একজন ব্যক্তি কতক্ষণ জেগে থাকে তার সাথে রাতে সে কতটুকু স্বপ্ন দেখবে তার যোগসূত্র রয়েছে।

১৯৬২ সালে মিশেল সিফ্রে নামের এক ফরাসি স্পেলিওলজিস্ট দুই মাস ভূগর্ভস্থ এক গুহায় সম্পূর্ণ একাকী বাস করেছিলেন। ঘড়ি, ক্যালেন্ডার এমনকি সূর্য থেকেও তিনি বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিনি তখনই খেতেন আর ঘুমাতেন যখন তার শরীর চাইত। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সময় নিরপেক্ষভাবে বসবাস করলে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কি হত সেটা আবিষ্কার করা।

পরবর্তী দশকে সিফ্রে মাটির নিচে একাকী থাকা বিষয়ক প্রায় ডজনখানেক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান। শেষমেশ ১৯৭২ সালে তিনি টেক্সাসের একটি গুহায় ছয় মাসের জন্যে অবস্থান নেন।

তার গবেষণাগুলো “হিউম্যান ক্রনোবায়োলজি” এর ক্ষেত্র সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। আমেরিকান সাংবাদিক ও লেখক যশোয়া ফয়ার ই-মেইল এর মাধ্যমে সিফ্রে’র এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন। অনুবাদ. দীপ্র আসিফুল হাই।

গুহামানব মিশেল সিফ্রে’র সাক্ষাৎকার

যশোয়া ফয়ার

১৯৬২ সালে আপনার বয়স ছিল মাত্র তেইশ বছর এই বয়সে ঠিক কী কারণে আপনি তেষট্টি দিন সম্পূর্ণ একাকি মাটির নিচে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলেন?   

মিশেল সিফ্রে

আপনাকে বুঝতে হবে যে আমি ছিলাম একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভূ-বিজ্ঞানী। ১৯৬২ সালে আমরা আল্পস-এ একটি ভূগর্ভস্থ গ্ল্যাসিয়ার (বিশাল আকৃতির চলমান বরফের স্তর) আবিষ্কার করি। এটি ছিল নিস থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূরে। প্রথমে আমার ইচ্ছে ছিল একটা ভূ-তাত্ত্বিক অভিযান চালানো। সেই সাথে প্রায় পনের দিন মাটির নিচে থেকে গ্ল্যাসিয়ারটিকে পর্যবেক্ষণ করা।

কিন্তু কয়েক মাস পরে আমার মনে হল পনের দিন আসলে যথেষ্ট নয়। এত অল্প সময়ে আমি কিছুই পর্যবেক্ষণ করতে পারব না। তাই আমি দুইমাস থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। আর তখনই আমার মাথায় এই চিন্তাটি এলো, এমন এক চিন্তা যা আমার জীবনের প্রধানতম চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়। আমি ঠিক করলাম মাটির নিচে একদম পশুর মত জীবন কাটাব। ঘড়ি ছাড়া, অন্ধকারে সময়ের কোনো হিসাব না রেখেই।

যশোয়া

গুহা পর্যবেক্ষণ বাদ দিয়ে আপনি সময় পর্বেক্ষণ করতে বসলেন!

মিশেল

হ্যাঁ, আমি একটা সহজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করলাম। গুহার প্রবেশ মুখে আমি একদল মানুষ রাখলাম। আমি ঠিক করলাম ঘুম থেকে উঠে, খাওয়ার সময় আর ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি তাঁদেরকে ডাক দিব। আমার দলের লোকদের আমাকে ডাকার অনুমতি ছিল না, যেন আমি বাইরের সময় সম্পর্কে কোনো ধারণা না পাই। এইভাবে সময় সম্পর্কে ধারণা হারিয়ে ফেলার মাধ্যমেই আমি হিউম্যান ক্রনোবায়লজির ক্ষেত্রটি সৃষ্টি করেছি। বহু আগে, ১৯২২ সালের দিকে আবিষ্কৃত হয়েছিল যে ইঁদুরের দেহে অভ্যন্তরীণ বায়োলজিকাল ঘড়ি আছে। আমার গবেষণার ফলে দেখা যায় মানুষেরও নিম্নশ্রেণীর স্তন্যপায়ীদের মত একটি ‘বডি ক্লক’ অর্থাৎ ‘দেহ ঘড়ি’ আছে।

