছিল তা দিয়ে বিছানার চাদর, কম্বল, পড়ালেখার এসেনশিয়াল জিনিসপত্র কিনে মাসের শেষে দেখি হাতে আছে মাত্র বাংলাদেশী টাকায় পঞ্চাশ টাকার মত।

ভেবেছিলাম, সময় মত তো স্কলারশিপ পাবোই।

মাঝখানে দু’দিন মাত্র।

পঞ্চাশ টাকায় দু’দিনে স্ন্যাক্স টাইপ কিছু কিনে খেয়ে চালিয়ে দেয়া যাবে।

ধরা খেলাম যখন স্কলারশিপ পাওয়ার দিন স্কলারশিপ পেলাম না! জানানো হলো, স্কলারশিপ আসতে আরো তিনদিন লাগবে।

তখনো একদম নতুন বলে এমন কাউকে চিনি না যাকে বলতে পারবো আমার কাছে খাবার কিনে খাওয়ার টাকা নেই!

পরের দিন রাতের কথা স্পষ্ট মনে আছে।

পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। সারাদিন শুধু পানি খেয়েছি।

আমার রুমটা ছিলো কিউবিকল। ছোট্ট একটা রুম। তার সাথে ছোট্ট একটা বারান্দা।

বারান্দা থেকে ক্যাম্পাসের পিছনের দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ।

রাতের খোলা মাঠ আর খোলা আকাশের নিচে ক্ষুধার্ত আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম।

যে যুদ্ধ করে এসেছি, তাতে দেশে ফোন করে বলাও যায় না, স্কলারশিপ দিতে দেরি হচ্ছে। কিছু টাকা পাঠাও।

আগে আমার ধারণা ছিলো, অন্যান্য অনুভূতির মত ক্ষুধাও হয়তো তীব্র হতে হতে একসময় ভোঁতা হয়ে যায়।

ধারণাটা ভুল ছিলো।

ক্ষুধা তীব্র হতে হতে একসময় উলটা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বরং ভোঁতা হয়ে যায়।
পুরো পৃথিবী জুড়ে তখন খালি একটাই জিনিস বাকি থাকে—ক্ষুধা!

মধ্যরাতে দেখি আর পারি না।

হঠাৎ মনে হলো, আরে, ফ্লোরের কিচেনে গিয়ে চেক করে দেখি না কেন! অনেক সময় তো অনেক মেয়ে খাবার অর্ধেক খেয়ে কিচেনে ফেলে রেখে যায় পরদিন ক্লিনাররা এসে পরিষ্কার করবে বলে!

কিচেনে গিয়ে দেখি ধারণা ঠিকই আছে, বেসিনের পাশে একটা প্লেটে কেউ অর্ধেক প্লেট ফ্রাইড রাইস টাইপ খাবার ফেলে রেখে গেছে।

বিনা দ্বিধায় সে প্লেট টেনে নিয়ে খাওয়া শুরু করেছিলাম। কার ঝুটা, কতক্ষণ খাবারটা এমনভাবে এখানে পড়েছিল, কিচ্ছু ভাবি নি।

মাথার ভিতর খালি একটাই শব্দ তখন—ক্ষুধা!

কিন্তু তিন কী চার লোকমা খাওয়ার পর হঠাৎ বুক ভেঙে এমন কান্না এসেছিল, কাঁদতে কাঁদতে খাবার নাকে উঠে গিয়েছিল।

কখনো ভুলেও তো ভাবি নি জীবনে কখনো এভাবে মানুষের ফেলে যাওয়া ঝুটা খাবো বুভুক্ষের মত! .

