অ্যালোপিশিয়া আরিয়েটা হলো চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যা।

বয়স বাড়ার সাথে সাধারণত জৈবিক কারণেই চুল পাতলা হয়ে যায় এবং পড়তে শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে অল্প বয়সেই চুল পড়া শুরু হয়। খুশকি, রুক্ষতা এবং অনেক বেশি পড়তে থাকার মত সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ হতে পারে পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব কিংবা কোনো রোগ বা স্বাস্থ্যসমস্যা। তখন আপনি কী করবেন? এর সমাধানে ১০টি জিনিস কাজে আসতে পারে, তা নিচে থাকছে।

পেঁয়াজের রস

পেঁয়াজের কথা বলার কারণ হলো, এতে থাকা সালফার চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই বিষয়ে অত গবেষণা নেই, কিন্তু অ্যালোপিশিয়া আরিয়েটায় আক্রান্ত কিছু লোককে নিয়ে একটা ছোটখাটো গবেষণা করা হয়েছিল। অ্যালোপিশিয়া আরিয়েটা হলো চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যা।

তাদের অর্ধেক লোকেরা প্রতিদিন দুবেলা করে মাথায় পেঁয়াজের রস লাগিয়েছিলেন, বাকিরা ট্যাপের পানি। ২ সপ্তাহ পর দেখা গেছে, ট্যাপের পানি ব্যবহার করা ১৩% লোকের তুলনায় পিঁয়াজের রস ব্যবহার করা ৭৪% লোকের মাথায় নতুন চুল গজিয়েছে।

আয়রন

এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি শরীরকে রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। আর এর পরিমাণ কমে যাওয়ার সঙ্গে চুল পড়ার সম্পর্ক আছে। ঠিক কেন এমন হয় তা এখনো পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। তবু প্রতিদিনকার খাবার তালিকায় যথেষ্ট আয়রন সমৃদ্ধ খাবার রাখতে চেষ্টা করুন, যেমন মাংস, মাছ, মুরগি, হাঁস, ব্রোকোলি এবং সব ধরনের সবুজ শাক-সবজি।

আয়রন পিল খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। অতিরিক্ত আয়রন খেয়ে ফেললে বমি এবং কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। ডোজ হাই হলে অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে।

বায়োটিন

অনেক ডাক্তারই চুল পড়ার ওষুধ হিসেবে বায়োটিন (অর্থাৎ ভিটামিন বি৭) দেন। তার ফলাফলও ভালো হয় (এমনকি আপনার ত্বকের জন্যেও)। সাপ্লিমেন্ট আকারে বায়োটিন নেওয়া নিরাপদ, তবু হয়ত খাবার থেকেই আপনি যথেষ্ট বায়োটিন পাচ্ছেন, আলাদা খাওয়ার আর প্রয়োজন নেই।

ডিম ও গমে থাকা জীবাণু এবং মাশরুমে প্রচুর পরিমাণে বায়োটিন থাকে। এগুলি মাথায় দেওয়ার ব্যাপারে অত ভাববেন না। প্রচুর হেয়ার প্রডাক্ট এই দাবি করে, তাদের প্রডাক্টে নাকি বায়োটিন আছে। যেটার কোনো প্রমাণ নেই।

জিংক

বাঁচিয়ে রাখার অধিকাংশ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় জিংক সাহায্য করে। এমনকি এটা যে মাথার ত্বকের নিচে থাকা ফলিকলেও শক্তি যোগায় তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

শরীরের জিংক সঞ্চয় করার কোনো উপায় নেই। ফলে আপনার প্রতিদিনই খাবার থেকে কিছু জিংক পেতে হবে। এর পরিমাণ যদি কম হয়, তাহলে জিংক মুখে খেলে চুল পড়া কমবে। এর প্রমাণও আছে, তবে আরো বেশি গবেষণা হওয়া প্রয়োজন এই বিষয়ে।

আর ডাক্তার হয়ত আপনাকে আগে অন্যান্য ট্রিটমেন্ট দিবেন।

স পালমেটো (saw palmetto)