ভূগর্ভে প্লেটোর বই পড়ছেন সিফ্রে
যশোয়া

আপনি প্রথমবার যখন ভূগর্ভে থাকতে যান তখন তাপমাত্রা ছিল হিমাংঙ্কের নিচে। আর আর্দ্রতা ছিল আটানব্বই পার্সেন্ট। এমন পরিবেশে আপনি কীভাবে সময় অতিবাহিত করতেন?

মিশেল

আমার সরঞ্জামগুলোর অবস্থা ছিল করুণ। সাথে ছিল একটি ক্যাম্প যার মধ্যে অসংখ্য জিনিস ঠাসা ছিল। আমার পায়ের পাতা সব সময় ভিজে থাকত, আর দেহের তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট)-এ নেমে গিয়েছিল।

আমার সময় কাটত পড়াশুনা, লেখালেখি আর গুহার ভিতরে গবেষণা করে। এছাড়াও আমি নিয়মিত দুইটি পরীক্ষা করতাম। প্রথমত, আমি আমার পালস দেখতাম। দ্বিতীয়টি ছিল মানসিক পরীক্ষা। আমি ১ থেকে ১২০ পর্যন্ত গুনতাম। প্রতি সেকেন্ডে একটি করে সংখ্যা গুনতাম। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আবিষ্কার করি। এইভাবে ১ থেকে ১২০ পর্যন্ত গুনতে আমার পাঁচ মিনিট সময় লাগে। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমার মানসিক অভিজ্ঞতায় এই পাঁচ মিনিটকে মনে হয় দুই মিনিটের সমান।

যশোয়া

সাইকোলোজিস্ট এলিজাবেথ লফটাস একটা পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি কয়েকজন ব্যক্তিকে একটি ব্যাংক ডাকাতির ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে জানতে চেয়েছিলেন পুরো কাজটি করতে কত সময় লেগেছিল। তাঁরা অনুমান করতে গিয়ে এমনকি ৫০০ গুণ বেশি সময় বলেছিল। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে সময় বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা ব্যক্তিভেদে খুবই ভিন্ন। ঘড়িবিহীন অবস্থায় সময় অতিবাহিত হওয়া নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?

মিশেল

সময়জ্ঞান নিয়ে আমার ভিষণ উদ্বেগ ছিল। আমি গুহায় প্রবেশ করি জুলাইয়ের ১৬ তারিখে। আমার পরিকল্পনা ছিল সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে গবেষণা শেষ করব। যখন গুহার উপরে অবস্থানকারী দলটি জানাল শেষ দিনটি এসে গেছে, আমার মনে হচ্ছিল মোটে আগস্টের ২০ তারিখ এসেছে। আমার বিশ্বাস ছিল যে আমাকে আরো একমাস গুহায় থাকতে হবে। মানসিকভাবে আমার সময়জ্ঞান ২ গুণ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল।  

যশোয়া

এই যে আপনার মানসিক সময় আর ঘড়ির সময়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হল এর কারণ কি বলে মনে হয়?