চট্রগ্রামে চকবাজার ক্যাম্পাসে ক্লাসে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই দেখতাম গলির সামনের ডাস্টবিনটাতে টোকাইরা খাবার খুঁজছে।

ঐ মুহূর্তে নিজের সাথে ঐ টোকাইদের তেমন বেশি পার্থক্য খুঁজে পাই নি।

জীবনে কত টুইস্ট অ্যান্ড টার্ন, এখন আমি নিজের গাড়ি চালাই। নিজে কামাই করি। যখন যা খেতে ইচ্ছে করে কিনে খাওয়ার সামর্থ্য আল্লাহ দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

কিন্তু ভুলেও ভাবি নি, এর মধ্যেও আবার খাওয়ার কষ্ট পাবো!

মেয়েটা পেটে এলো।

প্রেগন্যান্সি এমন অদ্ভুত, একেক মেয়ের শরীরে এ একেক রকম রিঅ্যাক্ট করে।

আমার শরীরে তার রিঅ্যাকশান হলো অনবরতঃ চব্বিশ ঘণ্টা প্রতিটা মুহূর্ত নাকের ভিতর থেকে কফ মুখের দিকে যেতে থাকা। প্রতিটা মিনিটে তাই আমাকে হয় নাক দিয়ে অথবা মুখ দিয়ে কফ ফেলতে হয়।

যাই খাই না কেন, মুখের ভিতরের কফের সাথে মিশে যখন খাবারটা পিছলা হয়ে যায়, চ-র-ম বিশ্রী অনুভূতিতে শরীর গুলিয়ে উঠে সাথে সাথে বমি চলে আসে।

প্রথম সন্তান হবে, সবাই জিজ্ঞেস করতো—‘কী খেতে মন চায়?’

যতবার প্রশ্নটা শুনতাম, খালি মনে হতো, শুধু যদি এক প্লেট ভাত আর এক গ্লাস পানি পেট ভরে খেতে পারতাম!

পুরো নয়টা মাস, হ্যাঁ, পুরো নয়টা মাস শুধু অপেক্ষা করেছি কখন আবার এক প্লেট ভাত আর এক গ্লাস পানি খেতে পারবো!

একদিন আর না পারতে হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করে কাঁদতে বসেছি। জামাই ভয় পেয়ে দৌঁড়ে এসে জিজ্ঞেস করেছে, ‘কী হয়েছে?’ কাঁদতে কাঁদতে বলেছি, ‘আমি আর কিছু চাই না, এক প্লেট ভাত আর এক গ্লাস পানি খেতে চাই!’

সবাই বলে, দ্বিতীয় বাচ্চার সময় প্রথমটার মত অত কষ্ট হয় না।

সবাই যে কত ভুল বলে তা আবার নতুন করে টের পাচ্ছি এখন, একদম হাড়ে হাড়ে।

যখন—রেয়ারলি—কফ একটু কম থাকে, এটা সেটা খাই। কিন্তু এক গ্লাস পানি খাবো আর এক প্লেট ভাত? হাহ!

প্রায়ই ভাবি, আল্লাহ’র কাছে না হয় নয়মাস সময় কিছুই না। কিন্তু আমরা তো মানুষ। আমি তো মানুষ। আল্লাহ নিশ্চয়ই বোঝেন আমার কাছে নয়মাস মানে আমার এভারেজ জীবনের টোটাল সময়ের বি-শা-ল একটা অংশ!

এভাবে ন-য়-মা-স খেতে না দেয়ার মত কষ্ট সহ্য করা আমার মত মানুষের পক্ষে কীভাবে সম্ভব!?

আল্লাহ তো ইচ্ছা করলেই পারতেন নয় মাসের মধ্যে প্রতি মাসে না হোক, অন্ততঃ দুই মাস পর পর দুই/তিন দিনের জন্য ছুটি দিতে!

আচ্ছা তিন দিন না হোক, দুই দিন তো ছুটি দিতে পারতেন।

ঐ দুইদিন আমি আর কিছুই করতাম না, খালি পানি আর ভাত খেতাম!