একটা ছোট তালগাছের ফল থেকে এই হারবাল সমাধানটা আসে, যেটাকে মাঝেমধ্যে চুল গজানোর বিস্ময়কর ওষুধ বলে প্রতারণা করতে কাজে লাগানো হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটা পুরুষদের টেস্টোস্টেরন হরমোনের ভেঙে যাওয়া রোধ করতে পারে। যেটা চুল পড়া রোধ করতে পারে।

বিষয়টা এখনো পরিষ্কার না তাল এই কাজটা কীভাবে করে। তবে ভালো খবর হলো এটা নিরাপদ এবং অন্যান্য ওষুধ চলাকালীনও খাওয়া যাবে। দামও কম।

অ্যারোমা থেরাপি

১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চুল পড়া রোধে চন্দন, ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি এবং টাইম তেল ব্যবহার করা হচ্ছে। বলা হয় এগুলির মধ্যে থাকা কোনো একটা উপাদান চুল গজাতে সাহায্য করে। এই তেলগুলি থেকে আপনি যেকোনো একটা প্রতি রাতে ২ মিনিট মাথার তালুতে লাগাতে পারেন।

তারপর একটা গরম টাওয়েল মাথায় পেঁচিয়ে নিন যাতে মাথার ত্বক তেল শোষণ করতে পারে।

সিলিকন

এই উপাদানটি উচ্চমাত্রায় গ্রহণ করলে আপনার চুল পড়া কমাতে পারে। চুল দেখতেও সুন্দর করে সিলিকন। দোকানে বিভিন্ন ধরনের সিলিকন সাপ্লিমেন্ট পাবেন, তবে অর্থোসিলিসিক অ্যাসিড (ওএসএ) নামে একধরনের হাতে বানানো সিলিকন শরীরের শোষণ করার জন্যে সবচেয়ে ভালো। তারপরেও আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিন। সিলিকন সাপ্লিমেন্ট কতটা নিরাপদ তা এখনো জানা যায় নি।

সেলেনিয়াম

কিছু হেয়ার গ্রোথ সাপ্লিমেন্টে সেলেনিয়াম নামক একধরনের উপাদান থাকে। যা শরীরকে যেকোনো বিষাক্ত পদার্থের (যেমন সিগারেটের ধোঁয়া, বা অপরিষ্কার বাতাস) সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করে এবং চুলের ফলিকলকে ভালো রাখে। যদিও কম সেলেনিয়াম ধারণকারী ইঁদুররা টাক হয়ে যেতে শুরু করে, মানুষের ক্ষেত্রে তা এখনো সত্যি বলে প্রমাণিত হয়নি।‌ উল্টা, অতিরিক্ত সেলেনিয়ামের কারণে চুল পড়ে যেতে পারে, স্মৃতি শক্তিও কমে যেতে পারে।

মেলাটোনিন

মেলাটোনিনকে আপনি ‘স্লিপ হরমোন’ নামে চেনেন। অনেকে রাতে ভালো ঘুম হওয়ার জন্যে বা জেট ল্যাগ দূর করতে মেলাটোনিন খায়। তবে মেলাটোনিন যুক্ত ক্রিমও কিন্তু চুল পড়া কমাতে বা বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। এর কারণগুলি স্পষ্টভাবে জানা যায়নি এখনো।

কিন্তু একটা গবেষণায় দেখা গেছে, মাথার ত্বকে মেলাটোনিনের মিশ্রণ ব্যবহার করে ৩০ দিনের মধ্যে লোকেদের চুল পড়া কমে গেছে। মাথায় খুশকি থাকলে, সেটার ক্ষেত্রেও মেলাটোনিন সাহায্য করতে পারে। তবে যা’ই করুন যেকোনো সাপ্লিমেন্টের মতো এটা ব্যবহারের আগেও ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

কুমড়াবীজের তেল

কুমড়াবীজের তেল প্রতিদিন নিয়মিত খেলে নিরাপদভাবেই আপনার হারানো চুল ফেরত পেতে পারেন। এজন্যে আরো গবেষণা হওয়ার প্রয়োজন যদিও, একটা গবেষণায় দেখা গেছে যেসব পুরুষরা ৬ মাসের জন্যে প্রতিদিন ৪টা করে কুমড়াবীজের তেলের ক্যাপসুল খেয়েছে তাদের চুলের সংখ্যা ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে, পালমেটোর মতো কুমড়াবীজের তেলও টেস্টোস্টেরনকে ডিএইচটি নামক পদার্থে পরিণত হওয়া থেকে আটকায়। যেটা কিনা চুল পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গ্রিন টি