মিশেল

এটি একটি বিশাল প্রশ্ন। আমি গত চল্লিশ বছর ধরে এর উত্তর খুঁজছি। গুহাটি ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকার। মনে হত আমাকে ঘিরে আছে রাত। আমার মনে হয় এরকম রাতের মত অন্ধকার অবস্থায় আমাদের স্মৃতি সময়কে ধরে রাখে না। এরকম অবস্থায় যে কেউ সময়ের কথা ভুলে যাবে। এক বা দুই দিন পরেই আর মনে থাকে না আগের দিন বা তারও আগের দিন কি করেছি। একমাত্র যে পরিবর্তন টের পাই তা হল কখন ঘুমাতে যাই আর কখন ঘুম থেকে উঠি। এছাড়া বাকি সব কিছুই অন্ধকার। মনে হবে যেন পুরো সময়টি একটি মাত্র দীর্ঘ দিন।  

যশোয়া

এই ধরণের একাকী গবেষণা তো যেকোনো ল্যাবরেটরিতেই করা যায়। আপনি কেন সব সময় এই ধরণের কাজ ভূগর্ভে করেন?

সিফ্রে নিজের ওজন পরীক্ষা করে দেখছেন
মিশেল

ল্যাবরেটরি অবশ্যই এই ধরণের গবেষণার জন্যে আদর্শ জায়গা। কিন্তু আপনাকে এমন মানুষ খুঁজে বের করতে হবে যে সত্যিই আগ্রহী। মানুষজনকে কয়েকমাস ল্যাবরেটরি ক্যাপসুলে থাকতে বলাটা বেশ ঝামেলার।

১৯৬২ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে এক জার্মান প্রফেসর দেড়শো’র উপর একাকী থাকার গবেষণা করেছেন মাটির নিচে কৃত্রিম বাঙ্কারে। কিন্তু এগুলো ছিল স্বল্পকালীন গবেষণা। বড়জোর এক মাসের মত। আমরা ভূগর্ভে যাদের নিয়ে গিয়েছিলাম তাঁরা ছিল প্রধাণত স্পেলাঙ্কার (যারা গুহা আবিষ্কার বা এই বিষয় নিয়ে কাজ করে), এবং গুহা বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ ছিল। এই কারণে অনেক বেশি দিন থাকতে তাঁদের সমস্যা হয় নি।

যশোয়া

আপনি মাটির নিচে সম্পূর্ণ একাকী ছিলেন এবং কৃত্রিমভাবে সময় মাপার কোনো সুযোগ ছিল না। আপনি তখনই ঘুমিয়েছেন যখন আপনার শরীর চেয়েছে এবং কতক্ষণ ঘুমাবেন তাও ঠিক করেছে আপনার শরীর। তাই বলা যায় যে আপনি নিখুঁতভাবে ঘুমিয়েছেন। ব্যাপারটি কেমন ছিল?

মিশেল

আমার ঘুম ছিল নিখুঁত। আমার দেহই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কখন ঘুমাবে আর কখন খাবে। মাটির উপরে মানুষ যেমন চব্বিশ ঘণ্টার চক্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘুমায় আমার ঘুম সেরকম ছিল না। বরং চক্রটা কিছুটা দীর্ঘ ছিল। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হল আমরা প্রমাণ করেছি যে একটি অভ্যন্তরীণ ঘড়ি আছে যা ভূ-ভাগের উপরকার দিন/রাতের চক্র থেকে আলাদা। মজার ব্যাপার হল পরবর্তী গবেষণাগুলোতে আমি অন্য যেসব সহগবেষককে নিয়ে গেছি তারা সবাই চব্বিশ ঘণ্টার চক্রের চেয়ে বেশি সময় বোধ করেছে। এমনকি আটচল্লিশ ঘণ্টার চক্রে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াটাও তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। তারা ছত্রিশ ঘণ্টা কাজ করত আর বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা একটানা ঘুমাত।

এই আবিষ্কারটি করার পর ফরাসী সেনাবাহিনী আমাকে প্রচুর অর্থ দিয়েছিল। তারা আমাকে বলেছিল একজন সৈন্য কীভাবে জেগে থেকে কাজ করার সময় বৃদ্ধি করতে পারে তা বের করার জন্যে।

যশোয়া

আপনি কি আবিষ্কার করলেন?