আব্বুম্মুর বয়স হয়েছে। আগে আবেগের প্রকাশ করতেন না। এখন না চাইলেও উনাদের আবেগ ধরা পড়ে যায়। ফোনে আম্মু জিজ্ঞেস করে, খেতে পারতেছিস?
প্রশ্নটার ভিতর দিয়ে আমি আম্মুর উদ্বেগ স্পষ্ট টের পাই।

আব্বু জিজ্ঞেস করে, বুড়ি, খাইছো?

টের পাই, আব্বু আসলে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছেন, বুড়ি, বেশি কষ্ট হচ্ছে?

কখনো কখনো চোখের পানি, নাকের পানি এক হয়ে যায়। আল্লাহ মানুষকে এই ক্ষুধার কষ্ট না দিলেও তো পারতেন!

যে মানুষ নিজে এই কষ্টের ভিতর দিয়ে যায় নি, তার পক্ষে কখনোই বোঝা সম্ভব না ক্ষুধার কষ্ট, খেতে না পারার কষ্ট কেমন!

ইউনিভার্সিটি এত দূরে, রাস্তায় ট্রাফিক থাকলে তো কথাই নাই, দেড় ঘণ্টা লেগে যায়।
তাই গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে রেডিও শুনি।

কয়েকদিন আগে খবরে স্রেফ এক লাইনের একটা খবর শুনলাম: “Thousands of Rohingya people are stranded at sea. Malaysia, Thailand and Indonesia all denied their landing”.

স্রেফ এক লাইনের এই এতটুকুই খবর।

এত হাজার হাজার মানুষের জীবন-মরন ক্রাইসিস নিয়ে মাত্র এক লাইনের খবর!

মাইন্ড করি নি।

দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে, বুঝতে বুঝতে পৃথিবীর কয়েকটা বিষয়ে আমি এখন আর মাইন্ড করি না।

khudha 1

থাই আর্মি হেলিকপ্টার থেকে ছুঁড়ে ফেলা খাবার পানি থেকে তুলে আনছেন নৌকার যাত্রীরা

এর মধ্যে একটা হলো—ওয়েস্টার্ন সমাজ তাদের নিজেদের বাউন্ডারির ভিতরে শুধু মানবাধিকার না, কুকুর-বিড়ালের অধিকার নিয়ে পর্যন্ত একটু পান থেকে চুন খসলেই তুলকালাম কাণ্ড লাগিয়ে দেয়। কিন্তু ঠিক এই বাউন্ডারিটা পার হলেই, তারা মানবাধিকারের ‘ম’-ও মনে রাখে না।

জাস্ট কয়েক সপ্তাহ আগে কুকুরের রেইসে কুকুরদেরকে লাইফ বেটিং (জীবন্ত খরগোশ) দিয়ে দৌড়ের ট্রেনিং দেয়া হয় এটা গোপন ক্যামেরায় ধরা পরার পর অস্ট্রেলিয়ার মোটামুটি প্রতিটা চ্যানেল সারাক্ষণ এর উপর আপডেট আর ফলোআপ করতে করতে শেষে এই কুকুর-রেইসের যে মেইন প্রতিষ্ঠান তার বাঘা বাঘা কয়েকজনকে শুধু সাসপেন্ড করিয়েই ছাড়ে নি, অনেকের লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল করিয়ে ছেড়েছে!

সেখানে, হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রে পরিত্যক্ত অবস্থায় ভাসছে, কোনো দেশ তাদেরকে অ্যাকসেপ্ট করছে না, তাদের না আছে খাবার, না আছে পানি, না আছে কিছু!

সমস্যা নেই।

এটা ওদের কপাল যে ওরা অস্ট্রেলিয়ায় কুকুর হয়েও জন্মাতে পারে নি!

এই বোটে যদি আজকে বাংলাদেশী আর রোহিঙ্গা রিফিউজি না থেকে হাজার হাজার না, স্রেফ শ’ খানেক অস্ট্রেলিয়ান কুকুরও থাকতো, ট্রাস্ট মি, অস্ট্রেলিয়া পুরা দুনিয়াকে খবর করে ফেলতো।
তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যেত দুনিয়ায় কুকুরের মানবাধিকার, থুক্কু, কুকুরাধিকার নিয়ে!

