page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

গায়া

আমার সাথে বিড়ালদের খাতির ছোটবেলা থিকা।

আমার তখন চার বছর বয়স। একদিন ঝড়ের রাত্রে আমি আর মা লেপমুড়ি দিয়া ঘর অন্ধকার কইরা টুইন পিকস দেখতেছি আর একটু পর পর সোফার ভিতর লাফ দিয়া লাফ দিয়া উঠতেছি, এমন সময় শুনলাম বাসার দরজায় মৃদু টক টক আওয়াজ।

আমার পিতা তখন পাওয়ার প্ল্যান্টে নাইট শিফট করেন। বড় ভাই থাকেন বাংলাদেশে, নানুর বাসায়। আমাদের বাসার তিন মাইলের মধ্যে আর একটা মানুষও নাই। পড়শী বলতে যা বুঝায়, আমার জন্মশত্রু ক্লডিয়া এবং উনার আব্বা আম্মা এবং উনাদের বাদামী লোমওয়ালা ঘোড়া মার্কা কুকুরের বাসায় দ্রুতগতিতে হাঁইটা যাইতেও আধা ঘণ্টা সময় লাগে। বাসার আশেপাশে থাকার মধ্যে আছে ১০০ গজ দূরত্বে মানুষবিহীন ভূমধ্যসাগর।

তো আমি আর মাতাশ্রী একে অন্যরে জড়াইয়া জুড়াইয়া লেপ কাঁথা বালিশ সহ ভয়ে ভয়ে আল্লা খোদা সব ডাকতে ডাকতে দরজা খোলার পরে দেখা গেলো বাচ্চা সাইজের একজন বিড়াল দরজা ধাক্কাইতেছেন। বৃষ্টি থিকা বাঁচতেই সম্ভবতঃ। আমার আম্মাজানের ততক্ষণে সাহস ফেরৎ আসছে। গলার স্বর উঁচা কইরা উনি আমার দিকে তাকাইয়া হাসি হাসি গলায় কইলেন, ‘বাহ, স্মার্ট বিড়াল তো!’

আমার প্রথম বিড়াল সাহেবের কোনো নাম ছিলো না। উনি রান্নাঘরের খোলা জানলা দিয়া আসতেন। মাই মাদার উনারে এবং আমারে লাল শাক দিয়া ভাত মাখাইয়া দিতেন। আমরা দুইজনেই আগ্রহ নিয়া লাল লাল ভাত খাইতাম।

আমার তিরিশ বছরের জীবনে আমার বাসায় বিড়াল ছিলেন ঊনত্রিশ জন। আমি ক্যাট পারসন কিনা আমি জানি না, বিড়াল ছাড়াও কুকুর, বানর, পাখি, মাছ, কচ্ছপ, খরগোস থিকা শুরু কইরা সাপ, ব্যাং, ঝিঁঝি পোকা, বাচ্চা কুমীর, মাকড়শা, সজারু মোটামুটি সবই পালছি আমি, কিন্তু বিড়ালের মত অন্য কারো সাথে কখনোই তেমন খাতির হয় নাই।

উত্তরা ও শিশু সাপ, ২০০৪ – লেখক

লন্ডনে আমার প্রথম বিড়াল ছিলেন গায়া।

উনার পুরা নাম গায়া লিকোরিশ পিগম্যালিয়ন। গায়া নামটা আসছে প্রাচীন গ্রিক মিথোলজি থিকা, গায়া ছিলেন মাদার অফ অল, তিনিই টাইটান এবং জায়ান্টসহ পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের জন্ম দিছিলেন। আমি আর রঞ্জু তখন মাত্র বিয়া করছি। কী বিড়াল পালবো এই নিয়া প্রতিদিন তর্কাতর্কি করি আমরা। আমি বলি পারশিয়ান, রঞ্জু বলেন হিমালায়ান। আমি বলি সাদা রঙ, রঞ্জু বলেন বাদামী। আমি বলি ছেলে বিড়াল, রঞ্জু বলেন মেয়ে।

তো এরমধ্যে একদিন হঠাৎ আমার এক বন্ধু ডেবি একটা মোটকা ব্যাগ সমেত আমার কাজে আইসা উপস্থিত হইলেন। আমি দেখলাম, উনার মোটকা ব্যাগ একটু পরপরই মোচড় দিয়া নইড়া উঠতেছে এবং একসময় তার ভিতর থিকা দুইটা বড় বড় সবুজ জ্বল জ্বল চোখসহ দুইটা তিনকোনা কান সাবধানে বাইর হইয়া আসতেছে।