এর উপাদান থেকে তৈরি এক ধরনের নির্যাস চুল পড়ার মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দূর করতে পারে। গবেষকরা ইঁদুরদেরকে ৬ মাস টানা গ্রিন দিয়ে পরবির্তন লক্ষ করেন। এই গবেষণা এখনো মানুষের ওপর করা হয়নি।

তারপরেও গ্রিন টি’র সাপ্লিমেন্ট সাবধানে গ্রহণ করুন।

প্লেইটলেট-সমৃদ্ধ প্লাজমা (পিআরপি)

ডাক্তাররা মাঝে মাঝে সার্জারি পরবর্তী সময়ে রোগীর সেরে ওঠার জন্যে প্লেইটলেট-সমৃদ্ধ প্লাজমা (পিআরপি) ইনজেক্ট করে করেন। যেটা আপনার নিজের রক্ত থেকেই আসে। গ্রোথ ফ্যাক্টরে পরিপূর্ণ পিআরপি চুল গজাতে সাহায্য করে। আপনি অল্প রক্ত দিলে, ল্যাবে এটাকে সেন্ট্রিফিউজ করে প্লেইটলেট-সমৃদ্ধ প্লাজমা প্রোটিনে রূপান্তরিত করা হবে। তারপর তা ইনজেকশন আকারে আপনার মাথার তালুর বিভিন্ন জায়গায় দেয়া হবে। পিআরপি দেয়া বেশিরভাগ লোকের মাথায়ই নতুন চুল গজিয়েছে, এবং আগের থেকে ঘন।

অ্যামিনো অ্যাসিড

এগুলো প্রোটিনের জন্যে ‘বিল্ডিং ব্লক’। শরীরকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। সিস্টিন এবং এল-লাইসিনের মতো অ্যামিনো অ্যাসিডও চুলকে স্বাস্থ্যকর ও উজ্জ্বল রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু এগুলি সাপ্লিমেন্ট আকারে নেয়ার প্রয়োজন নেই। আপনাকে তা স্বাস্থ্যকর খাবার থেকেই পেতে হবে। এর ভালো উৎসগুলি হলো: কটেজ চিজ, মাছ, ডিম, বীজ এবং বাদাম, শস্যজাতীয় খাবার এবং মাংস।

স্মার্ট পদ্ধতিতে চুলের যত্ন

অনেক ক্ষেত্রে, ছোট খাটো কিছু পরিবর্তন এনেই চুল পড়া কমাতে পারবেন। চুল ধোয়া, শুকানো এবং আচড়ানোর কাজগুলি ধীরে বা আলতোভাবে করুন। স্ট্রেট এবং কার্ল করার মতো গরম যন্ত্রপাতি কম ব্যবহার করুন, এসব যন্ত্র চুলকে দুর্বল করে দেয়। শক্ত করে চুল বাঁধা, বেণি এবং ঝুটি করার কারণেও চুল দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

যদি ধূমপায়ী হন, তাহলে তা ছেড়ে দেওয়ার এখনই সময়। ধূমপায়ী পুরুষদের মাথায় ধূমপান না পুরুষদের তুলনায় কম চুল থাকে।

স্ট্রেস কমান

মানসিক চাপে থাকলে চুল পড়তে পারে আপনার। স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করে চুল পড়া রোধ করুন। মেডিটেশন, গভীর করে শ্বাস নেওয়া, গাইডেড ইমেজারি, রিল্যাক্সেশন এক্সারসাইজ বা কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলার মত পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করতে পারেন এক্ষেত্রে। ব্যায়ামও ভালো পদ্ধতি।

আর এগুলি শেখাও খুব সহজ এবং এদের মানসিক চাপ কমানোর প্রমাণ আছে।

মনে রাখবেন, আপনার চুল পড়ার জন্যে সবচেয়ে ভালো চিকিৎসাটা এর কারণের ওপর নির্ভরশীল। আপনার জন্যে কোনটা ঠিক তা জানতে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

সূত্র. ওয়েবএমডি