যা হোক, আগেই বলেছি। মাইন্ড করি নি।

কিন্তু মাইন্ড না করলেও, মেজাজ ঠিক রাখা খুব কষ্টের হয়ে দাঁড়ালো যখন গতকাল শুনলাম ঐ এক লাইনের খবর এখন তিন মিনিটের খবর হয়ে গেছে!

পুরো খবর জুড়ে একটাই কাহিনী—কীভাবে ঐ পরিত্যক্ত বোটের ভিতরে এই শ’ শ’ মানুষ খাবারের অভাবে একজন আরেকজনকে মারছে!

খুব বিস্তারিতভাবে বলা হলো, কীভাবে খাবারের সংকটের কারণে বোটের অনেকে মিলে একটা পরিবারের মা-ছেলে আর বাপকে প্রথমে ছুরি দিয়ে মেরে তারপর মারতে মারতে একদম মেরে ফেলে পানিতে ফেলে দিয়েছে।

আরো বিস্তারিতভাবে বলা হলো, প্রায় শ’খানে রিফিউজিকে অন্য রিফিউজিরা হয় ছুরি মেরে অথবা ফাঁস লাগিয়ে অথবা পানিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলেছে। এবং এসব ঘটনা এখনো চলছে।

আমরা যতই চেষ্টা করি না কেনো ইস্ট আর ওয়েস্টের মাঝখানের কমন-মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিংগুলো দূর করতে—যেন গ্লোবাল কম্যুনিটি হিসেবে পৃথিবী শান্তিতে থাকতে পারে—তা আসলে কখনোই সম্ভব না যতদিন পর্যন্ত ওয়েস্ট তাদের এমন চরম মাত্রার হিপোক্র্যাসি থেকে সরে না আসবে।

হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রে কয়েকটা বোটে ঘিঞ্জাঘিঞ্জি করে মরতে বসেছে, দিনের পর দিন তারা এভাবে ভেসে আছে পানিতে, তা স্রেফ এক লাইনের খবর হয়।

khudha 2

নৌকায় ওঠার ওঠার আগেই কুড়িয়ে পাওয়া খাবার খেয়ে ফেলছেন ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গা।

কিন্তু খাবারের অভাবে যখন তারা একজন আরেকজনকে মারছে, কাটছে, তা বার বার প্রচার করা হয়, বিস্তারিতভাবে, দৃষ্টিভঙ্গি এখানে একটাই—ইস্টের মানুষেরা শুধু বর্বরই না, এরা আদিম প্রজাতির!

এরা অসভ্য!

দেখো এরা কীভাবে একজন আরেকজনকে খুন করছে!

মিডল ইস্টে একটা দেয়াল থেকে একট ইট খসে পড়তে পারে না, চোখের পলকে দেখি শা-ই-ই করে এমেরিকার সৈন্য চলে আসে।

জাতিসংঘ চলে আসে।

ড্রোন চলে আসে।

পুরা দুনিয়া চলে আসে।

বার্মায় হাজার হাজার রোহিঙ্গাদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলে, ম্যাশেটি দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলে, বছরের পর বছর ধরে এথনিক ক্লিনজিং চলছেই, পুরো পৃথিবীর কারো কোনো বিকার নেই।

আজকে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুরের মত রোহিঙ্গারা যদি খ্রীষ্টান হতো, আজকে মিডল ইস্টের মত রোহিঙ্গাদেরও যদি তেল থাকতো, তাহলেই দৃশ্যপট ভিন্ন হয়ে যেতো। তখন চায়না বা ইন্ডিয়ার জিওগ্রাফিক্যাল পলিটিক্যাল পাওয়ারকে থোড়াই কেয়ার করে এমেরিকা শুধু উড়েই আসতো না, একটা রোহিঙ্গার রক্তের বিনিময়ে দশটা বার্মিজের রক্ত ঝড়িয়ে ছাড়তো!