ডেবি বললেন, উনার বয়ফ্রেন্ডের মায়ের কাউন্সিল ফ্ল্যাটে এক বিড়ালের কতগুলি বাচ্চা হইছিলো মাস তিনেক আগে। বয়ফ্রেন্ডের আম্মা নাকি বাচ্চাগুলি মাইরা ফেলতে কেতলিতে পানি ফুটায়ে গরম পানি ঢালছেন তাদের গায়ে। দুইটা বাচ্চা এইসব অত্যাচারে মারা গেছেন, বাকি দুইজনরে বয়ফ্রেন্ড কোনোমতে পাচার কইরা নিয়া আসছেন। একজনরে ডেবি ও বয়ফ্রেন্ড রাখবেন বইলা ঠিক করছেন। দুইটা উনারা পালতে পারবেন না। বিড়াল পালা খুব একটা কম খরচ না এই দেশে। খাবার দাবার, খেলনা, বিছানা বালিশ ছাড়াও ওষুধ, ক্যাট লিটার, ইনশুরেন্স, মাইক্রোচিপ, স্পেয়িং ইত্যাদিতে একেকজন বিড়ালের পিছে মাসে অন্ততঃ কয়েকশ’ পাউন্ড যায়। তাই উনি আরেকটা নিয়া আসছেন আমার জন্য। যদি আমি নেই।

আমি অবশ্য আর আগাপাশতলা কিছুই জিগাই নাই। আমার ম্যানেজাররে বললাম, ইদার আমারে এইখানে বিড়াল রাখার জায়গা দাও, অথবা আমারে এক ঘণ্টার জন্য বাসায় যাইতে দাও। ম্যানেজার আমারে কইলেন, তুমি বরং সারাদিনই ছুটি নাও, নাদিয়া! বাচ্চা বিড়াল, অনেক কিছু কিনতে তো হবে তোমার!

আমাদের প্রথম বাসা ছিলো ১৮ শতকের একটা প্রাচীন ভিক্টোরিয়ান বাড়ি। ঘরের ভিতরে পুরানা কাঠের আর্চ, পাথরের ফায়ারপ্লেস আর ১৫ ফিট উঁচা বিশাল বিশাল সব জানালা। গায়া তখন টিংটিঙ্গা শুকনা। উনি বাসায় ঢুইকাই এক লাফে পর্দা বাইয়া জানলার উপর গিয়া উঠলেন, উনারে নামাবে সাধ্য কার! আমার কাছে তখন মইও নাই!

সেই থিকা উনি আছেন আমাদের সাথে। বলা ভালো, আমার সাথে। রঞ্জু বা অন্য কারো সাথে উনার তেমন সখ্যতা হয় নাই কখনো। কেন হয় নাই সেইটা অবশ্য আমি জানি না। রঞ্জু উনারে যথেষ্টই আদর করতেন। কিন্তু আমি শুইতে গেলে উনি আমার পেট, আমার মাথার উপরই নিজের ঘুমের আয়োজন করতেন, আমি বাথরুমে ঢুকলে এমন কান্নাকাটি লাগাইতেন যেন মনে হইতো উনার জীবনে দুঃখের আর শেষ নাই, আমি বাসায় ঢুকলে এমন লাফালাফি শুরু করতেন যেন গত চার বছর উনি আমারে দেখেন নাই!

গায়ারে আমার কোনোদিনই বিড়াল মনে হয় নাই। মনে হইতো একটা ছোট সাইজের হিংসুটি মানুষ, কোনোভাবে বিড়ালের কুচকুচা কালো লোমওয়ালা গায়ে আটকায় গেছেন। আমি উনারে কম মারি নাই, ভোর চারটার সময় আমারে উঠানোর জন্য পা চাটাচাটি শুরু করলে পাশের ঘরে উনারে ফালায়ে রাইখা কম দরজা আটকাই নাই, আমার খাতাপত্র, সোফার কাভার, পর্দা, বালিশ খামচাইয়া চামড়া উঠানোর অপরাধে উনার গায়ে আমি কম পানি স্প্রে করি নাই। কিন্তু এতকিছুর পরেও উনার আমার উপর রাগ এবং অভিমান পর্বের মেয়াদ হইতো বড়জোর দুই ঘণ্টা। আমি উনারে কইতাম, ‘তোমার মত নির্লজ্জ বিড়াল তো আগে দেখি নাই বাবা!’ এই কথায় উনি আইসা নাক ঘষতেন আমার গায়ে।

গায়া, লন্ডন ২০১৩

গায়ারে হিংসুটি বলার কারণ আছে। আমার আশেপাশের কাউরেই উনি, তা উনি বিড়াল কুকুর বাচ্চা মানুষ আস্ত মানুষ যাই হন না কেন—কাউরেই তেমন সহ্য করতে পারতেন না। আমি আর রঞ্জু হয়তো পাশাপাশি বইসা মুভি দেখতেছি। উনি কিছুক্ষণ হয়তো আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। পেট আকাশের দিকে দিয়া চার হাত পা উঠাইয়া আমার সাথে খেলার চেষ্টা করলেন। যদি দেখতেন আমার পাত্তা পাইতেছেন না, তখন গিয়া চড়াও হইতেন রঞ্জুর ঘাড়ে। রঞ্জুরে আঁচড়াইয়া, কামড়াইয়া রক্তারক্তি কইরা উনার এ্যাটেনশান জোগাড় হইলে, অর্থাৎ উনারে কোলে নিয়া আদর কইরা উনার প্রিয় চিরুনী দিয়া লোম আঁচড়াইয়া দেওয়া হইলে উনার পেটের ভাত হজম হইতো।