মিশেল

আমার পরে আমি অন্য একজন লোককে চার মাস একটি গুহায় রাখি। তারপর এক নারীকে তিন মাসের জন্যে। ১৯৬৬ সালে আরেক ব্যক্তি ছয় মাস মাটির নিচে ছিল। এরপর আমরা চার মাসের আরো দুইটি পরীক্ষা চালাই। আমরা ঘুমের পর্যায়, আর-ই-এম (র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট/স্বপ্ন দেখার সময় চোখের পাতার স্পন্দন) এবং ঘুমের গভীরতা নিয়ে গবেষণা চালাই এবং আরেকটি ব্যাপার আবিষ্কার করি।

আমরা আবিষ্কার করি, একজন ব্যক্তি কতক্ষণ জেগে থাকে তার সাথে রাতে সে কতটুকু স্বপ্ন দেখবে তার যোগসূত্র রয়েছে। সোজা কথায় বললে, কেউ যদি অতিরিক্ত দশ মিনিট জেগে থাকে, তাহলে সে অতিরিক্ত এক মিনিট স্বপ্ন দেখবে।

আমরা আরো আবিষ্কার করি, একজন ব্যক্তি যত বেশি সময় ধরে স্বপ্ন দেখবে, পরেরদিন তার জেগে থাকার সময়ও ততই দীর্ঘ হবে। আমরা এই আবিষ্কারটি করার পর ফরাসী সেনাবাহিনী এক ধরণের ড্রাগ আবিষ্কারের চেষ্টা করে যা ঘুমানোর সময় স্বপ্ন দেখার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। তাদের ইচ্ছে ছিল এর মাধ্যমে সৈন্যরা ত্রিশ ঘণ্টা কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় জেগে থাকতে পারবে।

১৭৭২ এর ওই গবেষণাটিতে সিফ্রে তার মাথায় ইলেকট্রোড লাগিয়ে রাখতেন, এই ইলেকট্রোডগুলি তার হৃৎপিন্ড, মস্তিষ্ক এবং মাংসপেশীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করত
যশোয়া

আপনার প্রথম গবেষণার দশ বছর পরে আপনি আবার ভূগর্ভে ফিরে গেলেন ২০৫ দিনের জন্যে। এইবার টেক্সাসের ডেল রিও এর পাশে ‘মিডনাইট কেইভ’-এ। আবার কেন এই কাজটি করলেন?

মিশেল

এর দুটো কারণ ছিল। প্রথমত, আমি মানসিক সময়ের উপর বয়সের প্রভাব বুঝতে আগ্রহী ছিলাম। আমার পরিকল্পনা ছিল প্রতি দশ কিংবা পনের বছর পর পর পরীক্ষা করে দেখা যে আমার মস্তিষ্কের সময় ধারণ করার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন এলো কিনা।

দ্বিতীয়ত, যাদেরকেই আমি মাটির নিচে পাঠিয়েছি তাদের মধ্যে আমি ছাড়া বাকি সবাই-ই আটচল্লিশ ঘন্টার ঘুম-জাগরণ চক্র আয়ত্ত্ব করেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিই আমি ছয় মাস মাটির নিচে থাকব আর আটচল্লিশ ঘণ্টার চক্রটি আয়ত্ত্ব করব।

যশোয়া

বাকিরা কেন এই আটচল্লিশ ঘণ্টার চক্রে পড়ল?