হিপোক্র্যাসির চূড়ান্ত।

দেখতে দেখতে সয়ে গেছে।

কিন্তু তারপরও, নিজের ক্ষুধার কষ্ট বার বার খালি ঐ বোটগুলোর বাংলাদেশী আর রোহিঙ্গাদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আলজাযিরা বলছে, মোট প্রায় আট হাজার বাংলাদেশী আর রোহিঙ্গা হবে সবগুলো বোট মিলে!

এত্তগুলো মানুষ!

বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল নিউজ চ্যানেল ঘুরে যা দেখি, আমার খালি Hunger Game মুভিটার কথা মনে হয়।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমরা সবাই আসলে লাইভ-মুভি দেখছি।

আমরা সবাই দর্শক।

দর্শকদের উত্তেজনা বাড়াতে হেলিকাপ্টারে করে বোটের আশেপাশে পানিতে অল্প অল্প খাবার ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে।

বোট থেকে কিছু কিছু বাংলাদেশী আর রোহিঙ্গা যারা সাঁতার জানে, তারা জানপ্রাণ বাজি রেখে যতটুকু পারে সে খাবার উদ্ধার করছে।

নিজে সেখানেই ক্ষুধার যন্ত্রণায় বক্স খুলে বা ছিঁড়ে ফেলে যা পাচ্ছে খেতে চেষ্টা করছে! তাই করতে গিয়ে খাবারগুলো ভেসে যাচ্ছে।

বোটের উপরের অন্যরা হিংস্র হয়ে অপেক্ষা করছে কখন ঐ মানুষটা উঠে আসবে বোটে তাকে অন্যরা পিটিয়ে মেরেই ফেলবে খাবার এভাবে নষ্ট করার জন্য। কেউ হয়তো খাবারের বক্সটা কোনো রকমে টেনে আনছে বোটে। অন্যরা হামলে পড়ছে তার আগেই। কাড়াকাড়ির মধ্যে লেগে যাচ্ছে মারামারি। মানুষের রক্ত মিশে যাচ্ছে খাবারের সাথে। সেকেন্ডের মধ্যে খাবার উধাও। পড়ে থাকছে রক্তাক্ত মৃত মানুষের শরীর।

দর্শকরা চরম উত্তেজিত।

লাইভ-মুভি এগিয়ে যাচ্ছে।

আমার ভাল লাগে না।

নিজের পেটের ক্ষুধার যন্ত্রণায় আমার কিছুই ভাল লাগে না।

গতকাল সন্ধ্যায়, বমি করতে করতে এক পর্যায়ে টায়ার্ড হয়ে যখন আর নড়াচড়া করতে পারছি না, মেয়েটা এতদিনে আমার বমিতে অভ্যস্থ হয়ে গেছে, কাছে এসে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো, আম্মু, বাবু বেশি কষ্ট দিচ্ছে তোমাকে।

বমির বা ক্ষুধার কষ্টে না, মেয়ে জড়িয়ে ধরে এত আপন করে জিজ্ঞেস করছে তার আনন্দে না, কোনো কারণ ছাড়াই রোহিঙ্গা মানুষগুলোর কথা ভেবে চোখে পানি চলে আসলো।

নিজের ক্ষুধায়, ঐ বোটগুলোর বাংলাদেশী আর রোহিঙ্গা মানুষগুলোর ক্ষুধায়, বার বার খালি মনে হয়, পৃথিবীতে মনে হয় ক্ষুধার কষ্টের চেয়ে বড় আর কোনো কষ্ট নাই!

About Author

ফারজানা মাহবুবা
ফারজানা মাহবুবা

শিক্ষিকা। প্রকাশিত বই: পলাতক জীবন; এক জোড়া চোখ; একটি যুদ্ধ চাই; যাযাবর নামা।