ভাত অবশ্য উনি খাইতেন না। উনার প্রিয় খাদ্য আমি যা যা খাই, তার সবই। অর্থাৎ—চকোলেট, আইসক্রিম থিকা শুরু কইরা স্ট্রবেরি, আম, তরমুজ, বিস্কিট, চানাচুর, চিকেন উইংস, কালোজাম, ফ্রায়েড রাইস এই সমস্তই উনার খাদ্যতালিকায় ছিলো। আমার ভেট বার বার না করছেন বিড়ালরে ক্যাটফুড ছাড়া কিছু না দিতে। বিড়ালের স্টমাক মানুষের খাবার প্রসেস করার মত স্টমাক না। আমি আর ভেটরে বলি নাই উনার স্টমাক এরমধ্যেই কী কী জিনিস হজম কইরা ফেলছে! বলি নাই যে একবার উনি বাসায় পার্টি চলাকালীন আধা বোতল লাল ওয়াইন খায়ে ব্যাঁকা ব্যাঁকা হাঁটছিলেন খুব। অবশ্য আমার দেখার ভুলও হইতে পারে। বাকি আধা বোতল আমার পেটেই ছিলো তখন।

গায়ারে রঞ্জুর কাছে প্রথমবারের মত একলা রাইখা আমি তিনদিনের জন্য প্যারিস গেছিলাম একটা কাজে। আমার রেগুলার দিনের রুটিন উনি জানতেন। সকালবেলা বাসা থিকা বাইর হওয়ার সময় উনি আমার পিছ পিছ মেইন দরজা পর্যন্ত আসতেন, এরপর দৌড়াইয়া চইলা যাইতেন জানলার কাছে, যেইখান থিকা আমার যাওয়ার রাস্তা দেখা যায়।

আমি মোড় ঘুরার আগ পর্যন্ত দেখতাম পিছনের দুইপায়ে ভর দেওয়া কালো একটা বিড়ালের মাথা আর তিনকোনা দুইটা কান উঁচা হইয়া আছে। আমি বাসায় আসার আগেই আবার উনি সেই জানলায় ফেরৎ আসতেন, প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা নাগাদ। দরজায় চাবি মোচড় দেওয়ার আগেই উনি কান্নাকাটি কইরা দরজার হাতল ধইরা ঝুইলা লাফাইতে থাকতেন। ভাবখানা এমন যে উনার জরুরী ট্রেন মিস হইয়া যাবে এখনই দরজা না খুললে! তো প্যারিস থিকা তিনদিন পরে যখন ফেরৎ আসছি, তখন বাসায় ঢুকতে ঢুকতে দেখলাম—যথারীতি উনি কান লম্বা কইরা জানলায় বসা। আমি পকেট থিকা চাবি বাইর করলাম, চাবি ঘুরাইলাম তালার ফুটায়, দরজা খুললাম, উনার সাড়া শব্দ নাই। আমি লাগেজ সামলাইতে সামলাইতে ভাবলাম, কাহিনী কী? সব ঠিক আছে তো?

গায়া

বাসায় ঢুইকা উনারে ডাকি, উনি আমার কাছে আসেন না। খাওয়া দিলাম, তাও আসেন না। উনার জন্য প্যারিস থিকা আমি ক্যাটনিপ আর ঝুনঝুনিওয়ালা পাখির পালকের খেলনা নিয়া আসছি, সেইটার দিকে উনি একবার তাকাইয়া নবাবী চালে আমার সামনে দিয়া হাঁইটা গিয়া রঞ্জুর কোলে উইঠা বসলেন। ঘণ্টা দুয়েক পরে যখন উনার মনে হইলো আমারে যথেষ্ট শাস্তি দেওয়া হইছে উনারে ফালায়ে রাইখা যাওয়ার জন্য, তখন আমার কোলে উইঠা আমার আঙুল কামড়াইয়া আমারে গত তিনদিনে কী কী হইছে তার গল্প শুনাইলেন। আমিও উনারে বললাম প্যারিসে কী কী দেখছি।

আজকে আমি উনারে রাইখা ঢাকা যাইতেছি লম্বা সময়ের জন্য। কীভাবে জানি উনিও মনে হয় সেইটা বুঝতে পারছেন। উনি টিপু সুলতানের মত বিছানায় বালিশে হেলান দিয়া কাইত হইয়া শুইয়া ছিলেন। আমি পাসপোর্ট আর ই-টিকেট হাতে চেয়ারে বইসা আছি, কী মনে হইতে বালিশ ফালায়ে উইঠা আইসা আমার হাঁটুর উপর সামনের দুই পায়ে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া চোখ বড় বড় কইরা তাকাইয়া মনে হয় আমারে বললেন, বেশি দেরি কইরো না কিন্তু!

আমিও বললাম, ‘বেশি দেরি হবে না আম্মাজান!’

জানি না কত দেরি হবে!

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।