মিশেল

আমার কাছে এই বিষয়ে কোনো তত্ত্ব নেই। আমি তত্ত্ব বানাই না। আটচল্লিশ ঘণ্টার চক্রটি হলো একটি ঘটনা। আমি ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করেছি। এটি যে ঘটে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু কেউই জানে না কেন এমন ব্যাপকভাবে ঘুম-জাগরণ চক্রের ছন্দ পতন ঘটে।

আর স্নায়ু যুদ্ধের দিন যেহেতু শেষ, তাই এখন সেনাবাহিনীর তরফ থেকে অর্থ সাহায্য পাওয়াটা বেশ কঠিন। বর্তমানে শুধুমাত্র গণিতবিদ আর ফিজিওলজিস্টরাই এই বিষয়ে অধিকতর গবেষণা করতে পারেন।

যশোয়া

আপনি প্রথমবার ভূগর্ভস্থ গবেষণা চালিয়েছিলেন ১৯৬২ সালে। ওই একই বছর কিউবান মিসাইল সংকট পৃথিবীকে বম্ব-শেল্টার সম্পর্কে ব্যাপকভাবে সচেতন করে তোলে। আবার তার পরের বছরই ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে যান। এই দুটি ঘটনা কীভাবে ভূগর্ভ সম্বন্ধে আমাদের চিন্তা ভাবনাকে পরিবর্তন করেছিল?   

মিশেল

আমি একদম সঠিক সময়ে কাজটি শুরু করেছিলাম। তখন স্নায়ু যুদ্ধ চলছিল। আমরা মহাকাশে মানুষের ঘুমের চক্র সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। শুধু যে আমেরিকা আর রাশিয়ার মধ্যে কে আগে মহাকাশে মানুষ পাঠাবে তা নিয়ে প্রতিযোগীতা চলছিল তা নয়, ফ্রান্সও তখন তাদের নিউক্লিয়ার সাবমেরিন প্রোগ্রাম সবে শুরু করেছে। ফরাসী হেডকোয়ার্টার সাবমেরিনারদের ঘুমের সময়সূচি নির্ধারণ করা সম্বন্ধে কিছুই জানত না। সম্ভবত এই কারণেই আমি এত বেশি পরিমাণে অর্থ সাহায্য পেয়েছিলাম। নাসা ১৯৬২ সালে আমার প্রথম গবেষণাটি পর্যবেক্ষণ করেছিল এবং গাণিতিক বিশ্লেষণের জন্যে টাকা দিয়েছিল।

যশোয়া

কেন আমরা ভূগর্ভ নিয়ে কৌতুহূল বোধ করি আবার ভয়ও পাই?

মিশেল

ভূগর্ভ অন্ধকার। এখানে থাকতে গেলে আপনার আলো প্রয়োজন। আর যদি কোনো কারণে আলো নিভে যায় তাহলে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত। মধ্য যুগে বিশ্বাস করা হতো গুহায় পিশাচরা বাস করে। আবার একইভাবে গুহা হল আশ্বাসের জায়গা। আমরা গুহায় প্রবেশ করি খনিজ ও গুপ্তধন খুঁজে পাওয়ার আশায়। এটাই আমাদের জন্যে শেষ স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম যেখানে এখনও অ্যাডভেঞ্চার ও নতুন কিছু আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে।

যশোয়া

আপনি নতুন শতককে স্বাগত জানিয়েছেন ভূগর্ভের ২,৯৭০ ফুট নিচে ‘ক্ল্যামাউস কেইভ’-এ। কিন্তু আপনি প্রায় সাড়ে তিন দিন দেরি করে ফেলেছিলেন। আপনি আপনার একষট্টিতম জন্মদিনও মিস করেছেন। কেন আবার ভূগর্ভে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে আপনার প্রায় তিন দশক সময় লাগল?

মিশেল

আমি যখন ১৯৭২ সালে মিডনাইট কেইভ থেকে বের হয়ে আসি তখন আমার মাথায় ১০০,০০০ মার্কিন ডলারের ঋণের বোঝা। আমি গবেষণাকে ফ্রান্স থেকে টেক্সাসে নিয়ে আসার খরচের দিকটিকে খুব বাজে ভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলাম। আমাকে ক্রনোবায়োলজির ফিল্ড থেকে সরে আসতে হয়। এই গবেষণায় আমি যত তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম তার বেশিরভাগই গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণের বাকি ছিল।

১৯৯৯ সালে আমি সিদ্ধান্ত নিই ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুহায় প্রবেশ করব। আমি সেখানে দুই মাস ছিলাম। সার্কাডিয়ান সাইকেল (২৪ ঘণ্টায় মানুষের ঘুম আর জেগে থাকার সময়ের চক্র) নিয়ে গবেষণা করছিলাম। আমি জন গ্ল্যান’র পথ অনুসরণ করছিলাম যিনি সাতাত্তর বছর বয়সে মহাকাশে ফিরে গিয়েছিলেন।

যশোয়া

আমি জানি আপনি “পার্মানেন্ট সাবটেরানিয়ান স্টেশন ফর হিউম্যান কনফাইনমেন্ট এন্ড ক্রনোবায়োলজি এক্সপেরিমেন্টস” নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়া আর কিছু কি করছেন?    

মিশেল

গুহার মধ্যে গবেষণা শেষ। আর এই ধরণের গবেষণা করার সুযোগ নেই। যখন প্রথমবার করেছিলাম তখন ছিলাম যুবক। তাই সব ধরণের ঝুঁকিই নিয়েছিলাম। বর্তমানে গবেষকদের অভাব রয়েছে। সেই সাথে আছে নৈতিকতার প্যানেল। আপনাকে একটি উদাহরণ দিই।

আমার পরে ১৯৬৪ সালে দ্বিতীয় যে ব্যক্তি ভূগর্ভে গিয়েছিল তার সাথে ছিল একটি মাইক্রোফোন। একবার সে টানা তেত্রিশ ঘণ্টা ঘুমিয়েছিল। আমরা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না সে বেঁচে আছে কি না। এই প্রথমবার আমরা কোনো মানুষকে এতক্ষণ ঘুমাতে দেখলাম। আমি ভাবছিলাম গুহায় নেমে দেখব কি না কি হল। চৌত্রিশ ঘণ্টা পরে তার ঘুম ভাঙার আওয়াজ পেলাম। বুঝলাম সে বেঁচে আছে। কয়েক মিনিট পরে সে আমাদের ডেকে বলল তার পালস দেখার জন্যে।

ব্যাপারটি এখনকার সময়ে ঘটলে ডাক্তাররা তাঁকে ডেকে তুলতেন, কারণ বিষয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

যশোয়া

আপনি কি আটচল্লিশ ঘণ্টার চক্র আয়ত্ত্ব করতে পেরেছিলেন?

মিশেল

হ্যাঁ। ১৯৭২ সালে টেক্সাসে দুইবার আটচল্লিশ ঘণ্টার চক্র ধরতে পেরেছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটি নিয়মিত হয় নি। আমি ছত্রিশ ঘণ্টা জেগে থাকার পর বারো ঘণ্টা ঘুমাতাম। চব্বিশ ঘণ্টার সময়সূচি আর আটচল্লিশ ঘণ্টার সময়সূচির মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য টের পেতাম না। গুহায় অবস্থান করার সময় আমি যে ডাইরি লিখেছিলাম সেটিতে প্রতিটি চক্রের কথা পড়েছি। কিন্তু কোথাও এমন কোনো চিহ্ন নেই যা থেকে বোঝা যায় যে আমি কোনো পার্থক্য টের পেয়েছিলাম।

মাঝে মধ্যে আমি দুই ঘণ্টাও ঘুমাতাম আবার আঠারো ঘণ্টাও ঘুমাতাম। কিন্তু এতেও আমি কোনো পার্থক্য টের পেতাম না। আমার বিশ্বাস এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যা আমাদের সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে এটি হল আমাদের মনের সময় বিষয়ক রহস্য। এটি মানবজাতির রহস্য। সময় আসলে কি? আমরা সত্যিই জানি না।

সূত্র. কেবিনেট ম্যাগাজিন